ক্যাটেগরিঃ প্রবাস কথন

আপনারা প্রশ্ন করতে পারেন আমি কেন মাইনস লিখলাম, কারণ বাংলাদেশের পত্রিকাতে মাইনজ লেখে। জার্মান ভাষায় লেখা হয় Mainz। জেড অক্ষরটা জার্মান ভাষায় ছেড, অতএব শহরটা মাইনজ না মাইনস। ফাঙ্কফুর্ট কেন্দ্র থেকে মাইনস কেন্দ্রের দূরত্ব ৩৭ কিলোমিটার। চমৎকার শহর মাইনস। বাড়িঘরগুলোর মধ্যে পুরানো আভিজাত্যের ছাপ আছে। ফ্রাঙ্কফুর্টের মত অত্যাধুনিক দালান-কোঠায় ভরপুর না। এই শহরেই থাকেন জার্মান বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশনের সভাপতি জনাব ইউনুস আলী খান ও উনার সহধর্মিণী আসমা খান সীমা।

মাইনস রেলস্টেশন

জনাব ইউনুস আলী খানের সাথে আমার পরিচয় হয়েছিল ফ্রাঙ্কফুর্টে এক অনুষ্ঠানে। ওই অনুষ্ঠানে উনি যখন বক্তব্য রাখেন তখন জানতে পারি উনি জার্মান আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ও জার্মানির বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। অনুষ্ঠানের শেষে উনাকে সেদিন বলেছিলাম ভাই আমি আওয়ামী লীগের চেয়ে বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশনের হয়ে কাজ করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবো, যদি আপনি সুযোগ দেন। উনি আমাকে সাদর আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। এরপর টেলিফোন নাম্বার বিনিময় হয়েছিল। পরবর্তীতে ১০ই ডিসেম্বর আমি উনাকে ফোন করেছিলাম, অনেকক্ষণ কথা হয়েছিল। তারপর উনি আমাকে ১৬ই ডিসেম্বরের অনুষ্ঠানে নিমন্ত্রণ করেছিলেন। কিন্তু আমি সেদিন যেতে পারিনি আমার মেয়েটার জন্য কারণ সেদিন ওর মাও বাসায় ছিল না। উনাকে বললাম, ভাই এবার যেতে পারছি না কিছু ব্যক্তিগত সমস্যার কারণে, উনি বুঝলেন। বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনের অনুষ্ঠানে উনি প্রায় ছয় সপ্তাহ আগেই জানালেন। আমি সবরকম প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিলাম, কাজ থেকে ছুটি নেয়া, টিকেট কাটা সব শেষ করে রেখেছিলাম।

পুরো মার্চ মাসেই আমার রাতে কাজ ছিল। শুক্রবার সন্ধ্যায় কাজ শুরু করে শনিবার রাত দুটোর দিকে বাসায় ফিরলাম। কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে তারপর সকালে উঠে বাসে রওনা দিলাম মাইনসের উদ্দেশ্যে। এদিন বেশ ঠাণ্ডা ছিল, বাসা থেকে বেরুনোর পর কিছুক্ষণের মধ্যেই ক্লান্তি কেটে গেল। ঠাণ্ডায় যেন পুরো জেগে উঠলাম। আমি যে বাসে উঠেছিলাম সেটা যাত্রা শুরু করেছিল মিউনিখ থেকে তারপর বুজবুর্গ, ফ্রাঙ্কফুর্ট হয়ে মাইনসে। যখন প্রথম জার্মানি এসেছিলাম তখন প্রায় পাঁচ মাসের মত বুজবুর্গে ছিলাম। চমৎকার শহর, একদিক দিয়ে নদী বয়ে গেছে। শহরের প্রধান রেল স্টেশনের কাছে থেমে চালক আমাদের জানালেন এখানে ৩০ মিনিটের যাত্রাবিরতি। কেউ চাইলে বাইরে যেয়ে ধূমপান বা খাবার প্রয়োজন হলে কিনে আনতে পারে। আমার আসলে কোন কিছুরই দরকার ছিলনা। তারপরও নেমে গেলাম পুরানো স্মৃতির টানে।

নেমে সামনের দিকে এগিয়ে রেলস্টেশনের ওদিক থেকে একটু ঘুরে এলাম। বাসের সামনে ফিরে দেখি আমার পরিচিত একজন সিগারেট টানছেন, উনার নাম আরিফুল হক। জিজ্ঞাসা করলাম আপনি কোথায় যাচ্ছেন? উনি জানালেন খান ভাই নিমন্ত্রণ করেছেন মাইনসে যাচ্ছি বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনের অনুষ্ঠানে। আমি জানালাম ঠিক একই উদ্দেশ্যে আমিও রওনা দিয়েছি। আমি উনাকে জিজ্ঞাসা করলাম আপনি তো আমার আগে মিউনিখ থেকে উঠেছেন বাসে তো আপনাকে দেখলাম না। উনি জানালেন আমরা দুজনেই হয়তো খেয়াল করিনি। আমি বাসে বসেই আসলে কিছু লেখালেখির চেষ্টা করছিলাম, কিন্তু সম্ভব ছিল না ঝাঁকির কারণে। ট্রেনে অবশ্য এই ঝামেলাটা হয় না। ট্রেনে বসে আমি প্রচুর লিখেছি, এ কারণে আমি দূরে কোথাও গাড়িতে যাওয়া পছন্দ করিনা। আরিফুল ভাইয়ের সাথে দেখা হবার পর বাসের আসন পরিবর্তন করে উনার পাশের আসনে বসলাম। কথায় কথায় কখন যে সময় চলে গেল টেরই পাইনি। কথা প্রসঙ্গে আরিফুল ভাই জানালেন উনি তখন ছোট ছিলেন তারপরও মনে আছে, উনার বাবা উনাকে সাথে করে নিয়ে গিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ শুনতে।

মাইনস রেলস্টেশনের বিপরীতে একটা বাড়ি নীচে পানশালা

বাসটা বুজবুর্গ শহর ছেড়ে যখন ফ্রাঙ্কফুর্টের দিকে রওনা দিল কিছুটা অংশ পাহাড়ি রাস্তা ছিল, তখন তুলার মত বাতাসে তুষারগুলো উড়ছিল। বুজবুর্গের এই এলাকা আঙুর বাগানের জন্য বিখ্যাত। প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে যথাসময়ে আমরা মাইনসে পৌঁছে গেলাম। মাইনসের রেল স্টেশনটা চমৎকার। আমরা ওখানে হালকা কিছু কেনাকাটা সেরে আর এক পেয়ালা কফিতে চুমুক দিয়ে বাইরে বেরুলাম। বাইরে এসে মাইনস রেলস্টেশনের কিছু ছবি তোলার লোভ সংবরণ করতে পারলাম না। ছবি তুলে আমারা অনুষ্ঠানের স্থানে রওনা দিলাম ৭/৮ মিনিটের মধ্যে পৌঁছে গেলাম সেখানে। বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশনের সভাপতি জনাব ইউনুস আলী খান নিজে আমাদের অনুষ্ঠানে অভ্যর্থনা জানালেন। উনার আন্তরিক অভ্যর্থনা ভোলার না। অনুষ্ঠানের সময় ছিল বিকাল চারটায় থাকলেও শুরুতে একটু দেরি হয়ে যায়। আর এতে যা হয় তাই হয়েছিল। বক্তাদের বক্তব্য দিতে ডেকে অনুষ্ঠানের উপস্থাপিকা স্নিগ্ধা বুলবুল চাপের মধ্য রেখেছিলেন ভাই বক্তব্য একটু সংক্ষিপ্ত করবেন। চাপের মধ্যে থেকে বঙ্গবন্ধুর উপর আলোকপাত করা কঠিন। আমাকে বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশনের সভাপতি প্রস্তুতি নিয়ে যেতে বলেছিলেন টেলিফোনে। আমি উনাকে জানিয়েছিলাম, বঙ্গবন্ধুর উপর কথা বলতে আমার কোন প্রস্তুতির দরকার হয় না।

অনুষ্ঠান দেরিতে শুরু হলেও আমার কিন্তু কোন সমস্যা হয়নি। কারণ এই সময় আমি ওখানে উপস্থিত অনেকের সঙ্গে কথা বলেছিলাম এবং তাদের অনুমতিক্রমেই কথাবার্তার একটা রেকর্ড রেখেছিলাম যাতে পরে এ ব্যাপারে বিস্তারিত লেখা যায়। কোলন থেকে আগত দুজনের সাথে কথা হচ্ছিল। উনারা দুজনেই জোর গলায় জানালেন যে রাজনীতি বিষয়ে পড়াশোনা করেন এবং গবেষণা করেন। উনাদের মধ্যে একজন আবার জার্মান রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত, সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টির উনি একজন সক্রিয় সদস্য এবং নির্বাচিত সিটি কর্পোরেশনের সদস্য বলে জানালেন নিজেকে। এই দুজনের মধ্যে আমি বেশ জাসদ প্রীতি দেখতে পেলাম। তখন উনাদেরকে আমি বলেছিলাম আপনারা নিশ্চয় জানেন বঙ্গবন্ধু সরকারকে এই জাসদ কিভাবে নাস্তানাবুদ করেছিল খুন রাহাজানি করে। আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম যে সময় এরশাদ ক্ষমতা গ্রহণ করে সেই সময় জাসদ বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম দল হিসেবে প্রায় আত্মপ্রকাশ করেছিল। এই দলটাকে কিন্তু শেষ করেছিল তাদেরই নেতা মেজর জলিল পাকপন্থী এরশাদের সাথে হাত মিলিয়ে।

বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে এসে জাসদের নেতার ভূয়সী প্রশংসা আমার কিছু সন্দেহের উদ্রেক করেছিল। উনি জানালেন মেজর জলিল নাকি একমাত্র নেতা যে ‘যুদ্ধের সময় মিত্র বাহিনী আমাদের দেশের মধ্যে যেসব লুটতরাজ করেছিল’ ওনার ভাষায়, তার প্রতিবাদ করেছিলেন। এ কারণে নাকি তাকে যুদ্ধে ভাল অবদান রাখা স্বত্বেও কোন পদক দেওয়া হয়নি। উনাদেরকে আমি আরও বলেছিলাম যে মেজর জলিল এরশাদের সঙ্গে আঁতাত করার পর পাকিস্তান সফর করেছিল, তারপর ইসলামী সমাজতন্ত্রের কথা বলেছিল।

সমাজতন্ত্রের আবার বৈজ্ঞানিক আর ইসলামী রূপ কি সম্ভব? সমাজতন্ত্র হল সেই নীতি যা রাষ্ট্রের সকল নাগরিকের পাঁচটা মৌলিক চাহিদার পূরণ করবে। তারপরও এই দলটাকে ভাঙ্গা, প্রবর্তিতে তার পাকিস্তান প্রীতি এবং পাকিস্তান যোগাযোগ পরে অনেকেরই দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। সে মারাও যায় পাকিস্তানের একটা হাসপাতালে এই তথ্যটা আমি যখন তাদেরকে দেই। উনারা কোনোভাবেই স্বীকার করতে রাজি ছিলেন না যে মেজর জলিল পাকিস্তানে মারা গিয়েছিলেন। ওনারা আমাকে বললেন না মেজর জলিল বাংলাদেশের ঢাকাতে মারা গেছে তার বাসায়।

