ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

utpalKhisaBook
উৎপল খীসা’র লেখা ‘ফিরে দেখাঃ শান্তিবাহিনীর গৃহযুদ্ধ, স্বপ্নের অপমৃত্যু’ বইটি হাতে পাওয়ামাত্র পড়ে ফেললাম। বইটি এবারে ২০১৬ সালের বইমেলায় শ্রাবণ প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে সশস্ত্র সংগ্রাম চলাকালীন জেএসএস বা জনসংহতি সমিতি’র মধ্যে যে অন্তর্দ্বন্দ্ব বা ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত চলে তার উপর তিনি তার লেখাটি লিখেছেন। এর আগে ফেসবুকে তিনি তার বইয়ের লেখা ক্রম অংশে ভাগ করে শেয়ার করেছিলেন। সে সময় তার লেখাটিতে চোখ পড়লেও তেমন সিরিয়িাসভাবে পড়ার সুযোগ করা হয়নি। এছাড়া বিশেষভাবে মোবাইল বা ল্যাপটপ ডিভাইসের স্ক্রীণে মনদিয়ে পড়ার চেষ্টা করা ও তা অনুধাবন করা অনেকসময় কষ্টসাধ্য হয়ে ওঠে। তবে লেখাটির প্রিন্ট কপিও বইটি প্রকাশ হবার আগে আমি পড়ার সুযোগ পাই। তখনও খুব চিন্তাভাবনা করে লেখাটি পড়লেও বই প্রকাশ হবার আগে তিনি যে বিষয়বস্তু নিয়ে বা যে অনুসিদ্ধান্ত ও যুক্তি-তথ্য-তত্ত্ব ও বক্তব্য-মন্তব্য নিয়ে তার লেখাটি সাজিয়েছেন তা নিয়ে কথা বলা বা মন্তব্য বা পাল্টা মন্তব্য বক্তব্য প্রদান করা থেকে বিরত ছিলাম। কিন্তু বইটি হাতে আসার পরে আরেকবার একরাতের মধ্যে লেখাগুলো পড়ে ফেললাম। এবং বসলাম নিজের মতামত তুলে ধরার জন্য।
এখানে বলা প্রয়োজন, পার্বত্য চট্টগ্রামে ১৯৭৫ বা ১৯৭৬ থেকে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর বাংলাদেশ সরকারের সাথে চুক্তি সম্পাদনের আগে পর্যন্ত যে সশস্ত্র লড়াই সংগ্রাম ও সংঘাত চালু ছিল তা নিয়ে সাধারণভাবে ভারত বা বাংলাদেশের অনেক ব্যক্তি লেখালেখি করলেও পার্বত্য অঞ্চলের কোনো লেখক বা ব্যক্তি খুব ডিটেইলসে বা বিশ্লেষণমূলকভাবে এখনো খুবই কম অথবা বলা যায় এখনো লেখালেখি করেননি। হয়তো সাধারণভাবে সাল তারিখ বা ঘটনার সাধারণ বিবরণ উল্লেখ করে লেখালেখি হয়েছে। কিন্তু বিশ্লেষণ বা পর্যবেক্ষণ পর্যালোচনামূলক কোনো লেখা এখনো কেউ লেখেননি বলেই আমি জানি। সেদিক থেকে উৎপল খীসা’র লেখাটি অবশ্যই গুরুত্বের দাবি রাখে। কারণ তিনি বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণ করে নিজের একটি সিদ্ধান্ত দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছেন। তিনি নিজের বা নিজেদের জাতি বা জাতিসত্তার লড়াই