ক্যাটেগরিঃ প্রশাসনিক

 

চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী চাক্তাই খালের বর্তমান অবস্থা। ছবিটি খালের ‘মাস্টার পুল’ এলাকা থেকে তোলা।

 

কথাশিল্পী সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ ‘কাঁদো নদী কাঁদো’ উপন্যাসে বলেছিলেন ‘বাঁকাল নদী’র কথা। উপন্যাসটির পাঠক-পাঠিকার মনে স্বভাবতই প্রশ্ন জেগেছিল, কোথায় এ বাঁকাল নদী? উপন্যাসটি প্রকাশিত হওয়ার র্দীঘ চল্লিশ দশকেরও বেশি সময় পর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাঙলা বিভাগের প্রফেসর ড. মোহাম্মদ মহীবুল আজিজের এক প্রবন্ধ থেকে এ প্রশ্নের উত্তর মিলে। প্রাবন্ধিকের দাবি, চট্টগ্রাম শহরের ‘বাকলিয়া খাল’ থেকেই এ ‘বাঁকাল নদী’র ধারণা পান সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ।

‘কাঁদো নদী কাঁদো’ উপন্যাসটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দে। প্রাবন্ধিকের ‘দাবি’র সূত্র ধরে বলা যায়, ৪৭ বছর পূর্বেও চট্টগ্রাম শহরে ‘বাকলিয়া খাল’ ছিল তার পূর্ণ যৌবনে। কিন্তু আজ? স্থাণীয় কিছু প্রবীণ ব্যক্তির স্মৃতির কোষে ছাড়া বর্তমান প্রজন্মের কাছে এই ‘বাকলিয়া খাল’র যৌবন স্রেফ গল্প।

মজার বিষয় হলো, কালের আবর্তে বাকলিয়া খাল এখন তার নামও হারিয়েছে। নগরীর খালগুলোর সংরক্ষণের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের ২০১৪-২০১৫ অর্থ বছরে বিভিন্ন ওয়ার্ডের তথ্য নিয়ে যে বাজেট বই প্রকাশ করে সেখানে বাকলিয়া খালের নাম ছিলই না। যদিও ১৭ নং পশ্চিম বাকলিয়া ওয়ার্ডের উল্লেখযোগ্য খালের তালিকায় ছিল নয়টি খালের তালিকা। একইভাবে ১৮ নং পূর্ব বাকলিয়া ওয়ার্ড, ১৯ নং দক্ষিণ বাকলিয়া ওয়ার্ডর তথ্যকণিকায়ও ছিল না বাকলিয়া খালের। তবে কি বাকলিয়া খাল আজ অস্তিত্বহীন? পুরোপুরি অস্তিত্বহীন বলা না গেলেও এটা বলা যায়, মানুষ সৃষ্ট বহু কারণে খালটির প্রশস্থতা কমে গেছে এবং যেসব এলাকা দিয়ে খালটি প্রবাহিত হয়েছে সেখানে ভিন্ন ভিন্ন নাম ধারণ করেছে খালটি।

শুধু বাকলিয়া খাল নয়, চট্টগ্রাম শহরে কোনমতে এখনো ঠিকে আছে ৩৪টি খাল। এই ৩৪টি খালের কোন কোনটি দিয়ে একসময় ‘নৌকা-সাম্পান’ চলাচল করতে বলে এ অঞ্চলের অনেক প্রবীণের সাথে আলাপকালে জানা গেছে। কোন কোন খালে পাওয়া যেত মাছও। তবে বর্তমানে দুই পাড়ে গড়ে উঠা নানা অবৈধ স্থাপনার কারণে ধীরে ধীরে প্রশস্ততা কমে গেছে খালগুলোর।
অসচেতন নগরবাসীর নিক্ষিপ্ত ময়লা-আবর্জনা, উঁচু দালান তৈরি করার সময় পাইলিংয়ের মাটি নিক্ষেপ এবং পাহাড়ি বালিসহ নানা প্রাকৃতিক কারণে ধীরে খালগুলো ভরাট হয়ে কমে গেছে গভীরতাও। প্রশস্ততা কমে এবং ভরাট হয়ে এসব খাল কোন কোন এলাকায় এমন আকার ধারণ করেছে নে হবে এগুলো সরু নালা। এর ফলে প্রাকৃতিকগতভাবে এসব খাল নগরবাসীর যেসব উপকারে আসার কথা আসছে না। ভরাট হওয়ায় পানি চলাচলে বিঘœ ঘটছে। যার মাশুল গুণতে হচ্ছে প্রতি বর্ষায়। অল্প বৃষ্টিতেই জলযট বা জলাবদ্ধতার কবলে পড়ছেন নগরবাসী।