ওইদিন আমি বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনের অনুষ্ঠানে থাকার কারণে কোনরকম বিতর্কে যাওয়া থেকে বিরত ছিলাম। পরদিন বাসায় ফিরে নথিপত্র ঘেঁটে দেখলাম মেজর জলিল ইসলামাবাদের হাসপাতালে মারা গিয়েছিলেন, আমার এই জানায় কোন ভুল নেই। তারপর আমি ওনাকে টেলিফোন করি এবং বলি- আপনারা যা বললেন গতকাল এই কথার তো কোনো সত্যতা খুঁজে পাচ্ছি না। মেজর জলিল মারা গিয়েছিলেন পাকিস্তানের ইসলামাবাদের এক হাসপাতালে।

তখনই চুপ হয়ে গেলেন, বললেন হতেও পারে, হয়তো হবে। কিন্তু তথ্য কিভাবে বিকৃত হয় তার নমুনা দেখলেন। আরও কতজন সেদিন উনাদের কাছ থেকে বিভ্রান্ত হয়েছেন। সবার টেলিফোন নম্বর আমার কাছে নেই, আর সবাইকে টেলিফোন করে বলাও আমার পক্ষে সম্ভব না।

আমরা যখন অনুষ্ঠান স্থলে পৌঁছায় তখন প্রায় ফাঁকা ছিল অডিটোরিয়াম, কিছু মানুষ এসেছিলেন মাত্র। আমি ভিতরে ঢুকে ‘লেডিস ফার্স্ট’ কথাটা মনে রেখে সামনের দিকের চেয়ারে না বসে মাঝামাঝি জায়গায় একটা চেয়ারে আমার কিছু কাগজপত্র এবং কলম রেখে এলাম যাতে পরে যেয়ে বসতে পারি। কোলনের ভাইদের সাথে কথা সেরে কিছুক্ষণ পরে হলে ঢুকে দেখি আমার চেয়ারটা থেকে কাগজপত্রগুলো পিছনে পাঠিয়ে দিয়ে এক ভদ্ররমণী ওখানে বসে পড়েছেন, আমি একটু আশ্চর্যই হয়েছিলাম। জার্মানিতে সাধারণত কারো অনুমতি না নিয়ে এই জাতীয় কাজ কেউ করে না, অন্তত আমি করি না।

আস্তে আস্তে দেখলাম পুরো হলঘরটা মানুষে পরিপূর্ণ হয়ে গেল। মানুষ যে এখনো বঙ্গবন্ধুকে কি পরিমাণ ভালোবাসে তার প্রমাণ পেলাম এদিন। আমি তো মনে করেছিলাম হয়ত এই হল রুম জায়গা ফাঁকা পড়ে থাকবে কিন্তু সেদিন হলে সব মানুষের স্থানসংকুলান হচ্ছিল না অনেকেই বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। কি যে ভালো লেগেছিল দেখে, আর বাঙালির মহাসমারোহ অনেকদিন পর পাজামা-পাঞ্জাবি পরা মানুষ, শাড়ী পড়া মহিলাদের দেখে মনে হল যেন আমি বাংলাদেশে আছি। আবার এই অনুষ্ঠানে বেশ কয়েকজন জার্মান অতিথির আগমন আমাকে আশ্চর্য করেছে। আর বারবার মনে হয়েছে জার্মান বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশনের সভাপতি কতটা সক্রিয় হলে এত কিছু করা সম্ভব হয়েছে।

আমি এ দিন আসলেই নিজেকে খুব সম্মানিত মনে করেছি এজন্য যে উনি আমাকে অনুষ্ঠানে নিমন্ত্রণ করেছেন এবং বক্তব্য রাখার জন্য সুযোগ দিয়েছেন। আমার যে দিন প্রথম ইউনুস ভাইয়ের সঙ্গে কথা হয় উনি আমাকে বলেছিলেন ভাই আমার তেমন কিছু নেই, একটা সৎ স্ত্রী আছে আর নীতি আদর্শ আছে। মাইনস ঘুরে এসে আমার অভিজ্ঞতা যে, উনার হাতে বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশন সম্পূর্ণ নিরাপদ।

গতবছর ২৩ শে এপ্রিল আমি “শেখ ফজিলাতুন্নেছা ছাড়া কি বঙ্গবন্ধু সাফল্যের শিখরে পৌঁছতে পারতেন?” এই শিরোনামে একটা নিবন্ধ লিখেছিলাম । মাইনসে পৌঁছনোর পর বিভিন্ন ব্যস্ততার কারণে ইউনুস ভাই আমাকে ভাবির সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে পারেননি বা হয়ে ওঠেনি। আমি সবসময়ই নেপথ্যের মানুষগুলোর খোঁজ খবর রাখার চেষ্টা করি। অনুষ্ঠানে কিছুক্ষণ থাকার পর বুঝে গেলাম যে কে ইউনুস আলী খানের সহধর্মিণী। এক ফাঁকে আমি উনার কাছে যেয়ে নিজের পরিচয় দিয়ে বললাম, ভাই আমাকে বলেছেন আমার একজন সৎ স্ত্রী আছে। তো আপনি নিজেও নিশ্চয়ই গর্বিত যে,”আপনার একজন আদর্শবান স্বামী আছে।”

যখন আমি এই শেষের বাক্যটা বলছিলাম তখন ওখানে একজন মহিলা উপস্থিত ছিলেন উনি আমাকে ঠেসে ধরলেন আপনি শুধু কাকার কথা বলছেন কিন্তু আমার কাকিমাও খুব ভালো মানুষ ইত্যাদি। তখন সীমা ভাবি আমাকে বাঁচালেন বললেন ও আমার কথাও বলেছে, শুধু তোমার কাকার কথা বলছে না। এই ভদ্রমহিলার নাম রওশনারা সেলিম উনার বরের নাম মোহাম্মদ আবু সেলিম।

জনাবা আসমা খাঁন সীমা চালচলনে খুবই সাধারণ, নিরহংকারী মহিলা কিন্তু ব্যক্তিত্বে অসাধারণ। মার্জিত প্রতিবাদীও বটে যা আমাকে মুগ্ধ করেছে। এত বড় অনুষ্ঠানের অতিথিদের নাস্তার ব্যাপারে উনিই তদারকি করলেন। উনাকে সার্বক্ষণিক সাহায্য করতে দেখেছি রওশনারা সেলিমকে।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন সর্ব ইউরোপীয়ান বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশনের সদস্য সচিব নাহার মমতাজ এবং বিশেষ অতিথি ছিলেন স্পেন থেকে আগত কয়েস খান। গণ্যমান্য ব্যক্তিদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন প্রফেসর শরীফুল ইসলাম, ড. অরুণ ব্যানার্জি, মাইনসের মেয়র জোহানেস কোলম্যান, লুকাস আগস্টিন, হের মিলকে ও বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশনের নেতৃবৃন্দ উপদেষ্টা মাহবুবুল হক, উপদেষ্টা আবু সেলিম, উপদেষ্টা আজাহার হোসাইন, জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি মনিরুল আলম, সহ-সভাপতি হাকিম টিটু, সহ-সভাপতি বদরুল ইসলাম, সহ-সভাপতি ইমরান ভুঁইয়া, জনাব ইকবাল, সাংগঠনিক সম্পাদক মহসিন শাহ, জনাব খোকন, জনাব ফিরোজ, জনাব জিল্লুর রহমান সহ আরো অনেকে।

কয়েকটা পত্রিকায় খবর হয়েছে আলোচনা পর্বে বক্তারা বঙ্গবন্ধুর জীবনের উপর মূল্যবান বক্তব্য রাখেন এবং এই বক্তাদের মধ্যে আমিও একজন ছিলাম। আমি জানিনা বক্তারা কতটা মূল্যবান বক্তব্য রেখেছেন, কারণ আমি খুবই মর্মাহত ছিলাম যখন বক্তারা বক্তব্য দিচ্ছিলেন তখন হলঘরে কিছু ফিসফিসানি এবং কথা বলার শব্দ শোনা যাচ্ছিল। আমি নিজের কথা বলতে পারবো না অন্তত বাকিদের কথা বলতে পারি ওনারা বঙ্গবন্ধুর জীবনের উপর চমৎকার আলোকপাত করেছেন, বিশেষ করে বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশনের সভাপতি তারপর প্রফেসর শরিফুল ইসলাম এনাদের কথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

একজন বক্তা অতি-উৎসাহী হয়ে এই অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের জন্য ভোট চাইলেন, নৌকা মার্কার জন্য ভোট চাইলেন এটা আসলে আওয়ামী লীগের কোন অনুষ্ঠান ছিল না। আমি জানি এই সংগঠনের অধিকাংশ মানুষই আওয়ামী লীগের সঙ্গে কোন না কোনভাবে সম্পৃক্ত বা আওয়ামী লীগের নেতা ছিলেন কিন্তু এই দিনটা শুধু আওয়ামী লীগের জন্য না। আওয়ামীলীগের ভোট চাওয়ার জন্য না। এই দিনটাকে সার্বজনীন করতে না পারার দায় দায়িত্ব অনেকাংশে বা অধিকাংশে আওয়ামী লীগের ঘাড়েই বর্তায়। অবশ্য উনি ওনার বক্তব্য এভাবে শুরু করার পর লক্ষ করেছি বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশনের সভাপতি পিছন থেকে ওনাকে ইঙ্গিত দিলেন এই জাতীয় কথা না বলার জন্য। এই মানুষটাকে এইজন্যই আমি শ্রদ্ধা করি যে উনার নজর সবদিকে।

আজাহার হোসাইন, আবু সেলিম, লুকাস আগস্টিন, জোহানেস কোলম্যান, মুক্তিযোদ্ধা আমিনুর রহমান খসরু, মুক্তিযোদ্ধা নুরুল ইসলাম, জাকির হোসেন, কয়েস খান, নাহার মমতাজ এবং সবশেষে সভাপতি ইউনুস আলী খান তার সমাপনী বক্তব্য রাখেন। এই অনুষ্ঠানের ফাকে ফাকে আমি অনেকের সাথে কথা বলেছিলাম। এঁদের মধ্যে একজন ড. আজাদ ঠিক বিদায়ের সময় উনি আমাকে বলেছিলেন জোয়ার্দার সাহেব আপনি যেভাবে ৬ দফা থেকে শুরু করে শেখ মুজিবের উপর আলোকপাত করেছেন এটা চমৎকার ছিল। এভাবে না বললে আসলে উনাকে বোঝা যায় না। আমার পরিষ্কার মনে পড়ছে উনি শেখ মুজিবই বলেছিলেন, বঙ্গবন্ধু বলেননি। ড. আজাদ এসেছিলেন প্রফেসর শরীফের সাথে, উনি বয়সে তরুণ। ধন্যবাদ ড. আজাদকে উনারা অন্তত বঙ্গবন্ধুকে বুঝতে চেষ্টা করেন, কারণ তরুণ বয়সী মানুষদের মধ্যে বঙ্গবন্ধু সম্বন্ধে জ্ঞান ধারণা খুব কমই দেখি।

