ক্যাটেগরিঃ মুক্তমঞ্চ

সম্প্রতি একটি বাম সংগঠন রুমানা মঞ্জুরের পক্ষে অবস্থান নিয়ে সাইদের মৃত্যু ঠিকই আছে এই জাতীয় একটি বিষয়কে সামনে আনতে চেয়েছেন বলে মনে হল। তাদের একটি বিবৃতিও দেখলাম ব্লগের একটি লেখা নিয়ে।

তারা বলছেন জনৈক ইব্রাহিম শাহাদাত এবং তার গংরা বিপ্লবী নারী সংহতির প্রতিবাদী প্ল্যাকার্ড ও ব্যানার বিকৃত করে ফেস বুক এবং সোনার বাংলাদেশ ব্লগ অনলাইন অপপ্রচার করেছে। যদি তারা বিকৃত করে থাকে তবে অন্যায়।

কিন্তু আমি বলতে চাই নির্যাতিত বলে যে রুমানাকে আমাদের সামনে আনা হল, দৃষ্টি প্রতিবন্ধী সাইদকে হয়ত বা মেরে ফেলা হল সেখানে এইসব নারীবাদ আমাদের কোন দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এই সব বামপন্থা আমাদের কোন দিকে নিয়ে যাচ্ছে সেইদিকের আমার দৃষ্টি। রুমানার পরকীয়ার বিষয়টি হয়ত বা এখন অনেক বেশি স্পষ্ট। আমি যতদূর শুনেছি এই কথা সাইদ আগেও বলেছে। প্রমানও নাকি মিডিয়ার কাছে আছে। যা ধীরে ধীরে তারা প্রকাশ করছে। কিন্তু মিডিয়া নারীদের পক্ষে কথা না বললে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের পক্ষে কথা না প্রগতিশীল অবস্থান নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়তে হবে বলে তারা সাইদের বিরুদ্ধেই অবস্থান নিয়েছে।

আমি এই বিষয়টা নিয়ে কেমন যেন একটু অসহায় হয়ে পড়লাম। একজন মানুষ যে চোখে ঠিকমত দেখে না মানে দুর্বল তাকে কি নারী শাসন করে আরেকজনের সঙ্গে পরকীয়া করতে পারে? পুরুষেরও কি তাই করা উচিত? সাইদ কি তাই করেছিল? শাসন করেছিল না সে যখন আর কোনও উপায় খুজে পাচ্ছিল না তখন আমি যখন চোখে ভাল দেখি না, তোমাকেও অন্ধ করে দেব এমন একটি প্রতিশোধ কাজ করেছিল। হয়ত হয়ত বা না।

আমি বাম সংগঠনের আরেকজনের লেখা পড়লাম। সে বেশ সাহসের সঙ্গে সব মেয়েকে খারাপ মেয়ে হওয়ার আহবান জানিয়েছে, পরকীয়া করতে বলেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেরাসহ সব পুরুষেরাই ব্রোথেলে যায় বলে মেয়েদরকেও এমন জায়গায় যেতে বলেছে। আমার এই আইডিয়া বেশ ভাল লেগেছে। আমার মনে হয় এমন একটি জায়গা যদি থাকত যেখানে মেয়েরা গিয়ে ছেলে পছন্দ করে তার সঙ্গে সেক্স করবে তাহলে মেয়েদের জন্য খারাপ হত না। বেশ চলতও মনে হয়।

বেশ কিছুদিন আগে একটা ঘটনা ঘটেছিল এরকম যে স্ত্রীর পরকীয়ার বলি হতি হয়েছিল শিশু সন্তানকে। সে সময় পত্রিকায় এরকম এসেছিল ‘এশা (আয়েশা হুমায়রা) আমাকে বলল, “ছেলেটা বাড়াবাড়ি করছে। আমাদের সম্পর্কের কথা ওর বাবাকে বলে দেবে বলে আমাকে ব্ল্যাকমেইল করছে। ওকে একটা শিক্ষা দাও।” ১৯ জুন রাতে এশার ঘরে ওর সামনেই আমি সামিউলের গলা টিপে ধরি। এশা পা চেপে ধরে রাখে। তারপর বালিশ চাপা দিই। এতে সামিউল মারা যায়।’

