ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

 

আমি একজন মাধ্যমিক স্কুল শিক্ষক। আমার নাম কমল মজুমদার (ছন্দনাম)। বাবা মা ভাইবোন,স্ত্রী সন্তানসহ ৮জনের পরিবার আমার। সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি আমি। বাবা ডায়াবেটিকস ও চোখের রোগে আক্রান্ত। মা একজন হৃদরোগী। স্ত্রী রিউমেটিক আথ্রাইটিসে আক্রান্ত। আমাদের মাঠে কোন যায়গা জমি নেই। বাবা অথবা আমার পরিবারের অন্য কোন সদস্যের গচ্ছিত কোন অর্থও নেই। চার ভাইবোন পড়াশুনা করে। বাবার জন্য প্রতিমাসে ঔষধ বাবদ খরচ হয় ১৫’শ টাকা। মার প্রতিমাসে ঔষধ খরচে ব্যয় হয় ২ হাজার ৫শ টাকা। স্ত্রীর জন্য ১ হাজার টাকা। নিজ গ্রামে অর্থ উপার্জনের উৎস না থাকায় শহরে বাসা ভাড়া নিয়ে থাকি। প্রতিামাসে বাসা ভাড়া বাবদ ৩ হাজার ২’শ টাকা পরিশোধ করতে হয়। মাসিক বিদ্যুত বিল পরিশোধ করতে হয় ৫’শ টাকা। প্রতিষ্ঠানে যাতায়াত বাবদ খরচ হয় ৬’শ টাকা। খাবার খরচ বাদে আমাকে প্রতিমাসে প্রায় ১০ হাজার টাকা গুনতে হয়। নিজের ব্যায়ের এ হিসেব জানানো আমার মুল উদ্দেশ্য নয়। সম্প্রতি শিক্ষকদের কোচিং বন্ধে শিক্ষা মন্ত্রালয়ের একটি প্রজ্ঞাপন জারীর কারণে বাধ্য হয়ে ব্যয়ের কিছুটা হিসেব তুলে ধরেছি। আমি প্রজ্ঞাপনটি গভীরভাবে পড়েছি। কোচিং বন্ধে মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীর এ মহতী উদ্যোগকে স্বাগত জানাই। জাতির মেরুদণ্ডের খেতাব নিয়ে এমন জঘন্য কাজ আমি তথা কোন শিক্ষকই করতে চান না এটা আমার বিশ্বাস।

প্রসঙ্গত একটি বাস্তব ঘটনার অবতারনা করতে চাই। প্রায় ৪ বছর আগে আমি শহরের একটি বাসায় টিউশনি করতাম। জরুরী কাজ থাকায় একদিন নির্দিষ্ট সময়ের আগে পড়ানোর উদ্দেশ্যে ঐ বাসায় গিয়েছিলাম। দরজার কড়া নাড়তেই আমার ঐ শিক্ষার্থীর মা তাকে ফকিরকে ভিক্ষা দিতে পাঠায়। দরজা খুলে আমাকে দেখে আমার সেই শিক্ষার্থী লজ্জা পেয়েছিল। তবে তার থেকে একটু বেশি লজ্জা পেয়েছিলাম আমি। সে দিনের পর থেকে আমি আর কোন বাসায় পড়াতে যেতাম না। নিজেকে সমাজের একজন মর্জাদাবান ব্যক্তি হিসেবে ভেবে সেদিন থেকে দীর্ঘ সাড়ে তিন বছর আর কোন বাসায় পড়াতে যাইনি। তবে সংসার চালাতে বাড়তি আয়ের জন্য নিজের বাসায় পড়াতে শুরু করি। তখন অবশ্য মা বাবার কেউ অসুস্থ্য ছিলেননা। নিজেও অবিবাহিত ছিলাম। বিদ্যালয়ে চাকুরীবাবদ সরকারী অংশের ভাতা ও নিজের বাসায় পড়ানোর অর্থে সংসারটা সে সময় এক প্রকার ভালোই চলে যেত। এক পর্যায়ে বাবা মার দু’জনেই অসুস্থ্য হয়ে পড়ে। স্ত্রীও রোগাক্রান্ত হওয়ায় এবং এই কয়েক বছরে দফায় দফায় বিভিন্ন দ্রব্যাদির অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় ও সে অনুযায়ী আয় না বাড়ায় বেশ অভাব অনঠনে পড়ে, নিজের ভাড়া বাসায় পড়ানোর পাশাপাশি একটি বাসায় টিউশনি শুরু করি। রাত দিন হাড় ভাঙ্গা খাটুনির মধ্য দিয়েই চলছে আমার বর্তমান। আমার কষ্ট দেখে মাকে প্রায় বলতে শুনি‘ আল্লা আমাকে নিয়ে যাও এভাবে ছেলেটার কষ্টের টাকা গিলতে(ঔষধ খেতে) আর ভালো লাগেনা।” আমি যে দোকান থেকে ঔষধ ক্রয় করি সে দোকানদার আমাকে বেশ খাতির করে। কারণ আমি তার দোকানের একজন বড় কাষ্টমার।