নাহার মমতাজ তাঁর বক্তব্যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয় তুলে ধরেন, আর তাহলো উনি বলেন যে আমাদের সন্তানদেরকে বঙ্গবন্ধু সম্বন্ধে জানাতে হবে, না জানালে তারা বুঝবে না বঙ্গবন্ধুর ত্যাগ,অধ্যবসায়, অনুশীলন ও মহানুভবতা। আমার প্রশ্ন হল আমরা যদি আলোচনা শুনতে বিরক্ত বোধ করি বা মনোযোগ না দিই তাহলে আমাদের সন্তানরা কিভাবে জানবে? আমার অনুরোধ থাকবে বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশনের প্রতি ওনারা ভবিষ্যতে কোন অনুষ্ঠানের আয়োজন করলে যথাসময়ে অনুষ্ঠান শুরু করতে পারার দিকে নজর রাখবেন। অনুষ্ঠানে মানুষের উপস্থিতি কম থাকলেও বক্তাদের বক্তব্য শুরু করতে দিবেন। তাতে হবে কি হয়তো কম মানুষ শুনবে কিন্তু মনোযোগ সহকারে শুনবে। এতে যদি দশজন মানুষও মনোযোগ সহকারে বঙ্গবন্ধুর কথা শোনে তাহলে এই দশজন আরও দশ জনকে বা একশ জনকে বঙ্গবন্ধুর নীতি আদর্শের কথা ছড়িয়ে দিতে পারবে। আর অনুষ্ঠান যথাসময়ে শুরু করার দায়িত্ব শুধু বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশন এর সভাপতির একার না। এজন্য প্রত্যেককে তার নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করতে হবে। অনুষ্ঠানের উপস্থাপিকা আমি যতদূর জানি উনি বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদিকা উনিও এই কাজটার দায়িত্ব নিতে পারতেন। উপস্থাপনায় উনি ছিলেন চমৎকার, সাবলীল।

আমাদের দেশে একটা ব্যাপার আমি লক্ষ্য করি কোন কাজে, সামান্য কিছুতেও সবাই প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চায় সবাই। শেখ হাসিনা একজন মানুষ ওনাকেও ঘুমাতে হবে, ওনারও বিশ্রাম প্রয়োজন আছে। একটা মেশিনকেও আপনি বিশ্রাম ছাড়া অবিরাম কাজ করতে দিতে পারেন না, অবিরাম কাজ করালে বিকল হতে বাধ্য। আমি এই ক্ষেত্রে বলব যে শুধু সভাপতি না কিছু কিছু কাজ আমাদের অন্যান্য নেতৃবৃন্দকে করতে হবে। জার্মান যে অতিথিরা এসেছিলেন উনারা অনুষ্ঠানের শেষ পর্যন্ত ছিলেন না। কারণ অনুষ্ঠান দেরিতে শুরু হওয়ায় উনাদের অন্য প্রোগ্রামের কারণে আগেই চলে গিয়েছিলেন। জার্মান অতিথিরা অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার আগে চলে গেলেও তাদের মধ্যে বেশ প্রশান্তি লক্ষ্য করেছিলাম। এবং বাঙালির আতিথেয়তায় ওনারা নিঃসন্দেহে খুশি ছিলেন, সন্তুষ্ট ছিলেন। এটা অনেকেরই দৃষ্টিগোচর হয়েছে যে এই বিদেশী অতিথিরা প্রত্যেকেই বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশন এর সভাপতির সঙ্গে বন্ধুত্বের বন্ধনে আবদ্ধ।

আমি জানিনা বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে কেন বাংলাদেশ জাতীয় শিশু দিবস পালন করে? কারণ আন্তর্জাতিকভাবে একটা শিশু দিবস আছেই সেটাও আমরা পালন করছি। জাতিয় শিশু দিবস অন্যদিনও হতে পারতো। বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে শিশু দিবস পালন করতে গিয়ে এইদিনের গুরুত্ব ও মহানুভবতা কমিয়ে ফেলা হয়েছে, এটা আমার ব্যক্তিগত মতামত। বর্তমান সরকার বা আওয়ামী লীগ কি সন্দিহান যদি তারা ক্ষমতায় না থাকে তাহলে এই দিনটি পালন করা হবে না বিধায়, কমপক্ষে দিনটি শিশু দিবস হিসাবে পালিত হবে। না হলে আওয়ামী বিরোধীরা ক্ষমতায় থাকলেও তারা সমালোচিত হবে যে কেন তারা দিবসটি পালন করেনি।

একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের শহীদ দিবস ও ভাষা দিবস ছিল আমরা সেভাবেই দিনটিকে পালন করতাম। কিন্তু আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার পর থেকে এই দিনটিকে আমরা যত না শহীদ দিবস বা ভাষা দিবস হিসাবে পালন করি তার চেয়ে অনেক বেশি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালন করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করছি। অন্তত আওয়ামী লীগ সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি সেদিকে সে ব্যাপারটা লক্ষণীয়। কিন্তু আমার কাছে এটা যত না আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস তারচেয়ে বেশি শহিদ দিবস, ভাষা দিবস। প্রথমত এটা আমাদের ভাষা দিবস, আমাদের ভাষার জন্য আমাদের ভাইয়েরা প্রাণ দিয়েছিলেন এইদিন।

এই দুটি ব্যাপার যখন আমি তুলনামূলক-ভাবে দেখি তখন আমার কাছে মনে হয় যে সরকারের নীতি এখানে দ্বিমুখী। একটা ব্যাপারকে সরকার জাতীয় থেকে আন্তর্জাতিকভাবে পালন করার জন্য বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে, আবার আর একটা ব্যাপারকে আন্তর্জাতিকভাবে থাকার পরও জাতীয়ভাবে পালন করার ক্ষেত্রে বেশি গুরুত্ব আরোপ করছে। কিন্তু জাতীয়ভাবে শিশু দিবস পালন করাটা আমার কাছে খুবই ঠুনকো মনে হয়। আমি জানি বঙ্গবন্ধু শিশুদের খুব পছন্দ করতেন উনি একবার চিলড্রেন পার্কে বসে বাচ্চাদের সঙ্গে সকালের নাস্তা করেছিলেন। এই কাহিনীটা আমার মা আমাকে বলেছিলেন। চিলড্রেন পার্ক কিন্তু বর্তমানের শিশু পার্ক না, এটা ঠিক বঙ্গভবনের সামনের দিকে যে পার্কটা আছে সেই পার্কটা।

ফিরে যাই অনুষ্ঠানে- একটা কথা বলতে ভুলে গিয়েছিলাম তা হল যারা ইউরোপে থাকে এবং ইউরোপিয়ানরা, সাধারণত জন্মদিন বা এ জাতীয় অনুষ্ঠান যদি শনি-রবিবারে না পড়ে তাহলে ওই দিনের পরের শনি বা রবিবারে আয়োজন করে থাকে সেই উৎসবের। কিন্তু এবারে আমাদের সৌভাগ্য যে বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন শনিবারে পড়েছিল। শনিবারে অধিকাংশ মানুষের ছুটি থাকে বিধায় ঠিক বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনেই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা গেছে। আমার কাছে এটা একটা বাড়তি আকর্ষণ মনে হয়েছে।

এক সময় কথা হল ড. ব্যানার্জির সাথে। উনি একজন নজরুল গবেষক। আমাকে বঙ্গবন্ধু সম্বন্ধে কিছু প্রশ্ন করলেন, আমি আমার যথাসাধ্য চেষ্টা করেছিলাম উত্তর দেয়ার জন্য। চমৎকার মানুষ ড. ব্যানার্জি, উনি বাংলাদেশি না, ভারতীয়। এই অনুষ্ঠানটা সার্বিক অর্থেই ছিল আন্তর্জাতিক, শুধু জার্মানি বা জার্মান প্রবাসী বাঙ্গালীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না।

যারা গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনের অনুষ্ঠানে উনাদের মধ্যে আর একজন হলেন মুক্তিযোদ্ধা নুরুল ইসলাম। মুক্তিযোদ্ধা নুরুল ইসলামের সঙ্গে আমার দীর্ঘ সময় কথা হয়েছিল। আমি সাধারণত বয়স্ক মানুষদের সঙ্গে যখন কথা বলি তখন তাদের কথা গভীর আগ্রহের সঙ্গে শুনি। আর যদি সে মুক্তিযোদ্ধা হয় তাহলে তাঁর গুরুত্ব আমার কাছে শতগুণ বেশি। অনেকে অনেক সময় বলে বেশিরভাগ অশিক্ষিত লোকজন মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলেন। আমি এই কথার দৃঢ় প্রতিবাদ জানাচ্ছি, মুক্তিযোদ্ধারা যদি অশিক্ষিত হতেন উনারা মুক্তিযুদ্ধে যেতে পারতেন না। একজন মুক্তিযোদ্ধা নিরক্ষর হতে পারে এর অর্থ এটা বহন করেনা যে তিনি অশিক্ষিত। এই জাতীয় ভাষা যারা প্রয়োগ করে বরং তারাই অশিক্ষিত কুশিক্ষিত।

মুক্তিযোদ্ধা নুরুল ইসলামের সাথে যখন কথা হচ্ছিল তখন উনি অনেক সময় আঞ্চলিক শব্দ ব্যবহার করেছেন, আমি ওই এলাকার আঞ্চলিক ভাষার সঙ্গে কিছুটা পরিচিত এই কারণে যে আমার বড় ভগ্নীপতি ওই এলাকার মানুষ। উনি শুধু বঙ্গবন্ধুর উপর বক্তব্যই দেননি বরং স্বরচিত কবিতা পাঠ করে শুনিয়েছেন। চমৎকার একটা কবিতা লিখেছেন আমাদের প্রধানমন্ত্রীর উপর। বাংলাদেশে যেয়ে উনি চিকিৎসকের গাফিলতিতে বা অজ্ঞতাই বড় বিপদে পড়েছিলেন সে কথা আমাকে জানালেন। তবে এখনও উনি খুব সুস্থ না, তারপরও বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে আসতে কোন কার্পণ্য করেননি। ‘রাজা নাকি কখনো প্রজা হয় না’ ঠিক তাই উনি যে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা সেটা প্রমাণ করে দিলেন। অসুস্থতা সবকিছুকে উপেক্ষা করেছেন, বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন ওনার কাছে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে। আমাদের নতুন প্রজন্মকে জানিয়ে দিলেন বঙ্গবন্ধু জন্য আমাদের করনীয়। আমার আন্তরিক স্যালুট এই সম্মানীয় মুক্তিযোদ্ধার জন্য।

