ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

 

পৃথিবীর প্রতিটি পেশার পেশাগত কর্মটি সঠিক ও সুচারুভাবে সম্পাদনের জন্য বুদ্ধির প্রয়োগ করতে হয়।বুদ্ধি ব্যতিরেখে কোন কাজই সম্পাদন সম্ভব নয়।সুতরাং সেই অর্থে একজন পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা কর্মী থেকে আরম্ভ করে পৃথিবীর সব সমাজ স্বীকৃত পেশাজীবী মানুষই বুদ্ধিজীবী।কারন বুদ্ধি দিয়েই তার কর্ম সম্পাদনের মাধ্যমে জীবন ও জীবিকা নির্বাহ করতে হয়। একজন পাগল বা মস্তিষ্ক বিকৃত উন্মাদ মানুষ তার বুদ্ধির সঠিক প্রয়োগ করতে পারেনা বলেই তার দ্বারা আর্থিক বিনিময়ের মাধ্যমে বিশেষ কোন কার্য্য সম্পাদন করানো সম্ভবপর হয়না।যার ফলে এই শ্রেনীর মানুষ সমাজের পেশাজীবী শ্রেণীর আওতাভুক্ত নয়।

আমাদের দেশে বুদ্ধিজীবী শব্দটি যে অর্থে ব্যবহৃত তা একটি সামাজিক শ্রেণী বৈষম্যগত শব্দ।আমাদের সমাজে রাজনৈতিক ,সাংবাদিক ,বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ,সাংস্কৃতিক কর্মী ,সাহিত্যিক ,আমলা ,মানবাধিকার কর্মী,আইনজীবী এই শ্রেনীর পেশার অগ্রভাগের মানুষদের বুদ্ধিজীবী হিসেবে সম্বোধন করা হয়ে থাকে। যখন কোন বিশেষ পেশার মানুষকে এধরনের সম্বোধন করা হয় ও সামাজিক স্বীকৃতি দেওয়া হয় তখন ঐ ব্যক্তি বিশেষ নিজেকে সমাজের অন্য মানুষ থেকে আলাদা ভাবতে থাকে এবং নিজের মধ্যে এক শ্রেনীর বৈষম্যভাবাপন্ন অহংকারী মানুসিকতার উদয় ঘটায়।ফলে সমাজের কারখানার ঘাম ঝড়ানো বুদ্ধিদীপ্ত পেশাজীবী শ্রমিক থেকে আরম্ভ করে অন্যান্য প্রতিটি পেশাজীবী শ্রেনীর অবমূল্যায়ন করা হয়। তা ছাড়া এই ধরনের সামাজিক স্বীকৃতির ফলে তথাকথিত বুদ্ধিজীবীদের মতামত ও কথার উপর সমাজের মানুষের মধ্য এক ধরনের বিশ্বস্ততা ও আস্থার তৈরী হয় ,ফলে তারা ভুল বলুক আর সঠিক বলুক সেই বিবৃতির উপর সামাজিক তথা রাষ্ট্রীয় জনমতের সৃ্ষ্টি হয়।এমন পর্যায়ে যখন একজন মানুষকে পৌঁছে দেওয়া হয় তখন তার মধ্যে সমাজ থেকে আর্থিক সুবিধা নেয়া বা আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার মনোবৃত্তির উদয় ঘটে। পরবর্তীতে এই অবস্থানকে পূঁজি করে রাষ্ট্রের সুবিধাভোগী টাউট ,বাটপার ব্যক্তি ও রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে এবং সমাজ বিরোধী গোষ্ঠীর পক্ষে বিশেষ সুবিধার বিনিময়ে অন্যায়কে ন্যায়রূপে সমাজের মানুষের নিকট উপস্থাপন করে।ফলে সমাজে বিভাজন তৈরীর মাধ্যমে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়।এই সামাজিক বিশৃঙ্খলার ফলে সুধিধা ভোগী অসৎ রাষ্ট্রীয় শোষক শ্রেনী দুর্নীতি,লুটপাট করে পার পেয়ে যায়। এতে রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে কিন্তু মুষ্টিময়েও সুবিধাভোগী রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকা ও এদের আশেপাশের মানুষগুলো অবৈধ ব্যক্তিগত সম্পদের পাহাড় বানিয়ে ফেলে।তৈরী হয় চরম অর্থনৈতিক বৈষম্যমূলক সমাজ ব্যবস্থা।সমাজকে চরম দুরাশার দিকে ঠেলে দিয়ে বিশেষ গোষ্ঠীর প্রতি অবদান রাখার স্বীকৃতিস্বরুপ এই সব সমাজসৃষ্ট তথাকথিত বুদ্ধিজীবীদের সম্মাননাস্বরূপ প্রদান করা হয় রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন পদক।

