ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

আমার প্রাইমারি স্কুল এবং কলেজ জীবন ছিল যাযাবরের মত হলেও উচ্চ বিদ্যালয়ের পাঁচ বছর আমি একই স্কুলে পড়েছি। সেটাকে আমি আমার সৌভাগ্য বলেই মনে করি কারণ এই বিদ্যালয়েই আমি আমার জীবনের সেরা শিক্ষক  আফিল উদ্দিনের সহচার্য পেয়েছি। আমাদের সময় আলমডাঙ্গা বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ে  সাধারণত একজন শিক্ষক একটা বিশেষ বিষয়েই পড়াতেন। ব্যতিক্রম ছিলেন আফিল স্যার। তিনি দুইটা বিভাগের আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব পালন করেছেন; রসায়ন আর কৃষি বিজ্ঞান।

আমার এই বিদ্যালয়ের শিক্ষা জীবনে তিনজন প্রধান শিক্ষক পেয়েছিলাম। তারা প্রত্যেকে স্যারকে বলতেন অষ্টধাতুর মাদুলি। এর অর্থ, উনি ছিলেন সর্বগুণে গুণান্বিত। তিনি শুধু নিজের বিষয় না, বিজ্ঞান বিভাগের যে কোনো বিষয় উনি চোখ বুঁজে শেখাতে পারতেন। ভূগোলও চমৎকার শেখাতেন। আমি উনার কাছে বাংলা ব্যাকরণও শিখেছি। যে বিষয়ের পাঠ্যক্রমের শিক্ষা আমি তার কাছে থেকে নিইনি তা হল ইসলাম ধর্ম। কিন্তু তিনি আমাকে নীতি শিক্ষা দিয়েছেন ঠিকই।

সব বিষয়ে স্যারের পারদর্শিতা নিয়ে তার এক সময়ের শিক্ষার্থী হামিদুল আজম বলেন, “আফিল স্যার আমার একজন প্রিয় শিক্ষক ছিলেন। উনি বিজ্ঞানের শিক্ষক ছিলেন, কিন্তু সব ছাত্রদের বিজ্ঞানসহ সাবলীল ভাবে ইংরেজি, অংক, বাংলা সবই পড়াতে পারতেন। শুধু পারতেন বললে ভুল হবে, পারদর্শী ছিলেন।

“উনি শিক্ষক হিসেবে বিনয়ী, ভদ্র, মার্জিত, পুঁথিগত বিদ্যার বাইরে উনি একজন জ্ঞান ভাণ্ডার ছিলেন। উনি সাংবাদিকতাও করেছেন, একটি জাতীয় ইংরেজি দৈনিকে। সর্বোপরি একজন সত্যিকারের ভাল শিক্ষক বলতে যা বোঝায় উনার মধ্যে তার সব গুণই ছিল। মানুষ মাত্রই, দোষে-গুণে; হয়ত কোনো ক্ষেত্রে উনি সফল, কোনো ক্ষেত্রে উনি বিফল হোতেই পারেন, কিন্তু উনার শিক্ষকতা জীবনে উনি একজন সফল শিক্ষক। উনার অসংখ্য লেখা বিভিন্ন পত্রিকা, ম্যাগাজিনসহ লিটল ম্যাগ, জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত হয়েছে।”

তার কাছে থেকে যে নীতি শিক্ষা পেয়েছি আজও মনে রেখেছি। আমি তাকে বিমুখ করিনি, আশা রাখি করবোও না। আমি উনার আরও দুজন ছাত্রের কথা বলতে পারি যারা উনার কাছ নীতি শিক্ষা পেয়েছেন। দুজনই চিকিৎসক; একজন রওনক তুহিন, আরেকজন প্রখ্যাত হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক রিজওয়ানুল হক বুলবুল।

বুলবুল ভাইকে অস্ত্রোপচার করতে নূন্যতম নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থ নিয়ে থাকেন। কারণ তাকে চিকিৎসা নীতি মেনেই তার সহকারীদের সম্মানী দিতে হয়, উনি তাদেরকে ঠকাতে পারেন না। তারপরও বুলবুল ভাই আমার আব্বার অস্ত্রোপচারের ক্ষেত্রে পুরোপুরি খরচ নেননি। এ নিয়ে আমি আমার বন্ধু এনামুলের কাছে উষ্মা প্রকাশ করেছিলাম যে উনার এ জাতীয় সুবিধা আব্বাকে দেওয়ার দরকার নেই।

রওনক তুহিন চিকিৎসা ছাড়াও রাজনৈতিক বিষয়ে বিশ্লেষণ করে থাকেন। ব্যক্তিজীবনে তিনি সৎ এবং সাহসী। উনার সাথে আমার চমৎকার সম্পর্ক। হয়ত কোনো কোনো জায়গায় আমাদের মতের পার্থক্য আছে কিন্তু কোনো বিরোধ নেই। এটা সম্ভব হয়েছে আমরা সঠিক সময়ে উপযুক্ত নীতি শিক্ষা, কূটনৈতিক শিষ্টাচারের শিক্ষা আমাদের মহাগুরু  আফিল উদ্দিনের কাছ থেকে পেয়েছি। স্যারের ছাত্ররা স্ব স্ব ক্ষেত্রে সততা এবং যোগ্যতার সাথে কাজ করছে, যারা তার উপদেশ গ্রহণ করেছে।

চিকিৎসক হিসাবে উপরের দুজন যোগ্য। আমি এখনও স্যারের মুখ উজ্জ্বল করতে পারিনি ।  তবে বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশনের গঠনতন্ত্র  বিশ্লেষণে কাজ করছি আমি; যা বড় বড় পণ্ডিতরা মিলে করেছেন। সেখানে কলম ঢোকাতে জার্মানির অন্য নেতারা সাহস করবে না কারণ নীতির দিক থেকে তারা শক্ত ভিত্তির উপর নেই। আমি এটা পেরেছি; কারণ আমার নীতির ভীতটা তৈরি করে দিয়েছেন আমার প্রিয় শিক্ষক। উনি জানতেন কার কোন দিকে আগ্রহ, কাকে দিয়ে কী হবে। তাই সবাইকে উনি ডাক্তার বা প্রকৌশলী হতে উৎসাহিত করেননি।

যখন একজন প্রফেসর হয়ে যান তখন জার্মানিসহ ইউরোপের অন্যান্য দেশগুলোতে আর ডাক্তার বা ডক্টর লেখা হয় না। কারণ একজন অধ্যাপক এসবের ঊর্ধ্বে। আইনগত ভাবেও এটা এখানে ঠিক না। ইউরোপে একে  হাস্যকর মনে করা হয়। বাংলাদেশে কেন এটা করা হয় অহরহ?

