ক্যাটেগরিঃ প্রশাসনিক

এতোদিন খেয়াল করেন নি হয়তো, এবার একটু চোখ বন্ধ করে ভাবুন তো। আপনি যে উঁচু দালানটিতে থাকেন সেই ভবনে হুইল চেয়ার চলাচল উপযোগী কোন র‌্যাম্প রয়েছে? জানি বেশিরভাগেরই উত্তর হবে, না।

এবার প্রায় কাছাকাছি বিষয় নির্মিত একটি মুঠোফোন কোম্পানির বিজ্ঞাপনের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি। যেটি বিভিন্ন টেলিভিশনে প্রচার করা হচ্ছে। বিজ্ঞাপনটি ছিল এমনি, ‘বাসার সামনের মাঠে খেলা করছে একদল কিশোর-কিশোরী। এসময় বারান্দা থেকে উঁকি দেয় আরেকজন কিশোর। উঁকি দেয়া কিশোরকে মাঠের কিশোররা খেলায় আহবান করে। কিন্তু সে আসে না। পরে তারা আবিষ্কার করে, তাদের সমবয়সী কিশোরটি (বারান্দার) শারীরিক প্রতিবন্ধী। এবার কিশোররা উপায় বের করার চেষ্টা করে। একদিন তারা নিজেরায় হুইল চেয়ার চলাচল উপযোগী একটি র‌্যাম বানিয়ে ফেলে। এবং সেই র‌্যাম দিয়েই কিশোরকে মাঠে আসার আহবান করে। ওই সময় প্রতিবন্ধী  কিশোরের চোখেমুখে ছিল আনন্দ উচ্ছ্বাস’।

Disability_symbols_16

এ পর্যায়ে একটি প্রশ্ন। বিজ্ঞাপনের শেষের অংশটুকু কি সবসময় সত্য হয়, অন্তত আমাদের বাস্তবতায়। হয় না। কিন্তু হওয়া উচিত ছিল। এক্ষেত্রে শারীরিক প্রতিবন্ধীর জন্য র‌্যাম তৈরিতে তার বন্ধুদের এগিয়ে আসার দরকার নেই। কারণ বাংলাদেশের বিভিন্ন আইন ও বিধিতেই তাদের সে সুযোগের অধিকার দেয়া হয়েছে।

‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন ২০১৩’ তে ‘সর্বজনীন প্রবেশগম্যতা’র যে সুযোগ রয়েছে সে আলোকেই তাদের অধিকার পওয়ার কথা। অর্থাৎ ভবনে যদি সর্বজনীন প্রবেশগম্যতা নিশ্চিতের জন্য পূর্বে থেকেই হুইল চেয়ার উপযোগী র‌্যাম থাকতো তাহলে তো কিশোরটি প্রথম থেকেই খেলতে যেতে পারতেন। এখানে বিজ্ঞাপনের কিশেরটিকে  প্রতীক হিসেবে ধরে নিয়ে এটায় বলা যায়, সর্বজনীন প্রবেশগম্যতার সুযোগ না থাকায় দেশের কোথাও না কোথাও শারীরিক প্রতিবন্ধীরা বিভিন্ন সমস্যায় পড়ছেন।

বিষয়টি আরেকটু খোলাসা করে বলা যায়। আইনে থাকলেও বাংলাদেশের অধিকাংশ বহুতল ভবন, মার্কেট, রেস্টুরেন্টসহ বিভিন্ন স্থাপনায় সর্বজনীন প্রবেশগম্যতার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয় নি। ফলে এখানেও অবাধ যাতায়াত, চলাচল করতে পারছেন না হুইল চেয়ারের ওপর নির্ভরশীল প্রতিবন্ধীরা। বিষয়টি বিল্ডিং কোড না মানার দণ্ডে অভিযুক্ত হলেও সংশ্লিষ্ট ভবন নির্মাণকারীদের আইনের আওতায় আনা হয় না। ফলে এ পর্যন্ত কারো শাস্তি না হওয়ায় যে কোনটি  ভবন নিমার্ণকারীদের মধ্যে এ বিষয়ে সচেতনতাও তৈরি হচ্ছে না।

এখানে প্রসঙ্গক্রমে প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার নিয়ে কাজ করা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন বি-স্ক্যান’ এর ২০১৪ সালের একটি জরিপের তথ্য দিচ্ছি। তাদের নিজস্ব একটি জরিপের ভিত্তিতে সংগঠনটি ওই বছরের ১৬ জুলাই চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে একটি সংবাদ সম্মেলন করেছিলেন । সংবাদ সম্মেলনে তথ্য প্রকাশ করে সংগঠনটির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল, ‘৯০ ভাগ স্থাপনায় প্রতিবন্ধী মানুষের সহজ প্রবেশের সুযোগ নেই’। সংগঠনটির দাবি, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সিড়ির বিকল্প হিসাবে লিফটের ব্যবস্থা নেই যেখানে সিড়ির ধাপগুলো অত্যন্ত উঁচু। সিড়ি বা র‌্যাম্পের শুরু ও শেষে এবং করিডোরে টেকটাইল বা ব্রেইল ব্লক এর সঠিক নিয়ম অনুযায়ী ব্যবহার হয় নি। লিফটে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তির জন্য ব্রেইল বাটন ও ফ্লোর ঘোষণার ব্যবস্থা নেই। বিভিন্ন কক্ষে যেতে সাইন পোস্ট বা দিক নির্দেশনা নেই। এছাড়া হুইলচেয়ার ঘুরানোর পর্যাপ্ত জায়গাও নেই। স্বল্প দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিসহ সকলের জন্য স্থাপনাগুলোতে রঙের সঠিক ব্যবহার করা হয়নি দেয়াল, দরজা বা জিনিসপত্র আলাদাভাবে চেনা বা বোঝার সুবিধার্থে। ইনফরমেশন ডেস্কের উচ্চতাও হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী ব্যক্তিদের তুলনায় অনেক বেশি’।

