ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

 

 

আমরা মধ্যবিত্ত।আমাদের বাপ জীবনে বিরাট কিছু করতে পারেনি।৭১ এ যুদ্ধের বাজারে দাদা সম্পত্তির পাহাড় বানিয়ে যাননি।আমরা থাকি ভাড়া বাসায়।শহরে থাকতে পারাটা আমাদের জীবনের বড় স্বার্থকতা।আপোষ করে বেঁচে থাকতে পারা আমাদের জীবনে বড় বৈশিষ্ট্য।আমরা মাসে দশ হাজার টাকা আয় করি,ব্যয় করি বার হাজার টাকা।তারপরেও কীভাবে দিনের পর দিন আমরা চলছি সেটা একটা বিরাট রহস্য।আসল আয়ের কয়েক গুন বেশি জাঁকজমকের স্বপ্ন দিনের পর দিন দেখেই যাই।বাস্তবে সেটাকে ফলাতে না দেখেই কষ্ট পাই। মিশি আমরা উচ্চ বিত্তদের সাথে এবং তাল মিলিয়ে সম্পর্ক রাখতে গিয়ে খাবি খাই।

আমাদের বাবাদের কাছে প্রতিটি পয়সার হিসেব দিতে হয়।কোথায় খরচ করেছি ,কিভাবে খরচ করেছি। বাবাদের আমরা ভয় পাই এবং যাবতীয় অভিযোগ করি মায়েদের কাছে। গৃহবধূ মা বেচারিরা কোথায় যে টাকা পান সেটা আমরা জানার চেষ্টা করিনা। শুধু শখের কিছু চাইলে কোথায় থেকে যেনো টাকা এনে দেন এইটুকু জানি।মাসের শেষের তিন দিন আমরা মাছ,মাংস খেতে পাই না,ডিমের ঝোল খাই। মা লজ্জা চেপে বলেন আজকে এই রান্না হয়েছে।সামান্য খাবারের মাঝে আমরা স্বগীয় সুখ খুঁজে পাই।আমরা রিক্সায় চড়ি,লোকাল বাসে ঝুলি।একান্ত দরকার ছাড়া আমরা সিএনজিতে চড়িনা।কারো প্রাইভেট কারের সামনের সিটে বসতে পারলে নিজেকে আমরা গাড়িটার মালিক বলে মনে করি।

আমাদের প্রেম,ভালবাসা,ভাললাগা ইত্যাদি আবেগ সম্পর্কিত ব্যাপার নিয়ে খুব বেশি মাথা ঘামালে চলে না।যারা ঘামায় তারা কেউ ইতিহাস হতে পারেনি। তারা হেরে গিয়েছে।বাবা মায়েরা তাই আতঙ্কিত থাকেন আমাদের জীবনে প্রেমের গন্ধ পেলে।আমরা শিল্প ভালবাসি,সাহিত্যও ভালবাসি।গান বাজনার চর্চা থাকে অল্প বিসত্মর।তবে সমত্মানদের মধ্যে কেউ শিল্পকে পেশা বানাতে চাইলে আমরা আপত্তি জ্ঞাপন করি।আমাদের জীবনে সবচেয়ে বড় আবৃত্ত বাক্য হচ্ছে এসব করে পেট চলে না।

আমাদের ওপরে চাপিয়ে দেয় জীবনে মেলাতে না পারা যত সব অপূর্ন চাওয়া পাওয়ার হিসাব। ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হয়ে গেলেতো ভাল, না হলে দিনের পর দিন আমরা বিসিএস পরীক্ষা দিই।পায়ের তলে শক্ত মাটি খোঁজা আমাদের চিরন্তন অভ্যাস।আমরা সরকারী ইউনিভার্সিটিতে পড়াতে চাই এর বেশি খরচ করার সাধ্য আমাদের কোনদিনও ছিলনা।ভাবখানা এমন আমাদের সংসারে কুমেধার সন্তান জন্মাতে নেই।যদি ভুলে একটা কুলাঙ্গার জন্ম নিয়েই নেয়,তবে তার ওপরে সব রাগ ঝেঁড়ে মনে মনে অশ্রুপাত করি ,আর বলি এর বেশি সামথ্য ছিলনা আমদের।ছাত্র জীবনে অনেক আশা নিয়ে প্রবেশ করি, বিরাট কিছু করে ফেলবো।পাশ করে বের হয়ে মামা চাচাদের খোঁজে দৌড়ি, মিলে গেলে ভাল , না মিললে বেকার বসে থাকতে হয়।আর কিছু একটা হয়ে যাবে ভাবতে ভাবতে দিন পার করতে হয়।

