ক্যাটেগরিঃ চারপাশে

 

“আয় ছেলেরা আয় মেয়েরা ফুল তুলিতে যাই
ফুলের মালা গলায় দিয়ে মামার বাড়ি যাই॥” কবি পল্লীর ছেলে-মেয়েরা ফুল তুরে মালা গাঁথে, গলায় দিয়ে মামা বাড়ি যাওয়ার জন্য কিন্তু কালীগঞ্জের ফুল পল্লীর ছেলেমেয়েরা ফুল তুলে মালা গাঁথে দুটি পয়সা রোজগারের আশায়। টুম্পা রানী তাদের একজন। সে প্রতিদিন ফুল তোলে, মালা গাঁথে। পাশাপাশি পড়াশুনাও করে। ৭ম শ্রেণির ছাত্রী টুম্পার(১২) রোল নম্বর ৪। প্রতিদিন প্রায় দেড় কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে স্কুলে যায়। উপজেলার শাহাপুর ঘিঘাটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় টুম্পা পড়াশুনা করে। প্রতিদিন স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে ফুল তুলে মালা গাঁথে। একেকটি মালা গেঁথে টুম্পা ১০টাকা করে পায়। যে দিন স্কুল বন্ধ থাকে সেদিন সারা দিনে কমপে ২০টি মালা গাঁথতে পারে টুম্পা। এতে ওর প্রায় ২০০টাকা আয় হয়। তাই দিয়ে পড়ার খরচ মেটানোর পাশাপাশি পরিবারের টুকরো খরচও চলে যায়। মেয়েটাকে কাজ করতে না হলে হয়তো আরো ভালো রেজাল্ট করতে পারতো। কথাগুলো বলছিলো টুম্পার মা অর্চনা রানী। নিজের যায়গা জমি নেই। তাই পরের েেত কামলা খাটতে হয় টুম্পার বাবা রবীন্দ্র নাথের। বাবার আয়ে সংসারে টানাপোড়ন লেগেই থাকে। তাই বাড়িতে বসে মা অর্চনা রানী ও টুম্পা দু’জনে মিলে অন্যের েেতর গাঁদা ফুল তুলে মালা গাঁথে। এ থেকে যে বাড়তি আয় হয় তা দিয়ে তেমন কিছু না হলেও অন্তঃত মেয়ের পড়ার খরচের চিন্তা করতে হয় মা অর্চনাকে।

ঝিনাইদহ জেলার ফুলের ভান্ডার খ্যাত কালীগঞ্জ উপজেলার ফুল পল্লী ঘিঘাটি গ্রামের শতাধিক পরিবার প্রত্য ও পরোভাবে গাঁদা ফুলের ওপর নির্ভরশীল। শাহাপুর ঘিঘাটি ও বড় ঘিঘাটির প্রায় প্রত্যেক বাড়ির নারী-পুরুষ কোন না কোন ভাবে এ ফুলের সাথে জড়িত। টুম্পার মতো শিশুরাও বড়দের সাথে ফুল সংগ্রহ ও মালা গাঁথার কাজে সহযোগিতা করে। চতুর্থ শ্রেণি পড়–য়া মুক্তা জানায় সে প্রতিদিন ৫থেকে ৭টি করে ফুলের মালা গাঁথে। এতে ওর প্রতিদিন প্রায় ৫০থেকে ৭০টাকা আয় হয়। তানিয়া শাহাপুর ঘিঘাটির ব্রাক স্কুলের প্রথম শেণিতে পড়ে। ও প্রতিদিন ৩টি থেকে ৫টি করে মালা গাঁথে। এতে ওর প্রতিদিন ৩০ থেকে ৫০ টাকা আয় হয়। প্রতিদিনকার আয় মায়ের হাতেই তুলে দেয় বলে জানায় শিশু তানিয়া। ফুল পল্লী ঘুরে ঘুরে দেখা গেছে প্রায় প্রতিটি বাড়িতে মালা গাঁথায় ব্যস্ত সময় কাটাতে বাড়ির বউদের। তাদের সাথে শিশু ও বৃদ্ধাদেরকেও দেখা গেছে সমানতালে মালা গাঁথতে। শাহাপুর ঘিঘাটির ৬০ বছর বয়সী জয় বুড়িও প্রতিদিন ৭থেকে ৮টি মালা গাঁথতে পারে বলে জানায়। একই পল্লীর বউ তহমিনা জানান, ফুলের এ কাজ প্রায় সব সময় থাকে তবে প্রতি বর্ষার মৌসুমে ফুল গাছ মারা যায় আবার গাছ ভালো থাকলে ফুলে পচন ধরায় ঐ সময়ে কাজ থাকে না। এছাড়াও বছরের ২/৩ মাস ফুলের দাম পড়ে যায় যার কারণে ফুল চাষিরা ঐ সময় ফুল বিক্রি বন্ধ রাখে। ফলে এ সময় তাদেও বাড়তি রোজগার বন্ধ হয়ে যায়। তহমিনা জানায়, এসময়ে যদি কোন সংস্থা বা সরকারী উদ্যোগে ুদ্র কুঠির শিল্পের কাজের ব্যবস্থা করে দিতো তবে তাদের বাড়তি আয় বন্ধে কোন চিন্তা থাকতো না। এলাকার ফুল চাষি আশরাফুল ইসলাম জানান, ফুল পল্লীর এ বাসিন্দরা সকাল হতে বিকাল ৪টা পর্যন্ত ব্যস্ত সময় কাটায়। সারাদিনে গাঁথা মালা নিয়ে পল্লীর পুরুষেরা বিকালে পার্শ্ববর্তী বালিয়াডাঙ্গা ফুল হাটে তা বিক্রি করতে নিয়ে যায়। তিনি আরো জানান, গ্রামের অধিকাংশই মালা গাঁথার কাজে ব্যস্ত থাকায় এ পল্লীতে তেমন একটা ঝগড়া বিবাদ দেখা যায়না। তাই ফুল পল্লীর বাসিন্দারা উপজেলায় শান্তি প্রিয় মানুষ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে সবার কাছে।

মিজানুর রহমান, কালীগঞ্জ, ঝিনাইদহ
২৩.০৫.১২
০১৭৬৩৪৪৬৬২

লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে : http://bd24live.com, ৯ এপ্রিল ২০১২