ক্যাটেগরিঃ প্রবাস কথন

 

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকেই উচ্চশিক্ষা, রাজনৈতিক আশ্রয়, বিভিন্ন বৃত্তিসহ নানা ভাবে বাংলাদেশি জনগোষ্ঠীর মানুষের শিল্প সংস্কৃতির তীর্থভূমি ফ্রান্সে আগমন ঘটে। শুরুতে এ সংখ্যা নেহায়েত হাতে গোনা হলেও বর্তমানে ফ্রান্সে বসবাসরত বাংলাদেশির সংখ্যা প্রায় চল্লিশ হাজারের কোঠায়।ফরাসি ভূখন্ডে স্থানীয় প্রশাসন ও জনগোষ্ঠীর কাছে বাংলাদেশ ও বাঙালি নামটা এখন বিশেষ গুরত্ব বহন করে।এ দেশে সারা পৃথিবীর বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর বসবাসরত মানুষের মধ্যে বাঙালি জনগোষ্ঠী তাদের জীবনযাপন, পেশা, সরকারের আইনের প্রতি আনুগত্য, নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি, অন্য জাতিগোষ্ঠীর মানুষের প্রতি সন্মান প্রদর্শন ইত্যাদি কারণে স্বতন্ত্র এক ভাবমূর্তি সৃষ্টি করেছে।

এখানে বসবাসরত বাঙালি জনগোষ্ঠীর অধিকাংশই রাজধানী প্যারিসে বসবাস করে। এছাড়া তুলুজ, তুলোন, রেস্ট, মারছাইসহ ফ্রান্সের অন্যান্য শহরেও বেশ কিছু সংখ্যক বাংলাদেশির বসবাস রয়েছে।

স্থায়ীভাবে বসবাসরত বাঙালিদের অধিকাংশই রাজনৈতিক আশ্রয়ের মাধ্যমে স্থায়ী হয়েছেন।এখানে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ফরাসি নাগরিক, বাংলাদেশি রিফিউজি, ইমিগ্রান্ট, রাজনৈতিক আশ্রয় আবেদনপ্রার্থী পরিচয়সহ অনেকেই অবৈধ অভিবাসী হিসেবে অবস্থান করছেন।

পেশাগত দিক থেকে জনগোষ্ঠীর অধিকাংশই রেষ্টুরেন্ট ব্যবসা ও রেষ্টুরেন্ট সংশ্লিষ্ট পেশার সাথে জড়িত। এ ছাড়া ডিপার্টমেন্টাল স্টোর, ট্যাক্সিফোন ও আমদানি রপ্তানি ব্যবসা ইত্যাদি ক্ষেত্রেও অনেকেই সফলতার স্বাক্ষর রেখেছেন। এখানকার প্রশাসনিক কর্মকান্ডের সব কিছু ফরাসি ভাষায় পরিচালিত হয়ে থাকে। তাই অনেক বাঙালি ফরাসি ভাষা অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে আয়ত্ব করে অনুবাদকের পেশার মাধ্যমে কমিউনিটির মানুষের সেবার পাশাপাশি নিজেদেরকে স্বনির্ভর করেছেন। তারা এই পেশাকে তরুণদের মধ্যে জনপ্রিয় করে তুলেছেন। পাশাপাশি আইন ব্যবসা,প্রশাসনিক কর্মী ও কর্মকর্তা এবং শিল্প সংস্কৃতির মতো সৃজনশীল পেশায়ও বাঙালিরা স্বমহিমায় সমুজ্জ্বল।

এখানকার প্রত্যেক বাঙালি জন্মভূমি থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে বসবাস করলেও সবার বুকের এক কোণে বসবাস করে ছোট্ট একখন্ড বাংলাদেশ। স্ব স্ব পেশার পাশাপাশি শত ব্যস্ততার মধ্যেও নিজস্ব শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও রাজনীতি চর্চা ইত্যাদিতেও রয়েছে তাদের সরব উপস্থিতি। বাংলাদেশের মতো এখানেও বাঙালির চিরাচরিত অনুষ্ঠান—শহীদ দিবস, স্বাধীনতা ও বিজয় দিবস, পহেলা বৈশাখ, ঈদ, পূজা এবং অন্যান্য উৎসবগুলোর আনন্দ প্রবাসীরা মিলেমিশে নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয়। সাহিত্য সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক সংগঠনগুলো যথেষ্ট উৎসাহ ও উদ্দীপনায় উদযাপন করে থাকে ২১ ফেব্রুয়ারি, ২৬ মার্চ, ১৬ ডিসেম্বরের মতো জাতীয় দিবসগুলো। এছাড়া রবীন্দ্র-নজরুল ও অন্যান্য কবি সাহিত্যিকদের জন্ম ও মৃত্যু দিবস পালন এবং বিভিন্ন আঞ্চলিক কমিউনিটি সংগঠনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন যেন এক দেশীয় আমেজের সৃষ্টি করে। এখানে যে সব সংগঠন উল্লেখিত উৎসব আয়োজনের উদ্যোগ নিয়ে থাকে তাদের মধ্যে উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী, মুক্তিযোদ্ধা সংহতি পরিষদ, ইয়ুথ ক্লাব, একুশে উদযাপন পরিষদ, স্বরলিপি শিল্পী গোষ্ঠী, আমরা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ,মাটির সুর, বাংলাদেশ ভিউ, কালচার প্লাস অন্যতম। উল্লেখ্য বাংলাদেশের সবচেয়ে ব্যয়বহুল চলচ্চিত্র লাল টিপ ফ্রান্স প্রবাসী বিশিষ্ট ব্যবসায়ী কাজী এনায়েত উল্লাহর প্রযোজনা ও প্রবাসী স্বপন আহমদের পরিচলনায় প্যারিসেই নির্মিত হয়েছে। এছাড়া অনেকেই টিভি নাটক নির্মাণের প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছেন।বাংলাদেশের অনেক শিল্পী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের বসবাস এই ফ্রান্সে।তাঁদের মধ্যে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ও একুশে পদকপ্রাপ্ত মুকাভিনেতা পার্থ প্রতীম মজুদার,একুশে পদকপ্রাপ্ত বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী শাহাবুদ্দিন আহমেদ, সনামধন্য আলোকচিত্রী আনোয়ার হোসেন অন্যতম।

সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের পাশাপাশি অনেকেরই সাহিত্যচর্চার অভ্যাস রয়েছে। সাহিত্যপিপাসু প্রবাসীদের উদ্যেগে মাঝে মাঝেই প্যারিস থেকে প্রকাশিত হয় গল্প, কবিতা ও ছড়া সংকলন।উল্লেখ্য বাংলা সাহিত্যের অন্যতম কবি মাইকেল মধুসুধন দত্ত ও লাল সালুখ্যাত ঔপন্যাসিক সৈয়দ ওয়ালীউল্লা ফ্রান্সের প্রবাস জীবনেই লিখেছেন অনবদ্য গল্প, কবিতা ও উপন্যাস।

অবাধ তথ্য প্রযুক্তির যুগে সংবাদপত্র এবং সাংবাদিকতায় এসেছে এক নতুন দিগন্ত। প্রবাসীদের সুখ দুঃখ, আনন্দ বেদনা, সফলতা, অর্জন ইত্যাদি সম্বলিত সংবাদ এখন বাংলাদেশের সংবাদ মাধ্যমগুলোতে একটি বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে। ফ্রান্সপ্রবাসী বাঙালিদের নানাবিধ সংবাদ তুলে ধরার জন্য নতুন প্রজন্মের অনেক তরুণকেই দেখা যায় ফ্রিল্যান্স হিসেবে ক্যামেরা হাতে সংবাদ সংগ্রহের কাজে। বিভিন্ন ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ায় সংবাদ পরিবেশনকারীদের উদ্যেগে প্যারিসে একটি প্রেসক্লাব গঠনের চেষ্টা চলছে। অনেকেই প্যারিস থেকে নিয়মিতভাবে বাংলা পাক্ষিক ও মাসিক পত্রিকা বের করার প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছেন।

দেশের যে কোনো রাজনৈতিক সংকট ও অন্যান্য পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের মতো এখানেও বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনগুলো যথেষ্ট ভূমিকা পালন করে। দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর এখানে শাখা রয়েছে। প্রত্যেকেই যার যার দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করে থাকে। আবার অনেকেই স্বপ্ন দেখেন দেশের প্রচলিত রাজনীতির ধারা ভেঙ্গে নতুন আঙ্গিকে একটি বাংলাদেশ গড়ার। এর পরিপেক্ষিতে এখানকার প্রগতিশীল রাজনৈতিক চিন্তাধারার প্রবাসীদের দেখা যায় দেশের রাষ্ট্রীয় স্বার্থবিরোধী কর্মকান্ড, দুর্নীতি, অনিয়ম, সন্ত্রাস ও সামাজিক অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদমুখর হয়ে ব্যানার ফেস্টুন হাতে প্রতিবাদ জানাতে।

প্রবাসী বাংলাদেশিরা রাজনৈতিক কর্মকান্ডে সরাসরি জড়িত না থাকলেও যথেষ্ট রাজনৈতিক ও সমাজ সচেতন। দেশের যে কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও দুর্ঘটনায় নির্বিকার বসে না থেকে বিভিন্নভাবে অর্থ সংগ্রহ করে ক্ষতিগ্রস্থ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে থাকে। তাছাড়া এখানে অনেক সাদা মনের প্রবাসী রয়েছেন। যারা প্রতিনিয়ত নিঃস্বার্থভাবে কমিউনিটির বিপদগ্রস্থ ও সমস্যাক্রান্ত মানুষের পাশে দাঁড়ান এবং সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন।

আড্ডা দিয়ে ও খোশ গল্প করে সময় কাটানোয় বাঙালিদের বিশেষ জুড়ি রয়েছে, এখানেও তার ব্যতিক্রম নয়। প্যারিসের গারদো নর্থ, লাশাপেল, ক্যাথসীমা প্রভৃতি এলাকার রেষ্টুরেন্ট, ক্যাফে বার ও রাস্তার পাশগুলো প্রতিদিন জেগে ওঠে বাঙালিদের রাজনৈতিক, সাংগঠনিক আলোচনা ও হাসিঠাট্টায়। যা ক্ষণিকের জন্য ভুলিয়ে দেয় প্রবাস জীবনের দূরত্বের কষ্ট।

