ক্যাটেগরিঃ নাগরিক মত-অমত

মায়ানমার বা বার্মার শান জাতিসত্তার একটি নীতি কাহিনী। প্রাচীনকালে ব্রহ্মদত্ত নামে এক রাজা ছিলেন। তার রাজ্য ছিলো শক্তিশালী ও বিরাট। তার পাশেই আরেকটি রাজ্য ছিলো। সেই রাজ্যটি শাসন করতেন দিঘিতি নামে এক রাজা। তার রাজ্য তেমন বড় ছিলো না, আর রাজ্যের শক্তিও ছিলো কম।

একসময় দুই রাজ্যের মধ্যে ঝগড়া ফ্যাসাদ বেঁধে যায়। প্রথমে দুই রাজ্য কূটনৈতিকভাবে কথা বলে ঝগড়া মীমাংসা করার চেষ্টা চালায়। কিন্তু তারপরেও ঝগড়ার মীমাংসা হয়নি। এক পর্যায়ে রাজা ব্রহ্মদত্ত চিন্তা করে যে, তার রাজ্য বড়, সৈন্য সামন্তও তার বেশি। সুতরাং, দিঘিতি রাজা তার সাথে পেরে উঠবে না। এ কথা ভেবে ব্রহ্মদত্ত রাজা আলোচনার নাম করে দিঘিতি রাজার বিরুদ্ধে সেনা অভিযান চালানোর উদ্যোগ নেয়্

দিঘিতি রাজার গুপ্তচররা সে খবর রাজা দিঘিতিকে দেয়। রাজা দেখলো, রাজা ব্রহ্মদত্তের সাথে তিনি পারবেন না। তিনি তার রানী দেভাকে বললেন,ব্রহ্মদত্ত রাজা আমাদের রাজ্যে হামলা চালাবেন। আমরা তার সাথে যুদ্ধে পারবো না। আমরা বরং, এই রাজ্যে না থেকে ব্রহ্মদত্ত রাজার রাজ্যের রাজধানীতে আশ্রয় নিই। তাদের রাজধানী অনেক বড় আর জনসংখ্যাও অগনিত। এত জনগণের মাঝে ব্রহ্মদত্ত রাজা আমাদের খুঁজে পাবে না। আমরা সেখানে গোপনে ছদ্মবেশ ধারণ করে থাকব।

এ কথা বলার পরে তারা স্বামী-স্ত্রী ও তাদের সন্তান দির্ঘায়ু বা দিঘাবুকে নিয়ে পালিয়ে ছদ্মবেশ ধারণ করে ব্রহ্মদত্তের রাজধানীতে বাস করতে লাগলেন।

এদিকে ব্রহ্মদত্ত রাজা দিঘিতি রাজ্য জয় করলেন। তিনি এরপরই দিঘিতিকে খুজতে লাগলেন।

বেশ কিছুদিনপরে দিঘিতি তার স্ত্রীর সাথে পরামর্শ করে তার পুত্রকে গোপনে অন্য জায়গায় পাঠালেন। যেন ব্রহ্মদত্ত তাদের খুজে পেলেও তাদের পুত্রকে কিছু করতে না পারে তার জন্যই তিনি এই ব্যবস্থা করলেন।

একবার রাজা ব্রহ্মদত্তের এক অমাত্য, যে রাজা দিঘিতি’র রাজ্যের একজন কর্মচারীও ছিলো, সে রাজা দিঘিতিকে ছদ্মবেশ অবস্থায় চিনতে পারে। সে পুরস্কারের আশায় ব্রহ্মদত্তকে রাজা দিঘিতির ছদ্মবেশ ধারণের কথা জানায়। রাজা ব্রহ্মদত্ত সঙ্গে সঙ্গে দিঘিতিকে আটক করে এবং তাকে শূলে চড়ানোর ব্যবস্থা করে।

ঠিক সেই সময়ে দিঘিতির ছেলে গোপন এলাকা থেকে সেখানে উপস্থিত হয়। সে দেখতে পায়, তার পিতা ও মাতাকে রাজা শূলে চড়াতে নিয়ে যাচ্ছেন।

দিঘিতিও তা দেখলেন।কিন্তু তিনি মৃত্যুর আগেও তার পুত্রকে নিয়ে চিন্তিত ছিলেন। এদিকে বন্দী থাকায় তিনি তার পুত্রকে সরাসরি পালিয়ে যাবার কথাও বলতে পারছিলেন না।

তিনি তখন বু্দ্ধি করে উচ্চস্বরে আওয়াজ করে বললেন,

অল্পদৃষ্টির অধিকারী হবে না।

দূরদৃষ্টিসম্পন্নও হবে না।

সংঘাতে সংঘাতের সমাধান হয় না।

মিত্রতার মাধ্যমেই সংঘাতের সমাপ্তি ঘটে।

“Be not shortsighted.
Be not longsighted.
Not by violence is violence ended.
Violence is ended only by nonviolence.”

