ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

 

প্রতি বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর কোচিং কিংবা টিউশন থেকে ফিরে একে খান মোড়ে পেট্রোল পাম্পটার মাঝখানে বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়াই। অনেক্ষণ ধরে নীড়ে ফেরার জন্য মানুষের আকুতি আর চেষ্টা দেখি। আপন গৃহের প্রতি মানুষের টান দেখে মনটা ভরে যায়।
.
এদের মধ্যে কেউ ছাত্র, কেউ চাকুরিজীবি, কেউ গার্মেন্টসকর্মী, কেউ শ্রমিক কিংবা অন্য শ্রেণী-পেশার মানুষ। সবাই হয়তো পেশায়, কাজে, অভ্যাসে, ধনে-মানে ভিন্ন, কিন্তু সকলের উদ্দেশ্য এক- বাড়ি ফেরা। সারাদিন নিজ নিজ কাজ শেষ করে গাড়ির জন্য অপেক্ষা করা মানুষগুলো অনেকটা বিধ্বস্ত, ভীষণ ক্লান্ত থাকে কিন্তু সবার চোখে মুখে তৃপ্তির ছাপ। বাড়িতো ফেরা হবে, নীড়ে তো যাওয়া হবে।
.
অনেকের ব্যাগভর্তি নানারকম ফল দেখি, কারো হাতের শপিং ব্যাগে নতুন জামাকাপড়, কারো কারো পিঠে ফুলে উঠা ব্যাগ। এসবের মধ্যে নানারকম জিনিস থাকে, কিন্তু আসলে এসব হাতের ব্যাগ কিংবা শপিং ব্যাগভর্তি থাকে ‘মায়া আর ভালোবাসা’।
.
একের পর এক বাস এসে জড়ো হয়। কেউ উঠে, কেউ পরেরটার জন্য অধীর আগ্রহে দাঁড়িয়ে থাকে, কেউ কয়েকটা বাসে দামাদামি করে একটাতে উঠে। কিন্তু এদিন যাত্রী বেশি থাকায়, ভাড়া বেশি রাখে। নগরীর রুটে চলা ৪ কিংবা ৭ নম্বর বাস হয়ে যায় চয়েস। এর মধ্যে লোকাল বাসগুলোতে হুমড়ি খেয়ে উঠে পড়ে মানুষ। কোনমতে দাঁড়াতে পারলেই তো হলো। বাড়ি তো যাওয়া যাবে!
.
এভাবে প্রতি বৃহস্পতিবার আমি বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে ঘরে ফেরা মানুষের অপেক্ষা, বাসে উঠার সংগ্রাম, বাড়ি ফেরার আকুতি দেখি। তারপর নিজের কথা মনে পড়ে যায়। ঠিক আমিও একসময় এই বৃহস্পতিবারের জন্য অপেক্ষা করতাম। আমিও ক্লান্ত দেহ নিয়ে, একটার পর একটা বাসে উঠার চেষ্টা করতাম। বড় বাসে নিজামপুর বললে উঠায় না বলে, ফেনী-নোয়াখালী বলে বাসে উঠতাম আর ভাড়া দেয়ার সময় নিজামপুর নামব বলাতে, এসিস্ট্যান্টের বকা শুনতাম। কোন কিছুই তো গায় লাগতো না। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ৪০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দেয়া, কিংবা আমার ছোট্ট চিটিংবাজিতে নিজের কাছে আফসোসও লাগত না। কারণ মায়ার নীড়ে তো ফেরা হবে। খোলা হাওয়া, সবুজ প্রকৃতি, মেঠো পথ, পরিচিত মানুষজন আর পরিবারের কাছে তো ফেরা হবে…..
.
কিন্তু দেড় বছর ধরে জীবন জীবিকার তাগিদে অনিচ্ছা সত্ত্বেও পুরো পরিবারকে শহরে শিফট হতে হলো। সেই থেকে প্রতি বৃহস্পতিবার এলেই আমি ভীষণ নস্টালজিয়ায় ভুগি। বাড়তি ভাড়া, ভাটিয়ারির জ্যাম, জানালার পাশে বসে হরেক রকম ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখা, নিজামপুর থেকে সিএনজি না পেয়ে ভীরু ভীরু পায়ে হাঁটা, বাড়িতে আম্মু-দাদুর অপেক্ষা, আব্বুর পাঁচ মিনিট পর পর ফোন, এসব খুব মনে পড়ে।
.
কিন্তু এখন সেই সুযোগ নেই। তাই অন্যসব যাত্রীর জায়গায় নিজেকে কল্পনা করে আর স্মৃতি হাতড়ে সুখ খুঁজে নেই।
.
তারপর আস্তে আস্তে পূর্ব দিকে পার হই, বাসার দিকে পা বাড়াই। তখনো কানে বাজে, ‘চয়েস-বারিআট, উত্তরা বারিয়াট, নোয়াখালী-লক্ষীপুর-সোনাপুর, ফেনী-কুমিল্লা’ ।
.
আপন নীড়-গ্রাম, ভীষণ মিস করছি। প্রতি বৃহস্পতিবার এভাবেই মিস করে কাটে।