কোচিং বন্ধে বিগত কয়েকদিন ধরে পত্র পত্রিকায় বিভিন্ন লেখা পড়েছি, টিভিতে শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য শুনেছি। সর্বশেষ প্রজ্ঞাপনটিও পড়েছি। প্রজ্ঞাপন লঙ্ঘন করে আমি চাকুরী হারাতে চাইনা, আবার ঔষধের অভাবে বাবা মাকেও হারাতে চাইনা। মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী মহোদয় মা সেদিন অতি সংকোচে আমার পাশে বসে বলেছিলেন, ‘বাড়ি ওয়ালা ভাবি বলেছে এ বয়সে প্রতিদিন একটু দুধ ডিম খেতে, তাহলে নাকি শরীরে একটু বল পাব।’ আমি মাকে বলেছিলাম, ‘ঠিক আছে মা আগামী মাস থেকে দুধ ডিমের ব্যবস্থা করবো।’

এদিকে প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী চাকুরী বাঁচাতে গেলে আমাকে এখন বাসায় দিনে সর্বোচ্চ ১০ জন শিক্ষার্থীকে ১৫০ টাকা হারে পড়াতে হবে। এতে আমার আয় হবে মাসে ১ হাজার ৫’শ টাকা। মাননীয় মন্ত্রী মহোদয় বুঝিয়ে বললে হয়তো দুধ ডিম না কিনলে মা কষ্ট পাবেন না। কিন্তু ঔষধও যদি না কিনে দিতে পারি তাহলে ছেলে হিসেবে ঔষধের অভাবে মায়ের করুন মৃত্যু কিভাবে দেখবো?

আমি ৬ হাজর ৪’শ টাকার স্কেলে চাকরী করি। বেতন পাই মাসে ৬হাজার ৩’শ ৭১টাকা। আমার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি উপজেলা শহর থেকে বেশ দূরে। বিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষার্থী দরীদ্র ও অশিক্ষিত পরিবারের। তাই শুরু থেকেই আমি বিদ্যালয়ে ভালো পাঠদানের চেষ্টা করি। আমি নিজ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট পড়াই না। কাসে যা আলোচনা করি তাতে ওরা মোটামুটি ভালই বুঝতে পারে। বিদ্যালয়ের ফলাফল উপজেলার মধ্যে নজর কাটার মতো। চাকুরী বাঁচিয়ে নিজের প্রয়োজন মেটাতে আমি কি এখন বিদ্যালয়ে গিয়ে শিক্ষার্থীদের এক্সট্রা কোচিং এ (প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী যা শাস্তিযোগ্য অপরাধ)উদ্বুদ্ধ করবো? তাও করে খুব একটা লাভ হবে বলে মনে হয় না। কারণ তারাতো কোন না কোন শিক্ষকের কাছে পড়ছেই।

প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ আছে নিজ বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা আগ্রহী শিক্ষার্থীদের নিজ প্রতিষ্ঠানে প্রতিষ্ঠানের নির্ধারিত সময়ের পূর্বে বা পরে এক্সট্রা কোচিং করাতে পারবে। এক সাথে সর্বোচ্চ ৪০ জন পড়ানো যাবে। উপজেলা এর বিনিময়ে শহরে শিক্ষার্থী প্রতি একটি বিষয়ের জন্য ১৫০ টাকা নেয়া যাবে।

অন্যদিকে একজন শিক্ষক তার বাসায় দিনে নিজ প্রতিষ্ঠান বাদে অন্য প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ ১০ জন শিক্ষার্থীকে পড়াতে পারবেন। এই ধরনের বৈষম্য রয়েছে প্রজ্ঞাপনে।

শহরের বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা প্রাইভেট বা কোচিং এর শিক্ষার্থীদের এক্সট্রা কোচিং এর নামে নিজ প্রতিষ্ঠানে বিনা ভাড়ায় বিদ্যালয়ের কক্ষ ব্যবহার করে প্রত্যেক ব্যাচে ৪০জন শিক্ষার্থী পড়াতে পারবেন। প্রজ্ঞাপনে এমন শিক্ষকদের তেমন সমস্যা নেই বরং এতে তাদের আয় বাড়ার পথ আরো উন্মুক্ত হলো। কিন্তু আমার মতো যারা গ্রামের বিদ্যালয়ে চাকরী করে শহরে থাকে এবং নিজ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট না পড়িয়ে শহরের বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পড়ান তারা তো প্রজ্ঞাপন মেনে চলতে হলে চরম আর্থিক ক্ষতির সম্মুখিন হবেন।

