ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

 

ছবি: এটা প্রয়াত বোরহান উদ্দিন গগনের বাড়ি, এখানেই ছিলেন জাতীয় নেতারা ১৯৭১ এ নিরাপদ আশয়ে যাবার আগে।

ঢাকার জিরো পয়েন্ট থেকে ২১ কিলোমিটার মত দূর কলাতিয়া, কিন্তু ঢাকার মোহাম্মদ পুর থেকে ১২ কিলোমিটারের মত যেদিক দিয়েই যাওয়া হোক মাঝে বুড়িগঙ্গা নদী। আর গ্রামের অন্যদিকে ধলেশ্বরী নদী। পুরো গ্রামটাই নদী পরিবেষ্টিত অনেকটা দ্বীপের মত। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় এই গ্রামেরই একটা বাড়ি শুধু স্থানীয়ভাবে না জাতীয় পর্যায়েও মধ্যমণি হয়ে উঠে। কলাতিয়া হাই স্কুল থেকে পায়ে হেটে গেলে ৮/১০ মিনিটের দূরত্ব এ বাড়ীর। এ বাড়ীর বাসিন্দারা ছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামের অগ্র সৈনিক। বিশেষ করে জনাব বোরহান উদ্দিন আহমেদ গগন এবং জনাব আরফান উদ্দিন আহমেদ রতন। উনাদের ছোট ভাই জনাব হেলাল উদ্দিন আহমেদ মাখনও মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার গগন বঙ্গবন্ধুর সাথে বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়েছেন বিভিন্ন সময়ে। তাই বঙ্গবন্ধুর এই বিশ্বস্ত অনুচর তার ভাই এবং সমগ্র পরিবার দেশের ক্রান্তিকালীন সময়ে পিছপা হননি, বরং ঝাঁপিয়ে পড়েছেন শত্রু নর পিচাশ পাকিদের বিরুদ্ধে।

04

২৫শে মার্চ কাল রাতে হানাদার বাহিনীর আক্রমণের পর সকল জাতীয় নেতাই আত্মগোপনে চলে যেতে বাধ্য হন। বঙ্গবন্ধু আগে থেকেই আচ করেছিলেন যে, পাকিস্তানিরা ক্ষমতা হস্তান্তর করবে না। সেক্ষেত্রে আওয়ামী হাই কমান্ডকে নির্দেশ দেওয়া ছিল কি করতে হবে। ভারতের কলকাতার একটা নির্দিষ্ট ঠিকানায় শ্রী চিত্তরঞ্জন সূতার এর সঙ্গে দেখা করতে বলা হয়।

২৫শে মার্চের রাতে বঙ্গবন্ধুকে বন্দি করার পর থেকে যে কাজটা সামনে চলে আসে তা হল সরকার গঠন। আর সেটা ঢাকা বসে করা সম্ভব ছিলনা। সে কারণে ঢাকা থকে সব জাতীয় নেতারা সীমান্ত এলাকায় বা ইন্ডিয়ার উদ্দেশ্যে ঢাকা ত্যাগ করেছেন। তখন সোজা রাস্তায় ঢাকা থেকে বের হয়ে যাওয়া এত সহজ ছিল না হানাদার বাহিনীর রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে বা ফাকি দিয়ে। প্রথমত নেতারা আত্মগোপনে চলে যান তারপর বুড়িগঙ্গা নদী পার হয়ে কলাতিয়ার জনাব আরফান উদ্দিন আহমেদ রতন ও বোরহান উদ্দিন গগনের বাড়ীতে আশ্রয় নেন। বোরহান উদ্দিন গগন জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন, উনি স্বাধীনতার পর নির্বাচনে ওই এলাকার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। আর বড় ভাই আরফান উদ্দিন আহমেদ রতন স্থানীয় রাজনীতিতে উজ্জ্বল ভূমিকা রাখেন। উনি প্রায় ৫/৬ মেয়াদে ওই এলাকার চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন।
08
জাতীয় পর্যায়ের অন্তত ৫০/৬০ জন নেতা সেই সময় উনাদের বাড়িতে আশ্রয় নেন এবং তারপর উনাদের সহায়তায় ধলেশ্বরী নদী পার হয়ে ইন্ডিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা দেন। এদের মধ্য উল্লেখযোগ্য আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জনাব কামরুজ্জামান, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, পূর্ব বাংলা প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য ডাঃ আবু হেনা। সর্ব জনাব শেখ ফজলুল হক মনি, সিরাজুল আলম খান, আব্দুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমদ, আ.স.ম আব্দুর রব, শাজাহান শিরাজ, নূরে আলম সিদ্দিকী ও আব্দুল কদ্দুস মাখন।06