বক্তব্য পর্ব শেষ হওয়ার পর নৈশভোজের ব্যবস্থা ছিল। সে সময় আমি ভাবতেও পারিনি যে এত মানুষের খাবারের আয়োজন হবে। পর্যাপ্ত খাবার ছিল কিন্তু একটা জিনিস আমি লক্ষ্য করেছি, সেটা আমার ভালো লাগেনি। সবাই না অনেকে একটা ডেকচিতে খাবার আছে সেটা শেষ হয়নি কিন্তু ঠাণ্ডা হয়ে গেছে বা এরকম কিছু অজুহাতে আর একটা খুলে খাবার নিচ্ছে। কিন্তু একবার ভেবে দেখছে না যে খোলার পর ওটাও তো দ্রুত ঠাণ্ডা হয়ে যাবে। অতএব আমাদের উচিত যে একটা শেষ করে আর একটা থেকে নেওয়া। হয়ত একটার মধ্যে মাংস কিছু কম আছে কিন্তু আমাদের উদ্দেশ্যটা কি সেটা আমাদেরকে বুঝতে হবে। তারপরও আমাদের আরেকটা দিকে লক্ষ করা দরকার ছিল যে সব অতিথিরাও বাইরে থেকে এসেছেন তাদের জন্য ভালো খাবারটা থাকছে কিনা। অনেককে দেখেছি খাবার খেয়েছেন তাদের প্লেটটা জানালার ওপরে রেখে দিয়েছেন, কেউ বা চেয়ারের উপরে রেখে দিয়েছেন। কেউ পানির গ্লাস এদিক-সেদিক রেখে দিয়েছেন। এখানে যে খাবারের থালাগুলো ব্যবহার করা হয়েছিল সেগুলো একবার ব্যবহার যোগ্য। ময়লা ফেলার জন্য ওখানে যথেষ্ট ব্যবস্থাও ছিল কিন্তু কেন ওনারা সেগুলো ব্যবহার করেননি আমি বলতে পারব না। তবে আমার কাছে এই আচরণ খুবই দৃষ্টিকটু মনে হয়েছে। আমি নিজে কিছু থালা ও প্লাস্টিকের গ্লাস ময়লার বস্তায় ফেলে এসেছিলাম। এরপর আমিও ব্যস্ত হয়ে যায় আমার কাজে অর্থাৎ তথ্য সংগ্রহে। অনেকের সাথে কথা হয়েছিল। কথা হয়েছিল সর্ব ইউরোপিয়ান বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশনের সদস্য সচিব নাহার মমতাজের সাথে।

আপনাদের মনে আছে কিনা জানিনা আমেরিকার গত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সময় ডোনাল্ড ট্রাম্প হিলারি ক্লিন্টনের সমালোচনা করে বলেছিল যে, জনাবা ক্লিনটনের সবই আছে কিন্তু আমেরিকার রাষ্ট্রপতি হবার মত মানসিক ধাত বা শক্তি নেই। ইংলিশ যে শব্দটা ট্রাম্প বলেছিল তা হল Temperament। তবে আমি নাহার মমতাজের মধ্যে Temperament এর কোন অভাব দেখিনি। হিলারি ক্লিন্টন উনার কাছ থেকে Temperament ধার নিলে রাষ্ট্রপতি হয়ে যেতে পারতেন নিঃসন্দেহে। নাহার মমতাজের সাথে টেলিফোন নাম্বার বিনিময় হয়েছে কিন্তু এখনও ফোন করে উনাকে বিরক্ত করার সুযোগ পাইনি। তবে কথা অবশ্যই এক সময় হবে। উনার Temperament দেখে মনে হয়েছে এরকম তিন-চারটা মেয়ে আমার থাকলে নিজেকে গর্বিত পিতা মনে করাতাম।

নাহার মমতাজ মহিলাদেরকে যথেষ্ট উদ্বুদ্ধ করেছেন, উৎসাহ যুগিয়েছেন এবং কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেছেন। কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেছেন এজন্য যে, ভাবীরা তাদের মূল্যবান শনিবার বা সপ্তাহান্তের সময়টা উৎসর্গ করেছেন। এই ব্যাপারটার সাথে আমি একেবারেই একমত না। এতে বরং মহিলাদের আরও বেশি করে মহিলা বানিয়ে ফেলা হয়েছে। নাহার মমতাজ নিজেও একজন মা উনার ফেসবুকে পাতা আমাকে তাইই বলেছে। উনিও তো উনার শনিবার উপেক্ষা করেই সুদূর সুইডেন থেকে এসেছেন। তাছাড়া বঙ্গবন্ধু উনার সারাটা জীবন বাংলাদেশের জনগণের জন্য উৎসর্গ করেছেন সেখানে ভাবিরা যদি ছেলে মেয়েদের নিয়ে একটা দিন কম উপভোগ করেন এটা এমন দোষের কিছু না। এরজন্য আমি অন্তত ভাবিদের বা ভাইদের কারো কাছে কৃতজ্ঞ থাকতে পারবো না। কর্তব্যের কারণে হলেও আমাদের বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন পালন করা উচিৎ।

আমি অবশ্য মাইনসে গিয়েছিলাম হৃদয়ের সকল ভালবাসায় কর্তব্যের জন্য না। আমার মেয়ের জন্মের পর থেকে আমিও সাধারণত ওকে ছাড়া কোথাও যাই না। কিন্তু যখন তাকে জানালাম বাবা এক রাত বাসায় আসতে পারবে না বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে অনুষ্ঠান আছে মাইনসে। বললো ঠিক আছে বাবা। ওর যখন ১০-১১ মাস বয়স তখন যখন জিজ্ঞাসা করতাম, বঙ্গবন্ধু কই বাবা? হাত উঁচু করে বঙ্গবন্ধুর ছবিটা দেখাত। নাহার আপা আপনার নামের নামের অর্থ ‘দিনের মুকুট’ আর আমার নামের অর্থ ‘স্বর্গের মুকুট’। দুই মুকুটের খুনসুটি এখানে থেকে গেল। ভাইবোনের খুনসুটি হতে পারে কিন্তু যেন আপনার স্নেহপ্রীতি বঞ্চিত না হয়।

কর্তব্য আর ভালবাসার পার্থক্য আপনারা নিশ্চয়ই বোঝেন। আমি অভিনেতা ঝুনা চৌধুরীর একটা সাক্ষাতকার নিচ্ছিলাম টেলিফোনে ৭ই মার্চের ভাষণকে কেন্দ্র করে। উনি আমাকে কথা প্রসঙ্গে বললেন আপনি তো অনেক কষ্ট করে কাজটা করেছেন। আমি সাথে সাথে উনাকে বলেছিলাম, না আমি বঙ্গবন্ধুর জন্য কোন কিছু করতে কোন কষ্ট বোধ করিনা এটা করতে পারি উনার জন্য আমার ভালবাসা আছে বলে। উনি তখন বলেছিলেন আসলেই তাই যেমন সন্তানের জন্য সারারাত জেগে থাকলে কোন ক্লান্তি লাগে না। কিন্তু অন্যকোন কাজে রাত্রি জাগলে পরদিন ঘুম থেকে জাগতে দেরি হয় ক্লান্তি লাগে। জনাব চৌধুরী চমৎকার ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন আমি খুবই খুশি হয়েছিলাম।

কথা হয়েছিল কয়েস ভাইয়ের সাথে যিনি স্পেন থেকে এসেছিলেন। হয়েছিল ফেসবুক আইডি ও টেলিফোন নাম্বার বিনিময়। উনার সাথে অবশ্য পরবর্তীতে যোগাযোগ হয়েছে চমৎকার মানুষ উনি। কয়েস ভাই তো অনুষ্ঠানের মধ্যে ঘোষণাই দিয়ে দিয়েছেন যে, বঙ্গবন্ধু ফেডারেশনের পরবর্তী অনুষ্ঠান স্পেনে করলে যত জন যাবে তাদের বিমান ভাড়া এবং থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা সব কিছু উনি করবেন। এ বড় লোভনীয় প্রস্তাব দেখা যাক ভবিষ্যতে কারা এ সুযোগ পায় বা আদৌ অনুষ্ঠান স্পেনে আয়োজন করা হয় কি না।

নৈশভোজের পর এক মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। এই অনুষ্ঠানের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশন জার্মান শাখার নেত্রী সাংস্কৃতিক সম্পাদিকা জনাবা কণা ইসলাম। চমৎকার গান করেন আমি তো ভেবেই পাইনি জার্মানিতে বসেও কেউ গানের গলার এত সুন্দর যত্ন নিতে পারেন। কারণ জার্মান সমাজব্যবস্থায় আমাদের মত ভোরবেলা উঠে হারমোনিয়াম নিয়ে সঙ্গীত সাধনা করার সুযোগ নেই। সকাল ৮ টার আগে উচ্চস্বরে গান বাজনা করলে বাসার মালিক বাসা থেকে বের করে দেবে, সেই ক্ষেত্রে রাস্তায় ঘুমাতে হবে। উনি কখন যে সঙ্গীত সাধনা করেন আমি জানিনা। তবে উনি তাহমিনা ফেরদৌসী,এবং অন্যান্য সঙ্গীত শিল্পীরা আমাদেরকে নিঃসন্দেহে মুগ্ধ করেছেন। আব্দুল মুনিমও চমৎকার গান করেছেন। উনি আরেকটা হিন্দি গজল আমাদেরকে শোনাতে চাচ্ছিলেন, এরমধ্যে কেউ একজন বলে উঠলেন এখানে বাংলা গান ছাড়া মানাবে না বা বাংলা গান ছাড়া অন্য ভাষায় গান করা ঠিক হবে না।

আমি দেখলাম এই কথায় বেচারা খুবই মর্মাহত হয়েছেন। সাথে সাথে উঠে দাঁড়িয়ে বললাম মুনিম ভাই আপনি অবশ্যই একটা হিন্দি গান করতে পারেন, আমি কোন সমস্যা দেখছি না। তার কারণ বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনীও বিভিন্ন ভাষায় অনুদিত হয়েছে, আজকের এই অনুষ্ঠানেও জার্মান অতিথিরা জার্মান ভাষায় বক্তব্য দিয়েছেন। এই অনুষ্ঠানে ভারতীয় অতিথিও আছেন ভদ্রলোক আমার কথায় খুব খুশি হয়েছিলেন, আশ্বস্ত হয়েছিলেন। পরে অবশ্য একটা হিন্দি গজল শুনিয়েছিলেন। আমি ব্যক্তিগতভাবে হিন্দি গানের ভক্ত না। সেদিনের এই অনুষ্ঠানটা আমাদের ভাষা দিবসের অনুষ্ঠানও ছিল না যে, সেখানে বাংলা ছাড়া আমরা অন্য কোন ভাষার গান শুনতে পারবো না। বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন এটা আমাদের জন্য আনন্দের এদিনে আনন্দ করা যেতেই পারে। সেক্ষেত্রে বাংলা গানই হতে হবে এরকম কোন বাধ্যবাধকতার প্রয়োজন আমি অনুভব করিনি।