মোহাম্মদপুরের আদাবরে শিশু সামিউল হত্যা মামলার আসামি শামসুজ্জামান আরিফ র‌্যাব সদর দপ্তরে এভাবেই এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বিবরণ দেন। তাঁর কথা শুনে র‌্যাব কর্মকর্তারাও বিস্ময় প্রকাশ করেন।

আমি একটি বিষয় খেয়াল করলাম এই বামেরা যতটা না এসিড সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়ে, যৌতুকের বিরুদ্ধে লড়ে তার চেয়ে এরা এমন কিছু বিষয় নিয়ে লড়ে যা ঠিক সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যাবার বদলে প্রতিক্রিয়াশীল করে তুলে। এরা গ্রামে একটা মেয়ে টিজের স্বীকার হয় এটা নিয়ে যতটা না কথা বলে তারচেয়ে বলতে পছন্দ করে ছেলেরা ব্রোথেলে যায় কাজেই মেয়েরাও ব্রোথেলে যাবে। এটা কি একটা প্রজেক্ট মাঝে মাঝে সন্দেহ হয়। কেননা এটাকে সুস্থতা বলে মনে হয় না আমার। মনে হয় দুনিয়া জুড়ে এই বাম আর নারীবাদীরা একটা পর্ণোগ্রাফিক সমাজ চায়।

আমি একবার ভাবি এই যে সাইদ প্রতিবন্ধী বলে যার করার কিছুই নেই সেই কারণেই হয়ত সে রুমানাকে ছাড়তে চায়নি। প্রতিবন্ধীদের যেমন ছোট মানুষের মত ক্রোধ থাকে সে কারণেই হয়ত সে রুমানার চোখে আঘাত করে জানাতে চেয়েছিল তোমাকে আমাকেই ভালবাসতে হবে, কেননা আমি শুধু তোমাকেই ভালবাসি। তার এই অবস্থান কি খারাপ ? তাহলে কি প্রতিবন্ধী পুরুষ নারীর কাছ থেকে ভালবাসা আসা করতে পারবে না? বলতে পারবে না, আমি তোমাকে ভালবাসি কাজেই তোমাকেও আমাকে ভালবাসতে হবে।

তাহলে কি নারীবাদ এখন সেই সহিংসতার মুখোমুখী, মিডিয়ায় সেই সহিংসতার উস্কানিদাতা, যেখানে একজন পুরুষের অসহায় হওয়া ছাড়া কিছুই করার থাকবে না। ফারজানা যখন যৌতুকের বিরুদ্ধে লড়েছিল আমি তখন একটা লেখা লিখেছিলাম এই বাম ও নারীবাদীদের কাজকর্মকেই সন্দেহ করে । এটা আবারও দিলাম।

আমরা যারা এ দেশে বসে নারীবাদ, মুক্ত যৌনতা, মেয়েদের ঘরের বাইরে আসা মানে হয়ে দাঁড়ায় ছেলে-মেয়ের এক সঙ্গে সিগারেট-গাজা খাওয়া এসব নিয়ে কথা বলে, আমরা তারা কথা বলি ইউরোপের দিকে তাকিয়ে। এটা না হয় নারীবাদ, না হয় মার্কসীয় প্রগতিশীলতা না হয় ইউরোপীয় প্রগতিশীলতা। সত্যিকার অর্থে এশিয়ার ফেমিনিজম বলে বা এশিয়ার নারীবাদ বলে একটা ব্যাপার আছে। ইউরোপের নারীবাদীরা আসলে এই এশিয়ার নারীবাদীদের কিভাবে দেখেন- এটা এনজিও এর জায়গা থেকে নয় একেবারেই একাডেমিক অর্থেই ইউরোপ মনে করে যে এশিয়ায় অহরহ পারিবারিক নির্যাতন, যে এশিয়ায় পণপ্রথার যাতাকল, যে এশিয়ায় অধিকাংশ নারীর জীবন মানে চার দেয়ালের বন্দীত্ব সে এশিয়ায় আসলে কোন নারীবাদ? এটা কি আদৌ নারীবাদ? কেননা আমাদের সমাজের নারীর বিশেষ অবস্থানেরই যেখানে উত্তরণ ঘটেনি, সেখানে ইউরোপীয় নারীবাদের অনুকরণ হাস্যকর আর কৌতুকরও বটে।

