ক্যাটেগরিঃ গণমাধ্যম, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

 

কয়েকদিন আগে সংবাদভিত্তিক একটি টেলিভিশন চ্যানেলে টক শো দেখছিলাম। অনুষ্ঠান সঞ্চালকের প্রশ্নের জবাবে এক অতিথি (যিনি আবার একটি এম এম রেডিওর আরজে) বললেন, ‌এফএম-এর ভাষা এরকমই হয়। সঞ্চালক সঙ্গে সঙ্গেই জানতে চাইলেন এফ এম এর ভাষা আবার কেমন? কোনো যৌক্তিক উত্তর দিতে পারেননি সেই আরজে।

এফএম-এর জন্য কি আসলেই সুনির্দিষ্ট কোনো ভাষা আছে? গত চার বছর নিজে এফ এম রেডিওতে কাজ করতে গিয়ে যতটা জেনেছি বা শিখেছি তাতে নিজেকে একরকম অজ্ঞই মনে হলো। কারণ এফএম-এর ভাষা বলে আমরা কিছুই শিখিনি। আমরা শিখেছি প্রমিত বাংলায় কতটা সুন্দরভাবে কথা বলা যায়। এর ফল অবশ্যই আমরা পেয়েছি। গত কয়েক বছর ধরে এফএম-এর ভাষা নিয়ে যেরকম আলোচনা-সমালোচনা চলছে, তার মধ্যেও আমাদের উদ্যোগটা প্রশংসিত হয়েছে শিল্পী, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবীসহ সব শ্রেণীর মানুষের কাছে। তার মানে প্রমিত বাংলায় কথা বলেও শ্রোতাদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করা যায় এবং শ্রোতারা সেটিকে বেশ

তাহলে খিচুড়ি ভাষায় কথা বলার দরকারই বা কী আর এরজন্য অভিযুক্ত হবারই বা কী যুক্তি থাকতে পারে? যারা এফএম-এর ভাষা বলে ভিন্ন একটি ভাষা চালু করতে চাইছেন, তারা কি এই প্রশ্নটি নিজেরাই কখনো করেছেন? আমার মনে হয়, বিষয়টি না বোঝার কোনো কারণ নেই। তারপরও তারা কেন এই ভাষা ব্যবহার করছেন? বিভিন্ন সময় তাদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে আমি যতটা বুঝেছি, তারা শ্রোতা হিসেবে ভাবেন তরুণদের। রাজধানীর অভিজাত এলাকার ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ুয়া তরুণরা মূলত এই ভাষায় কথা বলেন। তারা বাংলা বলতে গেলেও ইংরেজির মতো করে বলেন। আবার উচ্চ মধ্যবিত্ত এবং মধ্যবিত্ত তরুণদের একটি অংশও অভিজাত এই শ্রেণীটাকে অনুকরণের চেষ্টা করেন। এর অর্থ হলো রাজধানীর তরুণদের একটি অংশ এই ‌’খিচুড়ি’ ভাষায় কথা বলেন। কিন্তু এই সংখ্যা আসলে কি সামগ্রিক তরুণসমাজকে প্রতিনিধিত্ব করে?

বিতর্ক যাই থাকুক, তথাকথিত এই এফএম-এর ভাষা যে দূষণ ঘটাচ্ছে তাতে বোধ করি কোনো সন্দেহ নেই। ভাষাবিজ্ঞানীরা এ বিষয়ে বেশ সোচ্চার। তবে শুধু যে এমএম রেডিওর মাধ্যমে এই দূষণ হচ্ছে তাও নয়। সাম্প্রতিক সময়ে গণমাধ্যমে নাট্য নির্মাতাদেরও একটি ঘরানা তৈরি হয়েছে। তারাও তাদের নাটকে এক ধরণের ভাষা ব্যবহার করছেন। এটা নিয়েও অনেকে ক্ষুব্ধ। এর মাধ্যমেও ভাষা দূষণের অভিযোগ তুলছেন অনেকে। কিন্তু সংশ্লিষ্টরা এই অভিযোগ মানতে নারাজ। তাদের বক্তব্য হলো নাটক চলচ্চিত্রে সমাজের চিত্র ফুটে ওঠে। সমাজ-চিত্রই তারা নাটক চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন।

ভাষার এই বিকৃতির বিপক্ষে অনেকই সোচ্চার হয়েছেন। তারা মনে করেন, এই বিকৃতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া প্রয়োজন। আবার কেউ কেউ মনে করেন কঠোর হওয়ার কোনো যুক্তি নেই। কারণ, তাদের মতে ভাষা হলো চলমান নদীর মতো। নদীর প্রবাহমান গতিতে অনেক কিছুই আসবে। এক সময় অপ্রয়োজনীয় অংশটুকু সরে যাবে নদীর স্রোতের তোড়ে।

