ক্যাটেগরিঃ প্রশাসনিক, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

কয়েকদিন আগে আমাদের প্রধানমন্ত্রী নিজের হাতে পারমাণবিক চুল্লি বসানোর জন্য প্রথম কংক্রিট ঢালাই কাজের (ফার্স্ট কংক্রিট পোরিং বা এফসিপি) উদ্বোধন করেছেন। আমাদের ছোট্ট এবং ঘন বসতি পূর্ণ দেশে পারমানবিক বিদ্যুতের বিকল্প নেই। বর্তমানে চাহিদার বাস্তবতায় অন্তত বাংলাদেশ কোনভাবেই এই প্রযুক্তিকে উপেক্ষা করতে পারে না, সম্ভবও না। কিন্তু এই প্রকল্প শুরুর আগে আমাদেরকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে নিরাপত্তা জনিত বিষয় গুলোর উপর। শুধু সন্ত্রাসী আঘাত মোকাবেলাই নিরাপত্তা না। এখানে যারা কাজ করবে তারা কতটা পেশাদার সেটা দেখতে হবে। অবকাঠামোগত কোন দুর্বলতা যেন না থাকে। কোন রকম দুর্নীতি যেন এ প্রকল্পকে স্পর্শ না করতে পারে সেদিকে দৃষ্টি রাখা। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ হয়তো ৫০ বছর এগিয়ে যাবে কিন্তু একটা দুর্ঘটনা আমাদেরকে ১০০০ বছর পিছিয়েও দিতে পারে।

01_Rooppur_nuclear+power+plant_Sheikh+Hasina_301117_0005

১৯৮৬ সালের ২৬ এপ্রিল স্থানীয় সময় অনুযায়ী রাত ১টা ২৩ মিনিটে ইউক্রেন ও বেলারুশ সীমান্তে অবস্থিত পরমাণু কেন্দ্রটির চতুর্থ পারমাণবিক চুল্লী থেকেই দুর্ঘটনার সূত্রপাত হয়। দুর্ঘটনাটি মূলত ঘটেছিলো নিরাপদ শীতলীকরণের উপর একটি পরীক্ষা চালানোর সময়। রাতের শিফটে দায়িত্ব-রত কর্মীরা ভুল করে পারমাণবিক চুল্লীটির টার্বাইনে প্রয়োজনের অতিরিক্ত শীতল পানি প্রবাহিত করে। ফলে সেখানে বাষ্প কম উৎপাদিত হয়। এতে করে পারমাণবিক চুল্লীটি উত্তপ্ত হতে থাকে এবং এক পর্যায়ে প্রচণ্ড বিস্ফোরণ ঘটে। দুর্ঘটনার জন্য কর্তব্যরত কর্মীদেরই দায়ী করা হয়ে থাকে। কিছু নিরাপত্তা ব্যবস্থা বন্ধ করা ছিল এবং পারমাণবিক চুল্লীটি অনুপযুক্ত অবস্থায় চালানো হচ্ছিলো, যার ফলে শক্তি নির্গমন অতিরিক্ত বেড়ে যায়। আবার, একটি গবেষণায় বলা হয় কর্মীদের রাতের শিফটে কাজ করতে বাধ্য করা হয়েছিল। এ দৃষ্টিকোণ থেকে সার্বিক ব্যবস্থাপনাও দায়ী। একারণে ৩ জনকে ১০ বছরের শাস্তি দেওয়া হয়।

ঘটনার সময় চেরনোবিলে প্রায় ১৪ হাজার বসতি ছিল। দুর্ঘটনার সঙ্গে সঙ্গেই ৪ জন কর্মী মারা যান। পরবর্তীতে ২৩৭ জন মানুষ পারমাণবিক বিকিরণের ফলে অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং প্রথম তিন মাসে ৩১ জন মৃত্যুবরণ করে, যাদের অধিকাংশই উদ্ধার কর্মী ছিল। সরকারি তথ্যমতে, দুর্ঘটনার কারণে প্রায় পঞ্চাশ লক্ষ লোক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং তাঁদের মধ্যে ছিল ছয় লক্ষ শিশু। এই দুর্ঘটনার ফলে ২০০বিলিয়ন ডলারের মত ক্ষতি হয়েছিল। বর্তমানে চেরনোবিল শহরটি পরিত্যক্ত এবং প্রায় ৫০ মাইল এলাকা জুড়ে বলতে গেলে কেউ বাস করে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, চেরনোবিলের ধ্বংসাবশেষে থাকা গলিত প্রায় ২০০ টন পরমাণু জ্বালানি থেকে যে ভয়াবহ তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়েছে তা হাজার বছরেও সম্পূর্ণ দূর হবে না। তাই এ পরমাণু জ্বালানি বাইরের পরিবেশের আওতামুক্ত রাখতে নতুন একটি নিরাপত্তা স্থাপনা নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। উচ্চাভিলাষী স্থাপনাটির নির্মাণ-ব্যয় ধরা হয়েছে ১৬০ কোটি ইউরো।