সংগ্রামকে নিজের মনে করে দরদ দিয়ে তার বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করেছেন। এবং তিনি যা বিশ্বাস করেন তা খুবই সাহসের সাথে প্রকাশ করেছেন। হয়ত এক্ষেত্রে তিনি ঝুঁকির মধ্যে পড়বেন সে চিন্তা করেও তিনি তার লেখা সমাপ্ত করেছেন। আমি বা অন্যকেউ তার মতামত বা সিদ্ধান্ত বা বিশ্লেষণের সাথে একমত হই বা না হই তা প্রধান বিষয় নয়। বরঞ্চ তিনি যে আন্তরিকতার সাথে দরদ দিয়ে সে সময়ের ঘটনাকে বিশ্লেষণ করে তা থেকে ভবিষ্যত শিক্ষা গ্রহণের পথটি বেছে নেয়ার চেষ্টা করেছন তা-ই এক্ষেত্রে গুরুত্বের দাবি রাখে। সেই জন্যেই তিনি কী লিখেছেন তা নিয়ে এখানে আলোচনা করা প্রয়োজন বলে মনে করছি। কেননা আন্দোলনে হয়তোবা নিজের ব্যক্তিগত সরাসরি অংশগ্রহণ ছিল না, বা অংশগ্রহণ করার প্রশ্নই আসে না, তখন নিশ্চয় আমার জন্মই হয়নি এবং জন্মালেও সেই বয়স নিশ্চয়ই পেরোয়নি যে তাতে অংশগ্রহণ করা সম্ভব ছিল; কিন্তু সেই লড়াই বা আন্দোলন যে জুম্ম জনগণের সবার জন্যই ছিল সেদিক বিবেচনা করে তার প্রতি মমত্ববোধ ও আবেগ অনুভূতি নিশ্চয়ই বোঝার বয়স থেকে ছিল এখনো আছে এবং আগামীতেও থাকবে বলেই বিশ্বাস!
উনিশ শতকের প্রভাবশালী চিন্তাবিদ বা দার্শনিক জন স্টুয়ার্ট মিল সরকার বা প্রশাসন পরিচালনা বা বলা যায় সমাজ পরিচালনার ক্ষেত্রে মতামত প্রকাশ বিষয়ে বলেছিলেন, কেউ মতামত দিলে বা কোনো মতাদর্শ প্রচার করলে তা যতই ভুল হোক না কেন, তা প্রচার ও প্রকাশের সুযোগ করে দেয়া দরকার এবং তা নিয়ে বিতর্ক আলোচনার পরিবেশ সৃষ্টি করা দরকার। এতে বক্তব্য বা চিন্তাধারায় সঠিকতা বেঠিকতা যাচাই করার পরিবেশ সৃষ্টি হয়।
আমরা আশা করব, উৎপল খীসা যেভাবে মতামত প্রকাশ করেছেন সেভাবে আরো এই বিষয়ে যারা সেই সময়ে লড়াইয়ে ছিলেন তারাও নিজেদের বক্তব্য যুক্তি মতামত হাজির করে সামনে আসবেন। বলা প্রয়োজন, সেই সময়ের লড়াই নিয়ে তাদের যতই দরদ এবং ভালবাসা থাকুক না কেন বা সেই লড়াইকে তারা আবেগ দিয়ে অহমিকা দিয়ে বা দম্ভ দিয়ে যতই পুষে রাখুন শেষ পর্যন্ত কিন্তু সেই লড়াই ছিলো জনগণের জন্য, জনগণের লড়াই এবং এখনো তা জনগণের জন্য ও জনগণের লড়াই। সুতরাং সেই সময়ের লড়াইয়ে তারা কী করেছেন বা কী করতে পেরেছেন বা কী ব্যর্থতা তাদের ছিল তা জানার অধিকার কিন্তু আমাদের সবার রয়েছে। এবং তাদের বা যারা সেই সময়ে লড়াই করেছেন তাদের জবাবদিহিতার মধ্যে রেখে তাদের প্রশ্নবাণে জর্জরিত করার অধিকার কিন্তু বর্তমান প্রজন্মের রয়েছে।