এখানে আমার একটা কথা মনে পড়ছে তখন আমি ঢাকা কলেজের উচ্চমাধ্যমিকের ছাত্র, আমার কিছু কাগজপত্র নিতে আমাদের অংকের শিক্ষক জনাব লুৎফুল জামান স্যারের কাছে উনার কার্যালয় গেলাম। স্যার আমাকে কাগজপত্র বুঝিয়ে দিলে আমি ওনাকে Thank you বলে বেরিয়ে আসি। তারপর উনি আমাকে অন্য ছাত্রদের দিয়ে ডাকিয়ে কার্যালয়ে আবার নিয়ে গেলেন এবং আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন ফেব্রুয়ারি মাসে তুমি Thank you কেন বললে? উত্তরে আমি বলেছিলাম স্যার আমরা একুশে ফেব্রুয়ারি পালন করি সেটাও তো English তাহলে Thank you কেন বলা যাবে না? এ প্রশ্নের সঠিক উত্তর ওনার কাছে ছিল না সেটা আমি বুঝে গিয়েছিলাম, উনি আমাকে যেনতেন করে বুঝিয়ে দেয়ার চেষ্টা করলেন। উনি আমার শিক্ষক বিধায় উনার সঙ্গে সেদিন তর্কে যায়নি। কিন্তু ব্যাপারটা মনে নেওয়া তো দূরে থাক মেনেও নিইনি।

আমার এক বয়োজ্যেষ্ঠ বন্ধু ছিলেন, বলতে পারেন উনি আমার শিক্ষকও ছিলেন উনার নাম আবু ইউসুফ খান। আপনারা কি অনুমান করতে পারেন কে মানুষটা? বোধ করি না। উনি কর্নেল তাহেরের বড় ভাই ফ্লাইট সার্জেন্ট আবু ইউসুফ খান ১৯৭১ এ সৌদি আরবে; সৌদি বিমান বাহিনীতে ডেপুটেশনে ছিলেন। যুদ্ধে বাধলে পালিয়ে এসে তিনি ছোট ভাইয়ের সেক্টরে যোগ দিয়েছিলেন। সেদিন কলেজ থেকে ফিরে এ নিয়ে কথা বলেছিলাম ইউসুফ সাহেবের সাথে, তখন আমি থাকতাম শুক্রাবাদ বঙ্গবন্ধুর বাড়ির ঠিক উল্টোদিকে এখন যেখানে নিউ মডেল ডিগ্রী কলেজ, কলেজের ঠিক পিছনে চারতলা যে বাড়িটা ওই বাড়িতে। কলেজের পাশ দিয়ে এই বাড়িতে ঢোকার রাস্তার শুরুতে মিরপুর রোডে দ্বিতীয় দোকানটা ছিল ফ্লাইট সার্জেন্ট আবু ইউসুফ খানের। দোকানটার নাম ছিল ‘পূর্বানি জেনারেল স্টোর’। ইউসুফ সাহেব আমাকে সেদিন বলেছিলেন, “তোমার শিক্ষকের এটা একটা একগুঁয়েমি এবং নির্বুদ্ধিতা। তোমার অবস্থানে তুমি ঠিক আছো যদি পরিবর্তন করতে হয় তাহলে সবকিছুতেই পরিবর্তন আনতে হবে। বাংলা সর্বস্তরে চালু করতে হবে। আর ফেব্রুয়ারি মাসে শুধু ইংরেজি বলা যাবে না ফেব্রুয়ারির মাসের পর কোন বাধা নেই এটা খুবই মেকি ব্যাপার, এটা দিয়ে বাংলা ভাষাকে কোনোভাবেই সম্মানিত করা হচ্ছে না।”

এই পরিবারের সবাই ছিলেন জাত শিক্ষক সামরিক বাহিনীতে কাজ করলেও অসাধারণ দক্ষতা ছিল শিক্ষাদানে। আমাকে মাঝে মাঝে উনার দোকানে দাড়িয়েই ইংলিশ কবিতা বুঝিয়ে দিতেন। মাফ করবেন বিষয়ের বাইরে চলে গেছি। এই বিশাল হৃদয়ের মানুষটা সম্বন্ধে লিখতে গেলে একটা বই হয়ে যাবে। এইসব মানুষের সাথে আমার পরিচয় হয়েছিল বিধায়ই সেদিন মুনিম ভাইয়ের পক্ষ নিতে পেরেছিলাম।

সঙ্গীতানুষ্ঠানের ফাঁকে কণা ইসলামের সাথে অল্প একটু কথা হয়েছিল। আমি উনাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম ভাবি, “বঙ্গবন্ধু ফিরে এলে তোমার স্বপ্নের স্বাধীন বাংলায়” এই গানটা কি কেউ শোনাবে না?” উনি আমাকে বলেছিলেন যে গানটা তো আমি করতে পারি না ভাই তাছাড়া আমাদের গানের অনুষ্ঠান শেষের পথে। এখন ঘরে ফেরার পালা। আমি উনাদের চমৎকার সঙ্গীতানুষ্ঠানের জন্য প্রশংসা ও ধন্যবাদ জানাই আমার পছন্দের গানটা শুনতে পাই বা না পাই। এত চমৎকার গান করেও উনি বোধহয় নিশ্চিত ছিলেন না, আমাকে জিজ্ঞেস করলেন সত্যি কি ভাল লেগেছে ভাই আমাদের গান? একজন শিল্পীর মধ্যে যে বিনয়ী ভাব থাকা উচিত, কণা ইসলামের মধ্যে পরিপূর্ণ ভাবে তা বিদ্যমান।

সংগীত অনুষ্ঠানের পর অনেকে আস্তে আস্তে বিদায় নিচ্ছিলেন। এক সময় দেখলাম বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশন এর উপদেষ্টা মোহাম্মদ আবু সেলিম একজন কে বলছেন যদি কোন ভুল-ত্রুটি হয় কিছু মনে করবেন না ইত্যাদি। সাথে সাথে কথাগুলো আমার কানে বেজেছিল। ওই মানুষগুলো বিদায় নেবার পর আমি জনাব সেলিমকে জিজ্ঞাসা করি ভাই আপনারা কি কন্যাদায়গ্রস্ত পিতা যে বর পক্ষের কাছে ভুলত্রুটির ক্ষমা চাচ্ছেন। একই কাজ আমি জনাব সভাপতিকেও করতে দেখেছি সে ক্ষেত্রেও আমি এর প্রতিবাদ করেছিলাম। কারণ এখানে যারা এসেছে তাদের প্রত্যেকের একটা জিনিস বোঝা উচিত আমরা বঙ্গবন্ধুকে ভালবেসে এখানে এসেছি, তাঁকে সম্মান জানাতে এখানে এসেছি, আমরা বরযাত্রী হয়ে আসিনি। সভাপতি জনাব খান আমাকে বললেন তুমি বুঝবে না, কি পরিস্থিতির মধ্যে আমি আছি, আমরা সব বাঙালি তো। এরপরও আমি তাদেরকে সন্তুষ্ট করতে পেরেছি বলে মনে হয় না।

এসবের পর সুযোগ পেলাম অধ্যাপক শরীফের সাথে কথা বলার। খুবই বন্ধুত্বপূর্ণ বিনয়ী একজন মানুষ তিনি। বিভিন্ন বিষয়ে কথা বললেন, ওনার লেখা বইয়ের জন্য ব্রিটেনের রানী ওনাকে ইংল্যান্ডে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন সে কথা বললেন। তারপর বললেন আগের মত এখন লেখালেখি করতে পারেন না, দুটো আঙ্গুলে সমস্যা আছে এজন্য। তখন আমি ওনাকে বললাম আপনি তো ডিক্টেশন দিতে পারেন, ডিক্টেশন দিলে গগুলের একটা প্রোগ্রাম আছে ভালই বাংলা লিখে দেয়। একেবারে হয়তো সঠিক হয় না কিন্তু সেগুলো আস্তে আস্তে একটু এদিক ওদিক করে নেয়া যায়। কিন্তু আপনাকে এটা খুব সাহায্য করবে প্রাথমিকভাবে। উনি বুঝতে পারছিলেন না যে, সেটা কেমনে কাজ করবে, পরে ড. আজাদকে ডেকে আনলে আমি তাঁকে বুঝিয়ে দিলাম কেমনে কাজটা করে প্রোগ্রামটা।

আমি উনাকে বললাম আজকে তো সময় কম, আমি আপনার সাথে বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ নিয়ে কথা বলতে চাই। উনি টেলিফোন নাম্বার দিয়ে দিলেন, পরবর্তীতে সময়ে যাতে আমরা কথা বলে নিতে পারি। আরও কত বিষয়ে কথা বলার ছিল, উনি বলতে চাচ্ছিলেনও, আমারও সময় ছিল আমার কোন তাড়া ছিল না। কিন্তু উনি এসেছিলেন ড. আজাদের সঙ্গে তাঁর আবার পরের দিন একটা প্রোগ্রাম ছিল। এজন্য ওদের যাওয়ার তাড়া ছিল, ড. আজাদ আমার দিকে বার বার তাকাচ্ছিলেন। আমি কথা শেষ করে অধ্যাপক শরীফকে পায়ে সালাম করে ছেড়ে দিলাম। তারপর আবার উনি অন্য একজনের সঙ্গে কথা বলা শুরু করলেন। আর আজাদ তখন উসখুস করছেন। আমি তখন আজাদকে বললাম আপনি কিন্তু আমাকে দোষারোপ করতে পারবেন না আমি উনাকে ছেড়ে দিয়েছে। খুবই প্রাণখোলা মানুষ অধ্যাপক শরিফ। প্রকৃতই বঙ্গবন্ধুর একজন সৈনিক। এই বয়সেও অনেক প্রতিবন্ধকতা উপেক্ষা করে এসেছেন এবং আমাদেরকে অনেক কিছু জানিয়েছেন। আরও অনেক হয়ত বলার ছিল, সময় স্বল্পতার জন্য সেদিন সম্ভব হয়নি। উনি নিজেও পরবর্তীতে বনে পয়লা বৈশাখের একটা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলেন, ওই অনুষ্ঠানে আমাকে নিমন্ত্রণও দিয়েছিলেন। কিন্তু আমার কাজ থেকে আগে ছুটি নিয়ে না রাখার কারণে বিনয়ের সঙ্গে আমি উনার কাছ থেকে ক্ষমা চেয়েনিলাম, যে আমার পক্ষে যাওয়া সম্ভব হবে না।

সবাই একে একে বিদায় নিলে ওখানে ছিলাম আমরা কয়েকজন যাদের সেদিন নিজ শহরে ফেরা সম্ভব ছিল না। বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশনের সভাপতি আমাকে আগেই টেলিফোনে জানিয়ে দিয়েছিলেন, সেদিন রাত্রে আমার ফেরা হবে না। উনি জানিয়েছিলেন আমরা সবাই একসঙ্গে একটা ঘরে আড্ডা দিয়ে কাটিয়ে দেবো। আমার তো কোন সমস্যাও ছিলনা এক রাতের ঘুম নিয়ে। তাছাড়া বাঙালির সাথে এক রাত আড্ডা দিতে পারা আমার কাছে ছিল বাড়তি পাওয়া।