এইসব জাতীয় নেতারা যেদিন বিদায় নেন এ বাড়ি থেকে সেদিন এই বাড়ির এক কনিষ্ঠ সদস্যা নাহারুন নাহার মিতু খুব কেঁদেছিল। তার খুব কষ্ট লেগেছিল যখন তার মনি মামা তাকে ছেড়ে চলে যায়। মনি মামা বলতে সে শেখ ফজলুল হক মনিকে বুঝিয়েছে। তার মনি মামা নাকি তাকে খুব আদর করত। তখন তার বয়স ছিল পাঁচ বছরের মত। উনি এখন ইউ.এস.এ প্রবাসী। ওর বড় বোন আরিফুন নাহার খান আমার বড় বোন মেরিনা জাবেদ খুকুর বন্ধু। উনারা দু’জনে একসাথে ইডেনে পড়তেন। কয়েকদিন আগে আমি যখন নাহারুন নাহার মিতুর সাথে ফোনে কথা বলি উনি খুব দৃঢ়তার সাথেই আমাকে উত্তর দিয়েছেন। আমি বিভিন্নভাবে উনাকে প্রশ্ন করি, তিনি আমাকে বলেন তার সবকিছু পরিষ্কার মনে আছে। উনার বড় বোনকেও বিভিন্ন ব্যাপারে প্রশ্ন করি মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ের বিভিন্ন ঘটনা জানতে, উনিও আমাকে অনেক তথ্য দিয়েছেন। মিতু আমাকে বলেছেন অন্তত তিনবার উনাদের গ্রামে পাকি পিশাচরা গিয়েছিল। উনার চারটা পাকা পেয়ারা ছিল সেগুলো পাকি হানাদাররা নিয়ে নেয়। আর ওর মাটির ব্যাংকটা ভেঙ্গে সব পয়সা নিয়ে যায় পাকি হায়েনারা। মিতু আমাকে এটাও উল্লেখ করতে ভোলেননি ঐ ব্যাংকে শুধু খুচরা পয়সা ছিল।

প্রয়াত আরফান উদ্দিন আহমেদ রতনের সহধর্মিণী প্রয়াত আঞ্জুমান আরা আহমেদ ক্যাপ্টেন মনসুর আলীকে চাচা ডাকতেন। উনারা একজন আরেকজনের রক্তের সম্পর্কের কেউ ছিলেন না, কিন্তু সাংগঠনিক, পারিবারিক ও আত্মিক বন্ধন ছিল দৃঢ়। যে সকল মানুষ এ বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন নিরাপদ আশ্রয়ে যাবার উদ্দেশ্যে বিদায়ের সময় এদের সকলের জন্য মাটির হাড়িতে করে খাবার বেধে দিয়েছেন আঞ্জুমান আরা আহমেদ, যাতে রাস্তায় উনাদের ক্ষুধার্ত থাকতে না হয়। তাছাড়া মুক্তিযুদ্ধের পুরোটা সময় এ বাড়িতে ৮০/৯০ জনের খাবারের আয়োজন করতে হত যার পুরো দায়িত্ব ছিল উনার উপর, উনাকে সাহায্য করতেন দু/তিন জন কাজের মানুষ। দেশের স্বাধীনতার প্রশ্নে আনন্দ চিত্তে তিনি তা করেছেন। উনি যা করেছেন তার অনেক কিছুর সাক্ষী বাংলাদেশের জাতীয় নেতারা। আমার সৌভাগ্য হয়েছিল উনার স্নেহ পরশে ধন্য হবার। মোহাম্মদ পুর তাজমহল রোডে উনার বাসায় যতবার গেছি কোনদিন কিছু না খেয়ে আসতে পারিনি।09
ভৌগলিক কারণে এ এলাকার মানুষ জনপদ কিছুটা নিরাপদ ছিল। আর সে সুযোগটা কাজে লাগিয়েছিলেন এ এলাকার নেতারা, মুক্তিযোদ্ধারা এবং জনগণ। জনাব বোরহান উদ্দিন আহমেদ গগনের তথা এই পরিবারের জাতীয় রাজনীতিতে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। সেই কারণে স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হবার আগেই বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে এখানে গেরিলা মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ শুরু হয়ে যায়। ১৯৭১ সালের মার্চ মাসের ২/৩ তারিখ থেকে বাঙ্গালী সেনা কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন মাহফুজুল আলম বেগের তত্ত্বাবধানে গেরিলা প্রশিক্ষণ চলতে থাকে।03

