ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের ষোড়শ রাষ্ট্রপতি আব্রাহাম লিংকন গণতন্ত্রের চমৎকার এক গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। যা ছিল, “Government of the people, by the people, for the people, shall not perish from the earth.” অর্থাৎ ‘সরকার জনগণের, সরকার জনগণের দ্বারা, সরকার জনগণের জন্য, পৃথিবী থেকে মুছে যাবেনা।’ ১৮৬৩ সালের ১৯শে নভেম্বর আব্রাহাম লিংকন যে ব্যাখ্যা বা সংজ্ঞা দিয়েছিলেন তার প্রয়োগ ৩৫তম রাষ্ট্রপতির সময়েও ছিল না। সেইজন্যই জন এফ কেনেডি একদিন আক্ষেপ করে উনার এক বক্তব্যে বলেছিলেন, “কি ধরনের গণতন্ত্র আমদের প্রয়োজন এবং কি গণতন্ত্র আমাদের আছে। সত্যি কথা হল আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে আজ পর্যন্ত আব্রাহাম লিংকনের সংজ্ঞায়িত গণতন্ত্রের প্রয়োগ হয়নি।”

বঙ্গবন্ধুও ঠিক একই রকম আক্ষেপ করেছিলেন। যে গণতন্ত্র বাংলাদেশে ছিল তাতে বঙ্গবন্ধু খুশি ছিলেন না। উনি বারবার শোষিতের গণতন্ত্রের কথা বলেছেন। আর যখনই বঙ্গবন্ধু শোষিতের জন্য ব্যবস্থা নিতে গেছেন তখনই তাকে হত্যা করা হয়েছে। ঠিক একই কারণে ধারণা করা হয় জন এফ কেনেডিকেও হত্যা করা হয়েছিল। কারণ উনি শোষিতের জন্য কিছু গণতান্ত্রিক পদক্ষেপ নিতে চেয়েছিলেন। উনি ভিয়েতনামে যুদ্ধ বন্ধ করতে চেয়েছিলেন। যা আমেরিকার ধনিক শ্রেণী তথা অস্ত্র ব্যবসায়ীরা এ সিদ্ধান্তকে ভাল চোখে দেখেনি, আর তাই উনাকে হত্যার ষড়যন্ত্র করে।

jfk-podium-reuters-e1386053690559

জন এফ কেনেডি এবং বঙ্গবন্ধু এ দুই হত্যার পিছনেই রাষ্ট্রযন্ত্রের ভূমিকা ছিল। যারা অলিভার স্টোনের জে এফ কে ছবিটা দেখেছেন তারা বুঝবেন ব্যাপারটা খুব সহজেই। ‘কেনেডি হত্যা সম্বন্ধে সত্যের সন্ধানে’ শিরনামে আমি একটা বই পড়েছিলাম সেখানে ব্যাপারটা ছিল পরিষ্কার। শুক্রবার, ২২ নভেম্বর, ১৯৬৩ সালে ১২:৩০ এ ডালাসে রাষ্ট্রপতি কেনেডিকে হত্যা করা হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের সরকার যা বোঝাতে চেয়েছিল তা হল- লি হারভে ওসওয়াল্ড তাদের রাষ্ট্রপতিকে হত্যা করেছে। এর দু’দিন পর ২৪শে নভেম্বর ১৯৬৩ ওসয়াল্ডকে অধিক নিরাপত্তার জন্য ডালাস পুলিশের সদর দপ্তরের বেজমেন্টে আনা হয়। সেখানে পুলিশ হেফাজতে থাকা অবস্থায় এক জনাকীর্ণ ঘরে যেখানে সরাসরি সম্প্রচারের জন্য টিভি ক্যামেরা ছিল, সাংবাদিক ছিল আর পুলিশ তো ছিলই, এরমধ্যে জ্যাক রুবি তার গোপন .৩৮ রিভলভার দিয়ে একটা মাত্র গুলি করে ওসওয়াল্ডকে হত্যা করে। জ্যাক রুবি ছিল এক নৈশ ক্লাবের মালিক যার বিভিন্ন অপরাধের সাথে সম্পৃক্ততা ছিল। পুলিশ তাকে দ্রুত আটক করে খুনের অভিযোগে অভিযুক্ত করে। বিচার চলাকালে রুবি পুলিশি হেফাজতে থাকা অবস্থায় মারা যায়।