যাহোক, ভণিতা না করে উৎপল দা’র লেখা নিয়ে আামি এখানে সামান্য আলোচনা করার চেষ্টা করছি।
তবে আমার এই লেখা উৎপল খীসা’র দেয়া একটি তথ্য বিষয়ে মাত্র আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখার চেষ্টা থাকবে। বিষয়টি হল, লেখক তার বইয়ের মুখবন্ধ অংশে জুম্ম জনগণের লড়াই আন্দোলনে অগ্রবর্তী ভূমিকা পালনকারী শহীদ এম এন লারমা বিষয়ে একটি তথ্য তুলে ধরেছেন। তা হলো, তিনি বলতে চেয়েছেন, এম এন লারমা ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধ বা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। তিনি লিখছেন- ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে তাঁর বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা অপরিসীম, অতুলনীয়।
তথ্যটি বিভিন্ন সূত্র থেকে যাচাই করার চেষ্টা করলাম।
কিন্তু মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা স্বাধীনতাযুদ্ধ বা মুক্তিযুদ্ধে যে অংশ নিয়েছেন তার সমর্থনে কোন তথ্যই পেলাম না। বরং, নানা ছলচাতুরি করে এম এন লারমা ও তার অনুসারীদের স্বাধীনতাযুদ্ধে অংশ নিতে বাধা দেবার যে চেষ্টা করা হয়েছে সে ‘ভয়াবহ’ তথ্যই পেলাম।
জনসংহতি সমিতি’র অন্যতম কেন্দ্রীয় নেতা স্নেহকুমার চাকমা তাঁর ‘জীবনালেখ্য(জীবন, সংগ্রাম ও সংঘাতময় দিনগুলির কথা)’ বইয়ে লিখেছেন-
মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার নেতৃত্বে পাহাড়ী ছাত্র সমিতি ছাত্র, যুব এবং স্থানীয় রাঙ্গামাটির বাঙ্গালী যুবকেরা মুক্তিবাহিনীতে অংশগ্রহণ করার জন্য পশু সম্পদ অফিস(Animal Husbandry) সংলগ্ন স্টেশন ক্লাবে ৩ দিনব্যাপী লাঠি নিয়ে ট্রেনিং দেয়। কিন্তু দুঃখের বিষয়ে ডেপুটি কমিশনার হাসান তৌফিক ইমাম ও সাইদুর রহমান প্রমুখ বাঙ্গালী আওয়ামীলীগার পাহাড়ীদের বাদ দিয়ে শূধু বাঙ্গালীদের ত্রিপুরা রাজ্যে(ভারত) পাঠিয়ে দিল। বলা হলো তোমেদেরকে (পাহাড়ীদেরকে) বাদ দিয়ে আমরা(বাঙ্গালীরা) দেশ স্বাধীন করতে পারবো। তখন জুম্ম বুদ্ধিজীবীরা, ছাত্ররা, যুবকেরা হতবাক।….। পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে কোন আসন না পাওয়াতে তাদের জুম্ম বিদ্বেষী মানসিকতা, উগ্র বাঙ্গালী জাত্যাভিমানী চেহারা আরো নগ্ন ও হিংস্রভাবে উন্মোচিত হল।’(পৃঃ১১৩)