এছাড়াও জাপানে সম্প্রতি পারমানবিক চুল্লীতে দুর্ঘটনা ঘটেছে। জাপানের দুর্ঘটনার জন্য অবশ্য প্রাকৃতিক বিপর্যয়ই দায়ী। আমাদেরকে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে যাতে এই প্রকল্পের অবকাঠামো যেন ভূমিকম্পের ধাক্কা সামলাতে পারে। ইউরোপের অধিকাংশ দেশই পারমানবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। কিন্তু জার্মানির যথেষ্ট নিরাপদ প্রযুক্তি থাকলেও বর্তমান সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা আর কোন পারমানবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে না। কারণ যদি কোন দুর্ঘটনা ঘটে সেক্ষেত্রে কার দোষে এটা ঘটেছে কেন ঘটেছে তার একটা তদন্ত বা বিচার হয়তো ঠিকই করা যাবে। কিন্তু জনগণ যে ক্ষতির সম্মুখীন হবে তা কোনভাবেই পূরণ করা যাবেনা। এ ব্যাপারে অবশ্য সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে সবুজ দল(গ্রুন পার্টাই)।

বাংলাদেশ যখন এ জাতীয় কোন প্রকল্প হাতে নেয় তখন আমাদেরকে বার বার ভাবতে হয় কারণ আমাদের দেশের মানুষ জন কেউই পূর্ণাঙ্গ পেশাদারিত্বের সাথে কাজ করে না। এরা কর্তব্য, ধর্ম , দায়িত্ব সবকিছু গুলিয়ে খিচুড়ি পাকায়। আপনাদের মনে আছে কিনা জানিনা আজ থেকে ২৫/৩০ বৎসর আগে সিদ্ধিরগঞ্জ বিদ্যুৎ কেন্দ্রে আগুন লেগে কয়েক কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছিল। এর কারণ ছিল দুইজন প্রকৌশলীর কর্মে অবহেলা। যতদূর জেনেছিলাম ওই দুই প্রকৌশলী তাদের কর্তব্যে অবহেলা করে নামাজ পড়ছিল। আর তখনই এই ঘটনা ঘটে। এদের দু’জনের মধ্যে সেদিন পেশাদারিত্বের স্বাক্ষর বিন্দুমাত্রও ছিল না। সেদিন কর্তব্য পরায়নতাও তাদের মধ্যে পুরোপুরি অনুপস্থিত ছিল। ওনারা যে ধার্মিক সেটাও আমি মনে করি না। আমার জানা নেই ইসলাম জনগণের জানমালকে ঝুঁকির মধ্যে রেখে কাউকে নামাজ পড়তে বলেছে। যারা রাষ্ট্রীয় এরকম গুরু দায়িত্বে থাকেন তাদের উচিত কাজের পরে কাজা নামাজ পড়া। ধর্মীয় গুরুরা এরকম অনেক উদাহরণ রেখেছেন। সব থেকে দুঃখের বিষয় সিদ্ধিরগঞ্জ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের দুর্ঘটনার পর ওই দুই প্রকৌশলীর কোন শাস্তিও হয়নি।
সরকারকে তথা জনগণকে মনে রাখতে হবে এই রকম কর্মী বাহিনি দিয়ে আমরা পারমানবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প চালাতে পারবো না। আরও গুরুত্বপূর্ণ যে ব্যাপার তা হল এখানে রাশিয়ার সাথে আমাদের দ্বিপাক্ষিক চুক্তি হবে, সম্ভবত আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার সাথেও একটা চুক্তি করতে হবে। এখানে আমাদের বিশেষজ্ঞদের সর্বোচ্চ দেশপ্রেম ও সতর্কতার সাথে চুক্তিগুলো করতে হবে। আমাদের সাংবাদিকরা তোষামোদি মনোভাব পরিহার করে এব্যাপারে খুঁটিনাটি বিষয়গুলো তুলে ধরতে পারে যাতে এই চুক্তি দেশের পক্ষে যায়। বঙ্গবন্ধু কন্যা পারমানবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প উদ্বোধন করেছেন এটাই শেষ কথা নয়। প্রত্যেককে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করতে হবে। সবকাজের দায়িত্ব প্রধানমন্ত্রীর একার না।

বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকলে অনেক আগেই এই প্রকল্প চালু হয়ে যেত। আপনারা জানেন আমাদের প্রধানমন্ত্রীর স্বামী জার্মানির কার্লসরুয়ের আণবিক শক্তি কেন্দ্রে গবেষণা করছিলেন। সেই সময় বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে উনি পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নিয়ে জার্মানির উপর মহলে কথা বলেছিলেন। এবং এ ব্যাপারে যথেষ্ট অগ্রসর হয়েছিলেন। আজকে ড. এম. এ ওয়াজেদ মিয়া বেঁচে থাকলে আমাদেরকে চিন্তা করতে হত না। এই প্রকল্প সর্বোচ্চ সুন্দর ও নিরাপদ ভাবে বাস্তবায়িত হত। উনার মত দক্ষ, সৎ দেশপ্রেমিক মানুষ যার বিকল্প বর্তমান বাংলাদেশে কেউ আছে বলে আমার জানা নেই।