ক্যাটেগরিঃ মতামত-বিশ্লেষণ

 

আমরা দেখেছি আমেরিকানরা কিভাবে তাদের দেশের একজন নাগরিককে বাঁচাতে আমাদের দেশে এসে চাপ সৃষ্টি করেছিল যদিও সে ছিল একজন সন্ত্রাসী। আমরা দেখেছি কিভাবে হিটলারের মত ঘৃণীত ব্যক্তিকে বাঁচাতে তার দেশের ন্যাৎসি বাহিনী চেষ্টা করেছিল আমরণ। আমরা দেখে আসছি কোন দেশের একজন সৈনিক যদি অন্য দেশে মারা যায় তারা কিভাবে তৎপর হয়ে ওঠে।আমরা এখনও দেখে আসছি ভ্রাতৃত্ববোধ কাকে বলে আর তার বহিঃপ্রকাশ কেমন হতে পারে।

আর আফসোসের সহিত বলতে হয় আমাদের দেশের একজন নিরীহ মানষ যদি সন্ত্রাসী হামলায় মারা যায় তাহলে আমরা বলি “মানুষের বেডরুম পাহারা দেয়া সম্ভব নয়”, যদি কেউ রোড এক্সিডেন্ট এ মারা যায় তাহলে আমরা বলি “এটা হতেই পারে”, যদি একজন ছাত্র তারই বিদ্যাপীঠ এ মারা যায় সন্ত্রাসীদের গুলিতে তাহলে আমরা বলি “এটি একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা”, আবার যখন অন্য দেশে আমাদের ভাইদেরকে অপরাধের শাস্তি হিসেবে গলা কেটে ফেলা হয় দিন দুপুরে সারা পৃথিবীতে ঢোল পিটিয়ে তখন আমরা বলি “উচিৎ শিক্ষা হয়েছে” আর ঠিক তেমনিভাবেই দেশের অসংখ্য মানুষ মৃত্যুর পরেও আমাদের এইসব হীনম্মন্য বক্তব্যের শিকার হচ্ছে।

দুর্নীতিতে জরিয়ে পড়ার খুব সুন্দর একটা কারন বর্ননা করা যেতে পারে। একজন লোককে একটি কাজের জন্য ঘুষ হিসেবে ১০ হাজার টাকা দিতে চাইলে সে বলবে, ‘আমি কখনই দুর্নীতি করবনা’।তাকে যখন একই কাজের জন্য ১০লক্ষ টাকা দেয়া হয় তাহলে সে একটু ভেবেচিন্তে তারপর বলবে, ‘না,আমি পার্থিব লোভে পরে দুর্নীতি করব না’।কিন্তু তাকে যদি ঐ কাজের জন্য ১০ কোটি টাকা দেয়া হয় তখন সে মনে মনে ভাববে, ‘হজ্জ্ব করব এবং দুইজনকে করাব ২০ লাখ টাকায়,মসজিদ বানাব আর মাজারে দান করব ৫০ লাখ টাকা; আর তো পাপ থাকার প্রশ্নই উঠে না;বাকি টাকা দিয়ে সারা জীবন আরামে দিন কাটাব।চাকরি গেলে যাক,আর মামলা হলে সেখানে কয়েক লাখ খরচ করব।এমন সুযোগ বারবার আসেনা’।যদিও ঘটনাটি কাল্পনিক,বাস্তবের সাথে এর খুব একটা অমিল থাকার কথা নয়।

আর আমাদের দেশে খুবই বড় সমস্যা হল রাজনীতিতে জ্ঞ্যান ও সদিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও আসতে চাইলেই কেউ আসতে পারেনা।রাজনীতিতে আসতে গিয়ে অনেককেই খরচ করতে হয় অঢেল টাকা যেগুলো সৎ উপায়ে অর্জন করা খুবই কষ্টসাধ্য ব্যাপার।আর রাজনীতিতে আসলেও নিজের অস্তিত্ব ও সম্মান টিকিয়ে রাখতে তাদের জড়িয়ে পড়তে হয় টাকা অর্জনের নির্বাক এক প্রতিযোগিতায় এবং অনাকাঙ্খিত কার্যকলাপে যেখানে অবৈধ পন্থাই বেশি অবলম্বিত হয়। বড় বড় উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বা স্বনামধন্য লোকদের বেলায়ও একই ঘটনা ঘটে।

আমরা প্রতিনয়ত দূর্দান্ত বক্তব্য দিয়ে বেরাচ্ছি যারতার বিরুদ্ধে যখন তখন। শুধু সারাদিন দেশটাকে নিয়ে বদনাম করে বেরাচ্ছি।কোন দল দেশের কত বড় ক্ষতি করল তা স্লাইড ক্যালিপার্স,স্ক্রু গেজ দিয়ে মেপে বেড়াচ্ছি সারাদিন। আমরা কি চাইনা দেশটাকে পাল্টাতে? আমরা কি কেবলই নিজের বিচক্ষণতা ও বাকপটুতা দেখাতে ব্যস্ত? আমাদেরকে কেউ কিছু বললেই আগে তাকেই জিজ্ঞেস করি সে কি করেছে দেশের জন্য।কখনই কি আমরা অন্যের কথার ভুল না ধরে তার কথা থেকে উৎসাহ নিয়ে নিজের কৃতকর্ম নিজেই সংশোধন করতে চাইনা?