সার্বজনীন প্রবেশগম্যতা বিষয়ক আইন: ‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩’- এর ধারা ২ (সংজ্ঞা) এর উপধারা ১৩-এ বলা হয়েছে ‘প্রবেশগম্যতা’ অর্থ ভৌত অবকাঠামো, যানবাহন, যোগাযোগ, তথ্য এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিসহ জনসাধারণের জন্য প্রাপ্য সব সুবিধা ও সেবাসমূহ সবার মতো প্রতিবন্ধীদেরও অধিকার’।

২০০৮ সালের ২৯ মে দেশের প্রতিটি ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের কাছে সর্বজনীন প্রবেশগম্যতার বিশেষ বিধান গেজেট আকারে পাঠিয়েছিল সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ। এ বিশেষ বিধানে উল্লেখ করা হয়, সকল ইমারতে পার্কিং স্পেস থেকে সংলগ্ন তলার লিফট লবি (যদি থাকে) পর্যন্ত সর্বজনীনগম্যতার ব্যবস্থা রাখতে হবে। এছাড়া ১০০ বর্গমিটারের উপর ক্ষেত্রফল বিশিষ্ট সকল গণব্যবহার উপযোগী ইমারতে (যেমন : হোটেল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্য সেবা, সমাবেশ ও বাণিজ্যিক ব্যবহার ) প্রতিবন্ধীসহ সর্বজনীনগম্যতা অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে। প্রযোজ্য প্রতিটি ইমারতে টয়লেটসহ চলাচলের প্রতিটি জায়গায় প্রতিবন্ধীসহ সর্বজনীনগম্যতার জন্য প্রবেশাধিকার রাখতে হবে। এছাড়া প্রতিটি কক্ষ, করিডোর, চলাচলের পথ ইত্যাদির কোন না কোন অংশে একটি হুইল চেয়ার ঘুরানোর জন্য ন্যূনতম ১৫,০০মি.মি./১,৫০০মি.মি পরিমাণ বাধামুক্ত জায়গা রাখতে হবে’।

মজার বিষয় হচ্ছে- সরকারের এ বিধি মানা হচ্ছে না। বিশেষ করে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভবনে এই বিল্ডিং কোড না মানায় প্রতিবন্দ্বীর শিক্ষা গ্রহণ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এছাড়া যে সব ভবনে সর্বজনীন প্রবেশগম্যতা আছে সেটি চিহ্নিত করার জন্য ডিজিবিলিটি লোগো রাখা আবশ্যক। এই চিহ্ন থাকলে যে কোন মানুষই বুঝতে পারে সেখানে হুইল চেয়ার এক্সেস আছে। যা এখানে মানা হচ্ছে না। প্রতিটি ফ্লোর হুইলচেয়ার এক্সেসিবল হতে হবে এবং অন্তত একটি হুইলচেয়ার এক্সেসিবল টয়লেট থাকতে হবে। পার্কিং এরিয়া থেকে লিফট পর্যন্ত কোন বাধা থাকতে পারবে না। নতুবা সিড়িঁর পাশাপাশি র‌্যালিংসহ একটি র‌্যাম্প থাকতে হবে। লিফট বা র‌্যাম্প দেওয়া সম্ভব না হলে প্যাটফর্ম লিফটিং জাতীয় যন্ত্র ব্যাবহারের কথাও উল্লেখ আছে সেখানে। স্থায়ী সিমেন্টের র‌্যাম্প রাখা সম্ভব না হলে রাখা যেতে পারে কাঠের অস্থায়ী র‌্যাম্প। যদিও বিল্ডিং কোডে দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের জন্য রাস্তা-ঘাট এবং অফিস-আদালতসহ বিভিন্ন ভবনে সহায়ক ব্যবস্থা সম্বলিত ব্রেইলব্লক এর উল্লেখ রাখা হয় নি। ভবনের বাইরে বিভিন্ন পরিবহনেও সার্বজনীন প্রবেশগম্যতার বিধানটি নিশ্চিত করা হয় নি।

এক্ষত্রেও প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন ২০১৩ অমান্য করার প্রবণতা লক্ষ্যণীয়। কারণ আইনটির ৩২ ধারাতে বলা আছে, ‘আপাতত বলবৎ অন্য কোনো আইনে যাহা কিছুই থাকুক না কেন, সরকার কর্তৃক গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে সকল গণপরিবহনে মালিক বা কর্তৃপক্ষ তৎপরিবহনের মোট আসন সংখ্যার শতকরা ৫ ভাগ আসন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য সংরক্ষিত রাখতে হবে’। বাস্তবতায় তো এটি দেখা যায় না।

শাস্তির বিধান: বিল্ডিং কোড ২০০৮ এর বিধান অনুযায়ী বাংলাদেশের প্রতিটি বিল্ডিংয়ে সার্বজনীন প্রবেশগম্যতা মেনে না চললে তাকে আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ গণ্য করা হয়। বিল্ডিং কন্সট্রাকশন আইন (১৯৯৬ এর ১২ ধারা অনুযায়ী) এটা সর্বোচ্চ সাত বছর কারাদণ্ড বা ন্যূনতম ৫০ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দন্ডনীয়।