ইউনুস ভাই যখন আমাকে জানান আমরা একটা ঘরে আড্ডা দিয়ে কাটিয়ে দেবো। আমি ধারণা করেছিলাম কোন জায়গায় একটা ঘর হয়ত ভাড়া নেওয়া হচ্ছে, আমরা যারা রাতে যেতে পারব না তারা সবাই একসঙ্গে বসে আড্ডা দিয়ে কাটিয়ে দেবো। উনি যে আমাকে এরকম বোকা বানাবেন ধারণাও করতে পারিনি। অনুষ্ঠানের শেষে আমরা ওখান থেকে সবকিছু গুছিয়ে নিয়ে যখন গাড়িতে ওঠার প্রস্তুতি নিচ্ছি তখন বুঝতে পারলাম ইউনুস ভাই আমাদেরকে ওনার বাসায় নিয়ে যাচ্ছেন। একটা দল গেল ওনার বাসায় আরেকটা দল গেল সেলিম ভাইয়ের বাসায়, রওশনারা ভাবি আমাকে বলেছিলেন উনার বাসায় যাওয়ার জন্য। বড় বাড়ি ওনাদের যথেষ্ট জায়গা আছে কোন অসুবিধা হবেনা বললেন, কিন্তু আমি সভাপতি ইউনুস খানের নিমন্ত্রিত অতিথি বিধায় সে সিদ্ধান্ত নেবার সাহসও করিনি। তাছাড়া আমার কাজ তখনও শেষ হয়েছিল না। কয়েকজনের সাক্ষাৎকার নেবার ছিল স্বাভাবিক কারণেই খান দম্পতির আতিথ্য গ্রহণ করেছিলাম। নাহার আপা কয়েস ভাই হোটেলে যেতে চাচ্ছিলেন কিন্তু এই দুই পরিবার কাউকে হোটেলে যেতে দিতে নারাজ ছিলেন।

শেষমেশ সিদ্ধান্ত হল নাহার আপা যাবেন হক পরিবারের সঙ্গে আর আমরা যাব খান পরিবারের সঙ্গে। সবকিছু গুছিয়ে অতিরিক্ত জিনিসপত্র আমরা গাড়িতে ঢুকিয়ে মোটামুটি প্রস্তুত। আমরা মানুষ বেশি হওয়ার কারণে গাড়ির মধ্যে জাগায় একটু কম ছিল বিধায় ভাবীর তাঁর হাত ব্যাগটা পিছনে ক্যারিয়ারে রেখেছিলেন, কিন্তু গাড়ীর দরজাটা ঠিকমতো বন্ধ হয়েছিল না। পরে খান ভাই যখন দরজাটা বন্ধ করতে যান ভাবির হাতটা ওখানে ছিল উনি বেশ ব্যথা পেয়েছিলেন। খান সাহেব তাঁর বধূকে একটু বকুনি দিলেন। আহ সীমা আমি যখন করছি, তখন তোমার এখানে হাত দেবার দরকার কি। আমি জানিনা এই জাতীয় ক্ষেত্রে মহিলারা কিরকম ব্যবহার আশা করেন। এরকম পরিস্থিতিতে আমার অভিব্যক্তির বহিঃপ্রকাশও ইউনুস ভাইয়ের মতই হত। এ সময় মনে হয় এই ব্যথা আমি কেন পেলাম না। তখন মাথা ঠিক থাকে না নিজের উপর রাগ হয়, পরিস্থিতির উপর রাগ হয়। তখন যাকে সহানুভূতি দেখানোর দরকার তার উপরে হয়ত মিষ্টি রাগ করে বসি। ইউনুস ভাইয়ের এই ব্যবহারের মধ্য দিয়েই প্রেয়সীর প্রতি তাঁর গভীর ভালোবাসার প্রকাশ আমি পেয়েছি। দীর্ঘ সংসার জীবনে ভাবি নিশ্চয় এটা বোঝেন আর কেউ বুঝুক বা না বুঝুক।

জার্মানিতে আমরা কোন সময়ে ৫ জনের বেশি গাড়িতে উঠি না, কিন্তু এই দিন লোকসংখ্যা বেশি থাকায় গাড়ির মধ্যে ৬ জন বসেছিলাম। তবে আমার প্রদেশে অর্থাৎ বায়ার্নে হলে আমি কোন অবস্থায়ই ৬ জন এক গাড়ির মধ্যে উঠতাম না। বায়ার্নের আইন এবং প্রয়োগ খুবই কড়া। মাইনস পড়েছে রাইনল্যান্ড ফালস প্রদেশে। ইংলিশে এই প্রদেশকে বলে Rhineland-Palatinate। এই প্রদেশের আইন-কানুন সম্বন্ধে আমার তেমন কোন ধারণা নেই, যদি এখানে আইনের প্রয়োগ বায়ার্নের মত হত তাহলে এখানকার বাসিন্দারা এই জাতীয় কাজ করতেন না। গাড়ী চালালেন সীমা ভাবি।

গাড়ির মধ্যে ইউনুস ভাই আজহার ভাই কে উদ্দেশ্য করে বললেন এখন অনেককে দেখা যায় বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশন এর সঙ্গে আসতে চাচ্ছে, একসময় এদেরকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। এখন এদের কোন কাজ নেই, কেউ আসে কাজ চাইতে, কেউ আসে সঙ্গ পাবার জন্য। কেউবা আবার নেশাগ্রস্থ কিন্তু এ জাতীয় মানুষজনের বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশনে কোন স্থান নেই। এদের কেউ কেউ নিজের সংসার টিকিয়ে রাখতে পারেনি। অতএব এ জাতীয় লোকজন বঙ্গবন্ধু পরিষদকে কি দেবে? এরকম লোকজন বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশনে দরকার নেই। এই কথাগুলো শোনার পর এই ভদ্রলোকের উপর আমার শ্রদ্ধা আরও কয়েকগুণ বেড়ে গেল আমরা যদি এখন লক্ষ করে দেখি যে কেউই আওয়ামী লীগে ঢুকে যাচ্ছে এখানে কোন বিধি-নিষেধ নিয়ম কানুন কাজ করছে না। তাতে হচ্ছে কি এই দলের মধ্যে বিভিন্ন সময় শৃঙ্খলার অভাব দেখা দিচ্ছে। এতে দলের মঙ্গলের চেয়ে অমঙ্গলই বেশি হচ্ছে। সেই বিচারে আমি জার্মান বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশনের সভাপতির সাথে সম্পূর্ণ একমত পোষণ করি। উনি যে দৃষ্টিকোণ থেকে বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশনকে সাজাতে চান তা সম্পূর্ণ সঠিক পন্থা, এর বিকল্প কিছু নেই। এখানে বাংলার একটা প্রবাদ খুবই প্রযোজ্য আর তা হল, “দুষ্ট এঁড়ের চেয়ে শূন্য গোয়াল ভাল।”

আমি, আজহার হোসাইন, আরিফুল হক, খোকন খান, মহসিন শাহ ও কয়েস খান, যখন খান দম্পতির বাসায় উঠলাম, মধ্যরাত তখন। আমি তো অবাক উনাদের বসার ঘর দেখে। কয়েক সেট সোফা দেখলাম সেখানে। উনি যে একজন রাজনীতিবিদ এবং একটা অরাজনৈতিক সংগঠনের প্রধান উনার বসার ঘর তার প্রমাণ বহন করে। এর অর্থ মাঝেমাঝে উনার এখানে এই জাতীয় আয়োজন হয় এবং যথেষ্ট লোকজনের আনাগোনা চলে এখানে। এবং সেজন্য উনার যথেষ্ট প্রস্তুতিও আছে। উনাদের বাসায় ঢোকার পর আমরা শুটকির গন্ধ পাচ্ছিলাম। এই কারণে খান ভাই ও মহসিন ভাই মিলে সব জানালা খুলে দিলেন যাতে দ্রুত গন্ধ চলে যাই। মহসিন ভাইকে দেখলাম এ বাসার সবকিছুই তার কাছে খুব পরিচিত। উনি আমাদেরকে কফি বানিয়ে দিয়েছেন, অথচ ভদ্রলোক থাকেন হামবুর্গে। জানালা খোলা থাকার কারণে কয়েস ভাইয়ের বোধহয় একটু ঠাণ্ডা লাগছিল। উনি থাকেন স্পেনে যার জন্য জার্মানির এই ঠাণ্ডায় অভ্যস্ত না। সে কারণে উনার গায়ে তখনও জ্যাকেটটা ছিলই, আমরা অবশ্য সবাই জ্যাকেট খুলেই সোফায় বসে পড়েছিলাম। সারাদিন খান ভাবীর উপর যথেষ্ট ধকল গিয়েছিল বিধায় আমরা সবাই তাকে অনুরোধ করেছিলাম দ্রুত ঘুমিয়ে পড়তে, কিন্তু উনি অতিথিদের সবার ব্যবস্থা না করে ঘুমাতে নারাজ। বিছানা কোথায় কি আছে সব দেখিয়ে দিলেন। মহসিন ভাইকে দেখলাম উনি এ বাসার সবকিছু জানেন। উনি যথেষ্ট সাহায্য করেছেন সবার বিছানাপত্র ঠিক করে নিতে। আমি জানালাম ভোরে আমার ট্রেন আমি ঘুমাবো না তাছাড়াও খানভাই বলেছিলেন আমরা সবাই আড্ডা দিয়ে কাটিয়ে দেবো, আমি প্রস্তুত।

এরমধ্যে কয়েস ভাই বললেন ভাবি আসেন এক নতুন ভাবির গল্প শোনায়। ভাবি কাপড়চোপড় ছেড়ে রাতের পোশাক পরে এসে বসলেন। তারপর কয়েস ভাই আমাদেরকে নতুন ভাবির গল্প শোনালেন। কয়েস ভাই শুটকি মাছ খেতে খুব পছন্দ করেন। উনি আবার খুব আদুরে জামাই, শাশুড়ি ওনাকে খুবই স্নেহ করেন। উনার শাশুড়ি জামাইকে শুঁটকিমাছ পাঠাবেন বলে বাজার থেকে শুঁটকি মাছ কিনে এনেছিলেন। সেগুলো ছিল শোল মাছের শুটকি। সম্ভবত বাড়ির কাজের মেয়েটা উনার শাশুড়িকে জানায় খালাম্মা শুঁটকি মাছের পেটের মধ্যে ডিম আছে। তখন উনার শাশুড়ি বলেছিলেন ঠিক আছে, কোন ব্যাপার না তোমার রাখো আমি পরে দেখছি কি করতে হবে। কিন্তু এর মধ্যে একটা মজার ব্যাপার ঘটে কেউ একজন শুটকি মাছ গুলো পানির মধ্যে ছেড়ে দেয়। উনার শাশুড়ি হইচই শুরু করেন কে করেছে একাজ। যে এই কাজটা করেছিলেন তার ব্যাখ্যা হল মাছের পেটে ডিম আছে, তাই পানির মধ্যে দিয়ে দিয়েছি ডিম ছেড়ে দেবে। কয়েস ভাই বললেন ভাবি জানেন কে এই ব্যক্তি আমার বউ। একথা বলে কয়েস ভাই একটু কৃত্রিম আক্ষেপ করলেন আমার কপাল।

