ক্যাটেগরিঃ প্রযুক্তি কথা

 

ফিঙ্গারপ্রিন্ট একজন মানুষের প্রাইভেসির সর্বোচ্চ লেভেল
আমেরিকার মত নিরাপত্তা কাতর গোয়েন্দাবহুল দেশেও শুধু গ্রেফতার হলে (পুলিশ) বা ইমিগ্রেশন কাউন্টার (হোমল্যান্ড সিকুরিটি) ছাড়া কারো ফিঙ্গারপ্রিন্ট নেয়ার অধিকার কারও নেই। আমেরিকান নাগরিক বিদেশ ভ্রমণ না করলে, সোশাল সিকুরিটি কার্ড, চাকুরি পেতে, ফোন কিনতে, বন্দুক/পিস্তল কিনতে বা অন্য কিছু করতে হাতের ছাপ কেউ নিতে পারে না। এই আমেরিকান প্রাইভেসি অধিকার ৮০ দশকেই মার্কিন আদালতে নিষ্পত্তি হয়েছিল। পাসপোর্ট করতে বা বিদেশে যেতেও ফিঙ্গারপ্রিন্ট লাগে না, শুধু ফিরে আসার সময় সে যেই হউক সম্প্রতি গঠিত ‘হোমল্যান্ড সিকুরিটিকে’ হাতের ছাপ দিতে হয়।

আমাদের মত অনিরাপদ, দেশ যার বিপুল ঘনবসতি, অপর্যাপ্ত অবকাঠামো। তখন হাওয়া ভবনের তৈরি অতিরিক্ত দেড় কোটি ভুয়া ভোটার। তাই ২০০৮ এ অতিগুরুত্ত্বপুর্ন নির্বাচন ও প্রথমবার ছবিসহ ভোটার তালিকা + NID করতে আঙ্গুলের ছাপ দিতে কেউ হ্যাসিটেট করেনি।
আমার নিজস্ব মত, আমেরিকার মত ‘অপরাধ করে গ্রেফতার না হওয়া পর্যন্ত কারো ফিঙ্গারপ্রিন্ট দিতে বাধ্য করে প্রাইভেসি বিপন্ন করার অধিকার কারো নেই। NID করতে সরকারকে একবার হাতের ছাপ দি্য়েছি, দরকার হলে ভেরিফিকেশন করতে আবার ফিঙ্গারপ্রিন্ট দিব, কিন্তু বেনিয়া মুনাফাখোর ফোন কোম্পানিকে দেয়ার কোন মানে হয় না।

কিন্তু এখন চলছে যত্তসব ননসেন্স!!
কোটি টাকা ট্যাক্স ফাঁকি দিয়া চলতে থাকা কিছু অসাধু বেনিয়া টেলকম মাল্টিন্যাশনাল প্রতিষ্ঠানকে এই অতি একান্ত ভয়ানক ডাটাবেস উম্মুক্ত করে দিয়ে রাষ্ট্রের এবং নাগরিকদের জীবন বিশ্বব্যাপি অনিরাপদ করার মচ্ছব চলছে!
ফিঙ্গারপ্রিন্ট একজন মানুষের চূড়ান্ত লেভেলের প্রাইভেট ম্যাটার, এ জিনিস বিক্রিকরে কোন মহলের হাতে তুলে দিয়ে সারা বিশ্বে আমাদের জীবন বিপর্যস্ত করার সুযোগ দেয়ার কোন মানে হয় না।
আমার ধারনা মার্কিন গোয়েন্দারা অলরেডি আমাদের দেশের সমুদয় NID (with fingerprint) ডাটাবেস হস্তগত করেছে। সেটা তত্তাবধায়ক সরকার কে হাত করে বা ঘুষ দিয়ে হস্তগত করেছে। এছাড়া তারা বিশ্বের সকল ফোনকল রেকর্ড করে, এটা ওপেন সিক্রেট। সম্প্রতি জার্মান চ্যান্সেলারের ফোনও আড়িপেতে ধরা খাওয়ার পর আরো নিশ্চিত জানা যায়। হাতের ছাপ তো নিয়েছেই, এখন এরা সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে এদেশের মানুষের অতি গুরুত্ত্বপুর্ন DNA নমুনা হাতিয়ে নিচ্ছে।

