ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

ঘটনাটি পুরনো হলেও কাঁচা ঘা এ নুনের ছিটার মতই তা আবারো দগদগে হয়ে উঠল, বন্ধু শাহজালালের ফোন পেয়ে। দুপরের খানিকটা পরে শাহজালাল ফোন করে বলছিল, ব্যস্ততায় থাকলেও যেন (23 মার্চের)ইত্তেফাকের শেষ পৃষ্ঠার “বিচার না পেয়ে ঘাতক হয়েছি ” শিরোনামের লেখাটি যেন পড়ি। সাথে সাথেই বললাম যশোরের ঘটনা ? শাহজালাল বলল হ্যা। যা হোক ব্যস্ততা সেরে লেখাটি পড়ায় মনোনিবেশ করলাম। “জানি, বিচারে আমার ফাঁসি হবে। তবে এ নিয়ে আমার কোন অনুশোচনা নেই। দুঃখ শুধু একটাই, দুর্বলের পাশে কেউ থাকে না। যার ক্ষমতা ও দাপট বেশি তাকেই সবাই সমীহ করে। সে যত বড় শয়তানই হোক না কেন। পুলিশ ও উপস্থিত সাংবাদিকদের সামনে এভাবেই প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন কিশোরী কন্যার উত্ত্যক্তকারীকে নিজ হাতে হত্যা করার অভিযোগে গ্রেফতারকৃত যশোর সদর উপজেলার দেয়ারা ইউনিয়নের ভেকুটিয়া গ্রামের কৃষাণী খাদিজা বেগম (৪৫)। গত ১২ মার্চ নিজ বাড়িতে তিনি হাসুয়া (বড় দা) দিয়ে হত্যা করেন উত্ত্যক্তকারী একই এলাকার বাসিন্দা পাঁচ সন্তানের পিতা মফিজুর রহমান মফিকে (৪৪)।”