কয়েস ভাই আক্ষেপের কোন কারণ নেই দেখবেন আপনার এই আনাড়ি গৃহিণীই একদিন সুগৃহিনী হয়ে উঠেছে। আমার স্লোভাকিয়ান বউ যখন পোলাও মুরগি রান্না করতে পারে, তখন আপনার চিন্তার কোনই কারণ নেই এর নিশ্চয়তা আমি মোটামুটি দিতে পারি। মেয়েরা শেখে খুব দ্রুত।

জার্মানিতে ডিমওয়ালা মাছ ধরা পড়ার কোন সুযোগ ছিল না। এখানে যারা মাছ ধরে তাদের কে লাইসেন্স নিতে হয়। এই লাইসেন্স পাওয়া বেশ কঠিন মাছ সম্বন্ধে কয়েকশ প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিয়ে তাদের এই লাইসেন্স নিতে হয়। কোন মাছ কোন সময় ডিম দেয় ইত্যাদি বিষয়ে জানা আবশ্যক। তারপরও কারো যদি লাইসেন্স থাকে ডাঙায় দাঁড়িয়ে পানি থেকে মাছ ধরার, তাহলে সে নৌকায় বসে অর্থাৎ পানির উপর অবস্থান করে পানি থেকে মাছ ধরতে পারবেনা। এটা করতে হলে তাকে আলাদা লাইসেন্স নিতে হবে।

কয়েস ভাইকে কিছুটা ক্লান্ত দেখাচ্ছিল, ওনার রাত জাগার তেমন অভ্যাস নেই বলেই মনে হল। তবে ঘুমাতে যাওয়ার আগে উনি জিজ্ঞাসা করছিলেন পরের দিন আবহাওয়া কেমন থাকবে, তুষারপাতের সম্ভাবনা আছে কিনা? কারণ উনি কখনো তুষারপাত দেখেননি স্পেনের বার্সেলোনাতে তুষারপাত হয় না।

টেবিলে প্রচুর খাবার সাজানো ছিল, খান ভাই মাঝেমাঝেই আমাকে তাগাদা দিচ্ছিলেন কিছু খাবার জন্য। অনুষ্ঠানের ওখানে আমি প্রচুর খেয়েছিলাম খিদে ছিলনা। রাতে সাধারণত আমি কফি পান করিনা। কিন্তু এদিন এক কাপ কফি নিলাম রাত জাগতে হবে তাছাড়া সবার সঙ্গে বসে এক কাপ কফি উপভোগ করার মজাই আলাদা। আমাদের সঙ্গে ছিলেন আজহার হোসাইন যিনি জার্মান আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি। উনি ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে উপস্থিত থেকে বঙ্গবন্ধুর ভাষণটা শুনেছিলেন। উনার সাথে এই ভাষণের বিভিন্ন দিক নিয়ে কথা হল। কথা কথায় আরও অনেক না জানা তথ্য বেরিয়ে এলো। উনি জানালেন বঙ্গবন্ধু রেসকোর্স ময়দানের ঘোড়দৌড় জুয়া বন্ধ করার জন্য কাদের সাহায্য নিয়েছিলেন।

মহসিন ভাই ঘুমাতে যাওয়ার আগে জানালা খুলে আমাকে ভালো করে রাস্তাটা দেখিয়ে দিলেন, কোন দিক দিয়ে রেল স্টেশনে যেতে হবে। খান ভাইয়ের বাসা থেকে রেল স্টেশনের দূরত্ব খুব বেশি না ৭/৮ মিনিটের রাস্তা। এইদিন ইউনুছ আলী খান সাহেবের কোন আনুষ্ঠানিক সাক্ষাৎকার আমি নিতে পারিনি। টেলিফোনে অত রাত্রেও দীর্ঘ সময় ব্যস্ত ছিলেন। তবে ওনার সাথে সাংগঠনিক ব্যাপারে কিছু কথা হয়েছিল।

আমার তো ট্রেন ছিল সকাল ৫ টা ১২ মিনিটে। আমি খান ভাইয়ের বাসা থেকে সাড়ে চারটার দিকে স্টেশনের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। তার আগে খান ভাই কে বললাম ভাই আমি একটা কমলা নিয়ে যাচ্ছি। এই কথা শুনে উনি রান্না ঘরে চলে গেলেন। যেয়ে একটা প্যাকেট এর মধ্যে বেশ কিছু ফল আর খাবার প্যাকেট করে আমার ব্যাগে ঢুকিয়ে দিলেন। যা আমি দুবার ঠিকমত খেয়ে শেষ করতে পারবো না। মাইনস থেকে আমার শহর ট্রেনে ঘণ্টা তিনেকের রাস্তা খুব বেশী দূরেও না।

বিদায় নেবার আগে খান ভাই আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন লীপু যাতায়াতের ভাড়ার টাকাটা কি আমি দিতে পারি কত খরচ হয়েছে তোমার? আমি বললাম যে আমি বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনের অনুষ্ঠানে এসে আপনার কাছ থেকে টাকা নেব এটা কেমনে ভাবলেন? যারা জেগে ছিলেন তাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে মাইনস প্রধান রেলস্টেশনের দিকে রওনা দিলাম। খান ভাই আমাকে করুন মুখে লিফট পর্যন্ত পৌঁছে দিলেন। তারপর আবারও আমাকে বললেন তুমি টাকাটা নিলে আমি খুশি হতাম। উত্তরে আমি উনাকে বললাম আপনি আমাকে প্রশ্নটা আর একবার না করলে আমিও খুশি হব। এরপর আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বিদায় দিলেন। জার্মানিতে আমার আত্মীয় স্বজন বলতে কেউ নেই, না আমার পক্ষের না বৌয়ের পক্ষের। কেউ কোনদিন এভাবে বিদায় দেয়নি, একটু না বেশ আবেগপ্রবণ হয়ে গিয়েছিলাম তবে তার বহিঃপ্রকাশ ঘটতে দিইনি।

বাইরে বেরিয়ে দেখি অভূতপূর্ব সুন্দর দৃশ্য তুষারপাত হচ্ছে। তুলার মত তুষার বাতাসে উড়ছিল তখন বারবার শুধু কয়েস ভাইয়ের কথা মনে পড়ছিল। কোনভাবেই আমি উনার চিন্তাটা মাথা থেকে সরিয়ে রাখতে পারছিলাম না। যে বেচারা কোনদিন তুষারপাত দেখেননি ওইদিনই ওনার সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল, সম্পর্কও এত গভীর না। যদি পূর্ব পরিচিত হতেন তাহলে আমি ঠিকই ফোন করে বলতাম যে, বেরিয়ে পড়েন দেখেন প্রকৃতি কেমন অপরূপ সাজে সাজছে। আমার কাছে একটা ছাতা ছিল সেটার ব্যবহার করতে ভুলিনি তা নাহলে তুষার কণা চোখে আঘাত করে। আর যখন বেশি ঠাণ্ডা থাকে না কিন্তু তুষারপাত হয়, সাধারণত তুষার গলে জামাকাপড় ভিজে যায়। এই কারণে আমি ছাতাটা খুলে স্টেশনের দিকে হাটতে থাকলাম। কিছুক্ষণের মধ্যে স্টেশনে পৌঁছে একজনকে জিজ্ঞাসা করলাম যে চার নম্বর প্লাটফর্ম কোনদিকে হবে? সে আমাকে জানালো আমিও ঐই ট্রেনের যাত্রী এখন ঠাণ্ডা বাইরে এখানে অপেক্ষা করেন ট্রেনের সময় হলে যাওয়া যাবে। ভদ্রলোকের সঙ্গে পরিচয় হয়ে গেল তবে তার সঙ্গ বেশিক্ষণ পায়নি। ফ্রাঙ্কফুর্ট পৌঁছে তার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ৮ নম্বর প্লাটফর্ম থেকে ৭ নম্বর প্লাটফর্মে যেয়ে নুরেনবার্গের ট্রেনটা ধরলাম। রোববার অত সকালে সাধারণত ট্রেনে কোন ভিড় থাকে না বিধায় আমি কোন নির্দিষ্ট আসন সংরক্ষণ করে রাখিনি। ট্রেনটা প্রায় ফাঁকা ছিল। শুধুমাত্র একটা জিনিস দেখে নিলাম যে ঐ আসনটা নুরেনবার্গ পর্যন্ত কারোর জন্য সংরক্ষিত কিনা।
এই ফ্লাইওভারের নীচে আমাদের ট্রেনটা থেমে ছিল

একসময় ঝড়ের গতিতে ইন্টার সিটি এক্সপ্রেস ট্রেনটা চলা শুরু করলো। প্রায় ২৪ ঘণ্টা না ঘুমিয়ে থাকার কারণে নুরেনবার্গের ট্রেনে ওঠার পর একটু ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম। কিছুক্ষণ পর অনুভব করলাম ট্রেনটা থেমে আছে চোখ খুলে দেখি একটা ফ্লাইওভারের নিচে ট্রেনটা দাঁড়িয়ে আছে। লক্ষ করলাম অন্যান্য যাত্রীরা এদিক ওদিক তাকাচ্ছে কি ব্যাপার কি হল। কিছুক্ষণ পর ট্রেন কর্তৃপক্ষ ঘোষণা করল লাইনের সমস্যার কারণে ট্রেন বিলম্ব করছে। তবে রক্ষণাবেক্ষণকারী দল সেখানে পৌঁছে গেছে কিছুক্ষণের মধ্যেই মেরামতের কাজ শেষ হলে ট্রেন যাত্রা শুরু করবে। তারপর ট্রেন কর্তৃপক্ষ ঘোষণা করল সকল যাত্রী খাবার গাড়ি থেকে বিনামূল্যে মাদক মুক্ত পানীয় সংগ্রহ করতে পারে। “বাঙালি নাকি মাগনা পেলে আলকাতরা খাই” জার্মানরাও বিনা পয়সায় কিছু পেলে ছাড়ে না।

