ক্যাটেগরিঃ প্রশাসনিক

রাঙামাটির সাজেক এলাকার সমসাময়িক কালের পরিচয় হলো এই এলাকা উঠতি এক পর্যটনের আকর্ষনীয় স্পট। এবং এখন এই বর্ষার সময়েও ছুটি পেলেই অনেকেই সাজেকে আসেন প্রকৃতির মোহে কিছুক্ষণ কাটানোর আস্বাদ পাবার জন্য। কিন্তু সাজেকের আরেক পরিচয় হলো- এই সাজেক বিস্তীর্ণ একসময় রিজার্ভ ফরেস্ট বা সংরিক্ষত বন ছিলো। কিন্তু কালক্রমে আজ তার দশাপ্রাপ্তি ঘটেছে! আজ রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার এই সাজেক ইউনিয়নে ৫০ হাজারের অধিক জনগণ বসবাস করছে। এখন এখানে ইয়া বড় বৃহৎ গাছ দেখা যায় না। দেখা যায় না কোনো বন্যপ্রাণীর। কেন এই অবস্থা্ হলো সাজেকের তা নিয়ে কথা এখানে বললাম না।

আমার এই লেখা সাম্প্রতিককালে ঘটে যাওয়া ঘটনা নিয়ে। গত ২২ জুলাই সাজেকের গঙ্গারাম উজো বাজারের এলাকাবাসী একটি বুদ্ধমূর্তি নির্মাণ করার কাজে হাত দেয়। কিন্তু প্রশাসন তাতে বাধ সাধে। প্রশাসন এবং সেনা ফোর্স এবং ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট এতদিনের কুম্ভকর্ণ ঘুম থেকে উঠে এসে ‘আইনের উছিলা’ দেখিয়ে বুদ্ধমূর্তি নির্মাণ করা যাবে না বলে নির্দেশনা জারি করে। এ নিয়ে ২৩ জুলাই প্রশাসনের লোকজনের সাথে উক্ত এলাকার জনগণের বৈঠক হয়। এই বৈঠকে রাঙামাটি থেকে ম্যাজিস্ট্রেট, এডিসি উপস্থিত ছিলেন।

দীর্ঘ আলোচনার একপর্যায়ে প্রশাসন এলাকাবাসীর সাথে মৌখিক সমঝোতা করে এই মর্মে যে, এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করা হবে না, এছাড়া কোনো পুলিশ ফোর্সও এলাকায় রাখা হবে না। এই শর্ত যদি প্রশাসন মানে তবে এলাকাবাসী বুদ্ধমূর্তি নির্মাণ আপাতত বন্ধ রাখবে। তবে যদি প্রশাসন সমঝোতা লংঘন করে তবে জনগণ বুদ্ধমূর্তি নির্মাণকাজ শুরু করবে।

কিন্তু সেইদিন রাতেই প্রশাসন জনগণের কাছে দেয়া এই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে। তারা এলাকায় পুলিশ ফোর্স মোতায়েন করে। এতে এলাকাবাসী প্রশাসনের বিরুদ্ধে সমঝোতা লংঘনের অভিযোগ তোলে।

পরে ২৮ জুলাই এলাকাবাসী পাশের এক গ্রাম থেকে একটি আগে থেকেই বানানো বুদ্ধমুর্তি ধার করে এনে উক্ত জায়গা বসিয়ে দেয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে নিচের লেখা-
এখানে বলে রাখা প্রয়োজন, এলাকায় পথের পাশে বুদ্ধমূর্তি নির্মাণ করা হলে এলাকার সৌন্দর্য বৃদ্ধি পেতো, বেড়াতে আসা জনগণ আমোদিত আহ্লাদিত হতো। পর্যটকগণ আনন্দিত হতেন।

প্রশাসন সমঝোতা লংঘন করেছে, সাজেকবাসী নয়

যে স্থানে বুদ্ধমূর্তি নির্মাণ করা হবে সেখানে বেদীর উপর গত ২৮ জুলাই সকালে আগে থেকে বানানো (বলতে গেলে অন্য এক গ্রাম থেকে ধার করে সিয়ে আসা) ছোটো সাইজের একটি বুদ্ধমূর্তি রেখে দিয়ে এসেছে সাজেকের এলাকাবাসী। এ নিয়ে প্রশাসন খুব টানটান ভাব দেখানোর চেষ্টা করেছে। ভাবটা ছিলো যেন, বিরাট কিছু একটা ‘অপরাধ’ ‘আইনের লংঘন’ ঘটতে যাচ্ছে বা ঘটে গিয়েছে। কোনো এক মিডিয়ায় সাজেক পুলিশ থানা প্রশাসনের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে- যারা ‘সমঝোতা লংঘন’ করে ‘রিজার্ভ ফরেস্ট’ এলাকায় ‘বেআইনীভাবে’ বুদ্ধমূর্তি বসিয়ে দিয়েছে তারা ‘বহিরাগত’ এবং তাদের বিরুদ্ধে ‘মামলা’ দেয়া হবে ও ‘আইনগত ব্যবস্থা’ নেয়া হবে।

কিন্তু দ্ব্যর্থহীনভাবেই বলা যায়. সমঝোতা হয়েছিল ‘বুদ্ধমূর্তি নির্মাণ’ করা হবে না। তাই বলে আগে থেকে বানানো বুদ্ধমূর্তি অস্থায়ীভাবে সেখানে রেখে আসা যাবে না তা কিন্তু সমঝোতায় ছিলো না। সুতরাং সমঝোতা লংঘনের প্রশাসনিক অভিযোগ ধোপে টিকেনা। বরং একদল পুলিশ সাজেকের উজো বাজারে রেখে দিয়ে প্রশাসন নিজেই নিজেই সমঝোতা লংঘন করেছে মাত্র।

