ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

রিলিফের ট্রাকে

স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে যুদ্ধ ফেরত বিপুলসংখক তরুন মুক্তিযোদ্ধাদের কর্মসংস্থানের জন্য ১৯৭২ এর শুরুতে “জাতীয় রক্ষীবাহিনী” গঠিত হয়। আর্মড পুলিশ এ্যাক্ট সংশোধন করে এই আধা সামরিক বাহিনীটি গঠিত হয়।

শুধুমাত্র মুক্তিযুদ্ধ ফেরত বেকার তরুনদের কর্মসংস্থানের জন্যই মিলিশিয়া রক্ষী ‘রক্ষীবাহিনী’ গঠিত হয় নি। প্রধান কারনটি ছিল ৭১এ পরাজিত পাকিস্তানিরা এবং ৭২ এর সুরুতে সকল ভারতীয় সৈন্য চলে যাওয়ার পর স্বাধীন দেশটিতে একটা বাহিনী শূন্যতার সৃষ্টি হয়। যুদ্ধশেষে অনেকেই অস্ত্র জমা না দেয়ায় একটা বিপদজনক অবস্থার শৃষ্টি হয়। জমা না দেয়া বিপুল সংখক অস্ত্রসস্ত্র বিভিন্ন ব্যক্তি, গোষ্ঠীর কাছে থেকে গিয়েছিল। উদ্ধার করার জন্য অপেক্ষাকৃত ভারি অস্ত্রে সজ্জিত আধাসামরিক মিলিশিয়া বাহিনী দরকার ছিল।

আমলাতান্ত্রিক ব্রিটিশ আইনের পুলিশকে দিয়ে একাজ হত না, বিডিআর কে দিয়ে হয়তো হতো, কিন্তু তারাও যুদ্ধশেষে সংখায় কম ছিল, সিমান্ত পাহারা দিতেই হিমসিম খাচ্ছিল।

সেনা বাহিনীতে এদেরকে ঢুকিয়েও অস্ত্র উদ্ধার অপারেশন করানো যেত। কিন্তু নিয়মিত বাহিনীতে একটা দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া আর লম্বা ট্রেনিং দরকার হতো, এত সময়ও হাতে ছিলনা। এরপরেও যদি করা তা করতো সেটা বিরাট বোকামির কাজ হতো। দেশের একটা নিয়মিত সশস্ত্র বাহিনী দেশ রক্ষা বাদ দিয়ে পুলিশি কায়দায় পাবলিকের সাথে সংঘাত করে অস্ত্র উদ্ধার করাটা ঠিক হত না।

এদিকে পাকিস্তানে আটক প্রায় ২০-৩০ হাজার বাংলাদেশি বাঙ্গালি সেনাবাহিনীর সদস্য সহ পুলিশ, রেঞ্জার্স আধাসামরিক মিলিশিয়া আটক থাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর স্বল্পতা আরো প্রকট আকারে দেখা দেয়।
পাকিস্তানে চাকুরিরত ২০-৩০ হাজার সেনাসদস্য, নৌ ও বিমান বাহিনী, আধাসামরিক রেঞ্জার্স, সীমান্তরক্ষী, মিলিশিয়া এবং পুলিশ সদস্য। এছাড়া সরকারি-আধাসরকারি সংস্থায় চাকুরিরত ১৫-২০ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী, ছাত্র, দোকান, কারখানা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত অগনিত বাঙ্গালি সহ প্রায় ৩ লাখ বাঙ্গালি পরিবার পরিজন নিয়ে বসবাস করছিল।

এই তিন লাখ বাঙ্গালিদের ৭১ সাল থেকে ৭৪ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানে প্রায় তিন বছর যাবত যুদ্ধবন্দীর মত জিম্মি করে রাখা হয়েছিল বিচারাধীন ১৯৫ জন পাকি সামরিক অফিসার যুদ্ধাপরাধীর বিপরিতে।
এই সকল শূন্যতা পুরন করতেই মুলত ‘রক্ষীবাহিনী’ গঠিত হয়েছিল।

বেছে নেয়া হয় মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে অপেক্ষাকৃত শিক্ষিত সাহসী তরুনদের। এদের একটা বড় অংশ ছিল মুজিব বাহিনী ও কাদের সিদ্দিকির কাদের বাহিনীর সদস্য। এই বাহিনীর সবুজ জলপাই রঙের ইউনিফর্মে SLR কম্ব্যাট রাইফেল হাতে রক্ষীবাহিনী ছিল রীতিমত ভীতিপ্রদ। অস্ত্র উদ্ধার করতে যেয়ে প্রায়ই অতিরিক্ত শক্তিপ্রয়োগের করতে দেখা গেছে। রাজনৈতিক মিছিল দমন করতে পুলিশ ব্যার্থ হলেও রক্ষীবাহিনী নিয়োজিত হত। কারন তখনো ‘দাঙ্গা পুলিশ ব্যাটেলিয়ান’ গঠন করা হয়নি।