মেজর জেনারেল(অবঃ) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বীর প্রতীক তাঁর ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি প্রক্রিয়া ও পরিবেশ-পরিস্থিতির মূল্যায়ন’ বইয়ে অবমাননাকর ‘উপজাতি’ শব্দটির ব্যবহারসহ ১৯৭১ সালে জুম্ম জনগণের স্বাধীনতা যুদ্ধে কী ভূমিকা ছিল তা জানাতে লিখছেন-

১৯৭০ সালে পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনে মানবেন্দ্র নারায়ণ লার্মা এবং এ এস প্রু চৌধুরী পূর্ব পাকিস্তান এসেম্বলীতে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হন এবং চাকমা রাজা ত্রিদিব রায় স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে জাতীয় এসেম্বলীতে নির্বাচিত হন। নিজেদের কাছে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি থাকা সত্ত্বেও উপজাতীয়রা স্বাধীনতা যুদ্ধে নিজেদের অবস্থান নির্ণয়ে দ্রুত ও সঠিক কোন সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হয়নি’ (পৃঃ৭৭)।
তবে তিনি এই বক্তব্য দেয়ার কয়েক লাইন পরে লেখেন-

অপরদিকে, মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দানকারী আওয়ামী লীগেরও রয়েছে এক্ষেত্রে ব্যর্থতা। উপজাতীয় জনগণকে মুক্তিযুদ্ধের সাথে সম্পৃক্ত করার ক্ষেত্রে যথেষ্ট উৎসাহ দেখায়নি আওয়ামী নেতৃত্ব।এমনকি যুদ্ধের প্রথম দিকে অতি উৎসাহী কিছু উপজাতীয় যুবক যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে চাইলে আওয়ামী নেতৃত্ব তাদের বিফল মনোরথ করেন (পৃঃ৭৭।

অপরদিকে পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাত্র সমিতি’র তৎকালীন নেতৃবৃন্দ ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে ৫ থেকে ৬ হাজারের মতো ছাত্র-যুবককে ট্রেনিং দেবার চেষ্টা করেছিল বলে সুবীর ভৌমিক লিখিত ‘Insurgent Crossfire’ বই থেকে জানতে পারি।
জনসংহতি সমিতি’র বাদি গ্রুপের নেতা ও সম্ভবত ১৯৭১ সালের সময় পাহাড়ী ছাত্র সমিতির নেতা প্রীতিকুমার চাকমা’র সাথে সুবীর ভৌমিকের সাক্ষাতকার উদ্ধৃত করে বইয়ে লেখা হয়-
We were keen to take at least five to six thousand able-bodied tribals to India, get them trained in arms and fight against the Pakistani forces. This was important for two reasons to win the goodwill of the Bengalis and create a body of trained guerrillas so that we could face any eventuality in future (page-249).
বাংলায় অনুবাদ করলে দাঁড়ায়-

পাকিস্তানী বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য আমরা কমপক্ষে ৫ থেকে ৬ হাজার শক্তসমর্থ জুম্মকে ইন্ডিয়া বা ভারতে নিয়ে গিয়ে তাদের সশস্ত্র প্রশিক্ষণ দেয়ার জন্য চেষ্টা করেছিলাম। এটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল দুই কারণে, প্রথম কারণ, বাঙালিদের সহানুভূতি আদায় করা এবং একই সাথে প্রশিক্ষিত একদল গেরিলা বাহিনী প্রস্তুত করা যেন ভবিষ্যতে আমরা যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে সক্ষম হই।

এছাড়া তার বই থেকে জানা যাচ্ছে যে, পাকিস্তানী বাহিনী রাঙামাটি দখলের আগে পাহাড়ি ছাত্র সমিতি’র নেতৃবৃন্দ রাঙামাটির একটি উচ্চবিদ্যালয়ে এক সভা আহ্বান করে এম এন লারমাকে পার্বত্য জুম্ম জনগণের জাতীয় নেতা হিসেবে ঘোষনা করে এবং যেকোন ধরণের করণীয় কর্মসূচি ঘোষণা করার জন্য তার প্রতি আহ্বান জানায়।
বইয়ে লেখা রয়েছে-
‘.. PCS activists organized a meeting In a Rangamati school just before the Pakistani forces arrived and declared M. N. Larma to be their “national leader”, asking him to decide what course of action to be adopt(page-249).

একই বইয়ের একই পৃষ্ঠায় সুবীর ভৌমিক লিখছেন-
The PCS, which by then had a huge organizational network, extending even to every school in the CHT, could easily have mobilized large numbers of tribal youth, but M. N. Larma remained undecided and finally went underground.(page-249)

