ক্যাটেগরিঃ প্রশাসনিক

 

সারা পৃথিবীর দেশগুলো চলে এক দিকে আর আমার সোনার বাংলাদেশ চলে ভিন্ন পথে। আমার দেশের মানুষ রং-বৈচিত্রে ভরা। কেউ ইয়া লম্বা, কেউ বা অনেক খাটো; কারো গায়ের রং ধূসর কালো, কেউ বা বিশ্ব সুন্দর সুন্দরী। বিশ্বের অন্য জাতির সাথে কোন মিল নেই আমাদের। চীন-জাপানে দেহের গঠন রং যেমন প্রায় একই, তেমনি পশ্চিমা বিশ্বেরও একই রূপ। পার্থক্য কেবল আমাদের এই উপমহাদেশে ভারত-বাংলাদেশে। এরকম পার্থক্য আছে আমাদের কর্মে, গুণে, পরিচয়ে।

অত্যন্ত বিলাসময় জীবন আমাদের। সরকারি চাকুরির দায়িত্বে থাকা হাজিরা, অতঃপর কোর্টটাকে চেয়ারে রেখে ঘুরি অন্য ধান্দায়, বেতনের বাহিরে অতিরিক্ত ইনকামেও আমরাই সেরা, হোক তা সরকারি কিংবা বেসরকারি সংস্থা, কর্তব্যে ফাঁকি ঘোষের মনোভাব জাতি আর কতদূর এগোবে?

বিশ্ব সেখানে সততা আর কর্মের গুণে পৃথিবীকে বিদায় দিয়ে মঙ্গলের চিন্তায় ব্যস্ত, সেখানে আমরা কেবলমাত্র প্রবেশ, যার কন্ট্রোলে আমরা হিমসিম খাচ্ছি। তবুও আমরা উন্নত পৃথিবীর সাথে পাল্লা দিয়ে আধুনিক বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে সাবমেরিন কেবলের সাথে সংযুক্ত হলাম, যেটাকে আমরা বলি ডিজিটালাইজেশনের যুগে প্রবেশ। কিন্তু বিধি বাম! শুরু হল ডিজিটালাইজেশনের অপব্যবহার। এবার আর শিক্ষকের চোখ ফাঁকি দিয়ে চুরি করে নকল নয়, পরীক্ষার পূর্বেই ফেসবুক, ইমেইল ও বিভিন্ন ডিভাইজের মাধ্যমে পরীক্ষার্থীর নিকট অর্থের বিনিময়ে গোটা প্রশ্নপত্র হাজির। বিভিন্ন গ্রুপ ইন্টারনেটের মাধ্যমে পরীক্ষার আগে প্রশ্নপত্রের জন্য প্রচারণা চালায়। শুধু প্রশ্নপত্র নয় সঠিক উত্তরপত্র সহ পরীক্ষার্থীদের নিকট বিক্রি করা হয়।

অনেকের হয়তো মনে আছে এরশাদের আমলে শিক্ষামন্ত্রী শেখ সেলিমের কথা। তার মন্ত্রী হবার পূর্ব যুগটা ছিলো পরীক্ষায় নকলের ছড়াছড়ি। পরীক্ষার হলে ওপেনে স্যারদের সামনেই বই খুলে উত্তর দেখে দেখে লিখে এসএসসি বা অন্য যে কোন পরীক্ষা দিচ্ছেন পরীক্ষার্থীরা। কারো কোন কিছু বলার নেই, কেউ কোন কিছু বলার সাহসও পান নাই। কেননা সেই যুগটি ছিল সামাজিক রাজনৈতিকভাবে অস্থির। অনেকে পরীক্ষার টেবিলের উপর পিস্তল-ছুরি রেখেও বই দেখে পরীক্ষা দিতো। তার অবসান ঘটে শ্রদ্ধেয় শিক্ষামন্ত্রী শেখ সেলিম সাহেবের কঠোরতার মধ্য দিয়ে। তিনি সামরিক সরকারের দোসর হওয়া সত্ত্বেও সব মহলেই ছিলেন প্রশংসিত।প্রতিটি শিক্ষাঙ্গনে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনেন। ছাত্র রাজনীতি, শিক্ষক নিয়োগে মেধা ও যোগ্যতাকে প্রাধান্য দেওয়া হতো এবং শিক্ষকদের মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় তিনি যে ভূমিকা রেখে গেছেন তা আজও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের এক জন ভাইস চ্যান্সেলর কিংবা সম্মানিত অধ্যাপকের সামনে দাঁড়িয়ে আদেশের সুরে কথা বলবেন এমন কোনো সামরিক, বেসামরিক আমলা, রাজনৈতিক নেতা অথবা মন্ত্রীর বাড়াবাড়ির কথা আমরা এরশাদের আমলে শুনি নাই। তখন পাবলিক পরীক্ষা অথবা ভর্তি পরীক্ষার ফলাফল ঘোষণায় কোন অনিয়ম ও দুর্নীতির কথা কল্পনাও করতে পারিনি। তার পরবর্তীতে বিএনপির আমলে শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী এহছানুল হক মিলন তার ধারাবাহিকতায় শিক্ষা ক্ষেত্রে চিরতরে পবিত্র করে দেন। সেই যে পরীক্ষার্থীরা এবং শিক্ষাঙ্গনে নকল করার সাহস হারালেন আজ পর্যন্ত তা বলবৎ ছিলো।