কিন্তু কেনই যেন পুরো লেখাটি পড়ে শেষ করতে পারছিলাম না। কারণ গত 12 মার্চ এর ঐ ঘটনাটি ঐ দিন বিভিন্ন টেলিভিশনের স্ক্রল নিউজে দেখে বহুবার আমার মধ্যে নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খেয়েছে। আমাদের টেলিভিশনে অপরাধ বিষয়ক একটি প্রোগ্রামের পরিকল্পনা বৈঠকেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছি। মনে হচ্ছিল, অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধি আর অপরাধের বিস্তারের পেছনে আমাদের সমাজ বাস্তবতা কতখানি দায়ী। একজনকে অপরাধী হয়ে ওঠার জন্য আমরা, আমাদের চারপাশ পরিবেশ, প্রতিবেশ আর প্রভাবেশ কতখানি দায়ী হতে পারে। ঘটনাটি জানার পর থেকে মনে হচ্ছিল, একজন মেয়ের মা, কিভাবে উত্যক্তকারীকে হত্যা করতে পারে। কোন পরিস্থিতিতে এটা করতে পারে। এর পেছনের গল্পটা তাহলে কি ? দৈনিক ইত্তেফাকের পিনাকি দাসগুপ্ত ও আহমেদ সাঈদ বুলবুল ভাইর রিপোর্টের কারণে সেই বিহাইন্ড দ্যা সিনটা কিছু জেনেছি। যতটুকু জেনেছি, তাতে আবার নতুন কিছু প্রশ্ন তৈরী হয়েছে। আর যা-ই হোক, একজন হত্যাকারী হিসেবে খাদিজা বেগমের তো ফাঁসি হবে’ই। নাকি হবে না ? ছোট বেলায় আব্বার কাছ একটা গল্প শুনেছিলাম। জারী গানের বিখ্যাত এক বয়াতির ফাঁসির রায় নিয়ে। বয়াতির গানের দলের এক দোহার ( কোরাশ জারি গানের সহযোগী) কে লাথি মারার পরে মারা যাওয়ার অপরাধে ঐ বয়াতির ফাঁসির রায় হয়েছিল। কিন্তু খুব জনপ্রিয় ঐ বয়াতির ফাঁসির রায় নিয়ে সবমহলেই ছিল নানা গুঞ্জন আর আলোচনা। কেন কিংবা কোন পরিস্থিতিতে বয়াতি তার দোহারকে মেরে ছিল তা নিয়ে নানা মহলের মুখরোচক নানা আলোচনা থাকলেও আদালতের আইনের বিচারের বয়াতির শাস্তি হল ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মারার। দিনক্ষণ নির্ধারনের পরে ফাঁসির দন্ডাদেশ প্রাপ্ত ব্যক্তির শেষ ইচ্ছে পূরনের পালায় বয়াতি একটি গান শোনাতে চান সবাইকে। শর্ত দেন, বিচারক, জেলার, প্রশাসনের সকল উচ্চ মহলের জ্ঞানী গুনীজনকে থাকতে হবে সেখানে। আর জেলে সব হাজতি কয়েদিও শুনবে তার জীবনের শেষ গান। শেষ ইচ্ছে অনুযায়ী সব কিছু হাজির। শুরু হল গান, খুবই মর্মস্পর্শী এক গান ধরলেন বয়াতি। পুরো আয়োজন মন্ত্রমুগ্দ্ধ। সবাই পিনপতন নিরবতায়, সুরের মূর্ছনায় এক অজানা জগতে বিচারক জেলারসহ সকল উপস্থিতি। গানের খুবই গুরুত্বপূর্ন একটি সময়ে হঠাৎ এক দোহার দিলেন গানের তাল ছেড়ে। থেমে গেল বয়াতির গান..। পুরো মঞ্চ ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল, গানের তাল ছেড়ে দেয়া দোহারকে মারতে উদ্যত হলেন উচ্চ পদের জ্ঞানী গুনীদের কেউ কেউ। সবাইকে শান্ত করলেন বয়াতি। বললেন, ওর কি দোষ ? তখন উপস্থিত শ্রোতাদের অভিযোগ, ভাল একটি গান শোনা থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে তাদের। এরপর কিভাবে কি কারণে, কেনই বা তিনি লাথি দিয়েছিলেন নিহত দোহারকে, তার খানিকটা বর্ননা করে উপস্থিত সকলকে। তার ঐ বুঝানোর ফলে, শাস্তি মওকুফ হয়েছিল কিনা বয়াতির, নাকি ফাঁসিতে ঝুলতে হয়েছিল, তা স্পষ্ট মনে নেই। কিন্তু যশোরের খাদিজা বেগম, যে কিনা নিজের মেয়েকে বারবার চেষ্টায় উত্যক্তকারীর হাত থেকে রক্ষা করতে না পেরে কুপিয়ে হত্যা করেছেন উত্যক্তকারীকে, সেই খাদিজা বেগমের অপরাধের মা্ত্রা কত খানি তা খুঁজতে খুব ইচ্ছে হচ্ছে। যদিও অপরাধ বিচার বিশ্লেষনে রায় দিবেন আদালত। তবু এই মনুষ্য বিবেকের আদালতে যে সব প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে তারই খানিক এলোমেলো ভাবনা তুলে ধরছি মাত্র।
অপরাধ কাকে বলে ?
ফৌজদারী কার্যবিধি বা দণ্ডবিধিতে অপরাধের কোন সুস্পষ্ট এবং সংক্ষিপ্ত সংজ্ঞা নাই। বস্তুত ফৌজদারী কার্যবিধি ও দণ্ডবিধিতে উল্লেখ্য সবধরনের কার্যকলাপই অপরাধ বলে গণ্য।
ফৌজদারী কার্যবিধির ধারা ৪(১)(ণ) অনুযায়ী, অপরাধ বলতে সেই সকল কাজ (act) বা কাজে ত্রুটি (omission) বুঝাবে যা বর্তমানে কার্যকর কোন আইনে দণ্ডনীয় করা হয়েছে।
সাধারণত অপরাধ বলতে আইন দ্বারা নিষিদ্ধ ও দন্ডনীয় কাজকে বুঝায়। আইনবিদ ই, এইচ সাদারল্যান্ড অপরাধের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেছেন, “আইন লংঘন করাই অপরাধ”। অপর আইনবিদ স্টিফেন এর মতে, “অপরাধ বলতে সেসব কাজ করা বা না করাকে বুঝায় যার জন্য আইনে শাস্তির ব্যবস্থা রয়েছে”। তাই আমরা এখানে বলতে পারি যে, আইন ভঙ্গমূলক যে কোন কাজই অপরাধ। আর সেই দৃষ্টিতে খাদিজা বেগম অবশ্যই অপরাধী।
কিন্তু আইনগত দৃষ্টি ভঙ্গির বাইরে অপরাধ সামাজিক প্রথা, রীতি নিতি ও অনুশাসনের সাথে সম্পর্ক যুক্ত। মানুষ সামাজিক জীব হিসাবে সমাজের প্রচলিত রীতি নিতি ও অনুশাসন মেনে চলে। তাই সামাজিক নিয়ম ভঙ্গ করলে ও সমাজ শাস্তির ব্যবস্থা করে। তাই প্রচলিত অর্থে সামাজিক রীতি ভঙ্গ করাও একটি অপরাধ।
এই অর্থে মনুষ্যরুপী নরপিশাচ যশোর সদর উপজেলার দেয়ারা ইউনিয়নের তেতুলবাড়িয়া গ্রামের মোসলেম শেখের ছেলে মফিজুর রহমান মফু‘র অপরাধ কতখানি ছিল ? যে কিনা প্রথমে খাদিজা বেগমের বোনের ননদের মেয়েকে প্রথম বিয়ে করে। ঐ ঘরে তার চার মেয়ে ও এক ছেলে রয়েছে। বড় মেয়ে কলেজে পড়ে। তারপরও সে কোটচাঁদপুরে গিয়ে খাদিজার বোনের মেয়ে রুনাকে উত্ত্যক্ত করত। সেখান থেকে রুনার বাবা-মা রুনাকে যশোরে খাদিজার কাছে পাঠিয়ে দেয়। সেখানে এসেও মফি রুনাকে বিরক্ত করত। একটা সময় রুনা বাধ্য হয়ে মফিকে বিয়ে করে।
তবে ঘটনা ওখানেই শেষ নয়। এরপর মফি খাদিজা বেগমের অষ্টম শ্রেণি পড়ুয়া মেয়েকে উত্ত্যক্ত করা শুরু করে। খাদিজা তাকে নানাভাবে বুঝালেও কোন কাজই হয়নি। এও বলে যে ও তোমার মেয়ের চেয়েও ছোট। ওকে বিরক্ত করো না। কিন্তু সে খাদিজার কথা না শুনে সাঙ্গপাঙ্গদের সঙ্গে নিয়ে মাঝেমধ্যেই বাড়িতে এসে শাসাত এবং বিয়ের জন্য চাপ দিত। এ নিয়ে এলাকার লোকজনও নানা বাজে মন্তব্য করতে শুরু করে। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে মফির বিরুদ্ধে থানায় জিডিও করে খাদিজা।