বাংলায় বলা যায়-
পাহাড়ী ছাত্র সমিতি(ইংরেজিতে সংক্ষেপে PCS)’র সে সময়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রায় প্রতিটি স্কুলে জোরালো বা শক্তিশালী সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক ছিলো, যার মাধ্যমে সহজেই বহুসংখ্যক জুম্ম যুবককে ঐক্যবদ্ধ করা যেত; কিন্তু এম এন লারমা ছিলেন সিদ্ধান্তহীন এবং শেষ পর্যন্ত তিনি আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে গেলেন।
সিদ্ধার্থ চাকমা তার প্রসঙ্গঃ পার্বত্য চট্টগ্রাম গন্থে লিখেছেন- একাত্তর সালে সারা দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও রক্তঝরা দিনগুলোতে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা উপজাতি জনগণের সামনে পরিষ্কার বক্তব্য রাখতে ব্যর্থ হন। আসন্ন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে উপজাতিদের ভুমিকা কি হওয়া বাঞ্ছনীয়, তার কোন সঠিক উত্তর তিনি দিতে পারেন নি। স্বাধীনতা যুদ্ধচলার সময় তিনি হানাদার অধিকৃত এলাকায় ঘোরাফেরা করেছিলেন, কিন্তু হানাদারদের সঙ্গে তিনি কোন সহযোগিতা করেছিলেন, এমন কোন প্রমাণ বা অভিযোগ নেই, তেমনি মুক্তিযুদ্ধে তিনি সহায়তা করেছেন, তারও কোন প্রমাণ ছিল না।(পৃঃ৩৮){*বইটি কোন প্রকাশনী থেকে বের হয়েছে এবং কখন তার বের হয়েছে তা বইয়ে লেখা নেই, তবে ভুমিকা অংশটি লিখেছেন কানাডা মেনিটোবা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক এবং একইসাথে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক এম.কিউ. জামান।তিনি ভুমিকা’র স্বাক্ষর অংশে ১ নভেম্বর, ১৯৮৫ তারিখ ব্যবহার করেছেন। সম্ভবত, সেই সময় পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে এমন ধরণের বই প্রকাশ করা দুরূহ ও ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচিত হওয়ায় প্রকাশনা সংস্থা ও প্রকাশের তারিখ ও স্থান বইটিতে প্রদান করা হয়নি।}
এম এন লারমার স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করা বা না করা নিয়ে আমাকে এতটুকু লেখা লিখতে হলো এ কারণে যে, মূলত, স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালীন সময় থেকে বা বলা যায় দেশ স্বাধীন না হবার আগে থেকে জুম্ম জনগণ বাঙালি জাতীয়তাবাদী জাত্যাভিমানী বিদ্বেষ ও অবহেলা বঞ্চনার শিকার হয়ে আসছিল। ইতিহাসের এই দিকটিকে আড়াল করলে পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণের দেশ স্বাধীনতা পরবর্তী আন্দোলন সংগ্রামের আবহ বা শর্ত সৃষ্টির প্রেক্ষাপট আড়ালে থেকে যাবে।
এছাড়া এম এন লারমার মতো একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি, যিনি পরে অবিসম্বাদিত নেতা হিসেবে জুম্ম জনগণের কাছে সম্মানীয় হয়ে ওঠেন তাঁর ঐতিহাসিক ভুল বা সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে অনেতৃত্বসূলভ ভুমিকাও যে রয়েছে সে বিষয়টি প্রকাশ্যে না আসার সম্ভাবনা থেকে যায়।
উপরে বিভিন্ন লেখকের লেখা থেকে দেয়া উদ্ধৃতি থেকে বা তথ্য সূত্র থেকে আমরা এই ধারণা করতে পারি যে, এম এন লারমা স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নেননি। তবে ছাত্র সংগঠন পাহাড়ি ছাত্র সমিতি অংশ নিতে চাইলেও তারা তাতে পেরে ওঠেনি।
এম এন লারমার স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ না নেয়ার কারণে ঐতিহাসিকভাবে পার্বত্য জুম্ম জনগণের ইতিহাসেক কী বাঁক বা মোড় পরিবর্তন ঘটেছে তা নিয়ে নানা বিশ্লেষণ করা যায়। কিন্তু এসকল বিশ্লেষণ হাইপোথেটিক্যাল বা শুধুমাত্র কল্পনাপ্রসূত হবে বলে আমরা আর সেদিকে আলোচনা বাড়াচ্ছি না। তবে তিনি স্বাধীনতা যুদ্ধে ভূমিকা থাকা বা না থাকার পাশাপাশি দেশের এক ঐতিহাসিক পটপরিবর্তনের সময়ে তিনি যদি জাতি বা জাতিসত্তার অধিকার নিয়ে আরো সক্রিয় ভূমিকা নিতেন বা পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণের পক্ষ হয়ে কোন ভুমিকা যদি রাখতেন তবে হয়তো ইতিহাস আরো অন্যভাবে লেখা হতো, এই মন্তব্যমাত্র আমরা করতে পারি।