এদেরকে সেনাবাহিনীর প্যারালাল ভাবার কারন ছিলনা, কারন এরা ছিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের অধীনস্ত প্যারামিলিটারি ফোর্স। নিয়মিত সশস্ত্র বাহিনী না। এদের মর্যাদা-বেতনকাঠামো সীমান্তরক্ষী BDR (BGB) এর অনুরুপ।

অনেকে বলত এরা স্বজনপ্রীতি করে ঢুকানো আওয়ামি লিগের রাজনৈতিক পেটোয়া বাহিনী। ৭৫’এর ঘাতকেরা এবং এর অনুসারী সামরিক জান্তা সুপরিকল্পিত ভাবে গুজব ছড়ায় যে এদের কিছু ভারতীয় বাহিনীর ইউনিফর্মে ভারতীয় সৈন্য।

অতচ বংগবন্ধু তার বাসভবনের নিরাপত্তার জন্যও রক্ষীবাহিনী রাখেননি। তার বাসভবন ও দফতর গণভবন-বঙ্গভবন নিরাপত্তার জন্য সার্বক্ষণিক ভাবে নিয়োজিত ছিল সেনাবাহিনীর কয়েকটি ইউনিট। তখনো PRG ও SSF বাহিনী গঠিত হয়নি।

সেনাবাহিনীর তরফ থেকে যে কোন মুভমেন্টের এগেইনস্টে রক্ষীবাহিনী কখনোই মোতায়েন ছিলনা, অন্তত তখনকার ঘটনাচক্র এটা সমর্থন করে না। তাদের অস্ত্রভান্ডারে মোকাবেলায় কোন ভারি অস্ত্র (কামান-ট্যাঙ্ক) দেয়াই হয়নি।

তৎকালিন সরকারের এই মোটিভ থাকলে তাদেরকে শহর থেকে এত দূরে সাভার ব্যারাক (বর্তমানে সাভার ক্যান্টনমেন্ট) কখনোই রাখা হত না। খুনিচক্র বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর গোয়েবলসিও স্টাইলে গুজব ছড়ায় যে বঙ্গবন্ধু সেনাবাহিনীকে বিশ্বাস করতেন না। তিনি সেনা সংখ্যা কমিয়ে সেনাবাহিনীকে একটি অকার্যকর বাহিনীতে পরিনত করেছিলেন। অনেক শিক্ষিতও এখনো এসব বিশ্বাস করে।

যুদ্ধবিধ্বস্ত সদ্য স্বাধীন দেশটিতে বঙ্গবন্ধুর শাসনকাল ছিল মাত্র সাড়ে তিন বছর। শূন্য রাজকোষ থেকেই শুরু করতে হয়েছিল, প্রথম একবছর সরকারি বেতন দিতে হয়েছিল ভারতীয় মুদ্রায়।

১. অনেক সংকটের ভেতরেও সেনাবাহিনীর সংখা বড়ানোর জন্য ফৌজদারহাটে বিশাল এলাকা নিয়ে মিলিটারি একাডেমি স্থাপন করেন। তখনো দেশের বিধ্বস্ত অবকাঠামোগুলো মেরামত সম্ভব হয়নি। চট্টগ্রাম বন্দর মাইন মুক্ত করে চালু করা সম্ভব হয়নি।

২. তাদের বিশ্বাস করে তার বাসভবনের ও দফতরের নিরাপত্তায় রক্ষীবাহিনীকে না দিয়ে সেনাবাহিনী মোতায়েন করেছিলেন। (যদিও বাসা আক্রান্ত হওয়ার সময় তারা কোন প্রতিরোধ সৃষ্টি করেনি, একটা গুলিও ছুঁড়েনি)

৩. পাকিস্তানে ৩ বছর বিনা বেতনে পনবন্দি করে রাখা ৩০ হাজার সৈন্য ফিরিয়ে এনে বকেয়া বেতন দিয়ে সেনাবাহিনীতে যুক্ত করে সেনা সংখা বৃধি করেছিলেন। এরপরও তাদেরকে মুজিবের প্রতি অসন্তোষ ব্যক্ত করতে দেখা যায়।

(বিনিময়ে তাকে বিচারাধিন ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধী পাকিস্তানি অফিসারদের ছেড়ে দিতে হয়েছিল, মুক্তিপন হিসাবে)