অগত্যা আমিও উঠে গেলাম একটু খোঁজখবর নিয়ে আসি আর পানি নিয়ে আসি। পানির সঙ্গে এক কাপ কফিও দিয়ে দিল। খাবার গাড়ির আগের কামরাটা ছিল ট্রেনের পরিচালকের আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম কি ব্যাপার আমরা কোথায় আটকে আছি এবং কেন? সে আমাকে জানালো কোন জায়গায় আমরা আটকে আছি, এবং কি কি সমস্যা হয়েছে সেটা ছবি এঁকে আমাকে দেখাল। ছবিটা আমি এখানে সংযোজন করে দিলাম। কফি পানি নিয়ে আমি আবার আমার আসনে ফিরে এলাম। আমার পাশের আসনে একজন দক্ষিণ আমেরিকান ছিল সে আমাকে জিজ্ঞাসা করল কি সমস্যা কি হয়েছে? কারণ ও জার্মান বোঝে না ইংলিশও বোঝে না। আমি স্প্যানিশ বুঝি না। কিন্তু বর্তমান বিশ্বে জানেন গুগল ট্রানসিলেটরের কারণে কোন অসুবিধায় হয়নি।

ওর স্প্যানিশ ইংলিশে ভাষান্তর করে নিলাম আর আমি যখন ওকে ইংলিশে বললাম ওটার স্প্যানিশ করে সমস্যার সমাধান করা গেল। প্রথমদিকে ট্রেন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল আধাঘণ্টার মধ্যে সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে কিন্তু ৫০মিনিট পার হওয়ার পরেও ট্রেন ছাড়ছিল না। পরে জানালো যেসব কর্মীরা ওখানে কাজ করছে ওরা জানিয়েছে আরও কিছুটা দেরি হবে। কিন্তু শেষমেশ তারা দ্রুত সমস্যার সমাধান করতে পারেনি। ইতিমধ্যেই বেশ খানিক দেরি হয়ে গেছে প্রায় দেড় ঘণ্টার উপরে। এরপর কর্তৃপক্ষ জানালো এই লাইন দিয়ে যাওয়া আর সম্ভব হবে না অতএব এখন পিছন দিকে ফিরে যাবে পরবর্তী স্টেশন পর্যন্ত। ট্রেন আস্তে আস্তে যাওয়া শুরু করলো পিছের দিকে। তখন কর্তৃপক্ষ আবারও ঘোষণা করল আপনারা ধৈর্য হারাবেন ট্রেন যখন পিছনের দিকে যাবে তখন ধীরগতিতেই যাবে। যদিও একটু বেশি সময় লাগবে কিন্তু সব রকম দুর্ঘটনা এড়ানোর জন্য এর বিকল্প আমাদের কাছে কিছু নেই। যদি হঠাৎ করে এই লাইনে কোন ট্রেন চলে আসে সেক্ষেত্রে যাতে সহজেই গাড়ি থামিয়ে ফেলা যায় এই কারণেই ট্রেন ধীর গতিতে যাবে পরবর্তী ষ্টেশন পর্যন্ত।

ট্রেন পিছিয়ে যে ষ্টেশনে আসলো তার নাম লোহর(Lohr)। ট্রেনটা যখন পিছনের দিকে যাচ্ছিল তখন ঘুমের কারণে যে মনোরম দৃশ্যগুলো থেকে বঞ্চিত হয়েছিলাম তা আবার দেখতে পেলাম। ট্রেন ধীরে চলছিল বিধায় ছবি তুলতেও কোন অসুবিধা হচ্ছিল না। তুষারে সব সাদা হয়ে আছে, বসেছিলাম ট্রেনে কিন্তু তখন আমার মন চলে গিয়েছিল ফ্রাঙ্কফুর্ট পেরিয়ে মাইনসের একটা অ্যাপার্টমেন্টে যেখানে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের কিছু সৈনিক অবস্থান করছিলেন। এদের মধ্যে অধিকাংশই হয়তো তখনো ঘুমিয়ে ছিলেন, তবে কয়েস ভাই বলেছিলেন উনি সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে পড়েন। উনার কথা আবারও মনে হচ্ছিল যে উনি কি তুষারপাত দেখতে পাচ্ছেন?

ুশহরের মধ্যে থেকে সাধারণত তুষারপাত প্রকৃতির অপরূপ দৃশ্যগুলো সেইভাবে উপভোগ করা যায় না। এসব উপভোগ করতে হলে, দেখতে হলে না বাইরে বেরিয়ে আসা খুবই জরুরী। দেশে যখন ছিলাম তখনও গ্রাম দেখেছি নির্দ্বিধায় মানুষের সঙ্গে মাঠের মধ্যে ঢালার উপরে বসে গেছি। সেই সময়ে আমি এইসব খুঁটিনাটি ব্যাপারগুলোকে খুব আগ্রহসহকারে কাছ থেকে অনুভব করেছি, উপভোগ করেছি, প্রকৃতির সঙ্গে মিশে যাবার চেষ্টা করেছি। একদিন আমার নানাবাড়ি গেলাম দেখলাম একজন জমিতে নাঙল দিচ্ছেন। আমি তার কাছ থেকে নাঙলটা নিয়ে আমি শুরু করে দিলাম। আমার নানাতো চেঁচামেচি শুরু করে দিলেন গরুর পায়ে ফাল লাগবে ও এসব পারবে না। না এ জাতীয় কোনো দুর্ঘটনার সেদিন ছিল না আমি খুব ভালোভাবেই কিছুটা সময় লাঙ্গল চালিয়েছিল জমিতে। পরে নানাকে বললাম আমার দাদু কৃষক ছিলেন আমার নানাও কৃষক অতএব রক্তের মধ্যে এটা-তো আছে, এই কারণে কোনদিন না করলেও আজকে সেটা করে দেখাতে পারলাম কোন দুর্ঘটনা ছাড়াই।

যে জায়গায় আমাদের ট্রেনটা আটকে ছিল ওই জায়গার নাম লোহর আম মাইন (Lohr am Main), ফাঙ্কফুর্ট থেকে ৯০কিলোমিটার আর বুজবুর্গ থেকে ৪৩.৫ কিলোমিটার দূরে। ওখানে একটা সুইচ-ট্রাকে সমস্যা হয়েছিল। ট্রেন যখন পিছু হাঁটছিল তখন ট্রেন কর্তৃপক্ষ প্রত্যেক যাত্রীকে একটা করে ফরম এবং খাম দিয়ে গেল, যেখানে লেখা ছিল ট্রেন দুই ঘণ্টার উপরে বিলম্বে চলছে। যাত্রী সকলকে অনুরোধ করা হল ফর্মটা পূরণ করে খামে ভরে পাঠিয়ে দেওয়ার জন্য এবং এটা পাঠাতে কোন ডাকটিকেটের প্রয়োজন হবে না। আমি বাসায় ফিরে কয়েকদিন পর ফরম পূরণ করে পাঠিয়ে দিলাম, এর কিছুদিন পর আমার একাউন্টে ক্ষতিপূরণ হিসেবে টিকেটের ৫০% অর্থ ফেরত পাঠিয়ে দিল জার্মান রেল কর্তৃপক্ষ।

সেদিন প্রায় ৩ ঘণ্টা দেরিতে নুরেনবার্গ পৌঁছেছিলাম। আমার নুরেনবার্গ পৌঁছানোর কথা ছিল ৭টা ৫৯মিনিটে কিন্তু আমি পৌঁছেছিলাম ১০টা ৫০এর দিকে। বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশন এর সভাপতি আমাকে নির্দেশ দিয়েছিলেন নুরেমবার্গে বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশন এর একটা শাখা গঠন করার জন্য। কমপক্ষে সাতজন সদস্য জোগাড় করার দায়িত্ব ছিল আমার উপর। আমি আমার পরিচিতজনদের সঙ্গে কথা বলে ১৬ জন সদস্যের নামের তালিকা আমাকে প্রদত্ত সময়ের আগেই জনাব সহ-সভাপতির কাছে লিখিতভাবে পাঠিয়ে দিয়েছি। কোন দলীয় কাজে যদি সদস্য জোগাড় করতে যেতাম আমাকে হয়ত বেগ পেতে হতো কিন্তু যখনই বঙ্গবন্ধুর কথা বলেছি শুধুমাত্র দুজন ছাড়াও কারো কাছ থেকে বিমুখ হয়নি। প্রত্যেকেই অত্যন্ত আগ্রহ সহকারে এই বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশন এর সঙ্গে কাজ করার জন্য একাত্মতা পোষণ করেছেন।

যে দুজন অপারগতা জানিয়েছেন এদের মধ্যে একজন ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতায় আসে তখন নুরেনবার্গ আওয়ামী লীগের যে কমিটি হয়েছিল সেই কমিটির সহ-সভাপতি ছিলেন। কিন্তু উনি সে ব্যাপারটা অস্বীকার করলেন এবং বললেন আমি তো কোন সময় রাজনীতি করি না, রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জড়িত ছিলাম না। আমি মনে করিয়ে দিয়েছিলাম আপনি নুরেনবার্গ আওয়ামী লীগের যে কমিটির সহ-সভাপতি ছিলেন আমি সে কমিটির যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক ছিলাম তখনই চুপ থাকলেন। যাহোক এরকম একজন মিথ্যুকের সঙ্গে আমার আর কথা বাড়াতে ভাল লাগেনি যে, বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশন কোন রাজনৈতিক সংগঠন না।

১১টার দিকে বাসায় ফিরে বউ-বাচ্চাকে বাসায় পেলাম না তারা বেরিয়ে পড়েছিল। একটুখানি চেষ্টা করেছিলাম কিন্তু ঘুম আসেনি, তখন মাথার মধ্যে ছিল মেজর জলিল। যা হোক ইন্টারনেটে খুঁজে সব তথ্য বের করে তারপর কিছুটা শান্ত হয়েছিলাম।

বিছানায় শুয়ে কিছুটা অলস সময় কাটাচ্ছিলাম কিছুক্ষণ পর আমার বাচ্চাটা ফিরে আসলো। বাবা ঘুমাচ্ছে মনে করে চুপচাপ ছিল কিন্তু আমি তাকে চমকে দিয়ে বিছানা ছেড়ে তার পাওনা কড়ি বুঝিয়ে দিলাম। ওই যে আপনাদের বলেছিলাম, রেল স্টেশনে পৌঁছে হালকা কিছু কেনাকাটা করেছিলাম। সেগুলোর অধিকাংশই ছিল তার জন্য। ট্রেন কর্তৃপক্ষ যে পানির বোতলটা দিয়েছিল সেটা দেখে বলল, বাবা আমি কি এটা পেতে পারি? আমি বললাম, অবশ্যই বাবার কোন জিনিস জিজ্ঞাসা করার দরকার নেই, তুমি নিতে পার।

আমার এই সফরটা ছিল চমৎকার প্রশান্তিতে ভরপুর, সামান্য কিছু মিশ্র অভিজ্ঞতা ছাড়া। ধন্যবাদ বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশনের শ্রদ্ধেয় সভাপতি জনাব মোহাম্মদ ইউনুস আলী খানকে যে, উনার বদান্যতায় আমি সেখানে নিমন্ত্রিত ছিলাম এবং সুযোগ পেয়েছিলাম এত জ্ঞানী-গুনি ব্যক্তিদের সঙ্গে পরিচিত হবার। আমি আন্তরিকভাবে কামনা করি উনার নেতৃত্বে জার্মানির বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশন উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি লাভ করবে।