ক্যাটেগরিঃ মানবাধিকার

 

মানবাধিকার প্রতিটি মানুষের এক ধরনের অধিকার যেটা তার জন্মগত ও অবিচ্ছেদ্য। মানুষ এ অধিকার ভোগ করবে এবং চর্চা করবে। তবে এ চর্চা অন্যের ক্ষতিসাধন ও প্রশান্তি বিনষ্টের কারণ হতে পারবে না। মানবাধিকার সব জায়গায়এবং সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। এ অধিকার একই সাথে সহজাত ও আইনগত অধিকার। স্থানীয়, জাতীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক আইনের অন্যতম দায়িত্ব হল এসব অধিকার রক্ষণাবেক্ষণ করা। উইকিপিডিয়া (বাংলা) থেকে মানবাধিকারের এমন একটি সংজ্ঞা পেয়েছি। আরো সহজভাবে বলতে গেলে মানবাধিকারের প্রধান বিষয়গুলো দাঁড়ায়, ‘জীবনধারণের অধিকার, সম্পদের অধিকার, মান-মর্যাদা ও ইজ্জত আব্রু রক্ষার অধিকার, ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার, ব্যক্তিগত ও পারিবারিক গোপনীয়তা রক্ষার অধিকার, বিবেক ও বিশ্বাসের স্বাধীনতা, আর্থিক নিরাপত্তালাভের অধিকার, বসবাস, যাতায়াত ও স্থানান্তরের অধিকার, গণতান্ত্রিক অধিকার, পারিশ্রমিক লাভের অধিকার, নারীর অধিকার, সংখ্যালঘুদের অধিকার, আইনের দৃষ্টিতে সমতা ও শ্রমিকের অধিকার ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। উপরে বর্ণিত অধিকারের চর্চা পৃথিবীর কোন দেশে আছে বলে আমার জানা নেই। মানব সভ্যতার উৎকর্ষের এ যুগে বর্তমান সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে চরমভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে মানবাধিকার। বর্তমান সময়ে মানবাধিকার রক্ষায় দেশে দেশে বিভিন্ন নামে মানবাধিকার সংস্থাগুলো সোচ্চার হচ্ছে। তারপরও সাধারণ মানুষের কাছে মানবাধিকার এখন সোনার হরিণ। ক্ষমতাধররা নিজ সুবিধা অনুযায়ী স্থান কাল পাত্র ভেদে মানবাধিকারের সংজ্ঞা পাল্টে ফেলছে। ফলশ্রুতিতে আধুনিক সভ্য সমাজে যেভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে তাতে মানুষকে আর যাই হোক বিবেক সম্পন্ন জীব হিসেবে মানতে কষ্ট হয়। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক দুষ্ট চক্র মানবাধিকারের গলায় পা রেখে সভা সেমিনারে মানবাধিকার নিয়ে গলাবাজি করে নিজেদের ফায়দা হাসিল করছে । এ দুষ্ট চক্রের যাতাকলে পিষ্ঠ মানবাধিকার এখন অন্তিম শয্যায় শায়িত। সাধারণ মানুষ আজ মানবাধিকার ভোগ থেকে যোজন যোজন মাইল দূরে।

বাংলাদেশে সব থেকে বেশি মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে সহিংস রাজনীতির কারণে। অরাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের হাতে রাজনীতি চলে যাওয়া ও রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিষ্ঠাতাদের আদর্শ থেকে দূরে সরে আসায় রাজনীতি সহিংস হয়ে উঠেছে। প্রবীন রাজনীতিবীদদের অনেকে মনে করেন রাজনৈতিক দলের কর্ণধারদের সামান্য আন্তরিকতাই পারে এ সংহিস রাজনীতিকে অহিংস রাজনীতিতে পরিনত করতে। আশার দিক রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলার মধ্য দিয়েও বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৬.১ শতাংশ। ভালোই বলতে হবে। তবে প্রবৃদ্ধি ভালো থাকলেও দেশে অতিদরিদ্র ও অতিধনীর সংখ্যা কিন্তু দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। দেশের অতিদরিদ্র এ শ্রেণির কর্মসংস্থানের তেমন ব্যবস্থা না থাকায় বিপদ জেনেও পরিবারকে একটু সুখে রাখতে, সমুদ্রপথে উন্নত দেশে পাড়ি জমানোর চেষ্টা করছে। মানবতা বিবর্জিত দালালের খপ্পরে পড়ে কত মানুষের সহায় সম্বল ও প্রাণ গেছে তার নির্দিষ্ট সংখ্যা হয়তো কোন দিনই জানা যাবে না। অথৈ সাগরে আজ বিপন্ন মানবতা। এদিকে দেশে আইন শৃংখলারক্ষাকারী বাহিনী কর্তৃক বিচার বর্হিভূত হত্যাকান্ডের ঘটনা কিছুতেই থামছে না। এই বাহিনীর হেফাজতে অপরাধী কিংবা সন্দেহমূলকভাবে ধরে আনা মানুষের ওপর অমানুষিক নির্যাতন, আটকের পর অস্ত্র ঠেকিয়ে গুলি করে প্রতিনিয়ত মানবাধিকারহরণ করা হচ্ছে। এছাড়া আইন শৃংখলারক্ষাকারী বাহিনীর নামে তুলে নিয়ে গুম, সংবাদপত্র প্রকাশনা বাতিল, সংবাদিক নির্যাতন, হুমকির মাধ্যমে মত প্রকাশে স্বাধীনতাহরণ, সংবিধানের ৩৭ অনুচ্ছেদে সভা-সমাবেশ ও মিছিল-র‌্যালী করা প্রত্যক নাগরিকের গনতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক অধিকার হলেও তা করতে না দিয়ে মানুষের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। দেশে ভূ-লুন্ঠিত হচ্ছে মানবাধিকার।