প্রশ্নটা তুহিন ভাইকে করেছিলাম। উত্তরে তিনি বললেন, “আমাদের বসবাস হতভাগ্য দেশে। যেখানে চিকিৎসা পেশার একজন অধ্যাপককে শুধু অধ্যাপক বললে মানুষ ভেবে বসতে পারে, তিনি বাংলা সাহিত্য বা ইতিহাসের অধ্যাপক। যা অনেক ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি করতে পারে। কারণ বাংলাদেশ যে এখনো জার্মানি হয়নি।”

স্যার ইংলিশে ছিলেন বিশেষের চেয়েও বিশেষভাবে পারদর্শী। কি গ্রামার আর কি সাহিত্য! আমি যখন নবম শ্রেণিতে তখন একদিন আমাকে বললেন,  “তুমি তো একটা ইংরাজি দৈনিক রাখতে পার।”

সেই সময় স্যার নিয়মিত দ্য নিউ নেশনে লিখতেন। যতদূর মনে পড়ে উনি তখন আলমডাঙ্গার প্রতিনিধি ছিলেন ওই পত্রিকার। আব্বাকে বললাম, স্যার বলেছেন একটা ইংরেজি পত্রিকা রাখতে।

এর তৃতীয় দিনের মাথায় দ্য নিউ নেশন পেতে থাকলাম। আফিল সাহেব বলেছেন, এটাই আব্বার কাছে যথেষ্ট ছিল। তাছাড়া আব্বাও আমাকে ইংলিশ ভাল করে শেখার জন্য উৎসাহিত করতেন সব সময়। তাই স্যারের এই উপদেশ আব্বাও আনন্দের সাথে নিয়েছিলেন।

স্যার কিছু বললে বাড়িতে সাত খুন মাপ হয়ে যেত। তবে আমি কখনও  স্যারের নাম ভাঙ্গিয়ে কোনো বিশেষ সুবিধা মা-বাবার কাছ থেকে নিইনি।

শুধু যে পত্রিকা নিয়েই শেষ তা না; পত্রিকায় কী পড়লাম তা নিয়ে আলোচনা করতে হত তার সাথে। উনি আমাদের ইংলিশ পত্রিকায় লিখতে উৎসাহিত করতেন। তখন কুষ্টিয়া থেকে দ্য বাংলাদেশ রিভিউ নামে একটা ইংরেজি সাপ্তাহিক পত্রিকা বের হত সেখানে আমাকে লেখার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। আমার প্রথম রিপোর্ট ছিল,  ‘ম্যাঙ্গো গ্রোভস আন্ডার ইনসেক্ট অ্যাটাক’ শিরোনামে। এখন এমন দেশে এসে পড়েছি জার্মানটাও শেখা হল না, আর চর্চার অভাবে ইংলিশও হজম হয়ে গেছে।

স্যারে নিয়ে অধ্যাপক রিজওয়ানুল হক বুলবুল বললেন, “উনি বৃত্তের বাইরে গিয়ে চিন্তা করতে পারতেন। ডেইলি অবজারভার পেপার পড়া দিয়ে আমাদের ইংরেজি পড়া শুরু হত। শুধু পড়া নয় ঐ পত্রিকায় লেখার জন্যও তিনি উদ্বুদ্ধ করেছেন আমাদেরকে। নির্মোহ একজন ব্যক্তি যিনি নিজের দৃষ্টি ভঙ্গিকে নিরপেক্ষ রাখতে পেরেছিলেন।”
স্যারের শেখানো ধরন কখনও  একঘেয়েমি ছিল না।  যে ছাত্রকে যেভাবে বোঝানো যাবে সেই রাস্তাটায় প্রয়োগ করতেন। আমি সর্বদা আনন্দের সাথে উনার কাছ থেকে শিখেছি। আমার প্রশ্নবাণে স্যার কোনদিনও বিরক্ত হননি। সব প্রশ্নের তিনি উত্তর দিয়েছেন এবং তা ব্যাখ্যা করেছেন।

কাপড় সাবান দিয়ে কাচলে পরিষ্কার হয় সবাই জানে কিন্তু কেন হয় সেটা তিনি ব্যাখ্যা করেছেন। সেখানে কী ধরনের ভৌত পরিবর্তন বা রাসায়নিক পরিবর্তন হয়েছে সেটা জানিয়েছেন।  আমাকে এসব এত বেশি আকৃষ্ট করতো যে আমি একা বাড়ি বসে পড়তেই পারতাম না। আমি যখন দশম শ্রেণির ছাত্র তখন কয়েক মাস স্যারের কাছে দু’বেলা পড়তাম। এটাও একটা ব্যতিক্রমের মধ্যে পড়ে কারণ অনেক ছাত্র স্যারের কাছে একবেলা পড়ার সুযোগই পায়নি, সেখানে আমি দুই বেলা!

স্যারকে যখন বললাম আমি দু’বেলা আসতে চাই তখন তিনি প্রশ্ন করলেন, দু’বেলা কেন? আমি বললাম, আমি বাসায় একা একা বসে পড়তে পছন্দ করি না। কারণ তাৎক্ষণিকভাবে যখন আমার মাথায় কোনো প্রশ্ন আসে উত্তর না পেলে অস্থির থাকি। তাছাড়া  আমার আরেকজন গৃহশিক্ষক আছেন রাতে তিনি অংক শেখান। বাকি অতগুলো বিষয় একবেলা পড়ে শেষ করা সম্ভব না। আর ইংলিশ বা বাংলাও আমি আপনার কাছে শিখি।

আমি তখন নাছোড়বান্দা হয়ে গিয়েছিলাম। তাই স্যার আমাকে না করতে পারেননি। সেই সময়ে তিনি আমার সাধারণ জ্ঞানের ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করতে সর্বোচ্চ অবদান রেখেছেন।

