ক্যাটেগরিঃ প্রকৃতি-পরিবেশ, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

 

এই ছবি অসত্য নয় যে সত্যিকার অর্থেই আদিবাসী জনগণ আবহাওয়া পরিবর্তনে প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে। এর একটি আদর্শ উদাহরণ হল যুক্তরাষ্ট্রের অলিম্পিক পর্বতে এন্ডারসন নামক বরফপুঞ্জ। এটি গলেই প্রাণ ফিরে আসে নদীর।

অতীতে এই বরফ ধীরে ধীরে গলে পড়ত আর নদীতে প্রাণলবন্ত ঢেউয়ের সৃষ্টি হত। যেন প্রাণ ফিরে পেত। কিন্তু সম্প্রতি সেসব নদীই শুকিয়ে গছে। বরফও অদৃশ্য হয়ে গেছে । এর ফলে এই নদীতে স্যামন মাছও আর ডিম পাড়তে আসে না। অথচ বলাই হয় এইখানে স্যামন আর এই আদিবাসীরা একসাথেই এসেছিল পৃথিবীতে। কিন্তু আবহাওয়ার পরিবর্তনে স্যামন মাছ হারিয়ে গেছে । হয়ত হারিয়ে যাব আদিবাসীরাও। আবার টুলালিপরা হচ্ছে আমেরিকান অধিবাসী। এরা ওয়াশিংটনের পশ্চিমাংশে বসবাস করে। এই টুলালিপ আদিবাসীরা সমুদ্রের এসিড মিশে যাওয়া নিয়ে প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে। সমুদ্রের রসায়ন পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে অতিমাত্রিক কার্বন ডাই অক্সাইড মিশে যাওয়ার কারণে। টুলালিপ আদিবাসীরা এই এসিড আক্রান্তের বিষয়টি ইল নামক ঘাসে আগেই দেখতে পেয়েছিল ।

আবার ভারতের দিকে তাকালেও দেখা যাবে ভারতের উপকূলে অবস্থিত পশ্চিমবঙ্গ, উড়িষ্যা, অন্ধ্রপ্রদেশ, তামিলনাড়ু, পণ্ডিচেরী, কেরালা, কর্নাটক, মহারাষ্ট্র, গুজরাটের আদিবাসীরা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে আবহাওয়া পরিবর্তনে অল্পবিস্তর পীড়িত হচ্ছে। এসব এলকায় মাছের লভ্যতা কমেছে এবং কমছে। আগে সমুদ্রে ২-৩ কিমি গেলেই যে মাছ পাওয়া যেত, এখন ৪-৫ কিমি গেলে তা পাওয়া যায়। ফলে মোটর চালিত নৌকা ছাড়া আগের মতো মাছ ধরা সম্ভব হচ্ছে না। ধীবর সম্প্রদায়ের দুর্বল অংশ প্রতিযোগিতায় না পেরে অন্যান্য পেশায় যাওয়ার চেষ্টা করছে। কোন কোন প্রজাতির মাছ, আগে যেগুলি প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যেত, এখন আর পাওয়া যাচ্ছে না। অভিজ্ঞদের ধারণা মাছের প্রজনন তাপমাত্রা বৃদ্ধির জন্যই হোক বা কমবেশি লবণাক্ততার জন্যই হোক, কমছে। বিভিন্ন রকম রাসায়নিক দূষণও এর জন্য দায়ী। বহু নদীর মোহানায় স্বাদু জল আগের মতো পরিমাণে পৌঁছচ্ছে না। বিপরীতে মোহানা থেকে উত্তরে নোনা জল উঠছে।

প্রায় সব রাজ্যেই সমুদ্র উপকূলে বিশাল ভূমিক্ষয় হয়েছে। সমুদ্র ওপরে উঠে এসেছে। বালিয়াড়ি জলে ডুবেছে। এর ফলে বেলাভূমি সংকীর্ণ হয়েছে। জাল শুকোনো, মাছ শুকোনো, জাল বোনা-মেরামতির জন্য প্রয়োজনীয় জায়গার অভাব বাড়ছে। আবহাওয়া পরিবর্তন হচ্ছে। বর্ষা আসছে দেরিতে। হঠাৎ হঠাৎ এক নাগাড়ে ঝড়-বৃষ্টির সংখ্যা বাড়ছে। এই সময় মাছ ধরা বন্ধ রাখতেই হয়। আগে ঝড়-বৃষ্টির প্রকোপ এত বেশি ছিল না। উপকূল অঞ্চল আগে যতটা শান্ত ছিল, এখন আর তা নেই। বালি তোলা, জেটি করে মালপত্র আনা-নেওয়া ইত্যাদিতে উপকূল এখন উপদ্রুত। পর্যটন কেন্দ্রগুলি উপকূলভূমিকে নানাভাবে দূষিত করছে।

