ক্যাটেগরিঃ মুক্তমঞ্চ

কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা এবং উদ্যোগকে সফল করার মধ্যে পার্থক্য করার জন্য কবি রবি ঠাকুরের লেখা থেকে একটি উদ্ধৃতি দিই- “শিক্ষ্যাসমস্যা” নামক একটি প্রবন্ধে তিনি বলছেন. ” … তিব্বতি মনে করে যে, লোক ভাড়া করিয়া তাহাকে দিয়া একটা মন্ত্রলেখা চাকা চালাইলেই পুণ্যলাভ হয় তেমনি আমরাও মনে করি, কোনোমতে একটা সভা স্থাপন করিয়া কমিটির দ্বারা যদি সেটা চালাইয়া যাই তবেই আমরা ফললাভ করিব।বস্তুত সেই স্থাপন করাটাই যেন লাভ।”

এরপর তিনি নিজের অভিজ্ঞতা প্রকাশ করে বলছেন : “আমরা অনেকদিন হইল একটা বিজ্ঞানসভা স্থাপন করিয়াছি, তাহার পরে বৎসরে বৎসরে বিলাপ করিয়া আসিয়াছি- দেশের লোকে বিজ্ঞান শিক্ষায় উদাসীন। কিন্তু একটা বিজ্ঞানসভা স্থাপন করা এক, আর দেশের লোকের চিত্তকে বিজ্ঞানশিক্ষায় নিবিষ্ট করা আর।সভা ফাঁদিলেই তাহার পরে দেশের লোক বিজ্ঞানী হইয়া উঠিবে এরূপ মনে করা ঘোর কলিযুগের কল-নিষ্ঠার পরিচয়।”

এক লেখায় বোধহয় তিনি বলেছিলেন,” আমরা আরম্ভ করি শেষ করিনা … … …।”

এই উদ্ধৃতি দেয়ার উদ্দেশ্য হচ্ছে, আমরাও মনে করি আমরা যেহেতেু একটি কাজ শুরু করেছি এবং তা সবার ভালোর জন্য সেহেতু আমাদের এই ভালো কাজের পেছনে হুড়হুড় করে সবাই আসবে, সবাই ভালো কাজকে প্রমংসা করবে …. …. ।

কিন্তু আসলে হয় তার উল্টো। আমরা কাজ শুর করি খুব উৎসাহ দিয়ে এবং মাঝখানে এসে আমরা চোখে সরষেফুল দেখি বা আশেপাশের নির্লিপ্ততা দেখে আমরা হতাশ হই। আমরা হতাশ-নিরাশ এবং পরে বিলাপ করতে থাকি শেষে ‘ভালো কাজ” করা থেকে ইতি দিয়ে নিজের ভালোর জন্য জানপরান সঁপে দিই।

এই বৈশিষ্ট্য যেমন রয়েছে আমাদের সাধারণ সকলের মধ্যে তেমনি আমরা যারা সমাজের জন্য কিছু করার চেষ্টা করি তাদের মধ্যেও। অথবা রবীন্দ্রনাথ যেমন বলেছেন, “দেশের লোকে বিজ্ঞান শিক্ষায় উদাসীন” এই উপসংহার টেনে নিজেকে প্রবোধ দেয়ার সর্বতো চেষ্টায় নিরত থাকি।

মূলতঃ এটাই সত্য যে, আপনি যে উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন সেই উদ্যোগ সফলও করতে হবে আপনাকে।এবং কিভাবে সফল করবেন তার কৌশল নির্ধারণ করাও তো আপনারই দায়িত্ব!

‘মন্ত্রের সাধন কিংবা শরীর পাতন’ এই মন্ত্র যদি আপনার থাকে কোনো কাজ হাতে নেয়ার ক্ষেত্রে তবে আপনি সফ ল হবেনই। মাও সেতুঙ যেমন বলেছিলেন, বোকা বুড়োর মতো হতে হবে, যে পাহাড় সরিয়েছিলো, যাকে দেবতারাই সহযোগিতা করেছিলো পাহাড় সরাতে! মাও সেতুঙ অন্ধ ভক্ত ছিলেন সেই দেবতাদের ।

তবে আমাদের কাছে এই সমস্যাটি আরো জটিল এবং তরল আাকারে আজ উপস্থিত হচ্ছে বলেই আমার কাছে মনে হয়েছে। আজকাল আমরা শুধু চিন্তাই করি, তা সমাজের জন্য,দেশের জন্য, বিভিন্ন উপলক্ষের জন্য। যেমন আজ ব্লগে ঢুঁ মেরে দেখলাম আমাদের অনেক ব্লগার লেখা লিখেছেন। একজন কোরবানীর ঈদে নাকি কোরবানী করার খাতে খরচ হয় মোট ২০ হাজার কোটি টাকা। রাশেদুজ্জামান নামে ব্লগারভাইয়ের লেখার শিরোনাম হচ্ছে “কোরবানির খরচ ২০ হাজার কোটি টাকা দিয়ে জনগণের কল্যাণে কী কী করা যেত?” তিনি এই ২০হাজার কোটি টাকা কোরবানীতে খরচ না করে তার কিছু অংশ জনকল্যাণ খাতে ব্যবহার করার পক্ষে মত দিয়েছেন। ব্লগার এহসান রাজনের লেখার শিরোনাম হচ্ছে, ‘বাংলাদেশে উচ্চ শিক্ষাঃ কেন এতো অবহেলা? ”

তিনি বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষা খাতে ব্যয় তেমন করা হয়না বলে মত দিয়েছেন। উপসংহার টেনে তিনি বলছেন, “ব্রিটিশদের কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া এই কেরানি তৈরির শিক্ষাব্যবস্থার জাল ছিন্ন করতে না পারলে হয়ত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার আমাদের সোনালী স্বপ্ন প্রতি পদক্ষেপে হোঁচট খাবে; উচ্চ শিক্ষার প্রতি আমাদের যে সুস্পষ্ট অবহেলা তা দূর করতে না পারলে হয়ত অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশ এটি মেধাহীন রাষ্ট্রে পরিণত হবে, যা কখনোই কারো কাছে প্রত্যাশিত নয়”।

ব্লগার সালেহ নোমানের লেখার শিরোনাম হচ্ছে “ত্যাগের শিক্ষা ঈদুল আযহা: ফিরে যেতে হবে ধর্মে”। তিনি তাঁর উপলব্ধি জানিয়ে বলছেন,”… সমাজের কোন স্তরেই নৈতিকতার শিক্ষা নেই। কোথাও কোন ধরনের অনুকরনীয় ব্যক্তিত্ব খুজে পাওয়া খুবই কঠিন।”

অর্থাৎ আমরা সবাই ভালো ভালো চিন্তা করছি এই সমাজের জন্য বা দেশের জন্য। কিন্তু চিন্তা করা, কোনো ভালো কিছু করার আকাঙ্খা প্রকাশ করা বা ভালো কিছু, মঙ্গলজনক কিছূ করার জন্য কল্পনা করার সাখে সাথে আমাদের সেই কল্পনাকে বাস্তবে রূপ দেয়ার জন্যও কি কিছু করার চেষ্টা থাকা সমীচীন নয়? এবং সেই বাস্তব রূপায়নের জন্য বাস্তবে সফল হবার জন্যই আমাদের কাজ করতে হবে।
অথচ এখন আমরা শুধু কল্পনাই করি ভালো কিছু করার জন্য।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে আমি এই কথাই বলতে চেয়েছি মাত্র।