ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

বিদেশে আসার কাগজ-পত্র ঠিক করতে ঢাকা বনানী গিয়ে রাতে বাড়ি ফিরছিলাম ট্রেনে করে। বিমানবন্দর রেল স্টেশন থেকে রাত নয়টার ট্রেনে উঠলাম। গাড়ি ছাড়লেন গন্তব্যপথ ধরে। আমার টিকেট ছিল, কিন্তু সিট ছিলনা। তাই ভাবছিলাম ট্রেনের আগে পিঁছনে কয়েকবার ঘুরতে ঘুরতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া স্টেশন এসে যাবে, সমস্যা হবেনা। সেই মোতাবেক ট্রেনে হাঁটাহাটি শুরু করলাম। হাঁটতে হাঁটতে একসময় দেখলাম একজন কলা বিক্রি করছেন, ট্রেনের দরজার কাছে বসে। রাতের ট্রেন তাই বেশি ভিড় ছিলনা। আমি কাছে গিয়ে কলার দামদর জিজ্ঞাস করলাম।

কলা ওয়ালা বললেন ভাইজান যা-ই দিবেন দিন, কলা খুব ভাল। সামনে নরসিংদী স্টেশন নেমে যাবো, রাতের বেলা দামাদামি করবোনা, বাড়িতে চলে যাবো। যা বিক্রি করতে পারি তা-ই লাভ। আমি কলা নিতে গিয়েই নজরে পরলো একটি ছেলে কলার টুকরীর সাথে বসে আছে। গায়ে জামা-কাপর ছিঁড়া ময়লা। বয়স ছয় বছর হবে। জিজ্ঞাস করলাম বাবু তোমার সাথে কে কে আছে? প্রথমে কথার উওর দিচ্ছিলেন না। আমি এক ডজন কলা নিলাম কলাওয়ালার কাছ থেকে এবং ছেলেটার কাছে বসলাম। বসে ছয়টি কলা বাচ্চা ছেলেটাকে দিলাম সেও খুশিতে নিলেন। আমি কলা খেলাম বাচ্চা ছেলেটাও কলা খেলেন।

তাঁরপর জিজ্ঞাস করলাম বাবু তোমার নাম কি? ছোট ছোট দাঁত বেড় করে মৃদু হাসি দিয়ে বললেন আমার নাম ‘রুবেল’। জিজ্ঞেস করলাম তোমাদের বাড়ি কোথায়? তোমার কে কে আছে? তারা কোথায় থাকে? তুমি রাতে ট্রেনে কি করে এলে? এসব জিজ্ঞেস করতেই বললেন আমার মা কিছুদিন আগে চট্রগ্রামের রেল বস্তিতে মারা গিয়েছে, বাবা কোথায় জানিনা। আমি রেল গাড়িতেই থাকি, আমার যাওয়ার জায়গা নেই। এ কথাগুলো শোনার পর আমার ভিতর কি যেন হয়ে গেল… দু-চোঁখে অদৃশ্য জল এসে গেল।

অনেকক্ষণ চুপ থেকে জিজ্ঞেস করলাম, রুবেল তুমি এখন কোথায় যাবে? সে বলছিলেন চট্রগ্রাম ট্রেন যাবে আমিও সেখানে যাবো। সকালে আবার এই ট্রেন ঢাকা আসবে আমিও ঢাকা আসবো। আমি ট্রেনেই থাকি ট্রেনেই ঘুমাই। এভাবে অনেক কথা বলছিলাম ছোট্র রুবেলে সাথে। একসময় রুবেলকে জিজ্ঞেস করলাম রুবেল তুমি কী আমার সাথে যাবে? রুবেল বলছিলেন কোথায়? আমি বললাম আমাদের বাসায়। রুবেল বললেন যাবো তবে বেশি কাজ দিলে যাবনা। আমি বললাম রুবেল তোমার কোন কাজ করতে হবেনা। আগে বলো যাবে কি-না? আমি তোমাকে স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেবো, সুন্দর কাপড় বানিয়ে দেবো, মাথার চুলগুলো ভাল করে ছেঁটে দেবো।

