ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

বঙ্গবন্ধুকে এক বিদেশি সাংবাদিক জিজ্ঞাসা করেছিলেন মাননীয় রাষ্ট্রপতি আপনার যোগ্যতা কী? বঙ্গবন্ধু উত্তর দিয়েছিলেন, “আমি আমার জনগণকে ভালবাসি।”

তারপর সাংবাদিক উনাকে আবার প্রশ্ন করেন আপনার অযোগ্যতা কী? বঙ্গবন্ধুর উত্তর ছিল, “আমি আমার জনগণকে খুব বেশি ভালবাসি।”

নিজের সম্বন্ধে এমন সরল ও নির্ভেজাল মন্তব্য খুব কম মানুষই করতে পারে। কুচক্রীরা বঙ্গবন্ধুর এই দুর্বলতা জানতো এবং এটাকে পুঁজি করেই তারা বঙ্গবন্ধুকে হত্যার ছক তৈরি করতে সক্ষম হয়।

তখন রাষ্ট্রপতি হিসেবে বঙ্গবন্ধুর নিরাপত্তা কর্মকর্তা কর্নেল জামিলও তাঁকে সতর্ক করেছিলেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধু এ ব্যাপারে উদাসীন ছিলেন। তার ধারনা ছিল বাঙালি তাকে মারতে পারেনা।

১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট সপরিবারে খুন হওয়ার কয়েক মাস আগে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের ওপর গ্রেনেড হামলা করা হয়েছিল।

‘৭৫ এর ২১শে মে সন্ধ্যায় সেই হামলা থেকে সুস্থ অবস্থায় বেঁচে গিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। উইকিলিকস থেকে ফাঁস হওয়া কিছু মার্কিন তারবার্তা থেকে জানা যায় এসব তথ্য। ভারতের অন্যতম প্রভাবশালী গণমাধ্যম দ্য হিন্দু এ নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে ২০১৩ সালে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে হত্যা ষড়যন্ত্রের বিষয়ে অনেক আগেই সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন তৎকালীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ও কিউবার রাষ্ট্রপতি ফিদেল ক্যাস্ট্রো। বাংলাদেশের ভেতর ও বাইরে বঙ্গবন্ধুকে সরিয়ে দেয়ার চক্রান্ত চলছে বলে তারা দুজনেই একাধিক বার বার্তা দিয়েছিলেন।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ঐতিহাসিক বন্ধন গড়ে উঠে। সে সময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর মধ্যেও গভীর বন্ধুত্ব হয়। বঙ্গবন্ধু নিহতের অনেক আগেই ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তের খবর জানিয়ে তাকে সতর্ক করেছিলেন।

বিশেষ করে ১৯৭৪ সালের মে মাসে ৫ দিন ভারত সফরে বঙ্গবন্ধুকে সতর্ক করা হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ড নিয়ে ভারতের প্রখ্যাত সাংবাদিক এ এল খতিবের ‘হু কিলড মুজিব’ বইয়ে ইন্দিরা গান্ধীর সতর্কবার্তার বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। তিনি লিখেছেন, ইন্দিরা গান্ধী খুব স্পষ্ট ভাষায় শেখ মুজিবকে একাধিক বার জানিয়েছিলেন, তার (বঙ্গবন্ধুর) বিরুদ্ধে একটি চক্রান্ত চলছে কিন্তু উনি এই সতর্কবার্তা গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নেননি।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার সুদূর পরিকল্পনা করতে খুনি খন্দকার মোশতাক আহমেদ ১৯৭৫ সালের জুন মাসে একবার লন্ডন সফরে গিয়ে গোপন বৈঠক করে ‘৭১-এর ঘাতক-কুলের শিরোমনি গোলাম আযমের সঙ্গে। এ বৈঠকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ১৫ আগস্ট প্রথম প্রহরে হত্যার ডেটলাইন নিয়েও আলোচনা হয় খন্দকার মোশতাক আহমেদ ও গোলাম আযমের মধ্যে।

১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের সময় জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির গোলাম আযমের নাগরিকত্ব বঙ্গবন্ধু সরকার বাতিল করে দেয়ায় সে তখন পাকিস্তান ও সৌদি আরব হয়ে প্রায়ই লন্ডন সফরে যেত তার তথাকথিত-‘পূর্ব পাকিস্তান পুনরুদ্ধার কমিটির জন্য তহবিল সংগ্রহ করতে। ১৯৭৫-এর জুন মাসে গোলাম আযম লন্ডনে অবস্থানের সময় তৎকালীন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার মোশতাক আহমেদ তার অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কাজ বাদ দিয়ে লন্ডন সফরের নামে আসলে সেখানে যান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার মুহূর্ত চূড়ান্ত করতে।

বঙ্গবন্ধু ক্ষমতায় থাকলে স্বার্থগত দিক দিয়ে সবথেকে ক্ষতিগ্রস্ত হত সামরিক বাহিনী বিশেষ করে স্বাধীনতার পর যেসব সেনাকর্মকর্তারা ফেরত এসেছিল তারা। কারণ উনি পিপলস আর্মির কথা বলেছিলেন। এই কারণেই কিছু বিপথগামী সেনাকর্মকর্তার উপর দোষ চাপিয়ে আংশিক একটা বিচার হলেও সচেতন জনগণকে ধোঁকা দেওয়া যাবে না।

বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় বিপ্লবের কারণে স্বার্থগতভাবে আরও যারা ক্ষতিগ্রস্ত  হতে পারতো তারা হল আমালা, উকিল, বিচারপতি, সুবিধাবাদী রাজনীতিবিদ, অসৎ-অতি মুনাফা লোভী ব্যবসায়ি, ও সংবাদপত্রের মালিক তথা সাংবাদিক।

বঙ্গবন্ধু প্রশাসনের বিকেন্দ্রীকরণ এবং জননেতাদের অন্তর্ভুক্তি চেয়েছিলেন প্রশাসনে। এবং ফাইল টানার পিয়নসহ অনেক অনাবশ্যক সুবিধা বৃহত্তর জনকল্যাণে বন্ধ করতে চেয়েছিলেন। যা এই কাল কেউটেদের সহ্য হয়নি।

বঙ্গবন্ধু মামলা জট শেষ করতে চেয়েছিলেন এজন্যও বিশেষ কিছু ব্যবস্থা নিয়ে ভেবেছিলেন। থানা পর্যায়ে আদালত, গ্রামীণ সালিশি বোর্ড। যাতে কম মামলা হয়। মানুষের মধ্যে সৌহার্দ্য বজায় রেখে আদালতের বাইরে ঝামেলার নিষ্পত্তি করা যায়। মামলা কমলে উকিল বিচারপতি উভয়েরই আয় কমবে। এসব ব্যাপারগুলো বিচারপতি এবং উকিলেরা ভাল চোখে দেখেনি তাদের স্বার্থ হারাবার ভয়ে। তখনকার সময়ের বড় এক উকিল শেষের দিকে মন্ত্রী সভায় যোগ দিতে গড়িমসি এবং বঙ্গবন্ধু হত্যার পর বিভিন্ন কার্যকলাপ কিছুটা সন্দেহের উদ্রেক করে।

বঙ্গবন্ধু যেদিন কম্বল চুরির কথা বললেন সেদিন সুবিধাবাদী রাজনীতিবিদরাও নড়েচড়ে বসেছিল যে উনি করছেন কী? এতদিন কষ্ট করলাম আমরা এখন একটু আয়েশ করবো আর উনি কি না আমাদের চুরির কথা ফাঁস করে দিচ্ছেন। বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রীসভার ২১ সদস্য খন্দকার মোশতাকের মন্ত্রীসভায় যোগ দিয়েছিল যাদের অধিকাংশই রাজনীতিবিদ ছিল। এবং এরা যে সুবিধাবাদী রাজনীতিবিদ ছিল তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

অনেক বড় বড় শিল্প কারখানা বঙ্গবন্ধু জাতীয়করণ করেছিলেন এ কারণে খেপেছিল অসৎ-অতি মুনাফা লোভী এই ব্যবসায়ীরা।

অস্ট্রেলিয়া আমাদের চেয়ে অনেক বড় দেশ ও সম্পদশালী সেখানে দৈনিক খবরের কাগজের সংখ্যা মাত্র চারটা। বঙ্গবন্ধু বুঝেছিলেন যে আমাদের দেশে এত খবরের কাগজের কোনও দরকার নেই।  তাই সংবাদপত্র কমিয়ে আনতে চেয়েছিলেন।

সেক্ষেত্রে সাংবাদিক ও সংবাদ পত্রের মালিকরাও খেপেছিল। বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রীসভার সদস্য সংবাদ পত্রের মালিক ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন মন্ত্রীসভা থেকে পদত্যাগ করেছিল। ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন বঙ্গবন্ধুর খুনিরা যখন প্রগশ নামে রাজনৈতিক দল গঠন করে তখন তাদের সাথে ছিল।

মুহাম্মদ আতাউল গনি ওসমানীও মন্ত্রীসভা থেকে পদত্যাগ করেছিল। রাষ্ট্রপতি মোশতাকের প্রতিরক্ষা-বিষয়ক উপদেষ্টা হয়েছিল মন্ত্রীর সমমর্যাদায়। তৎকালীন সেনাবাহিনী প্রধান সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসেনি। বিমান বাহিনী প্রধানও নিশ্চুপ ছিল। নৌবাহিনীও কোনও ভূমিকা রাখেনি।

বঙ্গবন্ধু হত্যা ছিল একটা বৃহৎ চক্রের সম্মিলিত চেষ্টার ফল। যে চক্রে সবরকম পেশার কর্ণধার ও সুযোগ সন্ধানী অধস্তনরাও জড়িত ছিল।  বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুতে যারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে লাভবান হয়েছে তাদের মিলিত একটা চক্রান্ত ও পরিকল্পনা এই হত্যাকাণ্ডের ফল।