যাইহোক, বুদ্ধর্মর্তি বসিয়ে দিয়ে আসার পরে সাধারণ জনগণ সেখানে ধর্মীয় সভার আয়োজন করে। এ সময় যেসকল ভিক্ষূগণ উপস্থিত ছিলেন তারা হলেন- চিরসুখ ভিক্ষূ, জ্ঞানমিত্র ভিক্ষু, শ্রদ্ধারত্ন ভিক্ষু, রত্নশিরি ভিক্ষূ, মৈত্রীসার ভিক্ষু, মানবজ্যোতি ভিক্ষু, শীলপ্রিয় ভিক্ষু, সংঘদ্বীপ ভিক্ষূ, প্রিয়শ্রী ভিক্ষু, ত্রিরত্ন ভিক্ষু।

সাজেকের একজন জানালো, দুপুরে দীঘিনালা বনবিহার থেকে যখন ভিক্ষুগণ গাড়িতে করে সাজেকের উজো বাজারে ধর্মীয় সভায় অংশ নিতে আসছিলেন তখন বাঘাইহাট আর্মি চেকপোস্টে ভিক্ষুদের বহন করা গাড়ি বেশ কিছুক্ষণ থামিয়ে রাখা হয়। পরে অবশ্য ছেড়ে দেয়া হয়।
ধর্মীয় দেশনা অনুষ্ঠান

ধর্মীয় সভায় ভিক্ষুগণ সকল সমস্যা মৈত্রীময় চিত্তে ধীরস্থির শান্ত থেকে মোকাবেলা করতে পরামর্শ প্রদান করেন।

সাজেকবাসী রাঙামাটি এমপি উষাতন তালুকদারের ভূমিকা দেখতে চায়

শুধুমাত্র সাজেকবাসীই কি উজো বাজারে বুদ্ধমূর্তি স্থাপনের সরকারী বাধাদানের প্রতিবাদ করে যাবে? বিজিবি ক্যাম্প স্থাপন করে জুম্ম জনগণকে নিজ বাস্তুভিটা থেকে উচ্ছেদের পয়াসের প্রতিবাদ কি শুধু সাজেকাবাসী করে যাবে? সাজেকবাসী রাঙামাটি তথা পার্বত্য চট্টগ্রামের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি উষাতন তালুকদারসহ সকল জনপ্রতিনিধিত্বশীল নেতৃত্বের ভূমিকা দেখতে চায়। তারা সাজেকাবাসীদের ভূমি অধিকারের লড়াই তথা নাগরিক অধিকার ও ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষার লড়াইয়ে একাত্মতা প্রকাশ করবেন বলে সাজেকবাসীর প্রত্যাশা।

সতর্ক থাকুন! নানা প্রচারণা, ‘অপ’ প্রচারণা চলবে


সতর্ক থাকুন! সাজেকবাসীর লড়াইকে ভিন্নখাতে নিয়ে যেতে নানা প্রচারণা-অপপ্রচারণা চলবে!

যেকোনো লড়াইকে পরাজিত করতে শাসকগোষ্ঠী প্রথমে নৈতিকভাবে লড়াইকে আঘাত করে। লড়াইয়ের নৈতিক ভিত্তি ধ্বংস করতে সচেষ্ট থাকে। তারপর নানা বিভ্রান্তির সৃষ্টি করে লড়াইকে কানাগলিতে নিয়ে যেতে চেষ্টা করে। অথবা, মূল লড়াইয়ে দিকে যেন দৃষ্টি নিবদ্ধ না হয় তার জন্য নতুন কোনো পরিস্থিতি বা প্রেক্ষাপটের ‘আমদানি’ ঘটানোর চেষ্টা করে।

এবং সাজেকবাসীর জায়গা জমি বাচানোর লড়াই, নাগরিক অধিকার রক্ষার লড়াই, ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষার লড়াইকেও শাসকচক্র ভিন্নখাতে নিয়ে যেতে সচেষ্ট রয়েছে বলেই বোঝা যায়।

প্রথমে, সমঝোতা লংঘনের অভিযোগ তারা তুলেছে। একইসাথে ‘বহিরাগত’দের দিয়ে ‘সকল সমস্যা’ হচ্ছে বলে তারা প্রচার চালাচ্ছে। এছাড়া তারা সাজেকে ‘সন্ত্রাস’ হয়, সাজেকে ‘অস্ত্র’ পাওয়ার বা উদ্ধারের ‘কল্পিত’ ঘটনাও প্রচারে নিয়ে আসতে পারে!

লড়াইয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টির জন্য আরো নানা কিসিমের প্রচারণাও তারা করতে পারে! তারা সাজেকবাসী ‘অবৈধভাবে রিজার্ভ ফরেস্টের’ এলাকায় বসবাস করছে অভিযোগ তুলতে পারে। সাজেকবাসী ‘আইন মানে না’ ইত্যাদি অপপ্রচারণা চালাতে পারে! এছাড়া আরো কতো প্রকারের বিভ্রান্তি সৃষ্টি প্রয়াস তারা তো করতেও পারে! সুতরাং, সতর্ক থাকুন! সতর্ক হোন!

#Sajek #সাজেক আপেডেট
তারিখ: ০১ আগস্ট, ২০১৪

সময়: সকাল ৭.১০ টা