ক্যাটেগরিঃ নাগরিক সমস্যা

যানজট একটি স্বাভাবিক নিয়ম হিসাবে আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের সাথে অঙ্গাঙ্গীক ভাবে মিশে আছে। আমরা চাইলেই বা শত চেষ্টা করলেও এই বলয়ের রাহুগ্রাস থেকে পাশ কাটিয়ে চলতে পারছিনা। যেন বিধির বিধানের মত যানজট আমাদের নগর জীবনের সাথে আষ্ঠে-পৃষ্ঠে জড়িয়ে রয়েছে। দিন দিন এই যন্ত্রণাময় অসহ্য পরিস্থিতি ক্রমবর্ধমান হারে বেড়েই চলেছে। এতে একদিকে নাগরিক জীবনে যেমন চরম দুর্ভোগ নেমে এসেছে অন্য দিকে দেশের অর্থনীতিতেও এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। ৩০ মিনিট দূরত্বের পথ অতিক্রম করতে প্রায়শঃ দেখা যায় ২/৩ ঘন্টা সময় লেগে যায়। এতে যানজটে বসে থেকে যাত্রীরা যেমন এক দিকে তাদের সময় এবং স্বাস্থ্যহানি ঘটায় অপর দিকে যানবাহন গুলো যানজটে বসে থেকে অতিরিক্ত জ্বালানী খরচ করে। যার নেতিবাচক প্রভাব প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে দেশের অর্থনীতির উপর পড়ছে। অনেক সময় যানজটের কারনে দেশের অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়ে। কেন যানজট হয় তার যথাযথ কারণ গুলো চিহ্নিত করে এখনই যথাযথ ও যুগোপযোগী পদক্ষেপ গ্রহন করা প্রয়োজন।

কেন যানজট হয়:
১.কর্মসংস্থান ,জীবিকার অনুন্ধান, অফিসিয়াল কাজকর্ম, শিক্ষা, চিকিৎসা, বিনোদন ও উন্নত জীবন যাপনের অভিপ্রায়ে মাত্রাতিরিক্ত জন গোষ্ঠীর নগর মুখী হওয়া।
২.রাস্তার ধারণ ক্ষমতার চেয়ে যানবাহনের সংখ্যা অত্যাধিক বেশী।
৩.ট্রাফিক আইন যথাযথ ভাবে মান্য না করা।
৪.চালকদের অদক্ষতা,অবহেলা ও প্রতিযোগিতার মানসিকতা।
৫.ফিটনেস বিহীন যানবাহন অবাধে রাস্তায় চলাচল করা।
৬.দুর্ঘটনা বা রাস্তার উপর যানবাহন বিকল হয়ে পড়ে থাকা।
৭.রাস্তার পাশে অবৈধ স্থাপনা ও ফুটপাতে দোকান স্থাপন করা।
৮.সড়ক পথের মাঝে রেল ক্রসিং।
৯.সড়ক অবরোধ করে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের বিভিন্ন কর্মসূচী ইত্যাদি।

যানজট থেকে পরিত্রানের উপায়:
বতর্মানে দেশের অধিকাংশ শিল্প কল কারখানা, অফিস আদালত, বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থার কার্যালয়, উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ, উন্নত চিকিৎসার প্রতিষ্ঠান, খ্যাতনামা বিনোদন কেন্দ্রগুলো সহ অধুনিক নাগরিক সুযোগ সুবিধার সিংহ ভাগই ঢাকা মহা নগরীতে অবস্থিত। যার কারনে বাধ্য হয়ে অনেক লোক রাজধানীতে অবস্থান করছে এবং কর্মসংস্থান ও উক্ত সুযোগ সুবিধা গুলো পাওয়ার আশায় জন স্রোতের মত লোকজন রাজধানী মুখী হচ্ছে। এক দিকে রাজধানীতে বসবাসরত বতর্মান জনসংখ্যার দ্রুত বৃদ্ধি অপর দিকে প্রতি ‍নিয়ত রাজধানী মুখী জনস্রোতের ফলে এখানে মানুষের তিল ঠাই হচ্ছে না। কিন্তু এই বর্ধিত জন গোষ্ঠীর জন্য যাতায়াত ও বসবাস উপযোগী অবকাঠামো রাজধানীতে নেই। এমনকি এই ক্ষুদ্র জায়গায় এত বিপুল সংখ্যক লোকের আবাসন ও যাতায়াত ব্যবস্থা সুষ্ঠ ভাবে নিশ্চিত করাও সম্ভব নয়। এই অবস্থা থেকে বাঁচার উপায় হলো জেলা পর্যায়ে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সৃষ্টি করা, বিভিন্ন সরকারী-বেসরকারী অফিসের কাজকমর্ বা সেরা নিজ জেলায় বসে সম্পাদন করতে পারা বা অন লাইনে করার সুযোগ সৃষ্টি করা, জেলা পর্যায়ে আধুনিক চিকিৎসা ও উন্নত বিনোদন ব্যাবস্থা গড়ে তোলা। এতে মানুষ তাদের হাতের নাগালের মধ্যে তার প্রয়োজনটুকু সারতে পারলে রাজধানী মুখী প্রবনতা অনেকাংশে হ্রাস পাবে।