এসব কিছুই খুব রহস্যজনক ছিল। তবে ওসওয়াল্ড বা জ্যাক রুবি কেউই সুবিচার পাইনি। রাষ্ট্রপতি কেনেডি হত্যার ষড়যন্ত্রকারী এ দুইজনের কেউ ছিল না সেটা নিশ্চিত। যে তদন্তকারী কর্মকর্তা কেনেডি হত্যার তদন্ত করেছিল সে বিভিন্নভাবে প্রত্যক্ষদর্শীদের প্রভাবিত করতে চেষ্টা করেছিল। জন এফ কেনেডিকে তিনটা গুলি করা হয়েছিল। মেরিলিন মনরো নামে একজন প্রত্যক্ষদর্শী সে রকমই জবানবন্দি দিয়েছিলেন, কিন্তু তাকে বলতে বলা হয়েছিল সে যেন বলে দু’টো গুলি শুনেছে। রাষ্ট্রপতি কেনেডির দেহে ময়না তদন্তে তিনটা গুলিই পাওয়া গিয়েছিল। এর মধ্যে একটা বিশেষ গুলি ছিল, যা সাধারণের ব্যবহারের প্রশ্নই ওঠে না। সেটা ছিল এফ.বি.আই এর গুলি। এটা সুনিশ্চিত ভাবেই বলা যায় যে, ওসওয়াল্ড যদি কেনেডিকে প্রথম গুলি করেও থাকে কিন্তু কেনেডির মৃত্যু শতভাগ নিশ্চিত করতে এফ.বি.আই এর সদস্য রাষ্ট্রপতিকে গুলি করে। রাষ্ট্রপতির গায়ে যতগুলো গুলি লেগেছিল সেগুলো এক জায়গা থেকে করা হয়নি তার যথেষ্ট প্রমাণ আছে। ধারণা করা হয় তৎকালীন উপ-রাষ্ট্রপতি এবং ধনিক শ্রেণী ও গোয়েন্দা সংস্থা মিলেই একাজ করেছিল। খুবই দুঃখের বিষয় যুক্তরাষ্ট্রের মত একটা আধুনিক রাষ্ট্রে তাদের রাষ্ট্রপতি হত্যার আংশিক বিচারও হয়নি।

Mujib

১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট ঠিক একই জাতীয় ঘটনা বাংলাদেশে ঘটে। বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। এ হত্যার অবশ্য বিলম্বে হলেও আংশিক বিচার হয়েছে। বিচারে বলা হয়েছে কিছু উৎশৃংঙ্খল সেনা কর্মকর্তা হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। এটা বিশ্বাসযোগ্য না। কিছু উৎশৃংঙ্খল সেনা কর্মকর্তা যদি হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে থাকতো তাহলে রাষ্ট্র ক্ষমতা তাদের হাতে যাওয়ার কথা ছিল না। সবথেকে বড় কথা, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর দেশে সামরিক শাসনও জারি হয়নি। যদি সামরিক শাসন জারি হত তাহলেও ধরে নিতে পারতাম যে কিছু উৎশৃংঙ্খল সেনা কর্মকর্তা হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। চক্রান্ত ছিল রাজনৈতিক, আন্তর্জাতিক, সামরিক এবং বেসামরিক। বিচার করা হয়েছে কিছু সেনা কর্মকর্তার। বেসামরিক, আমলা, রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক চক্রান্তকারীদের অপরাধ খতিয়ে দেখা হয়নি।

বঙ্গবন্ধু কমপক্ষে তিনজনকে টেলিফোন করে সাহায্য চেয়েছিলেন। এরমধ্যে তৎকালীন সেনাপ্রধান ছিলেন, উনার নিষ্ক্রিয় ভূমিকা সন্দেহের উদ্রেক করে। শুধুমাত্র বঙ্গবন্ধুর সামরিক সচিব কর্নেল জামিল উদ্দিন সাহায্যের জন্য রওনা দিয়েছিলেন কিন্তু উনাকেও ওইদিন সোবহানবাগ মসজিদের কাছে হত্যা করা হয়। তাছাড়া আর একজন সেনা কর্মকর্তাও সাহায্যের জন্য না আসা এ বার্তা বহন করে না যে, কিছু উৎশৃংঙ্খল সেনা কর্মকর্তা হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রীসভার ২১ সদস্য খন্দকার মোশতাকের মন্ত্রীসভায় যোগ দিয়েছিল সেক্ষেত্রে আমরা নির্দ্বিধায় বলতে পারি রাষ্ট্র এই হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত ছিল।

সেনাবাহিনীর উপ প্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান পরিষ্কার জানতো বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হবে। তারপরও কোন পদক্ষেপ সে নেয়নি। কিন্তু একজন সেনাবাহিনীর সদস্য শপথ করে যে নিজের জীবনের বিনিময়েও রাষ্ট্রপতির জীবন রক্ষা করতে বদ্ধপরিকর থাকবে।