স্যারকে নিয়ে রওনক তুহিনের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ মূল্যায়ন আমার কাছে ভাল লেগেছে। রওনক তুহিনের মতে,  স্যার একজন সাদা মনের মানুষ; উনি আমাদের শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাই দেননি, জীবনঘনিষ্ঠ অনেক শিক্ষা আমরা উনার কাছে থেকে পেয়েছি; আর শিক্ষক হিসেবে তিনি ছিলেন অনেক অনেক উঁচুমানের, যিনি শুধু তার নিজের বিষয়েই আমাদেরকে শিক্ষা দেননি, অগাধ পড়ালেখা থাকার সুবাদে তিনি অন্যান্য বিষয়ের সমস্যাগুলোর সমাধান করে দিতেন যা এ যুগে খুবই বিরল।

এই তিন বিষয়ই আফিল স্যারের প্রতি আজীবন শ্রদ্ধা থাকার জন্য যথেষ্ট কারণ বলে আমি মনে করি, রওনক তুহিন বললেন।

স্যারের প্রাক্তন ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে আমার যাদের সাথে যোগাযোগ আছে তাদের সবাইকে একটা বিশেষ প্রশ্ন করেছিলাম –  আপনি আফিল স্যারের ছাত্র ছিলেন। ধারনা করি, উনি আপনার প্রিয় শিক্ষকদের একজন বা আপনার প্রিয় শিক্ষক। যদি বলেন কেন উনি আপনার প্রিয়, তার কোন বিষয়গুলো আপনাকে আকৃষ্ট করতো?

এই প্রশ্নের উত্তরেই তার ছাত্র-ছাত্রীরা যে সব মন্তব্য করেছেন তা আমি  তুলে ধরেছি এই লেখায়।

সহকর্মীদের সাথে ছিল তার চমৎকার সম্পর্ক। বিদ্যালয়ের প্রত্যেক শিক্ষক তাকে সমীহ করে চলতেন। এমনকি আমাদের সময়কালীন সকল প্রধান শিক্ষকও তাকে বিশেষ সম্মানের সাথে বিবেচনা করতেন। স্যারকে যেমন তার সহকর্মীরা বিশেষ মর্যাদার আসনে রেখেছিলেন উনিও তেমন প্রত্যেককে সম্মান করতেন। অহমিকা উনার মধ্যে আমরা দেখিনি।

একবার একটা অংক নিয়ে সমস্যা হয়েছিল। আমি অংকটা একভাবে করেছিলাম, কিন্তু তখনকার সময়ে আমাদের সপ্তম শ্রেণিতে যে শিক্ষক অংক করাতেন তিনি বললেন, এটা ভুল। আমি সোজা আফিল স্যারের কাছে চলে গেলাম অফিসে। তিনি দেখলেন তারপর আমাদের উচ্চ শ্রেণিতে নিয়মিত যে শিক্ষক অংক করাতেন আবুল স্যার তার সাথে দ্রুত পরামর্শ করে নিয়ে বললেন, তুমি ঠিকই করেছ, এটা ভুল না। ভুল হবে কেমন করে? এ অংক তো আমি তার কাছেই শিখেছি।

আফিল স্যার বললেন, তুমি চুপচাপ শ্রেণিকক্ষে ফিরে যাও। স্বাভাবিক কাজকর্ম করো। কোনো আলোচনা বা সমালোচনা না। আমরা দুজনে উনাকে বলে দেব।

সেই বয়সে হয়তো আমি হাজারো জায়গায় ওই কথা প্রচার করতে পারতাম, তাতে উনার সহকর্মীর সম্মানহানি হত সেটা তিনি বিবেচনা করে আমাকে করণীয় বলে দিলেন।

কোনো ছাত্রের বিশেষ কোনো ব্যাপারে জ্ঞান থাকলে সেটাকে তিনি মূল্যায়ন করতেন। তাকে দিয়ে সে কাজটা করাতেন বা পরামর্শ করতেন। আলমডাঙ্গার তরকারির বাজারের মাঝে ঠিক আমাদের বাড়ির সামনে একটা খোলা নর্দমা ছিল। স্যার সেটা নিয়ে লিখবেন। এজন্য ছবি তোলা দরকার, স্যারের কাছে ক্যামেরা ছিল কিন্তু আমাকে বাসা থেকে ডাকিয়ে বললেন, তুমি ছবি তোলো ভাল, ছবিটা তুলে দাও। স্যারের এই রিপোর্টটা বেরুনোর পর সেই সময়ের থানা নির্বাহী কর্মকর্তা  (সম্ভবত সৈয়দ আব্দুল মালেক) স্যারকে অনুরোধ করে বলেছিলেন,  “আফিল সাহেব, এই রিপোর্টগুলো করবেন না, আমাদের চাপ আসে উপর থেকে। যথেষ্ট বরাদ্দ নেই যে কাজগুলো আমরা হাতে নেব।” এরপর স্যার বদান্যতা দেখিয়ে অন্য বিষয় নিয়ে লিখেছেন। আলমডাঙ্গার ইতিহাস নিয়ে লিখেছেন।

স্যারের আরেক ছাত্র বুলবুল আহমেদ ফেইসবুকে আমাদের আলমডাঙ্গা পাতার সম্ভবত প্রধান হর্তাকর্তা।

তিনি বলেন, “সাদা মনের অসম্ভব ভাল মানুষটির সান্নিধ্য পেয়েছি। আমার কাছে তিনি শিক্ষক হিসাবে যতটা প্রিয়, তার থেকে বেশি একজন ভাল মানুষ হিসাবে। আমার দৃষ্টিতে উনি যেমন একজন ভাল শিক্ষক তেমনই একজন সাদা মনের মানুষ। স্যারের লেখার হাত অনেক ভাল, আলমডাঙ্গার কিছু কিছু ইতিহাস নিয়ে ওনার লেখা আছে।”

স্যার তার বাড়িতে কোনো এক জায়গায় একটা অংশ সাদা রং  করতে চেয়েছিলেন কিন্তু কীভাবে সেটা সম্ভব আমাদের জিজ্ঞাসা করলেন। আমরা এ ব্যাপারে তাকে কোনো পরামর্শ সেদিন দিতে পারিনি। এখন অবশ্য এ ব্যাপারে আমার যথেষ্ট ধারণা আছে। তবে ওই সময় স্যার আমাকে উদ্দেশ্য করে বললেন,  “তোমার আব্বা এ ব্যাপারে বলতে পারবেন। উনার ইমারত নির্মাণে যথেষ্ট অভিজ্ঞতা আছে।”