এছাড়া স্বাধীনতাযুদ্ধের সময়ে সমাষ্টিকভাবে জুম্ম জনগণকে বা পার্বত্যট্টগ্রামের জনগণকে অংশগ্রহণ করতে সুযোগ না দেয়ার মাধ্যমে জাতিরাষ্ট্রের কাঠামোর ভেতর অন্য জাতি বা জাতিসত্তা বা জাতিসত্তাসমূহকে অধিকার প্রদানের পরিবর্তে নিপীড়ন-নির্যাতন-অবহেলিত-বঞ্চিত করার পথটিই প্রশস্ত হবার সুযোগ সৃষ্টি হলো বলে মন্তব্য করা যেতে পারে। যার ধারাবাহিকতা আমরা বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর থেকে একাদিক্রমে অনবরত চলতে দেখি। এবং তার ব্যত্যয় কোন বিপ্লবী বা প্রগতিশীল লড়াই সংগ্রামের মাধ্যমে মূলধারায় সৃষ্টি করা যায়নি বলেই প্রতীয়মান হয়।

আপাতত এই আলোচনা করে আমি লেখাটির ইতি টানতে চাই। উৎপল খীসা’র বইটি ও তার বিশ্লেষণ পার্বত্য চট্টগ্রামের সচেতন ছাত্র-যুবসমাজকে তাদের নিজেদের ইতিহাস নিয়ে আরো অনুসন্ধিৎসু হতে শেখাবে এবং একই সাথে সশস্ত্র লড়াই সংগ্রামের যারা কুশীলব ছিলেন বা যারা এ বিষয়ে জানেন, নিজের অভিজ্ঞতাসমৃদ্ধতার মাধ্যমে যারা ওয়াকিবহাল তারা এ বিষয়ে আরো অধিক পরিমাণে মুখ খুলবেন এবং নতুন প্রজন্মকে দায়িত্ববোধ ও ইতিহাস সচেতনতা বিষয়ে শিক্ষা প্রদান করবেন এই আশা আমরা করতে পারি এবং এই দাবিও আমরা তাদের কাছে তুলে ধরতে পারি।

উৎপল খীসা’র ‘ফিরে দেখাঃ শান্তিবাহিনীর গৃহযুদ্ধ, স্বপ্নের অপমৃত্যু’ বইটির প্রচার ও প্রসার কামনা করছি। বইটি একুশে বইমেলায় শ্রাবণ প্রকাশনীর ৪৫০-৪৫১-৪৫২নং স্টলে পাবেন(সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের শেষ প্রান্তে গ্লাসটাওয়ার-এর দিকে)

সহায়ক তথ্যসূত্রঃ
১. ফিরে দেখা শান্তিবাহিনীর গৃহযুদ্ধঃস্বপ্নের অপমৃত্যু- উৎপল খীসা, ২০১৬ বইমেলা, শ্রাবণ প্রকাশনী।
২. জীবনালেখ্য(জীবন, সংগ্রাম ও সংঘাতময় দিনগুলির কথা)-স্নেহকুমার চাকমা, দ্বিতীয় প্রকাশ-ডিসেম্বর, ২০১১।
৩. পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি প্রক্রিয়া ও পরিবেশ পরিস্থিতির মূল্যায়ন- মেজর জেনারেল(অবঃ) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বীর প্রতীক, মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা।
৪. Insurgent Crossfire- Subir Bhaumik, Lancer Publishers-Spantech and Lancer, New Delhi-London.
5. A Brief Profile of M. N. Larma
6. জন স্টুয়ার্ট মিল
৭. প্রসঙ্গঃ পার্বত্য চট্টগ্রাম, সিদ্ধার্থ চাকমা।