গত ১৬ ফেব্রুয়ারি আদালতের নির্দেশনাও এসেছে এই বিষয়ে। বেতার ও দূরদর্শনে বিকৃত উচ্চারণ ও ভাষা ব্যঙ্গ করে অনুষ্ঠান সম্প্রচার না করতে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। ওইদিন বাংলায় দেওয়া আদেশে আদালত বলেন, ‘আমরা আদেশ জারি করছি এই মর্মে যে বাংলা ভাষার পবিত্রতা সর্বোচ্চভাবে রক্ষা করতে হবে। এই ভাষার প্রতি আর যেন কোনো আঘাত না আসে, সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।’ একই সঙ্গে আদালত বাংলা ভাষার দূষণ, বিকৃত উচ্চারণ, ভিন্ন ভাষার সুরে বাংলা উচ্চারণ এবং বাংলা ভাষার অবক্ষয় রোধে অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করতেও বলেছেন। ওইসব বিষয়ে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে, এ বিষয়ে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে। এ ছাড়া ওই কমিটিতে কে কে থাকবেন, তা নির্ধারণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে অধ্যাপক আনিসুজ্জামানকে। তবে আদালত কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন, সিরাজুল ইসলাম, নির্মলেন্দু গুণ, সৈয়দ শামসুল হক ও রফিক আজাদের নাম কমিটিতে রাখা যেতে পারে বলেও মত দিয়েছেন।

আদালতের নির্দেশনাটি আসার পর ভাষার বিকৃতির বিপক্ষে আদালতের অবস্থানকে অনেকে স্বাগত জানালেও সমালোচনার পরিমাণও কম নয়। আদালত ওইদিন বাংলায় রায় দিলেও আদালতে নিয়মিতভাবে ইংরেজি ব্যবহার নিয়ে সমালোচনা করেছেন অনেকে। ১৯৯১ সালের ২৮ নভেম্বর হাইকোর্ট বেঞ্চে দেওয়া রায়ে আদালতের ভাষা আর প্রজাতন্ত্রের ভাষা নির্ধারণকে সংবিধানের লঙ্ঘন হিসেবে মন্তব্য করেছেন অনেকে। একে বাংলা ভাষাবিরোধী রায় হিসেবে চিহ্নিত করছেন তারা। ভাষার অবক্ষয় রোধে ড. আনিসুজ্জামানকে নিয়ে যে কমিটি গঠনের কথা আদালত বলেছেন সেই কমিটিকে আদালত এবং সরকারি দপ্তর এবং প্রতিষ্ঠানগুলোতে বাংলা ব্যবহার নিশ্চিত করার বিষয়টি বিবেচনায় রাখার আহবান জানিয়েছেন।

মহান ভাষা আন্দোলনের ৬০ বছর পূর্তির বছরে এসেও বাংলাদেশে ভাষাকে সম্মানের জায়গায় বসানোর জন্য এতো আলোচনার দরকার হচ্ছে এটা নিয়েই চিন্তিত অনেকে।
এখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন হচ্ছে মর্যাদার সঙ্গে।ভাষা নিয়ে বাঙালির সংগ্রামের কথা শুনে বিশ্ববাসী আশ্চর্য হয়, শিহরিত হয়, সম্মানের চোখে তাকায় বাঙালির দিকে। কিন্তু তারা কি জানে আমরা এখনো খিচুড়ি ভাষা নিয়ে, বিকৃত উচ্চারণে বাংলায় কথা বলা নিয়ে বিব্রত?

ভাষা আন্দোলনের ৬০ বছর পূর্তির প্রথম প্রহরে গিয়েছিলাম কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। সেখানে কথা বলেছিলাম অনেকের সঙ্গে। জানতে চেয়েছিলাম এই ষাট বছরে বাংলা ভাষাকে কতটা মর্যাদার জায়গায় নিয়ে যেতে পেরেছি আমরা? প্রায় সবাই বলেছেন রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবেই বাংলা ভাষা সঠিক জায়গায় যেতে পারেনি। তবে তাদের সবারই আত্মবিশ্বাস- ভাষার অধিকার রক্ষায় জীবন দিতে পারা একটি জাতির পক্ষে সেই মায়ের ভাষাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া মোটেও অসম্ভব নয়।

***
ফিচার গ্রাফিক্স: http://www.chillnite.com থেকে সংগৃহিত