আওয়ামী লীগ এবং জাতীয় নেতাদের যুদ্ধ প্রস্তুতি অনেক আগেই ছিল, তার কিছুটা প্রমাণ মেলে কলাতিয়ার এ বাড়ির কর্মকাণ্ডে। কারণ এরা মতান্তরে মার্চের ২/৩ তারিখ থেকেই গেরিলা প্রশিক্ষণ ক্যাম্প শুরু করেন। বোরহান উদ্দিন গগনের বড় ছেলে ডা. শাওন আমাকে সে রকমই বলেছেন। ডা. শাওন আমাকে আরও জানান যে উনি আমার অনুরোধে কেরানীগঞ্জ উপজেলা মুক্তিযোদ্ধাদের ডেপুটি কমান্ডার জনাব সিদ্দিকুর রহমানের সাথে কথা বলে নিশ্চিত হয়েছেন যে ১৯৭১ এর মার্চের ২/৩ তারিখেই ঐ বাড়িতে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ শুরু হয়ে যায়। আমি কথা বলেছিলাম এ বাড়ির আরেক সদস্যা বর্তমানে ইউ.এস.এ প্রবাসী জনাবা ইভা সামসুনের সাথে। উনি আমাকে খুব জোর দিয়ে যে ব্যাপারটা উল্লেখ করেন তা হল বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে দেশের যে সব জায়গায় মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু এই বাড়ি তার একটা।

বোরহান উদ্দিন আহমেদ গগন ১৯৭১ এর জুন মাসে ইন্ডিয়ার দেরাদুনে মুক্তিযোদ্ধার উচ্চতর প্রদক্ষিণ নেন এবং উনি ঢাকার বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্সের (বি.এল.এফ) কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেন। উনি শুধু মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডারই ছিলেন না উনি একজন সংগঠকের দায়িত্বও পালন করেন। উনার সহধর্মিণীও সেই সময় ইন্ডিয়ার আগরতলার অরুন্ধুতি নগরের বেলতলীতে একটা বাসাতে থাকতেন। এই বাড়িটা ছিল মাটির তৈরি। এ বাড়িতে তিনটা ঘর ছিল, দু’ঘর ছিল ছোট আর একটা ঘর ছিল বড়। একটা ছোট ঘরে থাকতেন গগনের সহধর্মিণী আর একটা ঘরে থাকতেন অভিনেতা ফারুকের বোন ও ভগ্নীপতি জগন্নাথ কলেজের ছাত্রলীগ নেতা জনাব মফিজ। আর বড় ঘরটাতে থাকতো বাংলাদেশ থেকে প্রশিক্ষণ নিতে আসা নতুন মুক্তিযোদ্ধারা। প্রশিক্ষণ শেষ হয়ে গেলে এসব নতুন মুক্তিযোদ্ধাদের দেশের মধ্যে দিয়ে আসতেন গগন সাহেব। আগরতলার এ বাসাতে বাচ্চা নিয়ে উনার স্ত্রীকে একাই থাকতে হত কারণ উনি মুক্তিযুদ্ধের সাংগঠনিক কাজে বিভিন্ন ক্যাম্পে ব্যস্ত থাকতেন। তবে মাঝে মাঝে উনি আসতেন পরিবারের সাথে দেখা করতে।