বতর্মানে রাজধানীতে যে পরিমান রাস্তা আছে যানবাহন সংখ্যা তার ধারন ক্ষমতার অনেক গুন বেশী এবং প্রতিনিয়ত যানবাহন সংখ্যা বেড়েই চলেছে। এক্ষেত্রে যানবাহনের উপর নিয়ন্ত্রন আরোপ করা প্রয়োজন। জনপরিবহন ব্যাবস্থা ঠিক রেখে ব্যাক্তিগত ব্যাবহারিত গাড়ীর উপর নিয়ন্ত্রন আরোপ করা যুক্তিযুক্ত হবে। যেমন- একটি নিদিষ্ট পেশা-শ্রেণীর লোক ব্যাক্তিগত গাড়ী ব্যবহার সুযোগ পাবে এবং এই নিদিষ্ট পেশা-শ্রেণীর লোক কি ধরনের দায়িত্ব পালন করলে বা সরকারকে কি পরিমান ট্যাক্স প্রদান করলে ব্যাক্তিগত গাড়ী ব্যবহার সুযোগ পাবে তার একটি সুর্নিদিষ্ট নীতিমালা থাকবে। এই নীতিমালা মান্য করেই শুধু মাত্র ব্যাক্তিগত গাড়ী ক্রয় ও ব্যবহার করা যাবে। চাইলেই কেউ ব্যাক্তিগত গাড়ী ক্রয় ও ব্যবহার সুযোগ পাবেনা। পাশাপাশি যাত্রীবাহী পরিবহনেও কিছুটা পরিবর্তন ও সংযোজন করা প্রয়োজন। প্রতিটি রুটে যাতাযাতকৃত বতর্মান যানবাহনের পাশাপাশি বেশ কিছু আরামদায়ক শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত সংযোজন করা এবং একই যানবাহনে এ শ্রেণী,বি শ্রেণী,সি শ্রেণীর সুযোগ সুবিধা সম্বলিত আসন বিন্যাস করা গেলে অনেক ব্যাক্তিগত গাড়ী ব্যাবহার কারী ব্যাক্তি ব্যাক্তিগত গাড়ীর পরিবর্তে এই সকল গাড়ীতে যাতায়াতে উদ্ধুদ্ধ হবে। এতে রাজধানীর রাস্তার উপর থেকে যানবাহনের চাপ অনেকটা কমে যাবে।

রাজধানীতে প্রতিনিয়ত দেখা যায় অধিকাংশ যানবাহনের চালক গন ট্রাফিক আইনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে নিজেদের ইচ্ছে মত বা খামখেয়ালী ভাবে গাড়ী চালায় এবং বিভিন্ন স্টপেজে অযথা সময় নষ্ট করে নির্দিষ্ট সময়ে গন্তব্যে পৌছানোর জন্য বেপরোয়া ভাবে গাড়ী চালিয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে যানজটের সৃষ্টি করে। এ ছাড়া অনেক অদক্ষ, লাইসেন্স বিহীন চালক এমনকি হেলপার গন গাড়ী চালানোর ফলে দুর্ঘটনা ঘটে এবং মারাত্বক যানজটের সৃষ্টি হয়। এ অবস্থা থেকে উত্তোরনের জন্য প্রশিক্ষিত চালক প্রয়োজন। বি আর টি এ এ লক্ষে একটি কর্মসূচী (কোর্স) চালু করতে পারে যেখানে বিভিন্ন মেয়াদী কোর্স করানো হবে এবং কোর্স সমাপ্তির পর পরীক্ষার মাধ্যমে উত্তীর্ণকারীগনকেই সনদ প্রদান করা হবে। বি আর টি এর কেন্দ্রীয় ও জেলা কার্যালয় থেকে এই কোর্স করার সুযোগ থাকবে। এই প্রক্রিয়ায় সনদ অজর্নকারীরাই কেবল মাত্র লাইসেন্স এর জন্য আবেদন করতে পারবে। রাস্তায় যত ধরনের যানবাহন চলছে প্রতিটি যানবাহন চালানোর জন্য লাইসেন্স গ্রহন করা বাধ্যতা মুলক। লাইসেন্স ছাড়া কেহুই কোন ধরনের যানবাহন চালাতে পারবেনা। তবে যানবাহনের প্রকার ভেদে কোসের্র মেয়াদ ও লাইসেন্স এর ধরন বিভিন্ন। যেমন ভারী যানবাহনের জন্য ৩ মাস, মাঝারি যানবাহনের জন্য ২ মাস, হালকা যানবাহনের জন্য ১ মাস, মটর সাইকেলের জন্য ১৫ দিন, রিক্সার জন্য ৭ দিন এবং বাই সাইকেলের জন্য ৩ দিনের কোর্স থাকবে। বর্তমান চালকদের জন্য এই কোর্স বাধ্যতা মুলক এবং কেবল মাত্র কোর্সসম্পন্ন করার মাধ্যমে সনদ অজর্ন কারীগনই নতুন লাইসেন্সের জন্য আবেদন করতে পারবে এবং যেই যানবাহন চালানোর জন্য সনদ অজর্ন করবে কেবল মাত্র সেই যানবাহন চালানোর জন্য লাইসেন্স প্রাপ্ত হবে। কোন ভাবেই এক ধরনের কোর্স করে অন্য ধরনের লাইসেন্স গ্রহন করতে পারবেনা। যেমন হালকা যানবাহনের জন্য কোর্স করে ভারী যানবাহনের জন্য লাইসেন্স নিতে পারবেনা। এ ছাড়া ত্রুটি যুক্ত, ফিটনেস বিহীন, অসংখ্য গাড়ী রাস্তায় চলতে দেখা যায়। এই ধরনের গাড়ী গুলো রাস্তায় বিকল হয়ে যানজটের সৃষ্টি করে। রাজধানীতে এই সমস্ত গাড়ীগুলো চলাচল নিষিদ্ধ করা প্রয়োজন। এই নিয়ম কাযর্কর করা গেলে রাজধানীর যানজট অনেকটাই লাঘব হবে এবং সারা দেশে যে হারে সড়ক দুর্ঘটনায় জানমালের ক্ষয় ক্ষতি হচ্ছে তা অনেকাংশে রক্ষা পাবে।

