ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

 

আমি খুব একটা ছোট না। যখন মায়ের সাথে নানার বাড়িতে যেতাম আম-কাঁঠালের সময়। আর নানার অনেকগুলো কাঁঠাল বাগান ছিল। যা এখন অনেকটাই বিলুপ্তি হয়ে গেছে মনে হয়। যাওয়া হয়না প্রায় ২২ বছর ধরে। কত স্মৃতি মনেপ্রাণে বেজে উঠে সে সময়ের কথা মনে পড়লে।

মা যখন দু-তিন দিন আগে বলতেন বাবার বাড়িতে যাবে, তখন আমি মায়ের পিছু পিছু থাকতাম। কেননা মা যদি আমাকে না নিয়ে চলে যায়! ফজরের নামাজ শেষ হতেই মায়ের সাথে হেঁটে হেঁটে পাগাচং রেলস্টেশন এ যেতাম। প্রায় ছয় কিলোমিটার রাস্তা হবে। তখন রাস্তাঘাট এতটা উন্নতি ছিলোনা। আমার হাঁটতে যখন অসুবিধা হতো, মা বলতেন আমাকে, বাজান এইতো সামনে এসে গেছি।

তারপরেও আমার চোখে মুখে খুশির ঝলক। নানা-নানির বাড়ি যাচ্ছি বলে। পাঘাচং রেলস্টেশনে যাওয়ার পড় মা আমাকে এক টাকা দিয়ে রুটি কিনে দিতেন, সাথে কলা। মা বলতেন বাজান খেয়ে নাও, তোমার নানার বাড়ি যেতে অনেক সময় লাগবে। আর আমি মাকে বলতাম মা রেলগাড়ি আসছে না কেন? মা আমাকে বুঝ দিতেন এই বলে, দেখনাই এই যে সবাই বসে আছে আমাদের সাথে যাবে বলে! একটু সবুর কর বাবা।

আর আমি বারেবারে রেল লাইনের উপর দাঁড়িয়ে দেখতাম গাড়ি আসছে কি-না। যখন দেখা যেতো গাড়ির ইঞ্জিন তখন খুশিতে মাকে এসে বলতাম, মা তারাতারি চল। গাড়ি এসেছে দেরী করা যাবেনা, সিট পাওয়া যাবেনা। মা বলতেন বাবা বাল্লাগাড়িতে সিট পাওয়া যায়না, দাঁড়িয়ে যেতে হয়। গাড়ি খুব ছোট, অল্প বগি লাগানো আছে। তার তুলনায় অনেক বেশি যাত্রী হয়। গাড়িতে উঠলাম মায়ের হাত ধরে খুব মানুষের ভিড়ে।

গাড়ি ছাড়লেন, আখাউড়া স্টেশনে যাবার পর মা আমাকে আমাদের ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পেরা মিষ্টি কিনে দিতেন। এদিকে গাড়ির লাইন বদলিয়ে গাড়ি ছাড়লেন মুকুন্দপুর স্টেশনের উদ্দেশ্য। সেখানে যাবার পর আবার পায়ে হেঁটে আউলিয়া বাজার হয়ে হাটিংগা নিজামউদ্দিন খন্দকারের বাড়ি। মামার নাম আবু মুছা খন্দকার।

মা গাড়িতে থাকতেই নানুর জন্যে পান, সুপারি কিনে নিতেন। মা গিয়ে প্রথমে নানুকে পান-সুপারি দিতেন। নানাবাড়ি যেনো ঈদের খুশি শুরু হয়ে যেতো। আর আমি গিয়ে দেখতাম কোন গাছের কাঁঠাল পেকেছে? অবশ্য নানু বাড়িতে আমার মায়ের জন্যে আলাদা করে একটি কাঁঠাল গাছ রিজার্ভ রাখতেন। সেই গাছ থেকে কাঁঠাল নিয়ে আসতাম।

কয়েকদিন বেড়াতাম ধুমধামের সহিত। মনেপরে দিঘির পাড়ে একটি বাজার হতো। সেই বাজারে গিয়ে অনেক কিছু কিনতাম, খেলতাম। মাঝেমাঝে মামাতো ভাইদের সাথে মিলে কাঁঠাল চুরি করে বিক্রি করতাম। সেই টাকা দিয়ে মার্ভেল-গুল্লি কিনে পাখি শিকার করতাম। এভাবেই কেটে যেতো কয়েকটি দিন।

আবার আসার পালা। সেই সকাল ৫ টায় নানী সাথে এসেছে স্টেশন পযন্ত দিয়ে যাবার জন্যে। নানী কে ছেড়ে আসার সময় আমার মায়ের দু’চোঁখে জল গড়িয়ে পরতো। কত না বেদনাদায়ক হতো সময়টা। আর মা সাড়া রাস্তা ট্রেনে বসে বসে কাঁদতেন। মাঝেমাঝে আমি মা’কে প্রশ্ন করতাম মা কাঁদছো কেন? মা কোন উত্তর দিত না। আজ বুঝি, মা কেন উত্তর দিতে পারেনি?

আজ নানা নেই, নানু নেই, মামা নেই। সবাইকে আল্লাহ্‌ পাক নিয়ে গেছেন না ফেরার দেশে। মাঝেমাঝে মনে হয় এইতো সেদিন নানু বলছিলেন “আবুইদ্যা কই গেলি কাইচুতনি?” মানে হলো অনেক আদর করে আমাদের ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মায়ের জাতিরা বাচ্চাদেরকে খাওয়াবার জন্যে খোঁজ-খবর নেন।

আহারে স্বাদের নানার বাড়ি।

(বাহরাইন থেকে)।