৪. ১৯৭৪ এ OIC সম্মেলন থেকে ফেরার সময় মিশরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত এর সাথে দেখা করে সেনাবাহিনীর জন্য বিপুল অস্ত্রশস্ত্র ও ৩০টি রাশিয়ান ট্যাঙ্ক সংগ্রহ করেন।

(পরে এই ট্যাঙ্কগুলো দিয়েই ফারুক রশিদেরা তার বাসভবন আক্রমন করে)

রক্ষীবাহিনীর বিরুদ্ধে সকল অপবাদ মিথ্যা প্রমানিত হয় ৭৫ এর পট পরিবর্তনের পর।

যখন রক্ষীবাহিনীর প্রতিটি সদস্যকে এক ধাপ পদোন্নতি দিয়ে সেনাবাহিনীতে যুক্ত করা হয়, আর রক্ষীবাহিনী চিফ কে দেয়া হয় রাষ্ট্রদুতের পদ। ৯ই অক্টোবর ১৯৭৫ এ একটি অধ্যাদেশ Jatiya Rakkhi Bahini Absorption Army Ordinance 1975. গেজেট নোটিফিকেশনের মাধ্যমে এই সেনাবাহিনীতে আত্তিকরণ করা হয়।

এই অধ্যাদেশটিতে অনেকটা দায়মুক্তি দিয়ে বলা হয়েছে –

“রক্ষীবাহিনী কর্তৃক বর্তমান ও পূর্ববর্তী সকল কর্মকান্ড, সেগুলো অনুমান করে নেওয়া হবে সেনাবাহিনীর নিজস্ব এখতিয়ারভুক্ত জিনিস”

আর্মি অর্ডিনেন্স ১৯৭৫
Jatiya Rakkhi Bahini Absorption Army Ordinance 1975

তারা উচ্চমান সম্পন্ন, দক্ষতা ছিল প্রশ্নাতীত। সেনাবাহিনীতে উচ্চপদে যোগ দেয়ার সময় কোন পরীক্ষা নেয়ার প্রয়োজন হয় নাই। কারন তারা ট্রেনিংপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা, যদিও সেনাবাহিনীই তাদের প্রশিক্ষণ দিয়েছিল, তারা ভালকরেই জানত রক্ষীবাহিনী স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে দলীয় নিয়োগ ছিলনা, ছিল Good selection. সুদক্ষ, চৌকস, যোগ্য এবং সাহসী মুক্তিযোদ্ধা। এদের পেশাদারিত্ব প্রমাণিত হয়েছিল। প্রমোশন নিয়ে আর্মিতে ঢুকেও যোগ্যতার প্রমান রেখেছিল। সঙ্গতকারণেই তাদের দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তোলার কোন সুযোগ হয়নি ততকালিন সামরিক শাসকদের।

রক্ষীবাহিনী থেকে সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত শতাধিক অফিসার কর্নেল, জেনারেল পর্যন্ত চাকরি করে মেয়াদ শেষকরে অবসরে যায়। দুজন সেনা প্রধান পর্যন্ত হয়েছিলেন, এখনো অনেকেই সেনাবাহিনীতে উচ্চপদে ব্রিগেডিয়ার, জেনারেল পদমর্যাদা সম্পন্ন দেখা যায়।

এটা সত্য যে রক্ষীবাহিনী গঠনের উদ্যেস্য মহৎ ও প্রয়োজনিয় হলেও বেশীর ভাগ সাধারন মানুষ এটাকে নেতিবাচক হিসেবেই দেখে এসেছে। যারা রাস্তায় মানুষ পেটায় তাদের কে তো ভাল ভাবার কারন নাই।
আসলে তারা ভাল ছিল, তাদের সিলেক্সান খুবই দক্ষ হয়েছিল, তাদের সুশৃঙ্খল ভাবমূর্তি সেনাবাহিনীতে যুক্ত হওয়ার পরও অটুট ছিল।

বিভিন্ন জনসভায় বা পত্র-পত্রিকায় প্রায়ই রক্ষীবাহিনীর উদাহরন দেয়া হয়। বলা হয় –

স্বজনপ্রীতি করে লোক ঢুকানো একটি দলিয় প্রাইভেট বাহিনী,

মুজিবের দেহরক্ষী বাহিনী,

সেনাবাহিনীর চেয়ে বেশী মর্যাদা দিয়ে একটি প্যারালাল বাহিনী।

এর কোনটিও সত্য নয়। ছিল রাজনৈতিক গুজব মাত্র। যদি তাই হত তাহলে এদের যায়গা অন্তত সেনাবাহিনীতে হোত না। বরখাস্ত করতো নতুবা কোনমতে ঠাঁই হোত আনসার বা VDP তে।