রাজা অতপর, দিঘিতিকে শূলে চড়িয়ে মেরে ফেলে। কিন্তু তিনি মনে করেছিলেন, রাজা দিঘিতি কেন এ কথা বললো? এই কথা কি রাজা দিঘিতি তাকেই উদ্দেশ্য করে বলেছে? এভাবে চিন্তা করতে করতে তার ঘুম হারাম হয়ে গেল।

এদিকে দিঘিতির পুত্র সেখান থেকে পালিয়ে অন্য জায়গায় চলে গেলেন। বেশ কয়েকমাস লুকিয়ে অন্যত্র থাকার পরে তিনি আবার ব্রহ্মদত্ত রাজার রাজধানীতে চলে আসলেন।

একবার দিঘিতির পুত্র দির্ঘায়ু বা দিঘাভু ভোর সকালে উঠে মধুর সুরে গান গাইছিলেন। রাজা ব্রহ্মদত্তও সকালে ঘুম থেকে উঠে পায়চারী করছিলেন।তিনি সেই মধুর স্বর শুনতে পেলেন। তিনি প্রহরী ডেকে মধুর সুরের সেই গায়ককে খুঁজতে বললেন।

গায়ককে তিনি এরপর প্রতিদিন তার জন্য গান শোনানোর ব্যবস্থা নিতে বললেন। তিনি জানতেন না যে, এই যুবক রাজা দিঘিতির পুত্র, যাকে তার স্ত্রীসহ তিনি খুন করেছিলেন।

একবার রাজা ব্রহ্মদত্ত শিকারে যাবেন। তিনি তার অমাত্য পরিজন সহকারীসহ শিকারে গেলেন। দিঘিতি রাজার পুত্র দির্ঘায়ু/দিঘাভুকে তার ঘোড়ার গাড়ির চালক মনোনীত করলেন।

দিঘাভু এখন এক সুবর্ণ সুযোগ পেলেন। তিনি কৌশলে রাজার রথকে অন্য সবার কাছ থেকে আলাদা করে ফেললেন। রাজা ব্রহ্মদত্ত কিন্তু তা বুঝতে পারলেন না। ঘুরতে ঘুরতে বহুদূর যাবার পরে রাজার ক্লান্তি লাগলে তিনি এক জায়গায় শুয়ে পড়লেন।

এবার দির্ঘায়ু বা দিঘাভু আস্তে করে তার খোপ থেকে তরবারি খুললেন। তিনি আস্তে করে তরবারি রাজার গলায় নিলেন। এবং, এই সময় তার সেই কথা মনে পড়লো। তার পিতা দিঘিতি তাকে উদ্দেশ্য করে সেই কথা বলেছিলেন।

তিনি তরবারি আবার খোপে ঢুকালেন। রাজা ব্রহ্মদত্ত জেগে উঠলেন। কিন্তু তিনি দুঃস্বপ্ন দেখেই জেগে উঠেছিলেন। তিনি তার ঘোড়ার গাড়ির চালককে বললেন, শোনো, আমি সবসময় এক দুঃসময় দেখি। দেখি যে, দিঘিতি রাজার পুত্র আমাকে হত্যা করতে এসেছে। এছাড়া তিনি দিঘিতি রাজা মৃত্যুর আগে যে কথা উচ্চস্বরে বলেছে তাও মনে তুললেন।

এটা বলামাত্র দিঘিতি রাজার পুত্র রাজার গলায় তরবারি ঠেকিয়ে দিলেন। তিনি বললেন, আমিই দিঘিতি রাজার পুত্র।

ভয়ে ব্রহ্মদত্ত মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচার জন্য কাকুতি মিনতি করতে লাগলেন।

অনেক্ষণ পরে দিঘিতি রাজার পুত্র দির্ঘায়ু তাকে মুক্তি দিলেন। এবং, তার পিতা যা বলেছে, তার ব্যাখ্যা তিনি রাজা ব্রহ্মদত্তকে শোনালেন।

তিনি বললেন-

প্রথম কথার মানে হলো- কারো বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দেয়াকে সহসা তাড়াতাড়িতে অবজ্ঞাভরে ছুড়ে ফেলো না। (‘Do not be quick to spurn a gift of friendship.’)

দ্বিতীয় কথার মানে হলো- ঘুণা বা শত্রুতাকে দীর্ঘদিন ধরে মনে পুষে রেখো না।(‘Do not allow your hate to last too long.’)

তৃতীয় কথার মানে হলো- আমার পিতা তৃতীয় এই বক্তব্য দিয়ে এটাই বুঝাতে চেয়েছেন যে, রাজা, আপনি আমার পিতাকে হত্যা করেছেন। তার প্রতিশোধ হিসেবে যদি আমি এখন আ্পনাকে হত্যা করি তবে আপনার মিত্ররা আমাকে খুন করবে। এবং, এরপর আমার বন্ধুরাও আপনার মিত্রকে হত্যা করতে চেষ্টা করবে। এবং এভাবে সংঘাতের শেষ হবে না, সংঘাত চলতে থাকবে। কিন্তু এখন যেমন, আপনি আমাকে হত্যা না করে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন, এবং তেমনি আমিও বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিয়েছি। এতে সংঘাত বন্ধ হয়ে গেল।

(“My father meant this: You, my lord, have killed my parents and stolen their kingdom. If I were to kill you in revenge, your allies would kill me, and then my allies would kill them, and so on, with no end to violence. But now instead, you have granted my life and I have granted yours. So violence is at an end.”)

উপরের গল্পটি একটি রূপক নীতিকাহিনী। সংঘাতের মাধ্যমে যে সংঘাতের উপশম হয়না সেই নীতির কথাই এই রূপকাহিনীতে তুলে ধরা হয়েছে।

লেখাটি মায়ানমার বা মিয়ানমার/বার্মার শান প্রদেশের একটি ইংরেজি ওয়েবসাইট থেকে ভাবানুবাদ করা হয়েছে।

লিংক