আমার কথা শোনে রুবেল হাসি দিয়ে বললেন যাবো। এদিকে কলা ওয়ালা বলছিলেন ভাইজান নিয়ে যান সাথে, ছেলেটা এতিম। একথা বলতে বলতে নরসিংদী স্টেশন এসেছে, কলা ওয়ালা নেমে গেলেন। আমি আর রুবেল অনেক কথা বলছিলাম। আমার মনে হচ্ছিল ছেলেটা অনেকদিন ধরে এভাবে কারো সাথে কথা বলতে পারছিলেননা। একটু পরে পরে গাড়িতে থাকা ফেরিওয়ালারা চানাচুর, বাদাম সহ অনেক জিনিস নিয়ে আসছিলেন। আমি অল্প অল্প করে সবকিছু কিনে দিচ্ছিলাম। সেও অনেক খুশি হচ্ছিলেন। এভাবেই একসময় ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলস্টেশনে পৌঁছলাম।

রাত অনেক হয়ে গিয়েছিল, তাই আমাদের বাড়িতে আসার জন্যে কোনো গাড়ি পাচ্ছিলামনা। ভাবছিলাম শ্বশুরবাড়ি শহরের কাছাকাছি যখন, তখন শ্বশুরবাড়িতে চলে যাই। রিক্সা করে রুবেলকে সাথে নিয়ে চলে গেলাম শ্বশুরবাড়িতে। রুবেলকে সাথে দেখে আমার শালী, শাশুড়ি সহ শ্বশুরবাড়ির সবাই বলতে লাগলেন এই ছেলে কার? বললাম এতদিন যানিনা সে কি ছিল, আজ থেকে রুবেল আমার পরিচয়ে বড় হবে। তাড়াতাড়ি সাবান দেন, গোসল করিয়ে দিই। গোসল করিয়ে ভাত খেয়ে রাতে সেখানে ঘুমিয়ে সকালে বাড়ি নিয়ে এলাম।

সকালে বাড়িতে এসেও সেই একই প্রশ্নের মুখামুখি। মা জিজ্ঞেস করলে এই ছেলে কার? আমার স্ত্রীও জিজ্ঞেস করলেন একই কথা! সব বিস্তারিত বলার সাথে সাথে মা এবং আমার স্ত্রী কাছে নিয়ে অনেক আদর-যত্ন করতে লাগলেন। মা সাথে সাথে গিয়ে গ্রামের টেইলার্সের কাছে গিয়ে জামা-কাপড়ের অর্ডার দিয়ে আসলেন। দু-তিনদিন পর স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিলাম। পাড়া-মহল্লার ছেলেদের সাথে ভালোই পড়ালেখা খেলাধুলা করছিলেন। এভাবে একমাস যাওয়ার পর আমার বিদেশ আসার ভিসা ওকে হয়ে গেল।

আমি চলে এলাম প্রবাসে ২০০৩ সালের ২৬ মার্চ মাসে। তখন প্রবাস থেকে কয়েকদিন পরে পরেই রুবেলের খোঁজ-খবর রাখতাম চিঠির মাধ্যমে। দুইমাস পর একদিন চিঠির মাধ্যমে জানতে পাড়লাম রুবেল কোথাও চলেগেছে বাড়ির কাউকে না জানিয়ে। সাথে সাথে বাড়িতে ফোন দিলাম। সেসময় ফোনের ভাল সুবিধা ছিলনা আমাদের এলাকাতে। দূরের একজনের কাছে ফোন দিয়ে বলেছিলাম আমাদের বাড়িতে মোবাইল নিয়ে আসতে। ফোন করলাম মায়ের কাছে। মা বলছিলেন আমরা অনেক খোঁজ-খবর নিয়েছি, কোথাও খোঁজ পাইনি। স্ত্রীর সাথে কথা বললাম, সেও একই কথা বললেন।

সেই থেকে আজও রুবেলের কথা অনেক অনেক মনে পরে। খুব জানতে ইচ্ছে করে রুবেল কোথায় আছে কেমন আছে? রুবেল মনে হয় অনেক বড় হয়ে গিয়েছে, বিয়ে-শাদি করেছে। আজ অনেক বছর হয়ে গেলেও মনের মাঝে সেই কলা খাওয়া, চানাচুর ওয়ালার কাছ থেকে চানাচুর কিনে দেয়া, ট্রেনের দরজাতে বসে কথা বলার মুহূর্তগুলো চোখের সামনে ভেসে বেড়ায়। রুবেল আমাকে ভাইয়া বলে ডাকতেন। এই ভাইয়া বলা ডাক কি ভুলতে পারবো? মনে হয় কখনো না…….!