তাই বর্তমান পরিস্থিতিতে আমাদের মতো শিক্ষকদের সামনে দু’টি পথ খোলা একটি বৈধ অপরটি অবৈধ উপায়ে বৈধ। বৈধ পথটি হলো নিজ প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষকের কাছ থেকে অন্য বিদ্যালয়ের যে দশজন শিক্ষার্থীকে প্রাইভেট পড়াবো তাদের নাম শ্রেণী রোলসহ বিদ্যালয়ের নামের তালিকা দিয়ে অনুমতি গ্রহণ করে পড়াতে হবে। অপরটি নিজ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদেরকে কৌশলে বিদ্যালয়ে এক্সট্রা কোচিং এ উদ্বুদ্ধ করে পড়ানো শুরু করা। তবে এ ক্ষেত্রে শহরের শিক্ষকের তুলনায় আমার বাড়তি আরেকটি কাজ করতে হবে তা হলো অভিভাবকের আবেদন পত্রটি আমার নিজেকে লিখে শিক্ষার্থী দিয়ে তার অভিভাবকের স্বাক্ষর করিয়ে আনতে হবে। কারণ শহরের অধিকাংশ অভিভাবক শিক্ষিত ও সচেতন হলেও গ্রামের অভিভাবকরা দু’দিক থেকেই পিছিয়ে।
আমি আবারো শ্্রদ্ধাভরে জানাচ্ছি মাননীয় মন্ত্রী মহোদয় আমাদের তথা শিক্ষকদের নৈতিক মানের অবক্ষয়রোধে প্রজ্ঞাপনটি খুব দরকার ছিলো । তবে আমার মনে হয় আরো ভালো হতো যদি শিক্ষকদের বাড়ি ভাড়া ১’শ টাকা ও চিকিৎসা ভাতা ১’শ ৫০ টাকার স্থলে সরকারী কর্মচারীদের মতো করা হতো সাথে সাথে উপযুক্ত বেতন দেয়া হতো। আমার মনে হয় সেক্ষেত্রে প্রজ্ঞাপনটি আরো কার্যকরী হতো। শিক্ষকসহ সকল মহল আপনার এ উদ্যোগকে আরো স্বাগত জানাতো। সে ক্ষেত্রে একজন শিক্ষককে সন্ধ্যা পর্যন্ত বিদ্যালয়ে শ্রম দিতে বললেও তিনি দিতেন। যেমনটি দিতে দেখি একজন ব্যাংকারকে তার কর্মস্থলে অধিক সময় দিতে । তাদের এই শ্রম দেওয়ার কারণ উপযুক্ত বেতন থাকায় তাকে বাড়তি আয়ের কোন চিন্তা করতে হয়না।

মাননীয় মন্ত্রী মহোদয় আমি প্রজ্ঞাপন মেনে চলতে চাই, রাষ্ট্রের একজন আদর্শ নাগরিক হতে চাই। কিন্তু বিদ্যালয়ে চাকুরী করে যে অর্থ পাই তা দিয়ে যে সংসার চালানো সম্ভব হচ্ছে না। প্রতিষ্ঠানের নির্দিষ্ট সময়ের বাইরে শুধু কোচিং করানো যাবেনা এটা প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ আছে। অন্য কাজে কোন বিধি নিষেধ নেই। আমি কোন কাজকে ছোট হিসেবে দেখিনা। তাই যে কোন কাজ করতে আমার আপত্তি নেই। এদিকে পারটাইম কাজ উপজেলা শহরে পাওয়া প্রায় অসম্ভব। তবে সহজে একটি কাজ করা যায় তা হলো রিক্সা-ভ্যান চালানো। কোন কাজে আমার লজ্জা নেই। তবে একজন শিক্ষক হয়ে রিক্সা-ভ্যান চালানো বাংলাদেশের পেক্ষাপটে তা অতি বেমানান দেখা যায়। অন্যরা এটা ভালো চোখে দেখবেন না। ইজিবাইক চালানো তার চেয়ে একটু স্টান্ডার্ড । কিন্তু ১ থেকে দেড় লক্ষ টাকা দিয়ে কিনে চালানো আমার মতো শিক্ষকের পক্ষে সেটাও সম্ভব নয়। কারণ যা আয় করি তা দিয়ে কোন রকমে সংসার চলে, বাড়তি জমানোর কোন সুযোগ নেই। এদিকে ইজি বাইক ভাড়া পাওয়া যায় কিন্তু এতো অল্প সময়ের জন্য ভাড়া পাওয়া কষ্টকর। কাজেই এটাও সম্ভব নয়। তাহলে আমি কি করে আগামী মাস থেকে আমার বৃদ্ধা অসুস্থ্য মায়ের জন্য দুধ ও ডিমের ব্যবস্থা করবো যা দেবার কথা আমি মাকে দিয়েছিলাম। কিভাবেই বা বাবা মা স্ত্রী সন্তানের ঔষধ কিনবো? আবার এদিকে প্রজ্ঞাপন লঙ্ঘন করে অসভ্য নাগরিক হবার ইচ্ছাও আমার নেই। এখন আমার সামনে দু’টি পথ খোলা এক বাবা মাকে পরিত্যাগ করা অপরটি প্রজ্ঞাপন উপেক্ষা করে নিজ বাসায় প্রাইভেট পড়ানো চালিয়ে যাওয়া। কোনটি করবো আমি? তবে আমি অসুস্থ্য বৃদ্ধ বাবা মার এই অসহায় বয়সে তাদেরকে ত্যাগ করতে চাইনা। আবার রাষ্ট্রের আইনও অমান্য করতে চাইনা। মাননীয় মন্ত্রী মহোদয় আপনিই বলে দিন আমি এখন কি করবো!