খন্দকার মোশতাকের ৮১ দিনের শাসনামলে সঙ্গী যারা ছিল। মোশতাকের উপ-রাষ্ট্রপতি ছিল মোহাম্মদউল্লাহ। আর মন্ত্রীসভার সদস্যরা হল পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী, আইনমন্ত্রী মনোরঞ্জন ধর, পরিকল্পনামন্ত্রী অধ্যাপক ইউসুফ আলী, অর্থমন্ত্রী ড. আজিজুর রহমান মল্লিক, শিক্ষামন্ত্রী ড. মোজাফফর আহমদ চৌধুরী, স্বাস্থ্যমন্ত্রী আবদুল মান্নান, কৃষি ও খাদ্যমন্ত্রী আবদুল মোমিন, এলজিআরডি মন্ত্রী ফণিভূষণ মজুমদার, নৌপরিবহনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান, গণপূর্ত ও গৃহায়নমন্ত্রী সোহরাব হোসেন। প্রতিমন্ত্রীরা হলেন ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী কে এম ওবায়দুর রহমান, ভূমি ও বিমান প্রতিমন্ত্রী শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন, রেল ও যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী নূরুল ইসলাম মঞ্জুর, তথ্য প্রতিমন্ত্রী তাহেরউদ্দিন ঠাকুর, শিল্প প্রতিমন্ত্রী নূরুল ইসলাম চৌধুরী, ত্রাণ ও পুনর্বাসন প্রতিমন্ত্রী ডা. ক্ষিতিশ চন্দ্র মণ্ডল, পশু ও মৎস্য প্রতিমন্ত্রী রিয়াজউদ্দিন আহমদ ভোলা মিয়া, যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী সৈয়দ আলতাফ হোসেন ও মোমিনউদ্দিন আহমদ (বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভায় ছিলেন না)। এ ছাড়াও মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়ক জেনারেল মুহাম্মদ আতাউল গনি ওসমানী রাষ্ট্রপতি মোশতাকের প্রতিরক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা হয়েছিলেন মন্ত্রীর সমমর্যাদায়।

খন্দকার মোশতাক সরকারের পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ের পথ উন্মুক্ত করে দেন সাবেক রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও মহিউদ্দীন আহমদ বিশেষ দূত হয়ে। বঙ্গবন্ধুর বিশেষ দূত বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী ১৫ আগস্ট সংঘটিত হওয়ার মাত্র এক সপ্তাহ আগে ৮ আগস্ট দেশে ফিরে মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন।

একটা কথা খুবই পরিষ্কার যে সাবেক দেশের শিক্ষায় শিক্ষিত সেনাবাহিনী দিয়ে একটা বিপ্লবী সরকার তার কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে পারে না। তেমন সাবেক রাষ্ট্রের শিক্ষায় শিক্ষিত আমলা দিয়ে বিপ্লবী সরকারের কর্মসূচি বাস্তবায়ন সম্ভব না। আমলারা কাল কেউটের চেয়ে ভয়ঙ্কর। বঙ্গবন্ধুর কিছু পদক্ষেপ আমলাদের পছন্দ হয়নি। যেমন উনি এক নির্দেশ নামায় ফাইল আনা নেওয়ার জন্য পিওন নিষিদ্ধ করেছিলেন। এই নির্দেশনামার খসড়া করেছিলেন উনার অবৈতনিক ব্যক্তিগত সহকারী জনাব হাজি গোলাম মোর্শেদ। বঙ্গবন্ধু জনগণের সেনাবাহিনীর (People’s Army) কথা বলেছিলেন যাদেরকে দেশের জন্য কাজ করতে হবে শুধু ব্যারাকে বসে ফুর্তি করলে চলবে না। এসব কথা তো সামরিক বাহিনীর লোকজনেরও পছন্দ হয়নি।

এমনকি যে মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বপূর্ণ অবদানে দেশ স্বাধীন হয়েছিল তারাও সেদিন সঠিক ভূমিকা পালনে ব্যর্থ হয়ে নিশ্চুপ ছিল।

যে তিন জন এই হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নিয়েছেন বা প্রতিবাদ করেছেন তারা হলেনঃ
১. কর্নেল জামিল উদ্দিন, ২. কাদের সিদ্দিকী, ৩. বরগুনা মহকুমা প্রসাশক সিরাজ উদ্দিন আহমেদ। অতএব সে সময়ে রাষ্ট্রের বিভিন্ন সংস্থার যে ভূমিকা, তা থেকে দ্বিধাহীন ভাবে একথা বলা যায় বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে রাষ্ট্রের মদদ ছিল, ভূমিকা ছিল।