তিনি আমার কাছে জেনে নিলেন আব্বা কখন বাসায় থাকেন।  তিনি মানুষকে মূল্যায়ন করতেন তো বটেই, অভিভাবকের সম্মানটা বুঝতেন ভালভাবে। কোনো অভিভাবককে নিজের কাছে ডেকে পাঠাতেন না।

স্যার আমাদের খুব প্রিয় শিক্ষক হলেও আমরা তার প্রিয় ছাত্র কি না জানিনা। তবে দুই সৌভাগ্যবান ব্যক্তি যে উনার খুব প্রিয় ছাত্র তা আমি জানি। এদের প্রথম জন হলেন সামুদ্রিক প্রকৌশলী পরবর্তীতে কম্পিউটার বিজ্ঞানি আমার বন্ধুর ভাই  আবুল বাসার। বাসার ভাইকে স্যার ‘বসর’ বলতেন। দ্বিতীয় সৌভাগ্যবান ব্যক্তি হচ্ছেন হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক রিজওয়ানুল হক বুলবুল।

স্যার আমাকে  মমতাজুল বলে ডাকতেন। এখনও নাকি ওই নামেই আমাকে মনে রেখেছেন। আমার বড় বোন আমাকে সে রকমই বলেছেন। কয়েকদিন আগে আমার বড় বোন স্যারকে হাসপাতালে দেখতে যান। তখন তিনি ওই নামেই আমার কথা বলেছেন।  আমার যে ফুফু আমার এই নামটা দিয়েছেন তিনিও কোনদিন আমাকে এ নামে ডাকেননি। বিদ্যালয়ের আর শিক্ষকরা আমাকে লীপু নামেই ডাকতেন।

স্যার তার ছাত্রদের অনুপ্রাণিত করতে পারতেন। সব থেকে বড় কথা উনি জানতেন কাকে-কীভাবে বা কী কথায় অনুপ্রাণিত করা যাবে। উনি কখনও রেগে কথা বলতেন না; বলতেন হেসে হেসে। আমরা এক জিনিস একাধিকবার বলার পরও করছি না দেখে একদিন এক নির্লজ্জ মানুষের কাহিনী শোনালেন। সে ব্যক্তি কোনো কিছুতেই অপমান বোধ করতো না। একবার তাকে কেউ একজন স্যান্ডেল দিয়ে মেরেছে। যখন অন্যরা জিজ্ঞাসা করেছে আরে তোকে নাকি স্যান্ডেল দিয়ে মেরেছে? উত্তরে সে বললো, ধুর! স্যান্ডেল কোথায়? ও তো স্পঞ্জের  মার। ওই নির্লজ্জ ব্যক্তির কাছে সেটা স্যান্ডেল ছিল না। এই কথা দিয়ে উনি শুধু বুঝিয়েছিলেন আমরা সে রকম নির্লজ্জ হয়ে গেলাম না কি! এটুকুই আমাদের জন্য যথেষ্ট ছিল।

হারুন-অর-রশিদ স্যারকে নিয়ে বললেন,  “স্যারের অনেক কথার মধ্যে যেটা আজও আমার মনে গেঁথে আছে তাহলো,  আরে তোকে তুই তো চিনিস না, সামান্য কিছু লেখাপড়া করলে তুই অনেক কিছু করতে পারবি। তুই নিয়মিত কিছুটা পড়, তোর মাথাটা সারা জীবন উঁচুতে থাকবে। স্যারের এই কথায় আমাকে ১৯৮৬ সালে আলমডাঙ্গা কলেজ থেকে ডিগ্রিতে মানবিক শাখায় প্রথম হওয়ায় অনুপ্রেরণা যুগিয়েছিল।”

স্যার ছিলেন অত্যন্ত আধুনিক ও আধুনিক প্রযুক্তি প্রিয় মানুষ। যখন বাজারে প্রথম ইলেকট্রনিক ঘড়ি আসলো তিনি একটা কিনলেন আর আমাকে বললেন,  “তুমি তো একটা কিনতে পার। এখানে সময় দেখা যায়, সেকেন্ড পর্যন্ত ঠিক ভাবে।

তখন আমি ঘড়ি পরতাম না। আফিল উদ্দিন স্যার আধুনিক হলেও উনার বাকি শিক্ষকদের অনেকেই সে রকম ছিলেন না। ঘড়ি হাতে দিয়ে আমার অনেক সহপাঠি তাদের টিপ্পনি শুনেছে।

আমি স্যারকে সে কথা জানালে তিনি বললেন, “এটা এমন কোনো জিনিস না যে তুমি কিছু জাহির করছো বা লোক দেখাচ্ছ। ঘড়ি জরুরি সময় জানার জন্য। এটা প্রয়োজনীয়, স্টাইল না।” এরপর আমি ডিজিটাল ঘড়ি কিনেছিলাম। তারপর যতদিন ঘড়ি ব্যবহার করেছি নিজে কিনলে ডিজিটালই কিনেছি।

স্যারের মুষ্টিমেয় কয়েকজন ছাত্রীর একজন মেরিনা আজিজুন নাহার খুকু বললেন, “স্যারের প্রবল মানবতা বোধ, পক্ষপাতহীনতা আমাকে আকৃষ্ট করে। তিনি অত্যন্ত আধুনিক, বিজ্ঞ, স্বল্পভাষী মানুষ । সর্বোপরি ওনাকে কখনো রাগান্বিত হতে দেখিনি আমি। এক সাথে এতগুলো গুণের সমন্বয়ে আরও সব গুণী শিক্ষকদের বলয়ের বাইরে গিয়ে তিনি আমার প্রিয় শিক্ষক হয়ে উঠেছিলেন।”

আলমডাঙ্গা বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় শুধুমাত্র বালকদের বিদ্যালয় না হলেও যেহেতু একটা বালিকা বিদ্যালয় ছিল সেহেতু মেয়েরা এখানে পড়তে আসত না;  কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া। যেহেতু বালিকা বিদ্যালয়ে কৃষিবিজ্ঞান ছিল না, তাই যে সব মেয়েরা কৃষিবিজ্ঞানে আগ্রহী ছিল তারা এখানে পড়তে আসতো।

