ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

 

মার্ক্সবাদের কথা শুনলে এখন মোল্লারাও ক্ষেপে না, সমাজতন্ত্রের কথা তারা সন্তোষের সাথেই শোনে; কিন্তু শরীরের কথা শুনলে লম্পটরাও ধর্মযুদ্ধে নামে।

এটি হুমায়ুন আজাদের একটি প্রবচন। সম্প্রতি হলুদ টিশার্ট পরিহিতদের নিয়ে মানে জাগ্র ফাউন্ডেশন নিয়ে আর মুহাম্মদ জাফর ইকবাল নিয়ে ব্লগগুলোতে এনজিও বিরোধিতার নামে যে সমালোচনা হয়েছে, তাতে এই প্রবচনটিই আমার বারবার মনে হয়েছে।

বামরা এনজিও বিরোধিতার নামে সেইসব উন্মাদ ধর্মাণ্ধদের যেন সত্যিকার অর্থেই জায়গা করে দিচ্ছেন। তারা যেন চুপচাপ । যেন ঘটুক । তাদের পক্ষেই তো আসবে। মানে এনজিও এর বিরোধী শক্তিই তো তারা । মানে হুমায়ুন আজাদকে তো হত্যা করা হয়েছিল। একটা মুখ- ভন্ডামির বিরুদ্ধে একটা সোচ্চার মুখ বন্ধ হয়ে গেছে।

এবার জাফর ইকবাল । একে যদি সেরকম কিছুই করা হয় তাহলে তো খারাপ না। এনজিও থাকবে না। কিন্তু একবারও কি ভেবেছেন, এই গ্রামে-গঞ্জে আপনাদের বড় বড় গলা নেই। এই শহরে ইউরোপীয় প্রগতিশীলতার ধাচের কারণে কিছুটা সুযোগ পেয়ে যা ইচ্ছা তা করতে পারছেন। একবার গ্রামে গিয়ে দেখুন না। মার্কসের বাণী শুনিয়ে আসুন না। ওখানে তো আপনারা নেই। এনজিওরা খারাপ তাই আছে। ওরা আছে বলেই গ্রামে এখনো মৌলবাদ গেড়ে বসতে পারেনি। প্রগতিশীলদের তো কিছু হবে না। কারন এখানে ঢাকায় কেউ তাকে মারবে না। কিন্তু একবার ভাবুন পুরো গ্রাম যখন এনজিও হীনতায় দখল করে নেবে মৌলবাদ, তখন আপনারা কি করবেন।

এনজিও এর বদলে পাল্টা কিছু করে তারপর বলেন যে এনজিও খারাপ। আপনারা গ্রাম দেখবেন । মেনে নেব। কিন্তু এই ঢাকা শহর ছাড়া আপনারা প্রগতিশীলদের কি ঘুম হবে? আপনাদের কি সময় হবে গ্রামে যাবার? তাই যদি না হয় তাহলে এনজিও বিরোধি, ওরা সাম্রাজ্যবাদের দালাল। এসব বলে চিল্লা-চিল্লি করলে সুযোগটা নেবে মৌলবাদিরাই।

আর সেকারণেই বোধহয় হুমায়ুন আজাদ আগেই বুঝেছিলেন আপনাদের। মার্ক্সবাদের কথা শুনলে এখন মোল্লারাও ক্ষেপে না, সমাজতন্ত্রের কথা তারা সন্তোষের সাথেই শোনে; কিন্তু শরীরের কথা শুনলে লম্পটরাও ধর্মযুদ্ধে নামে। আপনারাও ইংলিশ মিডিয়ামের মেয়েদের শরীরের কথা শুনে ঝাপিয়ে পড়লেন। ভাবলেন এনজিও বিরোধি কাজ করছি। কিন্তু এটা কি ভাবলেন আপনাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে কে ছোড়ে দিচ্ছে তীর।