ব্যস্ততম রাস্তার পাশ দখল করে ফুটপাতে দোকান পাট বসানো একটি স্বাভাবিক চিত্র। এই ফুটপাতের দোকান গুলোতে মানুষের প্রচন্ড ভীড় লক্ষনীয় এমনকি তিলঠাই থাকেনা। রাজধানীতে ব্যাস্ততম রাস্তার পাশে এমন অসংখ্য ফুটপাতের কারনে মারাত্বক যানজটের সৃষ্টি হয় এমনকি অনাকাঙ্খিত ও মর্মান্তিক দুর্ঘটনাও ঘটে।

রাজধানীতে অসংখ্য স্থানে সড়ক পথের মাঝে রেল ক্রসিং এর ফলে উক্ত স্থান গুলোতে প্রচন্ড যানজট লেগে থাকে। সড়ক পথ বন্ধ করে একবার রেল ক্রসিং এর সময় যে লম্বা যানজটের সৃষ্টি হয় তা স্বাভাবিক হতেনা হতে পুনরায় রেল ক্রসিং হয় এবং ধারাবাহিক ভাবে উক্ত রেল ক্রসিং গুলোতে যানযট লেগেই থাকে। এ অবস্থা থেকে পরিত্রানের জন্য উক্ত স্থান গুলোতে রেল পথ ঠিক রেখে সড়ক পথকে ওভারপাস বা সড়ক পথ ঠিক রেখে রেল লাইনকে আন্ডার পাস করা হলে যানজট অনেকটা কমে যাবে। অন্যদিকে চৌরাস্তা গুলোর যানজট নিরসনের জন্য একটি রাস্তার উপর উড়াল সেতু নির্মান করলে ঐ স্থান গুলোর যানজট কমে যাবে এবং ১০০% ডিজিটাল ট্রাফিক সিগনাল ব্যাবস্থা প্রবতর্ন করে সকলকে তা মান্য করা বাধ্যতা মূলক করা অপরিহার্য। পাশাপাশি রাজধানীতে ডাবল লাইনের মেট্রো ট্রেন সাভির্স চালু করে উভয় দিক থেকে ৩০ মিনিট অন্তর অন্তর ট্রেন নিয়মিত যাতায়াত করলে সড়ক পথের উপর থেকে যাত্রীর চাপ অনেকটা কমে যাবে।

এ ছাড়া অনেক সময় দেখা যায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দল বা সামাজিক সংগঠন বিভিন্ন দাবী দাওয়া নিয়ে রাস্তার উপর মিছিল, মিটিং বা রাস্তা অবরোধ করে। এর ফলেও ব্যাপক যানজটের সৃষ্টি হয়। এ যাতীয় কর্মসূচীগুলো কোন নির্দিষ্ট খোলা মাঠে করা গেলে এর থেকে সৃষ্ট যানজট থেকে মানুষ মুক্তি পেত।

সর্বোপরি আমরা আপামর জনসাধারন যদি সজাগ থাকি,হাটা চলা,রাস্তা পারাপারে সচেতন হই,ট্রাফিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করি তা হলে যানজট অনেকটা কমে যাবে। যারা ট্রাফিক ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ ও কাযর্কর করার দায়িত্বে আছেন বিশেষ করে সরকারী সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও সিটি কর্পোরেশন তারা যদি সচেতন হন এবং উপরোক্ত প্রস্তাবনা গুলো আন্তরিকভাবে বিবেচনা ও বাস্তবায়ন করেন তাহলে রাজধানীর যানজট লাঘব হবে এবং রাজধানী বাসী একটি যানজট মুক্ত বসবাস উপযোগী মহানগরী পাবে।এমন প্রত্যাশা সকলের।।