বিদ্যালয়ে বাইরে স্যার নিজের বাড়িতে কিছু ছাত্র পড়াতেন। এই ছাত্র পড়ানোর ক্ষেত্রে তার কিছু নিয়মনীতি ছিল। একদলে তিনি দশ-বারো জনের বেশি ছাত্র নিতেন না। সবাইকে উনি পড়াতেন না। সেক্ষেত্রে অনেকে হয়ত একটু মনঃক্ষুণ্ণ হয়েছে কিন্তু এর পিছনে যথেষ্ট কারণ ছিল। যে জিনিসটা আমি আগে বুঝতাম না এখন জার্মানিতে আসার পর বুঝতে পেরেছি। জার্মানিতে সাধারণত মেধার-ক্রম অনুযায়ী চার ভাগে ছাত্র-ছাত্রীদের ভাগ করে ফেলা হয় উচ্চ বিদ্যালয়ে। সবচেয়ে ভালো মানের ছাত্রদের জন্য একটি বিদ্যালয়, তারপরের জন্য আরেকটি বিদ্যালয়। এইভাবে চার ভাগে ভাগ করা হয়। কারণ এরা এখানে মনে করে যদি ভালো এবং খারাপ ছাত্র একসঙ্গে থাকে তাহলে দুই পক্ষেরই সমস্যা। আর একজন শিক্ষকের পক্ষেও শেখানো কঠিন হয়ে ওঠে।

উনার বাড়িতে আমরা যখন পড়তাম সেখানে কোনো টেবিল, বেঞ্চ বা চেয়ার ছিল না। খেজুরের পাটি ছিল আমরা মাটিতে বিছিয়ে বসে যেতাম। স্যার মাঝামাঝি জায়গায় বসতেন যাতে সবাইকে দেখতে পান। আমাদের সময় নবম শ্রেণিতে আমাদের বিভাগে ৭০ জনের উপরে ছাত্র ছিল। উপরের নিয়ম রক্ষা করে প্রত্যেক ছাত্রকে কোচিং দেবার সুযোগ তার ছিল না। তিনি অর্থলোভী ছিলেন না। আর নীতি আদর্শে ছিলেন অবিচল। অর্থ উপার্জন করতে আগ্রহী হলে সেই সময়ে তিনি আরও  দু-চারটা বাড়ি করতে পারতেন, লাখ টাকা কামাতে পারতেন। উনার কাছে কেউ কোচিং করুক বা না করুক প্রত্যেকই তিনি সমান চোখে দেখতেন। এ নিয়ে তাদের ব্যবহারিক পরীক্ষার নম্বরে কোনো সমস্যা হত না। কিন্তু অন্য শিক্ষকদের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা তা ছিল না। সেখানে কিছুটা চাপ ছিল তাদের কাছে কোচিং করার। অথচ স্যারকে দেখেছি অনেক ছাত্রকে বিনা পয়সায় পড়িয়েছেন।

জ্যামিতি যখন উনার কাছে শিখেছি এই বিদ্যার যে একটা ব্যবহারিক প্রয়োগ আছে প্রাত্যহিক জীবনে সেটা তিনি শিখিয়েছিলেন। শিক্ষা শুধু ডিগ্রিধারী হবার জন্য না, সেটা উনি বোঝাতে পেরেছিলেন।

জার্মানিতে যে কোনো ক্ষেত্রেই একজন প্রশিক্ষিত কর্মীর পারিশ্রমিক খুব চড়া এজন্য কিছু কিছু কাজ নিজেই করতে হয়। তা না হলে প্রচুর টাকা গুনতে হয়। আমরা এখন যে বাসায় থাকি এখানে রান্নাঘরের কিছু জিনিস কাঠ দিয়ে আমি নিজে বানিয়েছিলাম। আমি এবং আমার শ্যালক মিলে ঘরের বাকি কাজ করেছিলাম। এ কাজগুলো করতে জ্যামিতিক জ্ঞান অপরিহার্য। আমি একজন প্রশিক্ষিত কর্মিকে ফোন করেছিলাম এ কাজের জন্য কত খরচ হবে জানতে, তিনি জানালেন তার পারিশ্রমিক দেড় হাজার ইউরো এবং সব জিনিসপত্র আমাকে সরবরাহ করতে হবে। সে সময় আমাদের পক্ষে এত টাকা শুধু এ কাজের জন্য দেওয়া সম্ভব ছিল না। আমি শুধুমাত্র কিছু যন্ত্রপাতি কিনেছিলাম ২৫০ ইউরো দিয়ে, যেগুলো এখনও কাজে লাগে। এতে আমাদের খরচ বেচেছিল ১২৫০ ইউরো। যে কাজ আমি করেছি সেটা কোনভাবেই একজন পেশাদার শ্রমিকের চেয়ে কম না। আর নিজে কিছু করতে পারলে আনন্দও আলাদা।

স্যার কারো বাড়ি যেয়ে ব্যক্তিগতভাবে কাউকে পড়াতেন না। তবে একটা ব্যতিক্রম আছে উনি আমার বড় বোনকে বাড়িতে এসে উচ্চ মাধ্যমিকের রসায়ন শাস্ত্র পড়াতেন। আপনারা এখান থেকে ধারনা করতে পারেন কী পরিমাণ জ্ঞান থাকলে একজন মানুষ মাধ্যমিকের শিক্ষক হয়ে উচ্চ মাধ্যমিকের ছাত্রীকে পড়াতেন।

উনার একটা জিনিসের কমতি ছিল সেটা প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রী। তা না হলে উনার জন্য উচ্চ মাধ্যমিকের অংক, পদার্থ বিজ্ঞান বা রসায়ন শাস্ত্র শিক্ষা দেওয়া কোনো ব্যাপারই ছিল না।

তিনি চালচলনের মধ্যে দিয়ে যে ভদ্রতার প্রকাশ করা যায় সেটা সম্বদ্ধেও বলেছেন। সেটাও যে অনুশীলনের মাধ্যমে উচ্চ পর্যায়ে নেওয়া যায় তা শিখিয়েছেন। প্রিন্স চার্লস ও প্রিন্সেস ডায়ানার বিয়ের আগে থেকে ডায়ানাকে যে রাজপরিবারের  আচার শিখতে হয়েছে সে ব্যাপারেও আলোচনা করেছেন আমার বোনের সাথে।