মুক্তিযোদ্ধা গগনের মুক্তিযুদ্ধে অবদান সম্পর্কে জাতীয় নেতাদের অনেকেই অনেক লেখার মাধ্যমে বা মৌখিকভাবে বিভিন্ন সময়ে উল্লেখ করেছেন। বাণিজ্য মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদের একটা নিবন্ধ থেকে আমি এই বাড়ি এবং বোরহান উদ্দিন আহমেদ গগন সম্পর্কে নতুন কিছু জানতে পারি। এরপর থেকেই আমি এ বাড়ি সম্বন্ধে আগ্রহী হয়ে উঠি বিস্তারিত জানার জন্য। যদিও এ পরিবারের সাথে আমার সম্পর্ক ১৯৮০ সাল থেকে কিন্তু সরাসরি যোগাযোগ হয় ১৯৮৩ সাল থেকে।

07

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আনোয়ার হোসেনে উনার নিবন্ধে এ বাড়ির কথা লিখেছেন। আনোয়ার হোসেন ডা. শাওনের সাথে কথাবার্তার এক পর্যায়ে একদিন বলেছিলেন, “তোমাদের বাড়িটার তো মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতির জন্য যাদুঘর হওয়া উচিত।” অলি আহাদের ‘জাতীয় রাজনীতি ১৯৪৫ থেকে ৭৫’ বইটাতেও রতন সাহেবের বাড়ির কথা উল্লেখ আছে যে, এক ঝাঁক জাতীয় নেতা এ বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। বিস্ময়ের ব্যাপার যে কলাতিয়ায় বা কেরানীগঞ্জে আরও অনেক নেতা ছিল সে সময়ে কিন্তু সকল জাতীয় নেতারা আশ্রয় নিয়েছিলেন বোরহান উদ্দিন গগন এবং আরফান উদ্দিন আহমেদ রতনের বাড়িতে। এখানেই প্রমাণ পাওয়া যায় কতটা বিশ্বস্ত ছিল এ দুই ভাই, কতটা ভরসার স্থল ছিল জাতীয় নেতাদের কাছে এ দু’জন। বঙ্গবন্ধুর প্রতি বিশ্বস্ত থাকার কারণে অবশ্য এই দুই ভাইকে ১৯৭৫ এর ১৫ই আগস্ট পরবর্তী সময়ে চরম মূল্য দিতে হয়েছে।