কেন, আগে তো এমন ছিলাম না আমরা? যেই দেশের মানুষের নামের আগে উপাধি হিসেবে “বাঘ” যুক্ত হয়,”মজলুম জননেতা” যুক্ত হয়,”বঙ্গবন্ধু” “জাতির পিতা” যুক্ত হয় “বীরশ্রেষ্ঠ” যুক্ত হয়, “বিদ্রোহী কবি”, “পল্লীকবি” যুক্ত হয় সেই দেশের মানুষদের বর্ণনা না দিয়ে কেবল যুদ্ধের সময় এ দেশের মানুষের ভূমিকা তুলে ধরলেই সারা বিশ্বের মানুষ নির্দ্বিধায় মাথা নুইয়ে সালাম করেছে,করছে,করবে।তাহলে আমরা কি তাদেরই সন্তান নই? আমাদের মাঝে কি তাদের কর্মের,চরিত্রের ন্যূন্যতম প্রকাশ নেই ? আমরা কেন এমন হয়ে গেলাম? আমরা কেন দিনের পর দিন হয়ে পড়ছি হীন মানসিকতা সম্পন্ন?

আমি সবার কথাই বলছি না। কেননা অনেকেই আছেন এখনও যাদের বক্তব্য শুনলেই মনে হয় যুগ যুগ ধরে বেচে থাকা মহাপুরুষেরা বেঁচে আছেন আসলে তাদের মাঝেই। যেমন, অনেক মরহুম কৃতি সন্তানদের কৃতকর্ম থেকে নির্দ্বিধায় এ কথার সত্যতা মিলবে। আর জীবন্ত কিংবদন্তিদের মধ্যে আনিসুল হক, জাফর ইকবাল, এ বি মূসা, আবুল মকসুদ,আবেদ খান,আবুল ফজল স্যারদের কথা না ই বা বললাম। তাদের লিখা আমরা সবাই পড়ার চেষ্টা করি কেন তা আমরা সবাই জানি। তাদের কথায় আমরা খুজে পাই হাজার বছরের সেই খাঁটি বাঙালীদের ঐতিহ্য। তাদের দর্শন নিজের মাঝে গ্রহন করে আমরাও হতে চাই একজন খাঁটি বাংলাদেশী।

এবং আমি এ কথা নিশ্চিতভাবেই বলতে পারি,দেশে এখনও হাজার হাজার যুবক,তরুণ,জ্যেষ্ঠ আছেন যারা অন্তত একটা আইডিয়া দিতে পারবেন দেশের একটা সমস্যা দুর করার। তাহলে আমরা কি বলতে পারিনা যারা ক্ষমতায়/দায়িত্বে আছেন তাদের মধ্যেও সবাই যোগ্যতাহীন নয়। তাদের মাঝেও অনেক যোগ্যতাসম্পন্ন লোক আছেন যারা সেখানে পৌছানোর পর নিজের যোগ্যতার বিকাশ তো দুরে থাক, প্রয়োগও করতে পারছেন না কোন না কোন কারনে (না জেনে সেগুলো নিয়ে মন্তব্য করতে চাইনা)। এই কারনগুলই এখন খুজে বের করা আমাদের দায়িত্ব।কেননা আমাদের অসংখ্য মানুষের অসংখ্য মতামত বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়।নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি/দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারাই বাস্তবায়ন করতে পারবেন তাদের নিজেদের আইডিয়াগুলোকে,প্রয়োজনে জনগনের মতামত তারা গ্রহণ করুক। তাই যোগ্যদের সুনির্দিষ্ট অবস্থানে বসিয়ে তাদেরকে সততার সহিত সুষ্ঠুভাবে কাজ করার মত পরিবেশ আমাদেরকেই তৈরি করতে হবে একসাথে সোচ্চার হয়ে।

আমরা সবসময় দায়িত্ব এড়িয়ে চলতে চাই অনেকেই।আমরা চাই সমাজটা পাল্টাক কিন্তু কেউই নিজে থেকে পাল্টানোর কথা চিন্তা করতে গেলেই আগে মাথায় আসে, ‘আমার একার দ্বারা কিভাবে সম্ভব সমাজ পাল্টানো?’ তাই আসুন সবাই নিজের ক্ষুদ্র একটা কাজকেও দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অবদান হিসেবে মনে করি।আর সব থেকে উত্তম পথ তো খোলাই আছে,ধর্মের পথ। যে যার ধর্ম মেনে চললে নিশ্চিতভাবেই বলা যায় ধীরে ধীরে সম্ভব এবং অবশ্যই সম্ভব নিজেদেরকে তথা এই দেশটাকে বদলে দেওয়া।