এদিকে বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও বেশ স্পষ্ট। বাংলাদেশে যে অস্থায়ী কিংবা স্থায়ী নেতিবাচক এবং ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে, তার যাবতীয় চুলচেরা বিশ্লেষণকে বোঝাচ্ছে। কোনো দেশে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সত্যিই পড়ছে কিনা, তা চারটি মানদন্ডে বিবেচনা করা হয়:

১. জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ
২. কোথায় প্রাকৃতিক দুর্যোগ বেশি হচ্ছে
৩. সবচেয়ে বেশি জনসংখ্যা কোথায় ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে
৪. ক্ষতিগ্রস্থ দেশটি ক্ষতি মোকাবিলায় বা অভিযোজনের জন্য এরই মধ্যে কী কী পদক্ষেপ নিয়েছে।

বাংলাদেশে একাধারে সমুদ্রস্তরের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততা সমস্যা, হিমালয়ের বরফ গলার কারণে নদীর দিক পরিবর্তন, বন্যা ইত্যাদি সবগুলো দিক দিয়েই ক্ষতিগ্রস্থ হবে এবং হচ্ছে। এছাড়া প্রাকৃতিক দুর্যোগের মাত্রাও অনেক অনেক বেশি।

আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান জার্মান ওয়াচ-এর ২০১০ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত গ্লোবাল ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেক্স (CRI) অনুযায়ী জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে ক্ষতির বিচারে শীর্ষ ১০টি ক্ষতিগ্রস্থ দেশের মধ্যে প্রথমেই অবস্থান করছে বাংলাদেশ। এই সমীক্ষা চালানো হয় ১৯৯০ থেকে ২০০৯ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ১৯৩টি দেশের উপর। এই হিসেবে বরিশাল ও পটুয়াখালীতে লবণাক্ততার পরিমাণ ২ পিপিটি (লবণাক্ততা পরিমাপক মাত্রা) থেকে বেড়ে ৭ পিপিটি হয়ে গেছে । চট্টগ্রাম শহর সন্নিকটের হালদা নদীর পানিতে লবণাক্ততার পরিমাণ বেড়ে ৮ পিপিটি হয়ে গেছে। এছাড়া বন্যা, অনাবৃষ্টি , অতিবৃষ্টি, ভূমিকম্প, সুনামির মত ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের আশংকা তো রয়েই গেছে।

বর্তমানে দেশের তিনটি জেলা যথাক্রমে কক্সবাজার, বরগুনা ও পটুয়াখালীতেই রাখাইনরা বাস করে। এর মধ্যে বরগুনা ও পটুয়াখালী জেলায় ১০ হাজারের মতো, বাকি রাখাইনদের বসবাস কক্সবাজার জেলাতেই। রাখাইনদের মধ্যে কক্সবাজার শহরের বাসিন্দারা মূলত ব্যবসায়ী। আর উপকূলীয় এলাকার বাসিন্দারা কৃষি ও মৎস্যজীবী। সুন্দরবনে বাস করে মুন্ডারা। মুণ্ডাদের সংখ্যা এই অঞ্চলে ৩,৫০০ থেকে ৪,০০০ হতে পারে। এছাড়া তংচংগ্যারা বাস করছেন উপকূলীয় অঞ্চলে। উপকূলীয় অঞ্চল ও সুন্দরবনে বসবাসরত আদিবাসীদেরও আবহাওয়ার পরিবর্তনের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। এখানেও ধৃত মাছের হার কমে আসছে । কখনও কখনও এমনও হয় সাগর উপকূলে মাছ ধরার মৌসুমের দেড় মাস/ দুই মাস অতিবাহিত হওয়ার পরও পর্যাপ্ত মাছ ধরা না পড়ায় মৎস্যজীবিদের মাঝে হতাশা দেখা যায়। এছাড়া লবনাক্ততা, বন ও গাছ-গাছালির ধ্বংসও আদিবাসী জীবনের উপর প্রভাব ফেলছে।

***
ফিচার ছবি: বিএনবি নিউজ প্রতিবেদন থেকে সংগৃহিত