ক্যাটেগরিঃ প্রবাস কথন


সদ্য শরীরের কাঁটাছেড়া অংশে সকাল থেকে ব্যথার তীব্রতা বেড়েই চলছে। ব্যথানাশক ঔষধ সেবনে উপশমের চেষ্টা। ব্যথা নিয়েই মেয়েকে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে বাসায় একাকী দিন যাপনের প্রস্তুতি। প্রকৃতি আগাম আভাস না দিয়ে হঠাৎ করেই শুরু করেছে বাতাসে তুষারের ওড়াউড়ি। যে দৃশ্যর অবতারণ সাধারণত প্যারিসে খুব একটা মেলেনা। মনে হল দিনটা বাড়তি প্রাপ্তি দিয়ে শুরু হল। ড্রয়িং রুমের প্রতিটি পর্দা তুলে দিয়ে সোফায় শুয়ে শুয়ে প্রকৃতির আপন মনে এমন খেলা করার দৃশ্য হৃদয়ে এক ভিন্ন রকম শিহরণ জাগিয়ে মুহূর্তগুলো রাঙিয়ে দিচ্ছে। বেলকোনিতে মাঝে মাঝে দুটো কালো কবুতর এসে সঙ্গ দিয়ে আবার উড়ে চলে যাচ্ছে। সাথে প্রিয় রবি সুর। স্বেচ্ছায় গৃহবন্দী হলাম প্রকৃতির এমন আতিথেয়তায়!

 

 

এমন ভালোলাগা শুধু নিজে উপভোগ না করে প্রযুক্তির আশ্চর্য উদ্ভাবন ফেসবুক লাইভের মাধ্যমে কিছু সময় ভাগাভাভাগি করলাম বন্ধুদের সঙ্গে। কিছুক্ষণের মধ্যে সামনের ছোট্ট পার্কটির সমতল ভূমির উপর প্রকৃতি তুষারের সাদা মাদুর বিছিয়ে দিলো। বৃক্ষরাজির শাখাগুলোর কাণ্ড পরিণত হল থোকা থোকা সাদা পুষ্পের ন্যায়।

 

দীর্ঘদিন অবসর কাটানো ক্যামেরােকে জাগিয়ে তুললাম প্রকৃতির এমন রূপ ধরে রাখার জন্য। অসুস্থ শরীর, কিন্তু মনটা বেশ চনমনে হয়ে উঠেছে এরই মধ্যে। এভাবে দু‘দিন পার করলে পুরো প্যারিস কি রূপে উদ্ভাসিত হয়েছে সেই কৌতূহল ভেতরে ভেতরে তাড়া দিচ্ছে তা বেশ অনুভব করছি, কিন্তু সদ্য হসপিটালের অপারেশনের টেবিল থেকে ফেরা দেহ কি পারবে আমাকে শুভ্র সাদা প্যারিসের রূপ ঘুরে দেখাতে, সেই আশংকায় দোদুল্যমান মন। ভেতরে সাহস সঞ্চার করে নিজেকে গৃহকোণ থেকে মুক্ত করে শ্যেন নদীর দিকে রওনা হলাম।


বাঙলার প্রকৃতিতে আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে সারা দিন মেঘলা আকাশ গুড়িগুড়ি বৃষ্টির দিনে গৃহবন্দী জীবনের যেমন আলাদা স্বাদ রয়েছে। তেমন এখানকার প্রকৃতিতে শিমূল তুলোর মতো শুভ্র তুষারের উড়ে উড়ে ঝরে পড়ার দৃশ্যও দেহ মনে এক অন্যরকম শিহরণ জাগায়। প্রতি বছর প্যারিসের আশেপাশের শহরগুলোতে তুষারপাত হলেও গত পাঁচ বছরের মধ্যে প্যারিস নগরী তুষারে শুভ্র সাদায় সাজেনি। ক্রিসমাস বা নয়েল উৎসবগুলোতে কৃত্রিম তুষারে সজ্জিত করা হয় নগরীর বড় বড় পর্যটন ও জনপ্রিয় জনবহুল এলাকাগুলো। কৃত্রিম সজ্জা থেকে এই শহর নিজের শরীরকে মুক্ত করেছে জানুয়ারির শেষে, কিন্তু আজ প্যারিসকে প্রকৃতি সাজিয়েছে আপন হাতে। ফ্রান্সে চলমান বন্যা পরিস্থিতির কারণে শ্যেন নদী সাধারণ সীমানার উপর দিয়ে পানি’র স্রোতের ধারা প্রবাহিত করছে, ফলে প্রমদতরিগুলো কূলে নোঙ্গর করে অলস সময় পার করছে, তুষারের শুভ্র প্রলেপের কারণে নদীর দুই ধারের সারি সারি জাহাজগুলোকে দূর থেকে মনে হচ্ছে সেনের তীর ঘেঁষে সদ্য গড়ে উঠা পাড়া গাঁয়ে উৎসব চলছে।