সম্প্রতি বেসরকারী মানবাধিকার সংস্থা অধিকার-এর প্রকাশিত এক প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায়, এ বছরের জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত দেশে ৯৫টি বিচারবহির্ভূত হত্যার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ক্রসফায়ারে মারা গেছেন ৭৩জন। সংস্থাটির প্রতিবেদনে যেসব বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডের কথা বলা হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে বন্দুকযুদ্ধ, গুলিতে নিহত, পিটিয়ে ও শ্বাসরোধ করে হত্যা, নির্যাতনে মৃত্যু এবং অন্যান্য। এ ছাড়া প্রতিবেদনে বলা হয়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দ্বারা পায়ে গুলি করা ঘটনা ঘটেছে ৩০টি। আর গুমের ঘটনা ঘটেছে ৩৬টি। এর মধ্যে জানুয়ারি থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত ৩৩টি গুমের ঘটনা রয়েছে। পাশাপাশি গত পাঁচ মাসে সারা দেশে রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত হয়েছেন ১৩৭ জন। আহত হয়েছেন ৩ হাজার ৭৮৩ জন। প্রতিবেদনে এ ধরনের হত্যাকান্ডের ঘটনাগুলোর সঙ্গে জড়িত আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সংশ্লিষ্ট সদস্যদের বিচারের মুখোমুখি করার এবং আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের আন্তর্জাতিক নীতিমালা মেনে চলার সুপারিশ করা হয়। এছাড়া একই সময়কালে ধর্ষনের ঘটনা ঘটেছে ২৩৩, যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে ৬২, গণপিটুনিতে নিহত হয়েছে ৫৭ জন।

মানবাধিকার রক্ষায় বাংলাদেশে মানবাধিকার কমিশন আছে। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ ২০০৭ এর মাধমে ২০০৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর প্রথম একটি জাতীয় মানবাধিকার কমিশন প্রতিষ্ঠিত হয়। একজন চেয়ারম্যান ও দু’জন সদস্যকে নিয়োগ দেয়ার মাধ্যমে ২০০৮ সালের ১ ডিসেম্বর এ কমিশনের কার্যক্রম শুরু করে। পরবর্তীতে অধ্যাদেশকে বৈধতা না দিয়ে এরপর জাতীয় সংসদ ২০০৯ সালের ২২ জুন একজন চেয়ারম্যান, একজন সার্বক্ষণিক সদস্য এবং অন্য পাঁচ অবৈতনিক সদস্য নিয়োগ দেয়ার মাধ্যমে সাত সদস্য বিশিষ্ট মানবাধিকার কমিশন পুনর্গঠিত হয়। এ কমিশনের কাজ মানুষের অধিকার নিয়ে কথা বলা,অধিকার বঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়ানো। জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে নারী, পুরুষ সহ যে কোন বয়সের দেশী বা বিদেশী যে কোন ব্যক্তি কমিশনের কাছে অভিযোগ করতে পারেন। অর্থাৎ গ্রামের বা শহরের, সমতল বা পাহাড়ী জনগোষ্ঠী, ধনী, গরীব, কৃষক,শ্রমিক, শিক্ষিত অথবা যেকেই কমিশনে অভিযোগ করতে পারবেন। অবস্থা বিবেচনায় কমিশনও স্ব-উদ্যোগে অভিযোগ গ্রহণ করতে পারবে।

গা বাচিয়ে চলা মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যানকে কখনও কখনও অশ্রু ছেড়ে দিয়ে প্রতিবাদী কন্ঠে বক্তব্য বিবৃতি দিতে দেখা যায়। আবার কখনও কখনও তাকে শীত নিদ্রায় যেতেও দেখা যায়। অনেকে মনে করেন পদ হারানোর ভয়ে তিনি ক্ষেত্র বিশেষ রঙ পাল্টে ফেলেন। তাই শেষ আশ্রয় স্থলের প্রতি বিশ্বাস হারানো সাধারণ মানুষ মানবাধিকার হরণকারীদের ইহলৌকিক বিচারের আশা ছেড়ে দিয়ে পরোলৌকিক বিচার চাইছে।