এলাকার ইউপি মেম্বার,রাজনৈতিক নেতাদের কাছে নালিশ করেও মফির বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়নি কেউই। উল্টা মফির উত্পাত আরও বেড়ে যায়। এ অবস্থায় মাসখানেক আগে মেয়েকে খাদিজা ঢাকায় মেজ ছেলের ( রাজমিস্ত্রী) কাছে পাঠিয়ে দেয়। তাতেও মিলেনি সমাধান। ঐ 12 মার্চ এসে খাদিজাকে মেয়েকে বের করে দিতে হুমকি দিতে থাকে মফি। তখনই বাটা মরিচ চোখে মেখে দিয়ে হাসুয়া (বড় দা) দিয়ে খাদিজা হত্যা করেন উত্ত্যক্তকারী (পাঁচ সন্তানের জনক মফিকে)

দানবের রোষানল থেকে কিশোরী কন্যাকে রক্ষা করতে পুলিশ ও প্রভাবশালীদের দ্বারে দ্বারে ঘুরেও কারো সাহায্য না পাওয়ার কি কথা ছিল খাদিজার ? স্থানীয় গণমান্য, জনপ্রতিনিধি পুলিশ প্রশাসন সবযায়গায় গিয়েও যেখানে সমাধান পাননি কিশোরী কন্যা নিয়ে দিশেহারা মা, তার জন্য এই সমাজ বা রাষ্ট্র কত খানি দায় নিবে ? যে সমাজ বা যে রাষ্ট্র কিশোরীর নিরাপদ বেড়ে ওঠা, তার পরিবারকে নিশ্চিন্তে চলার অধিকার বঞ্চিত করে, সেই সমাজে নিরুপায় কিশোরী উত্যক্তকারীকে হত্যাকারী মা “খাদিজার” কি বিচার হবে ?