কেননা থার্ড ওয়ার্ল্ড ফেমিনিজম বা এশিয়ার নারীবাদের মোটাদাগের বৈশিষ্ট্যগুলো হল- নারী নির্যাতন-অবদমন, এর ওপর পুরুষতান্ত্রিক সাম্রাজ্যবাদ ও ঔপনিবেশিকতার প্রভাব, আর রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থার লৈঙ্গীয় দাপট। মূলত এখানকার নারীবাদের জায়গাটা ইউরোপের ৭০ ও ৮০ দশকের নারীমুক্তি ও ক্ষমতায়নের মধ্যেই ঠেকে আছে। যার জন্যে নারীবাদী নানা ক্ষমতা কাঠামো প্রসংগ একেবারেই অবান্তর। বা ইউরোপের জটিল পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোর বিরুদ্ধে নারীবাদের প্রতিবাদের ধরণের ধারে কাছেও এটি নেই। এর ফলে এখানে নারীবাদী কাজ বলতে কিছু এনজিও এর কাজ, সুধী সমাজের কাজ আর দরিদ্র মেয়েদের ক্ষেত্রে মার্কসবাদের প্রতি ঝোকের মত বিষয়টিই বোঝায়।

কথাটা এসেই গেল এই কারণে যে ফারজানা একেবারেই আমার আশেপাশের বান্ধবীর মতই। ও ইডেনে পড়েছে। ভাল রেজাল্ট। একটা স্কুলে কাজ আর বরের প্রাইমারি স্কুলের চাকরি। সে যে কাজটা করেছে সেটা এতটা আলোচনার মূল কারণই হল সে ফ্যাশনেবল নারীবাদীদের মত কিছু একটা করেনি। একেবারেই বিদ্যমান সন্ত্রাসীটিকে ঘাড় ধরে বের করে দিয়েছে। মানে সেই ৭০-৮০ দশকের নারীর আচরণটিই করেছে, যা আমাদের সমাজের জন্য দরকারি। শুধু দরকারি নয়, প্রচণ্ডভাবেই দরকারি।

আমার মনে হয় আমার সেই সব বান্ধবীদেরও এটা বোঝার সময় এসেছে যে এটা ইউরোপ নয়, ইউরোপের মত এগিয়ে যাওয়া কোনও সমাজ নয় যে পুরুষ কাঠামোটির প্রতি এতটাই বীতশ্রদ্ধ যে আমাদের লেসবিয়ান সোসাইটি গঠন করতে হবে, বা ফ্রি সেক্স ইত্যকার কাজ করে বেড়াতে হবে সমাজকে কাচকলা দেখানোর জন্য। আমাদের এই ইউরোপের ৭০-৮০ দশকের মত পিছিয়ে থাকা এই সমাজটিকে এগিয়ে নিতে হলে ফারজানাদের মত কাজ করতে হবে। কেননা আমাদের বিদ্যমান সন্ত্রাসী ধরণটি একে -৪৭ রাইফেল নিয়ে দাঁড়িয়ে নেই, সে একটা বড় জোড় ধারাল চাকু নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ওকে ইচ্ছা করলেই মূলোতপাটন সম্ভব। ার আমরা যদি এরকম পিছিয়ে পড়া একটা সমাজে ইউরোপের বর্তমান কোনও নারীবাদীর মত কথা বলতে যাই, তাতে হিতে বিপরীত হবে বলে কোনও সন্দেহ নাই।