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর জনাব বোরহান উদ্দিন গগন আত্মগোপনে চলে যান। উনাকে না পেয়ে দুই শিশু পুত্র শাওন, সংগ্রাম ও বাড়ির কাজের মানুষকে ধরে নিয়ে যায়। ওদের একজনের বয়স ছিল ৭বছর এবং আরেকজনের বয়স ছিল ৪বছর। এই শিশু বাচ্চাদের সাথে এদের মামা অর্থাৎ বোরহান উদ্দিন গগনের শ্যালক লক্ষ্মীবাজারের মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আশরাফ সিদ্দিকি ওরফে গোলাম রসুলকেও ডি.এফ.আই এর লোকেরা ধরে নিয়ে সেনানিবাসে বন্দি রাখে, এবং অমানুষিক শারীরিক নির্যাতন করে। ডা. শাওন যার বয়স তখন ৭বছর ছিল তাকে একটা অন্ধকার ঘরে আটকে ভয় দেখায়। তার বাবার অস্ত্র কোথায় রেখেছে বিভিন্ন প্রশ্ন করে। শিশুদের বন্দি রেখে তাদের বাবাকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করে। শাওন সেনা কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসা করেছিল, “আমাকে আপনারা আটকে রেখেছেন কেন? আমি তো কোন দোষ করি নাই।” বন্দি অবস্থায় ৪ বছরের শিশু সংগ্রাম কান্না কাটি করলে ওকে সম্ভবত দুধ বা কিছু খেতে দিয়েছিল ও তা না খেয়ে ছুড়ে ফেলে দিয়েছিল। তিন দিন বন্দি রাখার পর শিশু দুটিকে তৎকালীন সময়ে ওদের প্রতিবেশী মোহাম্মদপুরের বিচ্ছু জালাল বলে পরিচিত এক তরুণ মুক্তিযোদ্ধা সেনানিবাস থেকে নিয়ে আসেন। পরিবারের সদস্যদের কথা চিন্তা করে বোরহান উদ্দিন গগন আত্মসমর্পণ করেন। তারপর উনার উপর নেমে আসে অত্যাচারের খড়গ। স্বাধীন দেশে মোশতাক ও জিয়া গং উনার উপর যে অমানুষিক অত্যাচার করে তা কোন কোন ক্ষেত্রে পকিদেরও হার মানায়।02
সেনানিবাসে মুক্তিযোদ্ধা গগনকে তিন মাস আটকে রেখে বিভিন্নভাবে শারীরিক নির্যাতন করা হয়। উনার দুপায়ে এত আঘাত করা হয় যে উনার পা দু’টো ফুলে যায় জেল থেকে ছাড়া পাবার পর উনি আগের মত আর স্বাভাবিক চলা ফেরা করতে পারতেন না। তাছাড়া জেলে উনি হৃদরোগেও আক্রান্ত হন। বাংলাদেশের মাটিতে পাকিস্তানি চর মোশতাক জিয়া বিনা দোষে, বিনা বিচারে ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত উনাকে আটকে রাখে। উনার একটাই দোষ যে উনি মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন, উনি বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বিশ্বাস করতেন, উনি আওয়ামী লীগে থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। জিয়া নাকি মুক্তিযোদ্ধা ছিল, এই কি মুক্তিযোদ্ধার নমুনা যে মুক্তিযুদ্ধের অগ্র সৈনিকদের অন্যায়ভাবে আটকে রেখে বল প্রয়োগের মাধ্যমে মিথ্যা স্বীকারোক্তি আদায় করা। এবং সেনানিবাসে বসে সরকারি কোষাগারের পয়সা খরচ করে অবৈধভাবে রাজনৈতিক দল তৈরি করে, তার নিজস্ব দলে ভীতির মাধ্যমে লোক ভেড়ানো।

শুধু এই না মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ অবদানের জন্য সরকার মোহাম্মদপুরে আসাদ এভিনিউয়ে ৪৪-২২ সি নাম্বার বাড়িটা বোরহান উদ্দিন আহমেদ গগনকে বরাদ্দ দিয়েছিল। সেই বাড়ি থেকে সাত দিনের নোটিশে উনার সহধর্মিণীকে নামিয়ে দেওয়া হয়, তখনো তার পুত্রদ্বয় সেনানিবাসে বন্দি ছিল। উনি উনার বাবার বাড়িতে আশ্রয় নেন, মোহাম্মদপুর উনাদের বাসার সকল জিনিস পত্র লুট পাট হয়ে যায়।

শুধু বোরহান উদ্দিন গগনকে না উনার মেজ ভাই আরফান উদ্দিন আহমেদ রতনকেও ১৯৭৫ থেকে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত কয়েকবার অন্যায়ভাবে জেলে নিয়ে নির্যাতন করে সামরিক জান্তারা। ১৯৮৩ সালে যখন রতন সাহেবকে জেলে পাঠায় এরশাদ তখন উনার মোহাম্মদ পুর তাজমহল রোডের বাসায় আমার যাতায়াত ছিল। কঠিন সময় কেটেছে উনার সহধর্মিণীর ছোট ছোট ছেলে মেয়েদের নিয়ে। অথচ স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় এই মানুষটা তার সবকিছু উজাড় করে মুক্তিযোদ্ধাদের খাবার যুগিয়েছেন, দেশের জন্য যুদ্ধ করেছেন। উনার দোষ একটায় যে উনিও উনার ছোট ভাই গগনের মত দেশ স্বাধীন হবার পর বঙ্গবন্ধুর সাথে মুক্তির সংগ্রামে লিপ্ত ছিলেন। উনাদের সর্ব কনিষ্ঠ ভাই হেলাল উদ্দিন আহমেদ মাখনকেও জিয়া গং সেনা শিবিরে নিয়ে নির্যাতন করে। এবং তার সেজ ভাই গগনের অস্ত্রের ব্যাপারে মিথ্যা স্বীকারোক্তি আদায়ের চেষ্টা করে। স্বাধীনতা যুদ্ধে যাদের এত বড় অবদান তাদেরকে এভাবে নির্যাতন ও হয়রানি করা একজন নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘনের নিকৃষ্টতম উদাহরণও বটে।