বিচার যাই হোক, খাদিজার তাতে আফসোস নেই। কারণ সে বলেছেন,

“ সবাই দেখছি বলে আশ্বাস দিলেও কেউই সাহায্যের হাত বাড়ায়নি। শেষটায় বাধ্য হয়ে নিজেই সব বিচারের ভার কাঁধে তুলে নিয়ে ঘাতক হতে বাধ্য হয়েছি। কারণ মা হয়ে মেয়েকে রক্ষা করতো পারব না ?- এ যন্ত্রণা আমাকে তাড়িত করছিল। জানি, বিচারে আমার ফাঁসি হবে। তবে এ নিয়ে আমার কোন অনুশোচনা নেই। দুঃখ শুধু একটাই, দুর্বলের পাশে কেউ থাকে না। যার ক্ষমতা ও দাপট বেশি তাকেই সবাই সমীহ করে। সে যত বড় শয়তানই হোক না কেন।”

কথা বলার এক পর্যায়ে খাদিজা বেগম ডুকরে কেঁদে ওঠেন এবং বলেন, ইজ্জতের মালিক আল্লাহ। আল্লাই রক্ষা করবে। খুন করে আমি কোনো ভুল করিনি। আমার কষ্টটা আমার মত মায়েরাই একমাত্র বুঝতে পারবেন।

হয়ত খাদিজা বেগমের হন্তারক হওয়ার ঘটনা নিয়ে নানা মহলের নানা বিশ্লেষণ, আইনের নানা ধারায় বিচারের প্রসঙ্গে নানা আলোচনা হতে পারে। বিচারের ভার মহামান্য আদালতেরই।
কিন্তু সমাজ সদা পরিবর্তনশীল। আবার এক সমাজে যে কাজ করা অপরাধ অন্য সমাজে তা অপরাধ না ও হতে পারে। সামাজিক অনুশাসন একটি রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে যেমন বিভিন্ন রুপ পরিগ্রহণ করে তেমনি তার সার্বজনিনতা ও ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে। আবার এক কালে যে কাজ কে অপরাধ বলে গণ্য করা হত, কালের বিবর্তনে হয়ত এক সময় তা আর অপরাধ না ও হতে পারে। এর ফলে সামাজিক দৃষ্টি কোন থেকে সর্বকালের জন্য প্রযোজ্য অপরাধের সংজ্ঞা নির্নয় করা কষ্টকর।
তাই অপরাধকে সংজ্ঞায়িত করতে হলে আইনগত দৃষ্টি কোন থেকেই বিবেচনা করতে হবে। কেননা আইন সবার জন্য, রাষ্ট্রের সকল নাগরিকের জন্য সমান ভাবে কার্যকর। ব্যক্তি ভেদে বা সমাজ ভেদে আইনের ভিন্ন ভিন্ন প্রয়োগ নাই। সকল সমাজের জন্য আইন (একি রাষ্ট্রের মধ্যে) সমান ভাবেই প্রযোজ্য। সে হিসেবে আইন ভাঙ্গার জন্য মফি’র বিচার হওয়া ছিল জরুরী (যদিও প্রশাসন, সমাজ রাষ্ট্র ব্যর্থ হয়েছে সেটা করতে) আর আইন নিজের হাতে তুলে নেয়ার জন্য খাদিজার বিচারও জরুরী।

আর তা ই যদি হয়, তাহলে খাদিজারও তো মেয়েকে উত্যক্তকারীর হাত থেকে রক্ষা করার অধিকার ছিল ?

কিন্তু প্রশ্ন একটাই, তাহলে আসলে অপরাধী কে, ঘুনে ধরা ভঙ্গুর সমাজ, না নিরুপায় ব্যক্তির আইন নিজের হাতে তুলে নেয়া ?

লেখক : সিনিয়র ক্রাইম রিপোর্টার, এসএটিভি।
badsha2050@gmail.com