স্যার অসম্ভব কষ্ট সহিঞ্চুও ছিলেন। উনার ছাত্রী মেরিনা আজিজুন নাহার খুকু বলেছেন, “তাঁর গলায় একবার মাছের কাঁটা বিঁধেছিল। এটা যতদূর মনে পড়ে ওনার মামা বাড়িতে যেয়ে ঘটনাটা ঘটেছিল। অনেক চিকিৎসা, ঝাড়ফুঁক কিছুই বাদ যায়নি। আমি নেয়ামুল কোরান থেকে একটা দোয়া স্যারকে শিখাতে চেয়েছিলাম। কারণ ওই ঘটনা আমারও প্রায়ই ঘটতো। এই কথাটা উনি যখন আমাদের বলেন তখন থেকে বিশ বছর বা তারও চেয়ে বেশি আগে ঘটেছিল।  আমাদের এসএসসির আগে বা কাছাকাছি সময়ে সেই কাঁটা জিভের নীচে দিয়ে বের হয়েছিল। সেইদিন আমি ওনাকে দেখতে গিয়েছিলাম।

“পুরো কাঁটাটার গায়ে আয়রনের মত একটা কোট তৈরি হয়েছিল। কাঁটাটা ক্যাপসুলের মত একটা কভারের মধ্যে ছিল। একজন মানুষ কতটা কষ্টসহিষ্ণু হলে এত দীর্ঘদিন এমন কষ্ট সহ্য করতে পারে। আর রিসেন্টলি যে অপারেশন হয়েছে , সেটা যে কত কমপ্লিকেটেড ছিল তা তুহিনের কাছে শুনেছি।”

আমার শিক্ষক আফিল উদ্দিন খুব আধুনিক মানুষ ছিলেন। ঝাড়ফুঁকে উনার বিশ্বাস আছে সেটা আমি মনে করি না এবং বিশ্বাসও করি না। একবার আমার এক আত্মীয় ও সহপাঠী স্কুলে-বাড়িতে অস্বাভাবিক আচরণ করছিল। তখন সবার বদ্ধমূল ধারণা হল তাকে জ্বিনে ধরেছে। সে সময় মাঝে মাঝে সে মেয়েদের সুরে কথা বলত। স্যার আমাকে বলেছিলেন, ওকে তোমরা ঢাকা নিয়ে যেয়ে একজন ভাল নিউরোলজিস্টকে দেখাও।

আপনারা দেখে থাকবেন অনেক চলচ্চিত্রে দেখানো হয়েছে অক্সফোর্ড ও হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা তাদের ছাত্রদের নামের আগে মিস্টার  বলে সম্বোধন করে থাকেন। স্যারের অগাধ পড়াশুনার কারণে ওনার মধ্যেও এই উচ্চমার্গের আভিজাত্য ছিল। তিনি কখনও ছাত্রদের নির্দেশ দিতেন না বরং নরম সুরে কথা বলতেন।

আমার বড় বোন মেরিনা জাবেদ খুকু (বিবাহ পরবর্তী নাম) স্যারকে হাসপাতালে দেখে আসার পর সেদিন ফোনে আমাকে বলছিলেন, আচার-ব্যবহার আমরা পরিবার থেকেই শিখেছি কিন্তু স্যার এগুলো আরও শানিত করেছেন।

উদাহরণ হিসেবে খুকু বললেন, একদিন স্যার যখন তাকে বাসায় শেখাচ্ছিলেন তখন জানালা দিয়ে স্যারের চোখে সূর্যের আলো লাগছিল। তখন তিনি বলেছিলেন, খুকু তুমি কি অনুগ্রহ করে জানালাটা বন্ধ করবে? অন্য কোনো শিক্ষক আমাদেরকে এভাবে কখনও বলেননি। বরং তারা নির্দেশ দিয়ে প্রশান্তি বোধ করতেন।

উনি যেমন কোমল ছিলেন আবার কঠোরও ছিলেন। একবার আমার এক কাজিন  স্যারের বাসায় পড়তে যেয়ে এমন ত্রুটি করেছিল যে স্যার আমাদের দেড় মাস পড়াননি। তবে সে মাসের যে দু’সপ্তাহ পড়িয়েছিলেন তার পয়সাও নেননি।

আজকে একটা কথা না বলে থাকতে পারছি না, ওই মাসের বেতনের টাকা আমি ঠিকই আব্বার কাছে থেকে নিয়ে খরচ করেছি মজা করে। কিন্তু পরের মাসে আর মজা ছিল না। আব্বা আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি আফিল সাহেবের কাছে পড়তে যাচ্ছ না কেন? আমি নিরুত্তর থাকি। বাবা শুধু বললেন, দ্রুত আবার পড়া শুরু কর।

স্যারকে অনুরোধ করলাম, আব্বার কাছ থেকে চাপের মধ্যে আছি। আপনি না পড়ালে খুব সমস্যায় পড়ে যাব। স্যার আমাদের ক্ষমা করেছিলেন, সবাইকেই আবার পড়ার সুযোগ দিয়েছিলেন।

টিভিতে স্যার ইংরেজি সিরিয়াল দেখতেন এবং আমাকে দেখতে উৎসাহিত করতেন। আমি সোমবারে দ্য সিক্স মিলিয়ন ডলার ম্যান কখনও বাদ দিতাম না। আর এ নিয়ে তার সাথে আলোচনা করতে হত কী দেখলাম, কী বুঝলাম ইত্যাদি। স্যার ইংরেজি সিনেপত্রিকাও পড়তেন। যেমন স্টারডাস্ট, ফিল্মফেয়ার। আমি খুলনা থেকে দু’বার স্যারের জন্য ফিল্মফেয়ার নিয়ে এসেছিলাম। প্রথমবার স্যার আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন কত নিয়েছে পত্রিকা। আমি স্যারকে বলেছিলাম, আব্বার কাছ থেকে টাকা নিয়ে কিনেছি। আব্বা জানেন এটা আপনার জন্য কিনেছি টাকা নিতে পারব না স্যার।

আমরা যখন অষ্টম শ্রেণিতে পড়ি তখন আমাদের ক্লাস হত দোতলায়। টিফিন পিরিয়ডে আমরা শ্রেণিকক্ষের বাইরে ছাদের উপর যেদিকে বট গাছটা ছিল ওখানে বসে গানবাজনা করতাম।