আজ জাফর ইকবালের মেয়েকে নিয়ে কথা উঠল, কাল হুমায়ুন আজাদের মত তাকেও হয়ত মারা হবে। এই মারার পর আপনারা স্লোগান দিবেন, সমাবেশ করবেন এই আঘাতের জবাব চাই। কিছুদিন মিছিল-মিটিং করে বিপ্লবী জোশ নিয়ে দেশোদ্ধার করছেন এমন সুখ-স্বপ্ন নিয়ে ঘুমুতে যাবেন। তারপর আবার ভুলে যাবেন। যেভাবে ভুলে যাই হুমাযুন আজাদকে।

আপনাদের কথা শুনলে কেন মোল্লারা ক্ষেপে না, এখন বুঝতে পারছি। শরীরের কথা শুনলে কেন লম্পটেরাও ধর্মযুদ্ধে নামে এখন বুঝতে পারছি। কিন্তু তাহলে কি এই আমাদের পরিণাম মানে মৃত্যু। এনজিও এর পক্ষে কথা বললেই তাকে আহত করব? রক্তাক্ত করব ? ভন্ডামির বিরুদ্ধে কথা বললেই সে সাম্রাজ্যবাদের দালাল হয়ে যাবে?

এনজিও তো দেখাতে পারবে গুণে গুণে কয়জন বাচ্চাকে তারা পড়ালেখা শিখিয়েছে। আপনারা বাম প্রগতিশীলরা (?) কি তা দেখাতে পারবেন ? আপনাদের তো আমার ঠিক বাম প্রগতিশীলও মনে হয় না। বাম প্রগতিশীলতার নামে আমাদের দেশে এতদিন ধরে যা চর্চা হয়ে আসছে তার সবই তো আমার কাছে ইউরোপীয় প্রগতিশীলতা মনে হয়। জিন্সের-প্যান্ট পড়ে মেয়েরা ঘুরলে কি মার্কসীয় প্রগতিশীলতা হয় না ইউরোপীয় প্রগতিশীলতা ? ফ্রি সেক্স করলে কি মার্কসীয় প্রগতিশীলতা হয় না ইউরোপীয় প্রগতিশীলতা ? ছেলে-মেয়েরা একসাথে বসে সিগারেট খেলে বা গাজা খেলে মার্কষীয় প্রগতিশীলতা হয় না ইউরোপীয় প্রগতিশীলতা ? নারী অধিকার নামে আমরা যে চিল্লাচিল্লা করি, এটা কোন নারী অধিকার। নারী অধিকার মানে যা কিছু তাই করার অধিকার? আমরা কি ক্রমশ নারী অধিকারের নামে নামে নারীব্যবসা তৈরি করে ফেলছি না? এই প্রশ্ন সামনে আনতে হবে । কেননা এনজিও স্পষ্টভাবেই সাম্রাজ্যবাদের দালাল। স্পষ্টভাবেই চায় প্রভু দেশের জন্য কিছু করতে। এনজিও স্পষ্টভাবেই চায় নারী উন্নয়নের নামে নারী ব্যবসা গড়তে। কিন্তু আপনারা কি চান? আপনারা কি এই এনজিও ঘরানার প্রগতিশীল সংস্কৃতির বাইরের কিছু নির্মাণ করতে পেরেছেন? গ্রামে কাজ করার কথা না হয় বাদই দিলাম? এখনো ভাবেন – এমনও তো হতে পারে যেহেতু আপনাদের কর্মী সংখ্যা কম বা গ্রামে-গঞ্জে কাজ নেই, সেই কারণে আপনাদেরকে ব্যবহার করে এনজিও বিরোধি তৎপরতা তৈরি করে দেশটাকে মৌলবাদীরাই নিয়ে যেতে চাচ্ছে। কেননা তারা জানে আপনাদের কতটুকু শক্তি। কেননা তারা জানে আপনারা আসলে ভেতরে ভেতরে ভন্ড। কেননা তারা জানে আপনাদেরকে চুপ করিয়ে দিতে তাদের এক সেকেন্ডও সময় লাগবে না। এর চেয়ে বরং কারও বিরুদ্ধে কিছু করার আগে কি ভাবা উচিত না এর ফলাফল কি হতে পারে।