ক্যাটেগরিঃ ফিচার পোস্ট আর্কাইভ, স্বাধিকার চেতনা

নাসার আহমেদ চৌধুরী ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষণটা রেকর্ড করেছিলেন পাকিস্তানি বাহিনীর সকল নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে। ধারণ করা এই ভাষণ পরদিন ঢাকা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচার করা হয়েছিল। আর তখনই দেশবাসী বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার আহ্বানসহ  সকল নির্দেশাবলী জানতে পেরেছিল।

আজ এত বছর পরও আমরা সেই ভাষণ শুনে অনুপ্রাণিত হই। মুগ্ধ হই বঙ্গবন্ধুর চমৎকার বাকশৈলীতে। এখনও প্রতি ৭ই মার্চে  বাংলার আনাচে-কানাচে প্রতিবছর এই ভাষণ অত্যন্ত উৎসাহ-উদ্দীপনার সঙ্গে বাজানো হয়।

১৯৭১ এর ৮ই মার্চ এই ভাষণ বেজেছিল রেডিওতে। নাসার আহমেদ চৌধুরীর দুঃসাহসিক উদ্যোগে সেদিন দেশবাসী আর সারাবিশ্ব বঙ্গবন্ধুর গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ শোনা থেকে বঞ্চিত হয়নি।

তবে পাকিস্তানি বাহিনীর চোখে বড় ধরনের অপরাধ করেছিলেন তিনি। সেসময় তার জীবনে ছিল উচ্চমাত্রায় ঝুঁকি।

প্রথম যেদিন নাসার আহমেদ চৌধুরীর সঙ্গে কথা বলি উত্তেজনায় প্রায় কাঁপছিলাম। কিন্তু বিভিন্ন তথ্য জানার ক্ষেত্রে কোনো সময়ই আমি উনাকে ছাড় দিয়ে কথা বলিনি।

পত্রিকায় পড়েছিলাম  উনি দুটি টেপে ভাষণ রেকর্ড করেন। তারপর জামার মধ্যে লুকিয়ে ফেলেন টেপ দুটো। তখনই আমার মনে প্রশ্ন জেগেছিল,  উনি কি সেদিন যথেষ্ট পেশাদারিত্বের সঙ্গে কাজ করেননি? কেন উনাকে দুইটা টেপ ব্যবহার করতে হয়েছিল? একটা টেপে এটা রেকর্ড করেননি কেন?

উনি জানিয়েছিলেন যে উহার মেশিনের টেপে যে স্পুল ব্যবহার করা হত এগুলো তখন ১৫ মিনিটের বেশি ছিল না। এই কারণে উনি দুটো নতুন টেপ নিয়ে গিয়েছিলেন। একটা টেপ শেষ হয়ে গেলে খুব দ্রুততম সময়ে আর একটা টেপ পরিবর্তন করেছিলেন।

এতে উনি কিছু সেকেন্ড সময় নিয়েছিলেন মাত্র। উনি টেপ পরিবর্তন করতে সেদিন সময় ব্যয় করেছিলেন মাত্র ২৪ সেকেন্ডের মত। অতএব উনার সেখানে যথেষ্ট প্রস্তুতি ছিল। যথেষ্ট সতর্কতা এবং পেশাদারিত্বের সঙ্গে কাজ করেছেন তিনি।

তবে উনি উল্লেখ করেছেন, যদি সেদিন বেতারের প্রকৌশল বিভাগ ভাষণ রেকর্ড করত তাহলে তাদেরকে টেপ পরিবর্তন করতে হত না। তারা যে টেপ ব্যবহার করত সেগুলোতে দীর্ঘ সময় ধরে রেকর্ড করা সম্ভব ছিল।

নাসার আহমেদ চৌধুরী ১৯৬৮ সাল থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত রেডিওতে কাজ করেন। তারপর যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী হন। বর্তমানে ৭৩ বছর বয়সেও উনাকে প্রতিদিন কাজ করতে হয়। ইউরোপের কোনো দেশে হলে উনার এখন অবসর জীবনযাপন করার কথা।

আমাদের জন্য এটা খুবই লজ্জার যে এইরকম একজন গুণী মানুষ, একজন জাতীয় বীরকে এই বয়সে পরিশ্রম করতে হচ্ছে। অথচ মুক্তিযুদ্ধে, স্বাধীনতা সংগ্রামে তার ভূমিকা, অবদান অতুলনীয়। এত সাহসিকতাপূর্ণ ভূমিকা খুব কম মানুষই রেখেছেন।

দেশে অনেক রাজাকার ও অমুক্তিযোদ্ধা এখন মুক্তিযোদ্ধার সনদ নিয়ে ঘোরে; তার বেশ কিছু প্রমাণ আমার কাছেই আছে। আমার এলাকাতেই এ জাতীয় ঘটনা ঘটেছে। আমার কিছু পরিচিত এবং ঘনিষ্ঠরাও এসব কুকর্মের সাথে জড়িত।

অথচ নাসার আহমেদ চৌধুরীর মত একজন মানুষ মুক্তিযোদ্ধার সনদ পান না। যদিও বঙ্গবন্ধু সরকার সে সময় উনাকে মুক্তিযোদ্ধা বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন। উনার কাছে একটা তাৎক্ষণিকভাবে দেওয়া সনদ আছে। স্বাধীনতা পর মুজিব সরকারের পক্ষ থেকে বেতার কর্মচারীদের মুক্তিযোদ্ধার মর্যাদা দেওয়া নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনসহ পত্রিকাটিও রয়েছে উনার সংগ্রহে।

