ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

 

কর্নেল(অবঃ) কাজী নূর-উজ্জামান, যিনি বীর উত্তম খেতাব ত্যাগ করেছিলেন। এবং এই খেতাব বর্জন করার কারন হিসেবে তাঁর শেষ জীবনে লেখা ‘একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, একজন সেক্টর কমান্ডারের স্মৃতিকথা’ বইয়ে লিখেছিলেন,

সজ্ঞানে না হলেও এ বৃদ্ধা তার মনে দেশ ও ছেলেদের প্রতি ভালবাসার জন্য স্বেচ্ছায় ও স্বপ্রণোদিতভাবে কেন এ দায়িত্ব নিয়েছিল, আমার মতো ক্ষুদ্রমনা মানুষ তা বুঝে উঠতে পারিনি।এখন হয়তো অনেকে বুঝবেন কী কারণে আমি যুদ্ধে বীরত্ব প্রদর্শনের জন্য ‘বীর উত্তম’ পুরষ্কার গ্রহণ করতে পারিনি।এই ঝুপড়ির বৃদ্ধার মতো আরো অনেক সিভিলিয়ানের বীরত্বের প্রত্যক্ষদর্শী আমি। স্বাধীনতা যুদ্ধে আবালবৃদ্ধবনিতা সবাই সৈনিক। এই কারণেই স্বাধীনতা যুদ্ধে পেশাদার সৈন্যের মতো কাউকে বীরত্বের মেডেল দেওয়া হয়না। কাকে ছেড়ে কাকে দেওয়া হবে। এ পুরষ্কার অগণিত দেশবাসীর প্রাপ্য।”(সূত্রঃ একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, একজন সেক্টর কমান্ডারের স্মৃতিকথা; পৃষ্ঠা-৬০-৬১)।

তিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভোলাহাটে মুক্তিযো্দ্ধা ক্যাম্প পরিদর্শনে যান। এ সময় এক ঝুড়ি মাথায় নিয়ে এক বৃদ্ধা তাদের কাছে আসেন। তিনি পথের পাশে পেতে রাখা মাইন নিজের হাতে তুলে ঝুড়িতে ভরে এনেছিলেন। তিনি মাইন চিনতেননা। এই লোহা জাতীয় জিনিস মুক্তিযোদ্ধাদের পায়ে বিঁধতে পারে, তারা আহত হতে পারে এই ভেবেই তিনি এগুলো কুড়িয়ে এনেছিলেন।
আজীবন কর্নেল(অবঃ) কাজী নূর-উজ্জামান নিজের আদর্শকে উঁচুতে তুলে ধরে গেছেন।

তাঁর লিখিত উক্ত বইয়ে তিনি স্বাধীনতাযুদ্ধের আগে মধ্যবিত্তদের ভূমিকা নিয়ে নিজস্ব অভিজ্ঞতার একটি কাহিনী লিখে রেখে গেছেন। আমার এই অংশটি ব্লগ পাঠকদের কাছে শেয়ার করতে ইচ্ছে হলো। তিনি লিখেছেন,

অসহযোগ আন্দোলনের সময় শেখ মুজিবুর রহমান সাহেবের প্রতি বিভিন্ন সরকারী ও বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের আনুষ্ঠানিক আনুগত্য প্রকাশ করার হিড়িক পড়েছিল। সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারীদেরও একটি প্রমিষ্ঠান ছিল, যা কিনা এখনো RAOWA নামে পরিচিত।১৯৭১ সালের মার্চ মাসের কোন এক সময় এই প্রতিষ্ঠানে অবসরপ্রাপ্ত অফিসারবৃন্দ সমবেত হয়ে মিছিল করে শেখ সাহেবের প্রতি তাদের আনুগত্যের ঘোষণা দেয়। জানি না কেমন করে আমাকে বাদ দেয়া হয়েছিল। আমার অনুপস্থিতি অনেক বন্ধু-বান্ধবের নজরে আসে।তারা আমাকে সতর্ক করে দেয় যে অনুপস্থিতির ফলাফল আমার জন্য ভালো হবেনা।এই কথায় আমি দুঃখ পেয়েছিলাম।কিন্তু ‘৭১ এর স্বাধীনতা সংগ্রামে এই প্রতিষ্ঠানের একটি সদস্যকেও রণাঙ্গনে দেখতে পাওয়া যায়নি।
বাঙালী মধ্যবিত্ত সমাজের লোকদের কথায় ও কাজের মিল না থাক উপরোক্ত ঘটনায় পরিচয় দেয়। পরবর্তীকালে এ্ ধরণের অগনিত দৃশ্য দেখে এসেছি এবং এখনো সমাজে ও রাজনীতিতে দেখতে পাচ্ছি।

এই লেখাটির সাথে আমি আহমাদ ছফার একটি উদ্ধৃতিও এখানে যোগ না করে স্বস্তি পাচ্ছি না।
১৯৭২ সালে লেখা ‘বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস’ বইয়ে তিনি লিখেছিলেন,

“বুদ্ধিজীবীরা যা বলতেন, শুনলে বাংলাদেশ স্বাধীন হতো না। এখন যা বলছেন, শুনলে বাংলাদেশের সমাজ কাঠামোর আমূল পরিবর্তন হবে না। আগে বুদ্ধিজীবীরা পাকিস্তানী ছিলেন, বিশ্বাসের কারণে নয়-প্রয়োজনে। এখন অধিকাংশ বাঙালী হয়েছেন, সেও ঠেলায় পড়ে। কলাবরেটরদের মধ্যে এমন অনেকে আছেন যারা অন্ধভাবে হলেও ইসলাম পাকিস্তান ইত্যাদিতে সত্যি-সত্যি বিশ্বাস করতেন। আবার স্বাধীন বাংলাদেশে চতুস্তম্ভে জয়ধ্বনি দিচ্ছেন, এমন অনেক বুদ্ধিজীবী রয়েছেন, যারা জীবনে কোনো কিছুতে যদি নির্দ্বিধায় বিশ্বাস করতে পেরেছেন-সে বস্তুটির নাম সুবিধাবাদ। [পৃষ্ঠা ৯]

এরপর তিনি লিখেছেন, বাংলাদেশের জনগণই বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্থপতি। ঘটনা ঘটেছে ঘটনার নিয়মে। বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে তার কোনো তীক্ষ্ণ প্রতিক্রিয়া হয়নি। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে বুদ্ধিজীবীদের দান নগণ্য। বলতে গেলে বুদ্ধিজীবীদের সচেতন দিক নির্দেশনা ব্যতিরেকেই বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করতে পেরেছে। ‘চোর পালালে বুদ্ধি বাড়ে’-একটা কথা আছে, বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীদের ক্ষেত্রে তা আরো একবার সত্যে পরিণত হয়েছে। আসল ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর সকলে আপনাপন গর্ত থেকে শেয়ালের মতো বেরিয়ে সমস্বরে জয়ধ্বনি তুলেছেন। [পৃষ্ঠা ১১]”

মধ্যবিত্ত সমাজের মধ্যে বুদ্ধিবৃত্তির এই সুবিধাবাদ যতদিন থাকবে ততদিন কি আমরা এই বাংলাদেশের সকল কিছুতে ইতিবাচক মৌলিক পরিবর্তন আশা করতে পারি?