কিন্তু সম্প্রতি  প্রাথমিক শিক্ষা সমাপণী পরীক্ষা, ৩০তম বিসিএসনিবন্ধণ পরীক্ষা১৭ জেলায় প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র, এমনকি বিভিন্ন চাকরির পরীক্ষার প্রশ্নপত্র পরীক্ষার আগেই ফেসবুকে বা কোচিং সেন্টার প্রশ্নপত্র ফাঁস চক্রের নিকট অর্থের বিনিময়ে পাওয়া শুরু হলো। বলা যায় এ যেন প্রশ্নপত্র ফাঁস নয়, চলছে প্রশ্নপত্র বিক্রয় উৎসব। এটাতো নকলের চেয়েও জাতির জন্য খুবই খারাপ লক্ষণ ও দুর্ভাগ্যের ব্যাপার। কারণ নকল করে পরীক্ষা দিলে সেখানে পরীক্ষার্থীর পুরো বই সম্পর্কে তার আইডিয়া থাকত, আর এখনতো কেবল ফাঁস হওয়া নির্দিষ্ট করেকটি প্রশ্নের উপর জ্ঞানের পরিধি সীমাবদ্ধ থাকছে। তাইতো ছুটছে সবাই লেখাপড়া বাদ দিয়ে অর্থের বিনিময়ে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র পাওয়ার জন্য।

এবারও মানে ২০১৮ সালের এসএসসির প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে। ইতিমধ্যে কিছু পরীক্ষার প্রশ্নপত্র পরীক্ষার পূর্বেই দৈনিক পত্রিকাতে ছাপা হয়েছে। এমনি প্রশ্নপত্র ফাঁসের কারণে প্রশাসন কিছু পরীক্ষা স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছিলেন। কেবলমাত্র ঐ দুজন দু’জন মন্ত্রীর ইতিহাসের সঙ্গে তুলনা করে যদি আমরা বর্তমান শিক্ষাঙ্গনের পুরো পরিস্থিতির নজর দেই তবে কি দেখব? বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বা ভাইস চ্যান্সেলর পদটি এখন আর আগের মতো নেই। কয়েক দিন আগেও খবর ছিল যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকারপন্থি শিক্ষকদের দুটি দল নিজেদের মধ্যে বেদম মারপিট করে পরস্পরকে আহত করে ফেলেছেন। অনেকে বলেন এক জন শিক্ষক নাকি অনেকটা কুংফু পান্ডা স্টাইলে তার এক সহকর্মীকে পশ্চাদ্দেশে কিক মেরে জখম করেছেন। প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা অন্য এক জন যুবক শিক্ষক বলিউড সিনেমার আদলে ঘুষি দিয়ে তার পিতার বয়সী সিনিয়র ও নাম করা একজন শিক্ষকের নাক্শা ফাটিয়ে দিয়েছিলেন। আহত সেই শিক্ষকের আহাজারি মূলক ছবি সামাজিক মাধ্যমগুলোয় ছড়িয়ে পড়েছিলো। তার অভিযোগ ছিলো, ‘ওরা আমাকে ঘুষি দিয়ে ফেলে দিয়েছিল। তারপর আমার বুকের ওপর বসে আমাকে নির্দয় ভাবে পিটুনি দিয়েছে। আমি চিৎকার করে বাঁচতে চেয়েছি, কিন্তু কেউ বাঁচাতে এগিয়ে আসেনি…।’ এটা আমাদের জাতির জন্য কলঙ্ক ও দুঃখজনক। বিশ্ব দেখল এ জাতি কতটা উৎশৃঙ্খল!

