ক্যাটেগরিঃ ফিচার পোস্ট আর্কাইভ, মতামত-বিশ্লেষণ

ক্রমাগতই আমার মনে হচ্ছে এনজিও বিরোধিতা করতে গিয়ে আমরা কোন দিকে যেতে চাচ্ছি। আমি যখন ছোট ছিলাম তখন শুনেছি যে কেউ ভাবতে পারত না মেয়েরা সাইকেল চালাবে। অথচ ব্র্যাক কাজ শুরু করার পর আমি সেই সময় দেখেছি মেয়েরা সাইকেল চালিয়ে ব্র্যাকের স্কুলে যাচ্ছে। এটা কোনো বামপন্থি সংস্থা করতে পারেনি। ব্র্যাক করেছে। এই যে মেয়েদের সাইকেলে চড়ে অফিস করতে যাওয়া, এটা কি খারাপ। এটা কি পরকীয়া? এটা কি যৌন স্বেচ্ছাচারিতা? না, তা নয় । পেটের তাগিদে একটা মেয়ে এই কাজ করছে। ঘর-সংসার করছে। এটা কি সুষ্ঠু সমাজ নয়?

কথাগুলো বলছি সম্প্রতি বেশ কিছু ব্লগার এনজিও বিরোধিতার নাম করে বিভিন্ন ব্যক্তিকে হেয় করার চেষ্টা করছে। শুধু তাই নয় ব্যক্তি জীবন নিয়েও তারা টানা হেচড়া করছেন। এমনকি আমি রীতিমত ভীত, শংকিত, হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ছি। তারা জাফর ইকবাল স্যারের মেয়েকে নিয়েও কিছু বলতে দ্বিধা করেনি। এরা যে সমাজ পরিবর্তনের মুখোশ পড়ে কথা বলতে চাচ্ছে তা এগিয়ে যাওয়ার সমাজ নয়, পিছিয়ে পড়ার সমাজ। এখানে একটা মেয়ে ঘরের বাইরে বেরুতে পারবে না স্রেফ পুরুষের যৌন ঈর্ষার কারণে। এই ব্লগাররাই নিজেকে অগ্রসর বলে দাবি করে। কিন্তু এটা স্পষ্ট শুধু যৌন ঈর্ষা নয়, এর পেছনে রয়েছে এক পিছিয়ে পড়ার ছায়া। ধর্মীয় ভাবে পিছিয়ে পড়ার ছায়া। নিজেকে গুহার ভিতেরে ঠেলে দেবার ছায়া। যে গুহা অন্ধকার। যেখানে গেলে কোনও আলো দেখা যায় না।

আমি এক সময় হুমায়ূন আজাদের প্রচণ্ড ভক্ত ছিলাম। এখনও বটে। তার কথাকে আমার সমাজের ভণ্ডামি তীব্র তীরের মত আঘাত করার মত মনে হত। আমি তার প্রতিটি শব্দে, বাক্যে মোহমুগ্ধ হয়ে পড়তাম। আবিস্কার করে ফেলতাম আমার ধারণা ফুল, তার ধারণাই সঠিক। কিন্তু এই সমাজকে যারা অন্ধকারে ঠেলে দিতে চায় তারা আর তাকে বাঁচতে দেয় নি। তাকে আহত করার প্রতিবাদে আমরা অনেক মিছিল করেছি। অনেক স্লোগান দিয়েছি। কোনও কাজ হয় নি। এখনও বুঝি কিছুই হবে না। কেননা তার মৃত্যুর কিছুদিন পরই তাকে নিয়ে অনেক বাম ঘরানার সমালোচনা শুনেছি। কেননা উনি কাউকেই সমালোচনা করতে ছাড়তেন না। বামদেরও না। দেখলাম যাদেরকে আমরা প্রচণ্ড প্রগতিশীল ভাবি, এই বাম ঘরানাই তার মৃত্যু নিয়ে ভিতরে ভিতরে কেমন যেন খুশি। আমি টের পেতে থাকি সমস্যাটা অন্য কোথাও। রাজনীতি এমন এক জিনিস যেখানে অনেক ছদ্মবেশ থাকে। বাম ঘরানার ভিতরেও রয়েছে সেই পিছিয়ে পড়ার, অন্ধকারে যাওয়ার ছায়া। আমি বুঝতে পারি যারা হুমায়ুন আজাদকে হত্যা করেছে, এই হত্যার জন্য শুধু তারাই দায়ি নয়, এখানে ছদ্মবেশি বুদ্ধিবৃত্তিক – প্রগতিশীল মানুষগুলাও দায়ি।

স্যার, আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি আপনার পেছনে যারা লেগেছে তারা এনজিও বিরোধিতা করে অগ্রসর সমাজ কায়েমের জন্য লাগেনি, একটা অংশ লেগেছে যৌন ঈর্ষা থেকে, আরেকটা অংশ লেগেছে ছদ্মবেশে অন্ধকারে যাওয়ার বুদ্ধিবৃত্তিক প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য। যারা হুমায়ুন আজাদকে মেরেছে, তাদেরই ছায়া এদের ভেতর। এই ছদ্মবেশি প্রগতিশীল, অন্ধকারে যাওয়ার ছোট ছোট বুদ্ধিজীবি থেকে সাবধান। এদের পেছনে রয়েছে এক বড় হাত। এরা মেয়েরা এসব করে , ইত্যাদি বলে বলে একটা জেনারেশনকে নারী বিদ্বেষী অন্ধকারে ছুঁড়ে ফেলে দিচ্ছে। একটা জেনারেশনকে এনজিও বিরোধিতার নাম করে নিয়ে যাচ্ছে পশ্চাতবাদিতার দিকে।

বাংলাদশে এখনো যতটুকু পরিবর্তন,প্র্যাকটিকেল অর্থে এনজিওরাই করেছে, যদিও তারা সাম্রাজ্যবাদীদের দালাল। যদিও তারা সুদখোর। যদিও তারা তাদের স্বার্থে এটা করেছে। কিন্তু এই এনজিও গ্রহনযোগ্যতা জনমানুষের মধ্যে বেশ ভাল করেই আছে। অনেকেই চায় এরা থাকুক। কেননা এরা বাদে অল্টারনেট কিছুই নেই। যে বামরা বড় বড় গলায় কথা বলে তাদের ঢাকার বাইরে ঘুম হয় না। যে বামরা প্রগতিশীলতার কথা বলে ওদের গ্রামে যাবার সময় হয় না। এসবের সুয়োগেই এক শ্রেনীর ছদ্মবেশী বাম, এক শ্রেনীর ছদ্মবেশী ছোট বুদ্ধিজীবি ব্লগার, নিজেকে অগ্রসর বলে দাবি করা স্টুপিড ক্রমশ এনজিও বিরোধিতার নাম করে, যৌন ঈর্ষা সামনে টেনে এনে গুহায় নিয়ে যেতে চাচ্ছে আমাদের।

স্যার, আমার অনুরোধ আপনি দেশের বাইরে কোথাও চলে যান। এখানে এইসব ভন্ড রাজনীতিকদের সঙ্গে আপনি পারবেন না। এইসব ভন্ড ছদ্মবেশি বাম, ব্লগারদের সাথে আপনি পারবেন না। এরাই আপনাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিবে। যেভাবে দেওয়া হয়েছিল হুমায়ুন আজাদকে।

***
ফিচার ছবি: আন্তর্জাল থেকে সংগৃহিত