আমার ফুফাতো ভাই বদরুদ্দোজা হাবু টেবিল বাজিয়ে চমৎকার গান করত। এই ব্যাপারটা স্কুলের পাশে অগ্রণী ব্যাংকের এক কর্মচারী সোহরাব সাহেবের স্ত্রীর পছন্দ হয়নি। কারণ উনি ব্যাংকের উপরে থাকতেন আর খোলা ছাদে গোসল করতেন। ছাদ তো গোসল করার কোনো জায়গা না। কিন্তু আমরা ভদ্র মহিলাকে উদ্দেশ্য করে গান গাইনি। এরপরও অভিযোগ আসায় আমাদের প্রধান শিক্ষক আফিল স্যারকে পাঠিয়েছিলেন। উনি আমাদের বেশি কিছু বললেন না। শুধু বললেন, এখানে গান করার দরকার নেই। আমরা যেন শ্রেণি কক্ষের মধ্যে থাকি, আর বাইরে কোনো আড্ডার আয়োজন না করি।

আর আমার ফুপাত ভাইকে বললেন, বদরুদ্দোজা, গান যদি করতেই হয় ঠিক মত অনুশীলন কর। সামনে বার্ষিক প্রতিযোগিতা আছে আমি দেখতে চাই যে তুমি সেখানে অংশগ্রহণ করছো। তবে আমার ফুফাতো ভাই আমাদের সম্মান রেখেছিল সংগীতের প্রত্যেকটা বিভাগে সে প্রথম হয়েছিল এবং কোরআন তেলাওয়াতেও প্রথম পুরস্কার পেয়েছিল। ঐদিন আমাদের প্রধান শিক্ষক যদি অন্য কোনো শিক্ষককে পাঠাতেন আমাদের জন্য বেতের বাড়ি অবধারিত ছিল।

আমি পড়াশোনায় একটু ফাঁকিবাজ হলেও প্র্যাকটিক্যালে ভাল ছিলাম।অন্য যে কোনো ছাত্রের চেয়ে প্র্যাকটিকালে আমার পারদর্শিতা ছিল। স্যারও সেটা ভাল করেই জানতেন। আমার তিনটা প্র্যাকটিক্যাল করা বাকি ছিল। এসএসসি পরীক্ষার লিখিত পর্ব শেষ হবার পর  যখন পরীক্ষাগারে ঢুকলাম তখন স্যার ছিলেন না। আমি শুরু করেছি এই সময় স্যার এসে জিজ্ঞাসা করলেন তুমি এখানে কী করছ? জানালাম, তিনটা প্র্যাকটিক্যাল করতে বাকি আছে সেগুলো করব।

স্যার বললেন, “তোমার করা লাগবে না, তুমি যথেষ্ঠ করেছ।” আমাকে বাড়ি পাঠিয়ে দিলেন। আমি হাসতে হাসতে বাড়ি ফিরে আসলাম।

যখন আমরা নবম শ্রেণিতে তখন একবার আমি ব্লাক বোর্ডে রসায়নের কিছু সংকেত লিখে রেখেছিলাম স্যার আসার আগে। সেখানে ডিটুও লেখাছিল। সেই সময়ে বোধহয় আমাদের সেটা জানার কথা না, কারণ এটা পাঠ্য বইয়ে ছিল না।

স্যার আমাদের জিজ্ঞাসা করলেন, এগুলো কে লিখেছে? জানালাম আমি। তখন তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন ডিটুও কীসের প্রতীক জানো? বললাম, হেভি ওয়াটার। স্যার জানতে চাইলেন এটা কোথায় শিখেছি। তখন আমি জানালাম, কথা প্রসঙ্গে স্যারই একদিন বলেছিলেন সেটা আমি মনে রেখেছি।  স্যার খুব খুশি হয়েছিলেন।

স্যার খুঁটিনাটি অনেক বিষয়ই মনে রাখতে পারতেন। আমার চাচাতো ভাই গিয়াস উদ্দিন জোয়ার্দার যখন বুয়েটে পড়তেন তখন বুয়েটের সাময়িকীতে ইংরেজিতে একটা ছোট গল্প লিখেছিলেন। গল্পটার নাম ছিল এ টিয়ার ড্রপ। সেই পত্রিকাটা নিয়ে যখন আমি স্যারকে দিয়েছিলাম তৎক্ষণাৎ গল্পটা পড়ে একটা শব্দ দেখিয়ে বললেন, এই শব্দটা আমি গিয়াসকে শিখিয়েছিলাম, তার চমৎকার প্রয়োগ করেছে এখানে।

অনেকেই স্যার সম্বন্ধে বলতে যেয়ে বলেছেন উনি মানুষ হিসাবে সাদা মনের। কেমন মানুষ সেটা মূল্যায়নের দিকে আমি যাব না। কারণ একজন ভাল শিক্ষক অবশ্যই ভালো মানুষও। আমার কাছে উনি শিক্ষক সারা জীবন তাই থাকবেন। এর বাইরে আমি ভাবার প্রয়োজন মনে করি না এবং প্রয়োজন হবে বলেও মনে হয় না। তবে প্রতিবেশিদের সাথে উনার যে সম্পর্ক তাতে মানুষ হিসাবে উনি যে অত্যন্ত উঁচু মাপের তা দ্বিধাহীনভাবে বলতে পারি।

উনার চেয়ে অনেক বড় ডিগ্রিধারী শিক্ষক আমি পেয়েছি, এদের মধ্যে ডক্টরেট ডিগ্রিধারীও আছেন। কিন্তু আর কারো প্রতি হৃদয়ের টান সেইভাবে অনুভব করিনা উনার জন্য যেটা আছে।

আফিল উদ্দিন স্যার খুবই স্বদেশপ্রেমি মানুষ, দেশের বাইরে তার পক্ষে থাকা দুষ্কর। দেশের বাইরে কেন আলমডাঙ্গার বাইরেই উনি থাকতে পারেন না। উনার শ্যালক উনাকে নিউ ইয়র্ক নিয়ে গিয়েছিলেন স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য। কিন্তু দু’বছর থেকে উনি হাঁপিয়ে উঠেছিলেন। উনার নিউ ইয়র্ক প্রবাসী ছাত্র জগলুল ইসলাম টপি আমাকে সে রকমই জানিয়েছেন।