এ ছাড়াও আমরা কতটা নীচ আর কতটা অবহেলা করছি শিক্ষাক্ষেত্রে ও শিক্ষদের উপর তার নমুনা এইতো মাত্র কয়েক দিন আগেই দেখলাম। গত ২০১৭ সালের ২৩ ডিসেম্বর ঢাকাস্থ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শুরু হয়েছিলো সারাদেশ হতে আগত সহকারি শিক্ষকদের আমরণ অনশন কর্মসূচি। তাদের অভিযোগ ছিলো তারা বেতন বৈষম্যের শিকার। প্রধান শিক্ষকদের সাথে সহকারি শিক্ষকদের বেতনের পার্থক্য চার ধাপ। তাদের দাবি একধাপ নিচে রাখতে হবে। এটা তাদের যৌক্তিক দাবি ছিল। সে সময় বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদ শিক্ষকদের এই আন্দোলন মুখর সময়েই শিক্ষা ভবনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে কর্মকর্তাদের সহনীয় ভাবে ঘুষ খাওয়ার পরামর্শ দিলেন! তার প্রমাণস্বরূপ পেলাম, শিক্ষাক্ষেত্রে ঘুষ লেনদেনে তার পিও সহ তিন জনের বিরুদ্ধে মামলা হলো। তিনি আরও বললেন, খালি যে অফিসাররা ‘চোর’, তা নয়, মন্ত্রীরাও ‘চোর’, আমিও ‘চোর’। এরই মাঝে ২৬ ডিসেম্বর এমপিও ভুক্ত শিক্ষকরাও আন্দোলনে নামেন।

এই যে শিক্ষাঙ্গনে অস্থিরতা, অনিয়ম, এর জন্য দায়ি কে বা কারা? অনেকে বলেন আমরাই দায়ি। আমরা মিশ্রিত জাতি, আমাদের হুঁশ হয় না ততক্ষণ, যতক্ষণ না পাছায় মুগুরের বাড়ি পড়ে। এর জন্য দরকার একটি মন্ত্রণালয় যা শিক্ষামন্ত্রণালয় অলরেডি আছেই। এখানে প্রয়োজন এখন প্রয়োজন শেখ সেলিম বা এহছানুল হক মিলনের মতন বিচক্ষণ ও কঠোর শাসক, যা বর্তমান ব্যর্থ শিক্ষামন্ত্রী দিয়ে সম্ভব না। তবুও সে এক্ষেত্রে পুরস্কৃত হবে এটা নিশ্চিৎ। তবে দুঃখের বিষয় হলো যে আমাদের দেশে এমন কোন নজির নেই, কর্তব্যে ব্যর্থরা কখনোই নিজ কর্ম সম্পাদনে ব্যর্থতায় পদত্যাগ করেন না। বরং কেউ ব্যর্থ হয়েছেন এ কথাটিই মুখে স্বীকার করেন না।

ক্ষমতায় গেলে আমরা এতোটা বেহায়ইয়া আর নিলর্জ্জ্ব হই যে, তা কল্পনাতীত। অথচ এইতো সেদিন দক্ষিণ কোরিয়ায় সামন্য প্রশ্নপত্রে ভুল স্বীকার করে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করলেন দক্ষিণ কোরিয়ার শিক্ষামন্ত্রী ও শিক্ষা বোর্ডের প্রধান।  এখন প্রশ্ন হলো, তারা কি মানুষ নাকি আমরা মানুষ, যার হুঁশজ্ঞান দুটোই আছে। আমাদের শিক্ষাক্ষেত্রে এতো অনিয়ম আর দুর্নীতির পরও হয়তো নাহিদ স্যার পুরস্কৃত হবেন তাতে আমার কোন মাথা ব্যাথা নেই, কারণ আমি বা আমরা তো জানি ইভেন সেও জানেন এ পুরষ্কার তার প্রাপ্য কি না!

.