এদিকে সম্প্রতি মালেশিয়া ও থাইল্যান্ডের গহীন অরণ্যে বন্দি শিবির ও গণকবরের সন্ধান পাওয়ার পর ভূলুন্ঠিত মানবতার চিত্র উঠে আসে মানুষের সামনে। মায়ানমারের সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়কে নির্যাতন করে দেশ থেকে জোর পূর্বক সাগরে ঠেলে দেয়া হচ্ছে। সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলিম সম্প্রদায়কে নিজ দেশের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দিতেও অস্বীকার করছে দেশটির ক্ষমতাসীন সামরিক জান্তারা। এছাড়া কিছু দিন ধরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মায়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলিমদের হত্যা-নির্যাতনের যে ধরনের চিত্র তুলে ধরা হচ্ছে তাতে মানবতার লেশমাত্র টিকে আছে বলে মনে হয় না। মায়ানমার বিষয়ে বিশ্ব বিবেক যেন অন্ধ হয়ে গেছে। কোথাও তেমন কোন প্রতিবাদ নেই। অথচ ফিলিস্থিনে কে বা কারা ইসরাইলের তিন স্কুল ছাত্রকে হত্যা করেছে তা নিয়ে ফিলিস্থিনকে উচিৎ শিক্ষা দিতে লম্ফ ঝম্ফ দেখা গেছে বিশ্বমোড়লদের। কিন্তু মায়ানমারের রোহিঙ্গারা মুসলিম বলে তাদের বেলায় মানবাধিকারের ফেরিওয়ালারা টু-শব্দটিও করছেনা। বর্তমানে রোহিঙ্গাদের অবস্থা এমন, “ডাঙ্গায় বাঘ নদীতে কুমির মাঝখানে তারা।” কোথায় যাবে এই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, উত্তর নেই কারো কাছে। অনলাইন নিউজ পোর্টাল পিটিবি নিউজ টোয়োন্টি ফোর ডট কমের একটি সংবাদে দেখেছি অভিবাসন-প্রত্যাশী সংখ্যালঘু মুসলিম রোহিঙ্গাদের সহায়তা করতে নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী অং সান সু চির প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিব্বতের আধ্যাত্মিক নেতা দালাইলামা। দারিদ্র্য ও বৈষম্যমূলক আচরণে অতিষ্ঠ হয়ে মিয়ানমার থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দিকে পালাচ্ছে হাজারো রোহিঙ্গা। মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে সাগরে ভাসছে তাঁরা। অনেকে আধামরা অবস্থায় উদ্ধার হচ্ছে। কিন্তু এ নিয়ে সুচি কোনো মন্তব্য করেননি। রোহিঙ্গারা মুসলিম তাই হয়তো তার কাছে রোহিঙ্গা নির্যাতন মানবাধিকার লঙ্ঘনের পর্যায়ে পড়ছে না। এটাই বিশ্বের মানবাধিকারের সত্যিকার চিত্র।

দেশে হরতাল অবরোধ চলাকালীন সময় আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে নির্যাতন ও হত্যাকান্ডের শিকার হয় আন্দোলনকারীরা। আন্দোলনকারীদের হাতে আহত এমনকি নিহত হতে দেখা গেছে আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের। আবার দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আওয়ামীলীগকর্মীরা, জামায়াত শিবির কর্মীদের হত্যা করেছে। জামায়াত-শিবির কর্মীরা আওয়ামী লীগের কর্মীদের হত্যা করেছে। তেমনিভাবে বিএনপি আওয়ামী লীগ কর্মীদের, আওয়ামীলী বিএনপির কর্মীদের হত্যা করেছে। আস্তিকরা হত্যা করছে নাস্তিকদের। নাস্তিকরা আস্তিকদের। অবস্থাদৃষ্টে এটাই প্রতিয়মান হয় কেউ কোন মানুষকে হত্যা করেনি। কারন মানুষ বিবেক জ্ঞান সম্পন্ন। তারা এমন জঘন্য কাজ করতে পারেনা। মানুষকে হত্যা করতে গেলে বুক কেঁপে উঠতো। দরদী হাত হত্যা থেকে বিরত থাকতো। দলাদলির গোলক ধাঁধায় পড়ে মানুষ আজ বিবেক বর্জিত হয়ে পড়েছে। রক্তারক্তিতেও মানব অনুভূতিতে সামান্যতম রেখাপাত করে না। অথচ পৃথিবীর সব মানুষের কান্নার শব্দ এক। স্বজন হারানোর বেদনা সকলের এক। জাতি, ধর্ম-বর্ণ দলমত নির্বিশেষে সকলের রক্তের রঙও এক। তাহলে মানুষে মানুষে কেন এ হানাহানি? মানবাধিকার বিষয়ে কেন এই ভিন্ন দৃষ্টি ভঙ্গি? আসলে মানুষকে মানুষ বলে ভাববার সময় এসেছে। নইলে দলাদলি ও বিভিন্ন ধর্মে-বর্ণে বিভক্ত মানবজাতি একে অন্যের অধিকারহরন করার মাধ্যমে ডাইনোসরের মত অচিরেই বিপন্ন হয়ে যাবে।