ক্যাটেগরিঃ ভ্রমণ

natore

“হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে,
সিংহল সমুদ্র থেকে নিশীথের অন্ধকারে মালয় সাগরে
অনেক ঘুরেছি আমি ; বিম্বিসার অশোকের ধূসর জগতে
সেখানে ছিলাম আমি ; আরো দূর অন্ধকারে বিদর্ভ নগরে;
আমি ক্লান্ত প্রাণ এক, চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন,
আমারে দুদণ্ড শান্তি দিয়েছিলো নাটোরের বনলতা সেন।”
— জীবনানন্দ দাশ

নাটরের নাম আসলেই বনলতা সেন এর কথা চলে আসে। অনেকে নাটোরে আসলে বনলতা সেনকে খুঁজতে চেষ্টা করেন। বনলতা সেনকে খুঁজে না পেলেও একজনকে খুঁজে পাবেন। তিনি হচ্ছেন রানী ভবানি। তার রাজত্বকালে নাটোর জমিদারি অর্ধেক বঙ্গ শাসন করত বলে তাকে বলা হতো অর্ধবঙ্গেশ্বরী। জানা যায়, পলাশী যুদ্ধে সিরাজউদ্দৌলার পক্ষে যুদ্ধ করার জন্য সৈন্যও পাঠিয়েছিলেন রানী অর্ধবঙ্গেশ্বরী। কিন্তু সৈন্যরা পৌঁছার আগেই সিরাজের পরাজয় নিশ্চিত হয়ে যায়। তবে আজ আমাদের আলোচনার বিষয় সিরাজ উদ্দোলা নয়।

রানী ভবানী মিষ্টি অনেক পছন্দ করতেন। তার রাজপ্রাসাদে নিয়মিত মিষ্টি সরবরাহ করতেন লালবাজারের মিষ্টি বিক্রেতা মধুসুধন পাল। একদিন মধুসুদন পালের ২০ জন কর্মচারীর সবাই অসুস্থ হয়ে গেলো। দোকানে ২ মণ ছানা রাখা ছিল। ছানাগুলো নষ্ট হয়ে যাবে ভেবে মধুসূদন ছানার উপর চিনির সিরা দিয়ে ভিজিয়ে দেন। এরপর এগুলো চেখে দেখেন এর স্বাদ হয়েছে অপূর্ব। এদিকে রানী ভবানীর লোকেরা মিষ্টি নিতে আসলে তিনি সিরা দেয়া ছানাগুলো পাঠিয়ে দেন। রানী ভবানী এই মিষ্টি খেয়ে অনেক প্রশংসা করেন এবং এর নাম জানতে চান। মধুসূদন পাল তখন কাঁচা ছানা থেকে তৈরি বলে এর নাম দেন কাঁচা গোল্লা।

 

নাটোরে যদি আপনার বিয়ে হয় আর শ্বশুর বাড়িতে কাঁচাগোল্লা না নিয়ে যান তাহলে বিয়ে পর্যন্ত ভেঙ্গে যেতে পারে। নাটোরে বিয়ে থেকে শুরু করে যেকোন ধর্মীয় অনুষ্ঠানে কাঁচা গোল্লা থাকবেই।

নাটোর আরেকটি কারণে পরিচিত পাবে তা হল মাদার গানের কারণে। নাটোরবাসী এই কথিত মাদার পীরের অনেক ভক্ত। যেকোন বিপদে তারা মাদার পীরের নামে মানত করে এবং মাদার গানের আসর করে। এই মাদার গানের আসর বেশি হয় মহরম মাসে, চৈত্রসংক্রান্তি এবং পৌষ সংক্রান্তিতে। নাটোরে মাদার পীরের মাজার এর কোন অস্তিত্ব না থাকলেও এই নিয়ে জনশ্রুতি আছে। হারুত ও মারুত নামে দুই ফেরেশতা পৃথিবীতে ভ্রমণে এসে এক নারীর প্রেমে দেওয়ানা হয়ে যান এরপর তাদের মিলনের ফলে মাদার শিশুর জন্ম হয় আর কালক্রমে এই শিশুই মাদার পীর হিসেবে আবির্ভূত হয়।

আত্রাই নদীর তীরে অবস্থিত নাটোর একসময় ঘন জঙ্গলে ঢাকা ছিল আর অনেক উচু নিচু ছিল। সহজেই গমন করা যেত না। সহজেই গমন করা যেত না দেখে এই অঞ্চলকে বলা হত ‘নাতর’ ‘না’ মানে অসম্ভব আর ‘তর’ মানে গমন এই ‘নাতর’ থেকে ‘নাটোর’ নামকরণ করা হয়েছে বলে সবার ধারণা।

‘উত্তরা গনভবন’ যা প্রধানমন্ত্রীর ২য় বাসস্থান এবং কার্যালয় তা এই নাটোর অঞ্চলেই অবস্থিত। এছাড়াও বাংলাদেশের সবচেয়ে উষ্ণতম এলাকা লালপুর এই নাটোর এলাকায় অবস্থিত। বিখ্যাত চলনবিল যার ভেতর দিয়ে আত্রাই নদী প্রবাহিত হয়েছে তা এই নাটোর অঞ্চলেই অবস্থিত। রানী ভবানী সাহা থেকে শুরু করে এই চলনবিল দেখতে নাটরে আসতে পারেন। আপনার চোখ জুড়িয়ে যাবে নাটোর এর সৌন্দর্য দেখে।

 

লেখকঃ আলামিন মোহাম্মদ, সভাপতি, লোরক সোসাইটি