ফ্রান্সপ্রবাসী বাঙালিদের এখানে হাজারো সাফল্যগাথা, কর্মকান্ড ও প্রচেষ্টার পাশাপাশি রয়েছে বেশ কিছু প্রতিকূলতা। প্রথমত প্রত্যেক বাঙালিকে এখানে এসে যুদ্ধ করতে হয় পৃথিবীর অন্যতম দুর্বোধ্য ফরাসি ভাষার সঙ্গে। অদক্ষ ভাষাজ্ঞানের কারণে প্রশাসনিক ও কর্মক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত হোঁচট খেতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে কাজ হারিয়ে বেকারও হতে হয়। তাই নতুন করে যাঁরা ফ্রান্সে বসবাসের কথা ভাবছেন, তাঁদের উচিৎ এখন থেকেই ফরাসি ভাষা জ্ঞান অর্জনের ওপর বিশেষ গুরত্ব দেওয়া।

অনেক বাংলাদেশিকেই ফ্রান্সে আসার পর প্রথম প্রথম তীক্ত পরিস্থিতির সম্মুখীন ও মানবেতর জীবন যাপন করতে হয় শুধু আইনগতভাবে চলার সঠিক দিক নির্দেশনা ও বৈধভাবে বসবাসের স্বচ্ছ্ব ধারণার অভাবে। অনেক ক্ষেত্রে দালাল চক্রের খপ্পরে পড়ে সর্বস্বান্ত হওয়ার নজিরও রয়েছে।এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্যারিসস্থ বাংলাদেশ দূতাবাস ও কমিউনিটি নেতৃবৃন্দের যৌথ প্রচেষ্টায় একটি বিশেষ সেবা বিভাগ খোলার বিষয়টি ভেবে দেখার সময় এসেছে।

পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো ফ্রান্সেও বেড়ে উঠছে বাংলাদেশি বংশোদ্ভুত দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রজন্ম। যাদের জন্ম এই ফ্রান্সের মাটিতেই এবং এদের শিক্ষা সংস্কৃতি ফরাসি পরিমন্ডলের মধ্যে।এদের মধ্যে অনেকেই শিক্ষাজীবনের পরিসমাপ্তি ঘটিয়ে ফ্রান্স সরকারের বিভিন্ন প্রশাসনিক কর্মে নিয়োগ হচ্ছেন। যা বাঙালি কমিউনিটির প্রবাসীদের জন্য অত্যন্ত সুসংবাদ। তাছাড়া অনেক বাংলাদেশি নাগরিক এখানকার ফরাসি ও অন্য দেশের নাগরিককে বিয়ে করে সংসার করছে এবং তাদের ঘরে জন্ম নিয়ে বেড়ে উঠছে দ্বৈত নাগরিকত্বের প্রজন্ম। দুঃখের বিষয়, এখানে বেড়ে ওঠা এই প্রজন্মের অধিকাংশই শুদ্ধভাবে বাংলা বলতে, লিখতে, পড়তে এবং বলতে পারে না। এর কারণ যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও অন্যান্য দেশে বাংলা শিক্ষার বিভিন্ন স্কুল প্রতিষ্ঠিত হলেও এখনো ফ্র্রান্সের মাটিতে গড়ে ওঠেনি কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বাংলা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এ ভাবে চলতে থাকলে হয়তো অদূর ভবিষ্যতে এই নব প্রজন্মের অস্তিত্ব থেকে মুছে যাবে তার বাঙালিত্ব এবং হারিয়ে ফেলবে তার শেকড়ের সন্ধান। তাই বিলম্ব না করে এখনি বাংলাদেশ সরকারের সহায়তায় এবং কমিউনিটি নেতৃবৃন্দের সম্মিলিত উদ্যেগে কিছু বাংলা শিক্ষা স্কুল প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। যাতে এই স্কুল থেকে প্রবাসে বেড়ে ওঠা প্রজন্ম বাংলা শিক্ষার পাশাপাশি, বাংলা কবিতা, গান ও শিল্প সাহিত্যচর্চার সুযোগ পায় এবং বাংলাদেশের ইতিহাস সম্পর্কে ধারণা অর্জন করতে পারে।

অদূর ভবিষ্যতে ফ্রান্সে বসবাসরত বাংলাদেশি প্রবাসীরা রেমিটেন্সের মাধ্যমে দেশের আর্থ সামাজিক উন্নয়নে আরো বেশি বেশি অবদান রাখবে। ফরাসি ভূখন্ডে গড়ে তুলবে তথ্য প্রযুক্তি,মেধা ও জ্ঞান নির্ভর সমাজ। ফরাসি জনগোষ্ঠীর নিকট জায়গা করে নেবে সুনাম ও আস্থার বিশেষ একটি স্থান। এটাই প্রত্যাশা।

***
লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে: প্রথম আলো, ১৯ অক্টোবর ২০১৩