আমাদের বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট বিচার করলে উল্লেখিত আলোচনার সবকিছুই আজ বিদ্যমান। তথাকথিত বুদ্ধিজীবীদের চরিত্রের মধ্যে কোন এক সময় স্বাতন্ত্র্য ভাব লক্ষ্য করা গেলেও এখন তার লেশমাত্রও খুজে পাওয়া যায়না।এই সমাজসৃষ্ট বুদ্ধিজীবী মানুষগুলো এতটাই পেশাজীবী হয়েছেন যে তাদের পেশা অনেকটাই আইনজীবীদের পেশার স্বরূপ লাভ করেছে।একজন আইনজীবী যেমন পেশাগত কারনে অর্থের বিনিময়ে আদালতে একজন খুনিকে আইনের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য তার পক্ষে কথা বলেন। ঠিক তেমনি আমাদের রাষ্ট্রের কথিত বুদ্ধিজীবীরা এখন যার যার সুবিধাভোগী মক্কেলদের পক্ষে কথা বলে থাকেন। যার ফলে এদের পরিচয়ের ক্ষেত্রেও আজ একটু ভিন্নতর রূপ এসেছে।উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় ,লেখক আব্দুল গাফফার চৌধুরী যেহেতু আওয়ামিলীগের পক্ষে কথা বলেন তাই তাকে বলা হয়ে থাকে আওয়ামী বুদ্ধিজীবী অপর দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এমাজ উদ্দিন আহমেদ ,লেখক শফিক রেহমান যেহেতু বি এন পির পক্ষে কথা বলেন তাই তারা বি.এন.পি’মনা বুদ্ধিজীবী।কথিত বুদ্ধিজীবি সমাজের অবস্থা আজ যে রূপ লাভ করেছে তাতে অদূর ভবিষ্যতে এইসব বুদ্ধি ব্যবসায়ীরা সাংগঠনিকভাবে আওয়ামী বুদ্ধিজীবীলীগ ,জাতীয়তাবাদী বুদ্ধিজীবীদল,জাতীয় বুদ্ধিজীবী সমাজ এভাবে আবির্ভাব হলেও অবাক হবোনা।