১৯৭১ এ প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের দুই কর্ণধারও এ বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন, এ এইচ এম কামরুজ্জামান ও এম মনসুর আলী। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত এমন বাড়ি আর দ্বিতীয়টি নেই সারা বাংলাদেশে। তৎকালীন সময়ের সেই গুরুত্বপূর্ণ সেই দু’নেতাকেও জেলের ভিতর নিঃসংশ ভাবে হত্যা করা হয়েছে। বর্তমানে এই দুই কর্ণধারের সন্তানেরাও সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এরকম স্থাপনা গুলোকে অত্যন্ত যত্নের সাথে সংরক্ষণ করা হয়েছে। এ জাতীয় স্থাপনা গুলোর এক মিলিমিটারও সাধারণত জার্মানরা পরিবর্তন করে না, যেভাবে এগুলো তৈরি ঠিক সেভাবেই রেখে দেয়।01

আমি জানিনা কোন মন্ত্রণালয়ের কাজ মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত এসব স্থাপনাগুলো সংরক্ষণ করা। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতির স্বার্থে, জাতীয় নেতাদের স্মৃতির স্বার্থে, বর্তমান সরকারের স্বার্থে যে তারা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার, এ বাড়িটাকে সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা উচিত। আমাদের জাতীয় স্বার্থেই এটা করা অতি প্রয়োজনীয়। এ বাড়িটাকে একটা যাদুঘর হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করাই সবথেকে যুক্তিযুক্ত বলে আমি মনে করি। এ বাড়ির বাসিন্দাদের অন্য কোথাও ক্ষতিপূরণ হিসাবে বাসস্থানের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। আর সরকার সেই যাদুঘর থেকে বছরে যথেষ্ট উপার্জনও করতে পারে। আর এখানে বেশ কয়েকজনের কর্ম সংস্থান হতে পারে। আর সরকার যথেষ্ট ক্ষতিপূরণ দিলে এ বাড়ির বর্তমান বাসিন্দাদেরও কোন আপত্তি থাকার কথা না। কারণ পরিবারের সদস্য সংখ্যা বাড়তেই আছে আজ হোক কাল হোক এ বাড়িকে তাদের ছাড়তেই হবে। অথবা এটা ভেঙ্গে বহুতল বিশিষ্ট ভবন বানাতে হবে যা হচ্ছে এখন সারা বাংলাদেশে। আর যদি সেটা হয় একদিন তা হবে নিজের পায়ে কুঠারাঘাত, ঐতিহাসিক ভুল। ইতিহাসের পতন, অবশ্যই তা আমরা আশা করি না।

বর্তমান জাতীয় নেতা এবং সরকারের প্রতি আমার অনুরোধ থাকবে বঙ্গবন্ধু সরকার যে বাড়িটা প্রয়াত বোরহান উদ্দিন আহমেদ গগনকে বরাদ্দ দিয়েছিল তা আবার ফিরিয়ে দেবার ব্যবস্থা করা। কারণ বিশেষ করে এই পরিবার দিয়েছে অনেক নেয়নি কিছুই। সেই সময়ের জাতীয় নেতাদের অনেকই এখনও জীবিত তাদের অজানা না রতন ও গগনের অবদান। একটা নিবন্ধ লিখে শুধু দায়িত্ব শেষ করলে হবে না। যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে।

জয় বাংলা
জয় বঙ্গবন্ধু।