যেমন গত ৪ এপ্রিল সকাল ছয়টা থেকে সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত ৫৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছিল। আর এতেই পুরো শহরে তীব্র জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। সর্বশেষ গত ২১ এপ্রিল সকাল ছয়টা বিকেল তিনটা পর্যন্ত ৭৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়। এতে তো পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ আকার ধারণ করে। শহরের কোথাও কোমর সমান, কোথাও আবার হাঁটু সমান পানিতে থৈ থৈ অবস্থা। আবারো পুরোনো ভোগান্তিতে পড়েন নগরবাসী। আর এই জলাবদ্ধতার জন্য শহরের খালগুলো পরিষ্কার করা হয় নি অভিযোগ করেন নগরবাসী। ফেসবুকে তো এই নিয়ে কড়া ভাষায় সব স্ট্যাটাসও দিচ্ছিলেন শহরবাসী।

অবশ্য চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আ.জ.ম নাছির দাবি করেন, খাল-নালা খননের মাধ্যমে পরিষ্কার করেন সিটি কর্পোরেশনের পরিচ্ছন্ন বিভাগ। মেয়রের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে আমার কথাও হয়েছিল। তিনি আমাকে বলেছিলেন, ‘উত্তারিধকার সূত্রে তিনি জলাবদ্ধতার সমস্যাটি পেয়েছেন। তিনি এটাও বলেছিলেন আমাকে, ‘চট্টগ্রাম শহরের বিভিন্ন খাল, নালা-নর্দমা দখল, ভরাট এবং অপরিকল্পিত উন্নয়নের কারণে ভয়াবহ পরিস্থিতি বিরাজ করছিল। বাস্তবতা হচ্ছে এ ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যেই আমি দায়িত্ব গ্রহণ করেছি। আমি তো দায়িত্ব নিয়েছি মাত্র এক বছর নয় মাস আগে। এর আগে থেকেই তো সমস্যাগুলো ছিল’। যাই হোক, মেয়রের এই বক্তব্য কিন্তু প্রমাণ করে খালগুলোর সমস্যা আছে। হয়তো বা তার ভাষায় আগে থেকেই।

চট্টগ্রাম শহরের দৃশ্যমান ৩৪ খাল:
চট্টগ্রাম শহরে মোট কয়টি খাল রয়েছে তার সঠিক পরিসংখ্যান কোথাও পাওয়া যায় নি। যদিও বিভিন্ন সময়ে নগর পরিকল্পনাবিদরা চট্টগ্রাম শহরে ১৪৪ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে ১৭টি প্রধান খাল থাকার কথা বলে আসছেন। তবে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন প্রতি বছর বর্ষাকে সামনে রেখে শহরের ৩৪টি ছোট-বড় খাল থেকে মাটি, ময়লা-আর্বজনা অপসারণ করে থাকে। এ হিসাবেই এখনো ৩৪টি খাল রয়েছে, যেগুলো দৃশ্যমান। তবে এসব খালের প্রতিটিই হারিয়েছে তার প্রশস্ততা।

২১ এপ্রিলের জলাবদ্ধতার ফাইল ছবি।
এসব খালের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- চাক্তাই খাল, মির্জা খাল, রাজা খাল, চশমা খাল, নাছির খাল, বির্জা খাল, খন্দকিয়া খাল, কাজির খাল, গয়নাছড়া খাল, বামনশাহী খাল, কাট্টলী খাল, ত্রিপুরা খাল, ডোম খাল, শীতল ঝর্ণা ছড়া খাল, মায়া খাল, হিজড়া খাল, মহেশখাল, ডাইভারশন খাল, মরিয়ম বিবি খাল, সদরঘাট খাল, রামপুরা খাল, পাকিজা খাল, মোগলটুলী খাল উল্লেখযোগ্য।