তাদের দ্বিতীয় পরিকল্পনা ছিল বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে ধূলিসাৎ করা একারণে তারা জেলে চার জাতীয় নেতাকে হত্যা করে। যাতে বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে কেউ তার আদর্শ বাস্তবায়ন না করতে পারে। কয়েকজন বিপথগামী সেনাসদস্যের পক্ষে এমন একটা ষড়যন্ত্র করে বাস্তবায়ন সম্ভব না।

আর আন্তর্জাতিক চক্র ও পরাজিত পাকিস্তান তো ছিলই জাতির পিতা হত্যার পিছনে। ইজরাইল বঙ্গবন্ধুর উপর ক্ষ্যাপা ছিল কারণ বঙ্গবন্ধুর তাদের প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছিলেন। মোশতাক বঙ্গবন্ধুকে বলেছিল ইজরাইল আমাদেরকে স্বীকৃতি দেবে বিনিময়ে কূটনৈতিক সম্পর্ক। সেক্ষেত্রে ইজরাইল বঙ্গবন্ধু হত্যায় জড়িত থাকতে পারে।

চীন স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় এবং পরে বন্ধুর ভূমিকা নেয়নি। যুক্তরাষ্ট্রও না। আর জার্মানিতে জন্ম গ্রহণকারী ইহুদি হেনরি কিসিঞ্জার তো লেগেই ছিল বঙ্গবন্ধু সরকারের পিছনে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের রূপরেখার কারণে।

বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুতে সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়েছে জিয়া, তারপর সাত্তার এবং এরশাদ। এছাড়া মওদুদ আহমেদও কারণ তার রাজনীতিতে নিষেধাজ্ঞা ছিল। বিমানবাহিনী প্রধান এ কে খন্দকার জিয়াও এরশাদের কাছ থেকে সুবিধা নিয়েছিলেন এবং বর্তমানে তার অবস্থান প্রমাণ করে এরা এই চক্রান্তের সাথে জড়িত ছিল।

এরশাদ আগা গোড়া পাকিস্তান পন্থী। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মুক্তিযুদ্ধ শুরুর সময় এরশাদ ছুটিতে রংপুর ছিল। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ না করে তিনি পাকিস্তান চলে যান। পাকিস্তান থেকে আটকে পড়া বাঙালিরা যখন ১৯৭৩ সালে দেশে ফিরে আসতে শুরু করে তখন তিনিও ফেরেন।

পাকিস্তান থেকে দেশে ফেরার পর ১৯৭৩ সালে তাকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে অ্যাডজুটান্ট জেনারেল হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। ১২ ডিসেম্বর ১৯৭৩ সালে কর্নেল ও ১৯৭৫ সালের জুন মাসে সেনাবাহিনীতে ব্রিগেডিয়ার পদে পদোন্নতি পায়।

১৯৭৫ সালের ২৪ অগাস্ট ভারতে প্রশিক্ষণরত অবস্থায় মেজর জেনারেল হিসেবে পদোন্নতি পায় ও উপ সেনাপ্রধান হিসেবে নিয়োগ পায়। ১৫ অগাস্ট সামরিক অভ্যুত্থানের পর এরশাদ বাংলাদেশের দিল্লি মিশনের মাধ্যমে দেশে ফেরার আকাঙ্ক্ষা জানিয়ে বার্তা পাঠায়।

জিয়ারও মুক্তিযুদ্ধে প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা। সেটা আরও দৃঢ়ভাবে প্রমাণ করে মুক্তিযুদ্ধের সময় জিয়াকে লেখা কর্নেল বেগের চিঠি। এছাড়াও বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনি কর্নেল ফারুক এন্থনি মাসকারেনহাসের সাথে এক সাক্ষাতকারে বলেছেন, ১৯৭৫ এর ২০শে মার্চ তিনি জিয়াকে হত্যার পরিকল্পনা জানিয়েছিলেন। জিয়া তাকে এগিয়ে যাবার জন্য বলেন।

বঙ্গবন্ধু যদি জনগণকে খুব বেশি ভাল না বেসে শুধু ভালবাসতেন তাহলে হয়তো উনার হত্যা এড়িয়ে যাওয়া যেত।  সেই সঙ্গে তিনি যদি জিয়া ও এরশাদসহ পাকিস্তান ফেরতদের সেনাবাহিনীতে পুনর্বহাল না করতেন, তাহলে আমরা অসময়ে অভিভাবকহীন হতাম না।

সরকারের উচিত জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্বের সমন্বয়ে একটা উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন কমিটি গঠন করে এই চক্রান্তের সাথে জড়িতদের মুখোশ উন্মোচন করা। সত্য নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার জন্য এর বিকল্প নেই।

আর নতুন প্রজন্ম যদি সত্য জানতে পারে তা হলেই ভবিষ্যৎ চক্রান্ত রুখে দিতে পারবে। তা না হলে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটতে থাকবে। কারণ চক্রান্তকারীরা সাহসী হবে এই কারণে যে, এসব করে তো পার পাওয়া যায়।

তথ্যসূত্র:
(১) জনকন্ঠ ১৫ই আগস্ট ২০১৭
(২) তথ্যসূত্রঃ ভোরের ডাক ৪ঠা আগস্ট ২০১৬