সন্তানদের বিদেশ পাঠাতে পারলেই আমাদের চেয়ে সুখী আর কেউ হয় না। বিদেশ গিয়ে সেই সন্তান আমাদের ভুলে গেলেও,আমরা বড় গলা করি বলি,আমর সন্তান বিদেশে থাকে।

অবচেতন মনে আমরা ছেলেই চাই,মেয়ে হলেও অবশ্যই আপত্তি নেই,তবে তাকে যত দ্রুত সম্ভব বিয়ে দিয়ে তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করাটা আমাদের দায়িত্ব বলে মনে করি।মেয়েদের পড়া লেখা আমদেরে কাছে মূল্যরাখে অবশ্যই। তবে ছেলেদের মত নই।

আমরা শান্তিও খুঁজি।পিতৃপ্রদত্ত ধর্মটাকেও রাখতে চাই।পারতঃ পক্ষে অন্য ধর্মের কাউকে বিয়ে করতে চাইনা.লোক লজ্জার ভয়ে। পরিবারের মধ্যে কেউ এ কাজটি করে ফেললে,আমরা পারিবারিকভাবে তার সাথে সম্পর্ক এড়িয়ে চলি।জীবন সঙ্গী হিসেবে আমাদের আশা থাকে একটি রাজ কন্যা পাওয়ার,পাই মফস্বলের উচ্চ মাধ্যমিক পাশ মোটামুটি ধরনের মেয়ে ।আমাদের বিয়ে গুলো হয পারিবারিক পছন্দে।আমরা বিবাহ বিচ্ছেদের ঝামেলায় জড়াতে চাইনা,সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে। স্বামী-স্ত্রী এক অপরকে পছন্দ না হলেও দিনের পর দিন আমরা সুখী দাম্পত্য জীবনের অভিনয় করি,আর আড়ালে গিয়ে দীর্ঘশ্বাঃস ফেলি।

আমাদের বার্ধক্য শুরু হয় পেনশন সংগ্রহের দৌড়ের মধ্য দিয়ে। কিছুদিন পর আমরা হয়ে উঠি নাতী-নাতনীদের রুপকথা শোনানোর মেশিন।আমাদের প্রাচীন পন্থী চিন্তাধারার জন্য নাতি-নাতীদের বাবা মায়েরা অবশ্যই আমদের সব কথায় কান না দিতে তাদের সন্তানদের নিষেধ করেন।তাই পুরানো স্থৃতি রোমন্থন আর ছেলের বউয়ের অপমান জনক কথাবার্তা শুনতে শুনতে নিজের পরিবারেই গলগ্রহ হয়ে আমরা ভারতীয় বাংলা সিরিয়াল দেখতে দেখতে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাই।এই যে,আমাদের মধ্যবিত্ত জীবন চক্র ,এটা খুবই সাধারন এর মধ্যে অসাাধারন কিছুই নেই। মধ্য বিত্তরা অসাধারন স্বপ্ন দেখার ক্ষেত্রে। জীবনে এমন কোন স্বপ্ন নেই ,যেটা মধ্য বিত্তরা দেখে না। কিন্তু সব স্বপ্নই হেরে যা্য় সামথ্যের কাছে।স্বপ্ন দেখা,স্বপ্নে বসবাস করা,নিজের চোখে সেই স্বপ্নের মৃত্যু দেখা এবং আবার নতুন কোন স্বপ্ন তৈরি করে তার মধ্যে বসবাস শুরু করা এই হচ্ছে মধ্যবিত্ত জীবন।এখানে আর কোন কিছুর স্থান নেই।টাকা নামের মূল্যবান কাগজ দ্বারা চালিত এই পৃথিবীতে সব জায়গাতেই কেউ কেউ জিতে য়ায়,কেউ কেউ হেরে যায়। যারা জিততেও পারে না,হারতেও পারে না,মাঝখানে নিলর্জ্জের মত ঝুলে থাকে তারাই মধ্যবিত্ত।

মোঃ মহিউদ্দিন( মহি)