আমার নিজের চোখে দেখা, সেদিন স্কোয়ার হাসপাতালে এক রোগি দেখতে গেছিলাম, এর আগে আনোয়ারখান মর্ডানেও এরকম একজন দেখেছিলাম। একজনের অপেক্ষায় বসে আছি, পাশে একজন রিপ্রেজেন্টিটিভ দেখে আলাপ জমানোর চেষ্টা করলাম, কোন কোম্পানি?
না ভাই, মেডিকেল রিপ্র না। বললো “স্যাম্পলের জন্য বসে আছি”।
যা বুঝলাম, ব্লাডটেষ্ট সম্পন্ন হওয়ার পর বারকোড/নাম্বার সহ পরিত্যাক্ত স্লাইড/টিউব নামের তালিকা সহ একটি এনজিওর কাছে চুক্তিতে বিক্রি করা হয়। রাত ১০টার পর সে এগুলো নিয়ে যাবে।
জিজ্ঞেস করলাম এগুলো দিয়ে কি করেন? বললো “পরিক্ষা/গবেষনা এইসব … আর জানি না”।
বললাম ভাই অফিস কোথায় আপনাদের? বলে পল্লবি, মিরপুর। আমি তিনমাস হল এই অফিসে কাজ পাইছি, বেশি কিছু জানিনা।
বোঝাই যাচ্ছে কারা নিচ্ছে প্রতিদিন হাজার হাজার পরিত্যাক্ত রক্তনমুনা। এত ভয়ঙ্কর ব্যাপার জনসমক্ষে চলছে। দেশের তো দেখার কেউ নেই। মা বাপ কেউ নেই।

ফোন/সিম কিনতে বা রেজিষ্ট্রশন করতে আবার ফিঙ্গারপ্রিন্ট দেয়ার কোন মানে হয় না। সরকার দরকার হলে আবার ফিঙ্গারপ্রিন্ট নিয়ে NID রিভেরিফাই করুক, শুধু সরকার করুক। সিম কিনতে সুধু NID/Passport/Driving licence/জন্মনিবন্ধন যথেষ্ট। দরকার হলে চোদ্দবার ভেরিফাই করুক। দ্বিতীয়বার শুধু মোবাইল কোম্পানিকে সমুদয় ফিঙ্গারপ্রিন্ট দেয়া বিপর্যয়কর হবে। হচ্ছে।

অবৈধ সিম কার্ড ব্যবহার রোধে শুরু থেকে যেসব ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন ছিল, তার অধিকাংশই সরকার করতে ব্যর্থ হয়েছিল। সম্ভবত এর ব্যাপকতা কেউ অনুধাবন করতে পারেনি।
সরকারের ব্যার্থতার মধ্যে অন্যতম ছিল, সিম কার্ড সহজলভ্যতা এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রায় বিনা মূল্যে ফুটপাতে বিক্রির সুযোগ সৃষ্টি করে দেওয়া।
দ্বিতীয়টি হলো, সিম কার্ড অ্যাকটিভেশনে সরকারের বা বিটিআরসির নিয়ন্ত্রণ না রাখা। ফুটপাত থেকে সিম কার্ড কিনে তখনই তা সচল করা হচ্ছিল। যার ফলে সিম কার্ড ব্যবহার করে অপরাধ করার পথটি পরোক্ষভাবে তৈরি করে দেওয়া হয়েছে বললে ভুল হবে না। তৃতীয়টি হলো, মুঠোফোন অপারেটরদের যতেচ্ছ ভাবে সিম কার্ড বিক্রির মাধ্যমে গ্রাহক বৃদ্ধির কৌশল। এর মাধ্যমে অবৈধ VOipরা টোকাই, হতদরিদ্র মহিলার নামে ১৬ হাজার সিম কিনে নিরাপদে ব্যাবসা চালিয়ে গেছে।

২০০৮ এ সরকার যখন ভোটার আইডি বা NID জাতীয় পরিচয় পত্র যখন করা হলো, তখন কিন্তু শুরুতেই তৃতীয়পক্ষের হাতে এর ডাটাবেইজ হস্তান্তর করতে চায় নি সরকার। কারণটুকু খুবই ন্যায়সঙ্গত… জনগণের ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা।
আমাদের দেশে নাগরিক পরিচিতির জন্য বিভিন্ন সরকারি সংস্থা বিভিন্ন কাজে পাবলিক তথ্য সংগ্রহ করে সম্পুর্ন বিচ্ছিন্ন ভাবে, এসব সংস্থা ডাটা সংগ্রহের সময় কখনোই অন্য সংস্থার ডাটা মিলিয়ে দেখে না। তাই সবার নামেই গোজামিল, বানানে ভুল, পিতার নামে মাতা, জন্মতারিখ উল্টাপাল্টা,
১। আদমসুমারির ডাটা,
২। ইপিআই টিকাদান, জনস্বাস্থ ডাটা
২। সিটি কর্পরেশনের হোল্ডিং ডাটা,
৩। ভোটার আইডি বা NID জাতীয় পরিচয়পত্র।
৪। MRP পাসপোর্ট।
৫। ড্রাইভিং লাইসেন্স।
৬। জন্মনিবন্ধন সার্টিফিকেট