এ বিষয়ের একটি খোলা চিঠি,

মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী,

আমরা অধম সাধারণ পাবলিক, যাদের না আছে একুল, না আছে ঐ কুল। আমাদের ভরসা কেবলি আল্লাহ। সেই আল্লাহকে হাজির-নাজির করে বলছি, যা বলবো তা সত্য বলবো। জ্ঞানী লোকেরা বলেছে, শিক্ষা নাকি একটা দেশের উন্নতির প্রধান হাতিয়ার। যে জাতি যত শিক্ষিত সে জাতি ততো উন্নত। আমরা তা বাস্তবেও দেখছি পশ্চিমাদের কিংবা এশিয়ার অন্য দেশগুলোর দিকে তাকিয়ে। আমাদের যে উন্নতি হয়নি তা বলবো না, হয়েছে! তা কেবল আপনাদের নিজেদের আর আপনাদের সাথে যারা থাকে তাদের।

আপনারা মানে আপনার সরকার আইসা সকল সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারির লাগামহীন বেতন বাড়াইলো। আচ্ছা বলতেপারবেন! এদেশে কি শুধু আপনারা মানে সরকারি কর্মচারিরাই বসবাস করেন, নাকি আমাদের মতো আমপাবলিকও আছে? যখন যে সরকারই আপনাদের বেতন বাড়ায়, তার আগ থেকেই জিনিসপত্রের দাম হুরহুর করে বেড়ে যায়। বাজার থেকে আপনারা যে দামে জিনিপত্র ক্রয় করেন সেই একই দামে আমাদেরও কিনতে হয়। একবার ভাবুন তো আমরা কি আপনাদের সমান তালে জীবন চালাতে পারি? আপনাদের আয় আর আমাদের মতন দিনমজুরের আয় কি সমান? যাক, অনেক বকবক করলাম এবার আসি মূল বিষয়ে।

আপনাদের মতন আমাদেরও স্বপ্ন থাকে, আমাদের ছেলে-মেয়েরা লেখাপড়া করে মানুষের মতো মানুষ হবে। শিক্ষায় সুশিক্ষিত হয়ে বাবা-মায়ের কষ্ট লাঘব করবে। আপনারা আপনাদের সন্তানদের না হয় বিদেশে লেখাপড়া করান, আমাদেরতো এদেশে মাটির ঘরেই লেখাপড়া করার সুযোগটা অন্তত দিবেন! বাস্তবে তাও হয় না। আমাদের সন্তানেরা অধিকাংশই মেট্রিকের গণ্ডি পেরুতে পারেনা, তার মূল কারণ শিক্ষাক্ষেত্রে সীমাহীন ব্যয়, অথচ সরকার বা আপনারা কত কথাই না বলেন! ‘ওমুক ক্লাশ পর্যন্ত লেখাপড়া ফ্রি করেছেন, তমুক করবেন, আরো কত কি!’ শুনলে আশায় বুক ভরে যায় অথচ বাস্তবে এর উল্টো রূপ।

স্কুলগুলোতে এই ফিস সেই ফিস দেখিয়ে হাতিয়ে নিয়ে যায় লক্ষ কোটি টাকা- এর খবর কি আপনারা জানেন? জানবেন কি করে, আপনাদের চারপাশে তো মানুষ নয়, জড়িয়ে থাকে কতগুলো শকুনের দল, যারা কোন একটা সুযোগ পেলে কেবল তাদের আত্মীয়-স্বজনদের জন্য রেখে দিয়ে আপনাদের দেখান দেশ জনতার সেবকের উল্লেখযোগ্য অবদান।

আবার ধরেন, ভিটে-মাটি বেঁচে দিয়ে ছেলেকে পড়ালাম, তার বেনিফিট কি? চাকুরির বাজারে শিক্ষা নয়, টাকাই মূল। তাই এই গৎবাঁধা শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে বা করে কি লাভ? বিদেশের মতো যদি শিক্ষাটা হতো বাধ্যতামূলক কারিগরি শিক্ষা, তাহলে হয়তো বেঁচে থাকার মতো একটা ব্যবস্থা হত। যে শিক্ষায় বেঁচে থাকার মতো কোন সূত্র নেই, সেই শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে সন্তান কেবল হতাশায় জীবন কাটাবে। ফলে এক সময় যুব সমাজ ধ্বংসের দিকে ধাবিত হবে।

এখন আসি আলোচিত বিষয়ের দিকে, খুব তাড়াতাড়ি এই প্রশ্নফাঁস রুখতে হবে। আপনি বা আপনারা শিক্ষার অনিয়মে জিরো টলারেন্স দেখান, আমরা অভিভাবকরাও আমাদের সন্তানদের শুধু পাস নয়, সুশিক্ষায় শিক্ষিত করবো।

আর কি শুধু গদ্য লিখে আপনার ধৈর্য্যচ্যুতি ঘটাতে চাই না। আপনার এবং দেশের মঙ্গল কামনা করছি।

 

নিবেদক-

আমি ‘আমপাবলিক’

 

লেখাটি পূর্বে একটি ব্লগে প্রকাশিত হয়েছে।