চট্টগ্রাম শহরের জন্য ১৯৯৫ সালে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের করা হয়েছিল ড্রেনেজ মাস্টার প্ল্যান। এই মাস্টার প্ল্যান স্ট্যাডি করে দেখা গেছে, চট্টগ্রাম শহরের ‘সদরঘাট খাল’টি জুবিলী রোড, রিয়াজুদ্দিন বাজার ও সদরঘাটের ৮০ হেক্টর আবাসিক এলাকার উপর দিয়ে প্রবাহিত। ‘নাসির খালটি’ বটালি হিল, দেওয়ানহাট, পশ্চিম আগ্রাবাদ ও আগ্রাবাদের ৩১৫ হেক্টর এলাকার উপর দিয়ে প্রবাহিত। ফৌজদারহাট শিল্প এলাকা, হালিশহর, কাট্টলি,পাহাড়তলী ও সল্টগোলার ৩০৬৪ আবাসিক এলাকার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে ‘মহেশখাল’।

চকবাজার, দেওয়ান বাজার, জামাল খান, স্টেডিয়াম এলাকা, চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ এলাকা দিয়ে গেছে ‘চাক্তাই খাল’। লালখান বাজার, ষোলশহর, মেহেদীবাগ, নাসিরাবাদ, পাঁচলাইশ, শুলকবহর, বহাদ্দারহাট এবং বাকলিয়া এলাকার উপর দিয়ে গেছে ‘হিজরা খাল’, ‘মির্জা খাল’ ও ‘বাকলিয়া খাল’।

কহরের ফ’স লেক, বায়োজিদ বোস্তামী, অক্সিজেন, চান্দগাঁও, কালুরঘাট, খাজা রোড সংলগ্ন বাকলিয়া এলাকার সাথে সম্পৃক্ততা রয়েছে ‘শীতল ঝর্ণা ছরা খাল’র। মনসুরাবাদ থেকে আনন্দপাড়া পর্যন্ত এলাকায় হচ্ছে ‘পাকিজা খাল’। আমবাগান থেকে আগ্রাবাদ আবাসিক এলাকায়ও গেছে ‘পাকিজা খাল’।

সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রাম শহরের খালগুলো ঘুরে দেখেছিলাম। দেখা গেছে, প্রায় সব খালের প্রধান সমস্যা অবৈধ দখলদার কর্তৃক খালের প্রশস্থতা কমিয়ে ফেলা। কোন কোন খালের অংশ বিশেষ তো ময়লা-আর্বজনায় ভরাট হয়ে আছে। এসব চিত্র দেখে মনে হচ্ছিল, একসময় চট্টগ্রাম শহরের ঐতিহ্যের খালগুলো এখন এই অঞ্চলের মানুষের প্রধান দু:খের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এখানে উল্লেখ করতে হয়, ১৯৯৫ সালে ইউএনডিপি ও ইউএনএইএস এর সহায়তায় চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ শহরের জন্য ২০ বছর মেয়াদী মাস্টার প্ল্যান প্রণয়ন করে। যা ১৯৯৯ সালের ৩ মার্চ সরকারের চূড়ান্ত অনুমোদন লাভ করে। ২০১৫ সালে এর মেয়াদ শেষ হয়। মজার বিষয় হল, ২০ বছর মেয়াদী এ ড্রেনেজ মাস্টার প্ল্যানে খালগুলো নিয়ে যেসব সুপারিশ ছিল তার পুরোপুরি বাস্তবায়নে এগিয়ে আসেনি কোন সংস্থা। নগর উন্নয়নে সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখা সিটি কর্পোরেশন এবং চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষও কোন উদ্যোগ নেয়নি। এমনকি এ অঞ্চল থেকে নির্বাচিত মন্ত্রী-সাংসদরাও এ ক্ষেত্রে এগিয়ে আসেনি।