এই ছাত্রের সৌভাগ্য যে স্যার নিউ ইয়র্কে তার আতিথ্য গ্রহণ করেছিলেন।  স্যার প্রায় দুমাস তার বাসায় ছিলেন।  জগলুল ইসলাম আমাকে জানিয়েছেন, শেষের দিকে স্যার তাকে বলেছিলেন আমি নিঃশ্বাস নিতে পারছি না এখানে।

আফিল উদ্দিন স্যার আলমডাঙ্গার মুকুটহীন সম্রাটের মত। উনার তো আলমডাঙ্গার বাইরে মন টেকার কথা না। উনাকে যারা দেশের বাইরে স্থায়ীভাবে থাকার জন্য নিয়ে গিয়েছিলেন তার আগে ভেবে দেখা উচিত ছিল।

স্যারকে নিয়ে মতামত জানাতেে অনেককেই লিখেছিলাম।এর মধ্যে অপ্রত্যাশিতভাবে ফেইসবুকের ইনবস্কে একজন ভদ্রমহিলা আমাকে লিখেছেন যিনি স্যারের ছাত্রীও না এবং আমি তাকে কোনো প্রশ্নও করিনি।

তিনি আমার খুব ভাল বন্ধুদের একজন। ফাহমিদা পারভীন যা বললেন, “তাকে হাসপাতালে দেখে এসে জাহিদ আমাকে একদিন বললো, স্যার কিছুই খেতে চাচ্ছেন না। অন্য কারো হাতের রান্না খেতে পারছেন না। ছেলেমেয়েরা খাবার আনছে তাও খান না। এখন যেহেতু আমাদের বাসা কাছে তাই সবাই মিলে ঠিক করা হয়েছে যে, চাচী আমাদের বাসায় এসে প্রতিদিন খাবার রান্না করে নিয়ে যাবেন। আমি রাজি হলাম। কিন্তু একটু চিন্তা করে বললাম, চাচীও তো বৃদ্ধা।  তিনি কষ্ট করে প্রতিদিন আসবেন রান্না করতে, এটা কীভাবে সম্ভব। উনিও অসুস্থ হয়ে যাবেন, স্যারকে জিজ্ঞেস কর, আমি একদিন রান্না করে দেই, উনি না খেতে পারলে তখন না হয় চাচী আসবেন।

“আমি ফোনে চাচির সাথে কথা বললাম। চাচী বললেন, ঠিক আছে তুমি খাবার পাঠাও। আর আমার জন্যও ভাল হবে। আমি নিজেও ব্যথার রোগী বিধায় খাবার রান্না করে কাজের মেয়েকে দিয়ে পাঠালাম। শিং মাছ কলা দিয়ে, পেঁপে ভর্তা আর ডাল। একটু পরেই চাচী ফোন করলেন, স্যার নাকি তিন-চার মাস পর তৃপ্তি করে ভাত খেলেন। ভাত খেয়ে বিকালে বিছানা থেকে উঠে বসলেন। আর বারবার আমাকে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছিলেন, বলছিলেন চেনা নেই জানা নেই তাও আমি তাকে রান্না করে পাঠিয়েছি। আমি তিন দিন খাবার পাঠিয়েছি, তিন দিনই উনি খেয়েছেন। আমার খুব ভাল লেগেছে। উনি আলমডাঙ্গা ফিরে গেছেন কিন্তু প্রায়ই চাচী ফোন করেন।”

স্যারে আরেক ছাত্রের মন্তব্য দিয়ে শেষ করবো।  তাহাজ আলীকে প্রশ্ন করেছিলাম, স্যার সম্বন্ধে যদি অল্প কথায় বলেন তার কোন দিকটা আপনাকে আকৃষ্ট করে?

তাহাজ ভাই বললেন, “তার কথা তো বলে শেষ করা যাবে না। তবে একটা দিক শুধু আমি বলবো তার বিবেচনা বোধটা খুব প্রখর। যদি তিনি জানেন যে এই রাস্তা দিয়ে গেলে তার কোনো ছাত্র হয়তো বিপাকে পড়তে পারে সে রাস্তা তিনি এড়িয়ে যান।”

আলমডাঙ্গা উচ্চ বিদ্যালয় যেমন একটা প্রতিষ্ঠান, তেমন নিজের বহুমুখী প্রতিভার কারণে শিক্ষক আফিল উদ্দিন সমান্তরালভাবে নিজেকেও একটা প্রতিষ্ঠানের মর্যদায় উন্নীত করেছিলেন। আমি তাকে ছাড়া আলমডাঙ্গা বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় ভাবতেই পারিনা। প্রাকৃতিক নিয়মে তাকে অবসরে যেতে হয়েছে কিন্তু তাকে ছাড়া আলমডাঙ্গা বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় যে যোগ্যতার মানে পিছিয়ে গেছে তা নির্দ্বিধায় বলতে পারি।

আমার এই শিক্ষাগুরুর সচেতন, তীক্ষ্ণ, সুস্থ দীর্ঘজীবন কামনা করি। শুধু এরকম কয়েকজন শিক্ষকই পারেন একটা সমাজকে আমূল পাল্টে দিতে।

একজন মানুষের দৈহিক গড়ন যে কোনো বিষয় না সেটাও প্রমাণ করেছেন এই প্রজ্ঞাবান শিক্ষক। ব্যক্তিত্ব দিয়ে আর সবকিছু ম্লান করে দেওয়া যায় তিনি তার যোগ্য উদাহরণ।

লাল বাহাদুর শাস্ত্রী ছিলেন খুব ছোটখাট মানুষ কিন্তু সবচেয়ে মানবিক, সৎ এবং প্রজ্ঞাবান প্রধানমন্ত্রী ভারতের ইতিহাসে। তিনি বেঁচে থাকলে শুধু ভারতের না উপমহাদেশের রাজনীতিতে অন্য ধারা প্রবাহিত হত। আমি স্যারের মধ্যে সেই ব্যাপারটা দেখি। শারীরিক গঠনে তিনি শাস্ত্রীর মত কিন্তু ব্যক্তিত্বে পর্বত প্রমাণ। আমরা সৌভাগ্যবান উনি দীর্ঘদিন শিক্ষা দিয়ে আমাদের এলাকাকে সমৃদ্ধ করেছেন। তা না হলে অনেক তারকা অকালে ঝরে যেত।

 

মন্তব্য ০ পঠিত