দেশে চলমান কিছু নির্মম হত্যাযজ্ঞে দেশের বিবেকবান মানুষদের হতবাক করেছে। দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলের কর্ণধার ব্যক্তিরা তাদের চিরাচরিত ঐতিহ্য বজায় রেখে একে অপরকে এই ঘটনাগুলির জন্য দায়ী করে তাদের দায় সেরেছেন।অনেকেই ফেজবুকে ও অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আমাদের এই কথিত বুদ্ধিজীবী সমাজের এই সব নির্মম ঘটনাগুলোর প্রেক্ষাপটে কোন মন্তব্য বা প্রতিবাদ না দেখে হতাশ হয়ে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন।এর পরিপ্রেক্ষিতে আমি অনেকটাই আশ্চর্য হয়েছি যে কেন এদের প্রতিক্রিয়ার জন্য আমরা অপেক্ষা করি। প্রতিটি মানুষেরই বুদ্ধি রয়েছে সেই বুদ্ধি কে কোথায় ব্যাবহার করবে তা একান্তই ব্যক্তি সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করে। যাদের প্রতিক্রিয়া কামনা করা হয়েছে তারা অনেক কারনেই নিশ্চুপ থাকতে পারেন : যেমন
তারা হয়তো সুবিধাবাদী কোন গোষ্ঠীর সাথে চুক্তিবদ্ধ যার ফলে তার নিরপেক্ষ কোন মন্তব্য তার চুক্তিবদ্ধ মনিবের স্বার্থের পরিপন্থী হতে পারে।
তাছাড়া ইন্ডিয়ার একটি সাম্প্রদায়িক ঘটনাকে কেন্দ্র করে সেই দেশের শিল্পী সাহিত্যিকেরা প্রতিবাদস্বরূপ তাদের রাষ্ট্রীয় পদক ফেরত দিচ্ছেন কিন্তু আমাদের দেশের বুদ্ধিজীবীদের যেহেতু তাদের পদক অর্জিত হয় সুবিধাবাদী গোষ্ঠীর তোষামোদি ও তাদের গুণকীর্তনের ফলে তাই কোন মন্তব্য যদি এই গোষ্ঠির বিপরীতে যায় তাহলে তাদের পদক হয়তো কেড়ে নেয়া হতে পারে ,সেই ভয়েও কৌশলগত কারনে মৌনতা অবলম্বন করতে পারেন।
আবার যে সব বুদ্ধিজীবী সুবিধাবাদী গোষ্ঠীর নিকট দীর্ঘ সময় বুদ্ধি সেবা প্রদান করে সরাসরি রাষ্ট্রীয় ভোগ বিলাসের সুযোগ লাভ করেছেন কিন্তু বিশেষ মন্তব্যের ফলে যদি ভোগ বিলাসী জীবন থেকে বঞ্চিত করে আবার রাস্তায় নামিয়ে দেওয়া হয় সেই সংকায় নীরবতা অবলম্বন করতে পারে।
এমন অনেক কারনেই আমাদের পেশাজীবী বুদ্ধি ব্যবসায়ীরা সম্মিতভাবে কৌশলগত নীরব ভূমিকায় আছেন।

কিন্ত প্রতিটি অনাকাঙ্খিত নির্মম ঘটনায় আমি অপেক্ষায় থাকি দেশের বিবেকবান মানুষের প্রতিক্রিয়া ও প্রতিবাদের। সাম্প্রতিক দীপন হত্যাসহ প্রতিটি নৃসংশ ঘটনায় দেশের শ্রমজীবী বুদ্ধিদীপ্ত বিবেকবান মানুষ থেকে শুরু করে প্রতিটি পেশার মনুষ্য হৃদয়সম্পন্ন বুদ্ধিজীবী মানুষের প্রতিবাদ প্রতিক্রিয়ায় দারুনভাবে আশান্বিত হয়েছি।আমাদের সমাজে এই শ্রেণীর মানুষ সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও প্রতিনিয়ত সংখ্যালঘিষ্ঠ নীতি বিবর্জিত সুবিধাভোগী অমানুষদের কাছে আজ আমরা প্রতিনিয়ত পরাজিত হচ্ছি।কারন সুবিধাবাদিরা সংঘবদ্ধ আর বিবেকবান শ্রেনী অসংগঠিত।যেদিন প্রতিটি পেশার বিবেকসম্পন্ন বুদ্ধিজীবী মানুষের ডাকে সাড়া দিয়ে সর্বস্তরের মানুষ বিভ্রান্ত থেকে বেড়িয়ে এসে সংঘবদ্ধভাবে প্রতিবাদ প্রতিরোধ অব্যাহত রাখতে পারবে সেদিন নিশ্চিত বিবেক বর্জিত সুবিধাবাদী গোষ্ঠীর পরাজয় ঘটবে।