ঐতিহাসিক ওই ভাষণের দিন ঢাকা বেতারও সবরকম প্রস্তুতি নিয়ে গিয়েছিল। যদিও প্রকৌশল বিভাগ সেদিন সেনাবাহিনীর নিষেধাজ্ঞার কারণে কাজ করতে পারেনি। কিন্তু যদি সেনাবাহিনীর নিষেধাজ্ঞা না আসতো তাহলে প্রকৌশল বিভাগও ভাষণটা ধারণ করত এবং সেক্ষেত্রে যে অংশটুকু সেদিন ঢাকা বেতার ধারণ করতে পারিনি সেটা বাদ যেত না। স্বাধীনতার পক্ষে ঢাকা বেতার যে ভূমিকা রেখেছিল তার জন্য অবশ্যই এই প্রতিষ্ঠান প্রশংসার দাবি রাখে।

যারা ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে ভাষণ ধারণের সঙ্গে জড়িত ছিলেন তাদের মধ্যে শুধুমাত্র একজন এ পর্যন্ত সরকার থেকে পুরস্কৃত হয়েছেন; তাও মরণোত্তর। উনি হলেন প্রয়াত রাজনীতিবিদ জনাব মোহাম্মদ আবুল খায়ের। এছাড়া সরকার ১৯৯৮ সাল থেকে এ পর্যন্ত পাঁচটা প্রতিষ্ঠানসহ মোট ৮৪ জনকে স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধে অবদান রাখার জন্য স্বাধীনতা পুরস্কার দিয়েছে। এরমধ্যে এক ব্যক্তির পুরস্কার সরকার প্রত্যাহার করে নিয়েছে।

বাংলাদেশ বেতার ২০০৬ সালে এই পুরস্কার পেয়েছে। যারা এই পুরষ্কার পেয়েছে তাদের যোগ্যতা নিয়ে আমি কোনো প্রশ্ন তুলছি না এবং প্রশ্ন তোলা অবান্তর। তবে একটা প্রশ্ন আমি হাজার বার তুলছি তা হল নাসার আহমেদ চৌধুরীকে কেন তার অসামান্য অবদান স্বত্বেও এখন পর্যন্ত এই পুরস্কারের জন্য মনোনীত করা হয়নি?

নাসার আহমেদ চৌধুরীর পরিবারের লোকজনও স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি। উনার চাচা হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী ১৯৯৬ সালে জাতীয় সংসদের স্পিকার ছিলেন এবং ২০১৮ সালে মরণোত্তর এই পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।

কোন মাপকাঠিতে যোগ্যতা নির্ণয় করা হয় আমার তা জানা নেই। তবে যারা মুক্তিযুদ্ধে এবং স্বাধীনতায় অবদান রেখেছে জীবদ্দশায় তাদেরকে পুরস্কৃত করা উচিত। যে মানুষটা দেশের জন্য, জাতির জন্য এত কিছু করেছেন, জীবদ্দশায় যদি তারা এটা দেখে যান তাহলে তারা অনেক খুশি মনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে পারেন।

এই ভাষণের ভিডিও সংরক্ষণে যে ব্যক্তি সবচেয়ে সাহসিকতাপূর্ণ অবদান রেখেছেন তিনি হলেন তৎকালীন সময়ের সহকারী ক্যামেরাম্যান জনাব আমজাদ আলী খন্দকার। বর্তমানে তাকে হুইল চেয়ারে চলাফেরা করতে হয়, উনার দেহের একদিক অসাড়। উনার অবদান নিয়ে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন মাধ্যমে প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে। আমজাদ আলী খন্দকারের উপর বিবিসিও প্রতিবেদন তৈরি করেছে।

বঙ্গবন্ধুর সাতই মার্চের ভাষণকে আমরা জাতীয় পর্যায়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে থাকি। এই ভাষণ ছাড়া আমাদের স্বাধীনতা আসতো না। এটা এখন শুধু জাতীয় পর্যায়ে সীমাবদ্ধ না বরং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করেছে। এটা এখন শুধু বাংলাদেশের স্বাধীনতার গুরুত্ব বহন করে না বরং সারা বিশ্বের নিপীড়িত মানুষের মুক্তির বার্তা বহন করে। সেই জন্যই আজ আন্তর্জাতিকভাবে এই ভাষণ স্বীকৃত।

তাই এই  ভাষণ ধারণ-প্রচার এবং সংরক্ষণে যারা ভূমিকা রেখেছে তারা আমাদের দেশের সম্মানিত বীরযোদ্ধা, তাদের প্রত্যেককেই আমাদের মূল্যায়ন করা উচিত।

অতএব সরকারের কাছে বিনীত অনুরোধ রাখব, যারা সেদিন এই ভাষণের জন্য অবদান রেখেছেন তাদের প্রত্যেককে স্বীকৃতি দেওয়া এবং সম্মানিত করা। আর সরকারের উচিত মরণোত্তর পদক দেওয়ার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে জীবিত অবস্থায় গুণীদের কর্মের মূল্যায়ন করা।

 

মন্তব্য ১ পঠিত