 

 

 

 

 


রাস্তায় যান চলাচল স্বল্পতার কারণে প্যারিস শহুরে রূপ হারিয়ে কোথাও সাদা বিরান ভূমির মতো, আবার রাস্তার পাশের বিস্তীর্ণ গাছগাছালি ঘন তুষারের আবরণে ঢাকা পড়ে সাদা বনভূমিতে রূপান্তর হয়েছে। ফেব্রুয়ারি থেকে ফ্রান্সে বসন্তের শুরু কিন্তু এখনো ফুলেদের আগমনী চিহ্ন চোখে পড়েনি। কিন্তু প্যারিসের এভেনিউগুলোর দু’পাশের সৌন্দর্য বর্ধনশীল সারিবাধা গাছগুলো যেন তুষার দিয়ে সাদা চেরি ফুল ফুটিয়ে দর্শনার্থীদের মধ্য বসন্তের অগ্রিম রূপের সৌন্দর্যে বিমোহিত করছে। বিখ্যাত ভাস্করদের তৈরি ভাস্কর্যগুলোর উপর প্রকৃতি নতুন করে অলঙ্করণ করেছে, সে দৃশ্য একেবারে কম মনোহর নয়। এমন দিনে প্যারিসের পথে যে কারও স্বর্গীয় অনুভূতিতে দেহ মন আচ্ছাদিত হতে পারে।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 


মনে হল, প্যারিসের এমন রূপের দিকে তাকালে প্রেমে পড়বেনা এমন মানুষ খুঁজে পাওয়াই দায়। শত শত বছর ধরে হাজার হাজার শিল্পী প্যারিসের রুপের উৎকর্ষ সাধনের যে অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন তা আজ পণ্ডশ্রমে পর্যবসিত। প্যারিসের আজকের রূপের কাছে শিল্পকলার সমস্ত সৃষ্টিই যেন পরাজিত! যে হৃদয় পাথরসম অনুভূতিহীন প্যারিসের আজকের প্রকৃতি সেই হৃদয়ে প্রাণের সঞ্চার করতে দুহাত বাড়িয়ে ডাকছে। প্রকৃতির এই সৌন্দর্য ধরে রাখার জন্য ক্যামেরা হাতে বেড়িয়ে পড়েছে অসংখ্য সৌন্দর্য় পিপাসু্ মানুষ নিজেকে স্মৃতি করে রাখার জন্য। বৃষ্টির দিনে বাংলার দুরন্ত কিশোর-কিশোরী যেমন বৃষ্টিতে ভিজে তার দুরন্তপনা ও দুুষ্টুমিতে প্রকৃতির হেয়ালিপনাকে সার্থক করে তোলে, তেমনি প্যারিসের বুকে বেড়ে ওঠা দুরন্ত কিশোর-কিশোরীর দলও প্রকৃতির এই উৎসবের দিনে উজার করে উচ্ছ্বাস ঢেলে দিচ্ছে। বাংলার বর্ষা, বসন্ত, শরৎ যেমন প্রেমিক প্রেমিকার মনে দোলা দেয়, অনুভূতিতে ভিন্নতা আনে, হৃদয়ের রংয়ের বৈচিত্রতা আনে, পশ্চিমা প্রেমিক-প্রেমিকার হৃদয়ে আমাদের মতো এতো বৈচিত্র্য না থাকলেও আজকের প্যারিসের প্রকৃতি অবশ্যই ওদেরকে রোমাঞ্চিত করছে।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

আলোকচিত্র: মুহাম্মদ গোলাম মোর্শেদ, প্যারিস।