অন্তত NID, MRP, ড্রাইভিং লাইসেন্স ও জন্মনিবন্ধন, এই ৪ টি পরিচয় পত্র সমন্নিত অর্থাৎ একই ডাটা থাকা উচিত।
সময় বেশী লাগলেও এসব ত্রুটিমুক্ত করে এর যে কোন একটি মারফত সিম ভেরিফাই/বিক্রি করা যাতে পারে।
সিম ও সেট একজনকে দু-তিনটির বেশী অনুমতি না দেয়াই উচিত।

সিম ও সেট একসাথে নিবন্ধিত না হলে সরকারের মুল উদ্দেস্য সফল হবে না।
সিম ক্রয়ের সময়ই সেট/ডিভাইস নিবন্ধন করতে হবে, বা QR কোড বা ভিন্ন এক্টিভেশন কোড মারফত নিজেই নিবন্ধন করবে। সিমগুলোর সাথে সেট সমন্নিত করতে হবে, অর্থাৎ একব্যক্তির সিম অন্যকেউ বা ভিন্ননামে নিবন্ধিত সেটে কাজ করবে না। সেট হস্তান্তর/বিক্রি করলে ক্রেতার সিমের মাধ্যমে পুননিবন্ধন করতে হবে। সেট/ডিভাইস IMEI নম্বর ITU সমর্থিত একটি ইউনিক নম্বর। সিম-সেট সমন্নিত ভাবে নিবন্ধিত হলে ডুব্লিকেট চাইনিজ ডুব্লিকেট IMEI বা জিরো IMEI র দৌরাত্ত্ব বন্ধ হয়ে যাবে। প্রচলিত ভিওআইপি সিষ্টেমে কোন হ্যান্ড সেট ব্যবহৃত না হলেও ভিন্ন কৌশলে একটি IMEI থাকার কথা, তা না হলে বাংলাদেশী মোবাইল অপারেটর সিম কাজ করার কথা না।
এভাবে সিম ও সেট নিবন্ধনে মোবাইল চোর ও VOIP মেসিনগুলো অকার্যকর করা সম্ভব।

সিম ভেরিফিকেশনের কাজটি করবে সরকারের পক্ষে বিটিআরসি। বা সরকারি অনুমোদন সাপেক্ষে যে কোন মোবাইল কম্পানীও করতে পারে। সেটা করতে হবে NID / passport / Driving licence / জন্মনিবন্ধন, এই চার রকম ডকুমেন্ট যেকোন একটি মারফত। ভেরিফিকেশনে গরমিল পাওয়া গেলে সংশোধনের সুযোগ রেখে সিম কার্ড সাময়িক সময়ের জন্য বন্ধ করে দেওয়া যাবে। আর একজন ব্যক্তির নামে একই অপারেটরের দুটির বেশি সিম নিবন্ধন দেওয়া ঠিক না, (দিয়েছে ২০টি) একজনকে ২০টি সিমের অনুমতি দিলে একজন টোকাই বৈধভাবেই একশতটি সিমের মালিক হতে পারে, এতে সরকারের মুল উদ্দেস্য ব্যাহত হবে, অবৈধ voip র বৈধ প্রসার হবে। টেলকমের কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডারের নিয়ন্ত্রন ১০০% বিটিআরসির থাকবে।

বায়োমেট্রিক আংগুল ছাপ সিম রিরেজিষ্ট্রেশনের যে মহাযজ্ঞ চলছে এর মারফতেই আমাদের NID ত্রুটিমুক্ত করা যেত। সিম ও সেট রেজিষ্ট্রি হয়ে বিপদমুক্ত হত রাষ্ট্র।


অবৈধ মেক্সিকান ধরতে পুলিশী ভেরিফিকেশন

আমাদের বাংলাদেশটি একটি কাঁটাতারে ঘেরা জলবায়ু বিপর্যয়ে বিপন্ন পৃথিবীর সবচেয়ে ঘনবসতির দেশ।
ফিঙ্গারপ্রিন্ট ভেরিফিকেশনে অসাধু বেনিয়া মাল্টিন্যাশনাল প্রতিষ্ঠানকে জড়িত করা ঠিক হচ্ছে না। এরা যে হাসপাতালগুলোর মত এসব বিক্রি করে দিবে না তার কি গ্যারান্টি? আমেরিকা তো অলরেডি নিছেই, এবার ভারত নিবে। যে কোন মূল্যে কিনে নিবে। মাস মাইগ্রেশন ঠ্যাকাতে তাদের এই ফিঙ্গারপ্রিন্ট ডাটাবেস খুবই প্রয়োজন। নবাগতদের ঘাড় চেপে বলবে শালা জঙ্গি! ‘তুইনা বাংলাদেশে থাকস … থাইকা সিম কিনছিলি’।
আর DNA পাইলে আম্রিকা বলবে – “তুই কিছু না করে থাকলেও তর বাপে করছিল”।