ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

 
Humayun-11

বৃষ্টির আলতো ছোঁয়ায় ঘুম ভেঙেছে। জানালা খুলে ঘুমোনোতে এ পাওয়া। বৃষ্টি আমার ভীষণ প্রিয়। তবে বৃষ্টির সৌন্দর্য উপভোগ করি কেবল অবসর মুহূর্তগুলোতে। আজ অবসরে নেই। তবু ভাল লাগছে। বৃষ্টি উপভোগ্য। তবে আমি বৃষ্টিকে আকাশের কান্না হিসেবেই দেখি। এ কান্না, সুখের। কষ্টের নয়। তবে আজকের বৃষ্টিটা সুখের নয়। সত্যিকার অর্থেই কাঁদছে আকাশ। কারণ, আজ আকাশের কষ্টের দিন। এ কষ্ট স্বজন হারানোর। এই স্বজনের নাম হুমায়ূন আহমেদ।  ১৯ জুলাই হুমায়ূন আহমেদের পঞ্চম মৃত্যুবার্ষিকী। তাই কাঁদছে আকাশ। ঝড়ছে বৃষ্টি নাম নিয়ে। বৃৃষ্টি ভালোবাসতেন হুমায়ূন আহমেদ। যখন তিনি প্রেমিক, তখন প্রিয়তমার প্রতি আকুলতাও ছিল এই বৃষ্টির দিনে। তাঁর ভাষায়-

“যদিও তখন আকাশ থাকবে বৈরী,
কদমও গুচ্ছ হাতে নিয়ে আমি তৈরি…
উতলা আকাশ মেঘে মেঘে হবে কালো
ঝলকে ঝলকে নাচিবে বিজলি আলো
তুমি চলে এসো এক বরষায়
যদি মন কাদে তুমি চলে এসো এক বরষায়।”

হুমায়ূনের এই আহবানে আজ সাড়া দিচ্ছেন তাঁর হাজারো ভক্ত-অনুরাগী। সবাই ছুটছেন নুহাশ পল্লী।

‘প্রেমে পড়া মানে নির্ভরশীল হয়ে পড়া। তুমি যার প্রেমে পড়বে সে তোমার জগতের একটা বিরাট অংশ দখল করে নেবে। যদি কোনো কারণে সে তোমাকে ছেড়ে চলে যায়, তবে সে তোমার জগতের ঐ বিরাট অংশটাও নিয়ে যাবে। তুমি হয়ে পড়বে শূন্য জগতের বাসিন্দা’। অগণিত ভক্তের হৃদয় হরণকারী, ‘শব্দশিল্পী‘ হুমায়ূন আহমেদ অনেক আগেই হয়তো উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন তার চলে যাওয়ার পর ‘হুমায়ূন ভক্ত’রা নি:স্ব হয়ে যাবেন। তাই তিনি উচ্চারণ করেছিলেন- ‘প্রেমে পড়া মানে….শূন্য জগতের বাসিন্দা’।

আমার অযোগ্যতা হচ্ছে, জীবদ্দশায় জনপ্রিয়তার তুঙ্গে থাকা এই কথাসাহিত্যকের হাতেগোনা কয়েকটি ছাড়া বেশি উপন্যাস আমার পড়ার সুযোগ হয় নি। বছরখানেক আগে তাঁর সর্বশেষ লেখা উপন্যাসটি কিনেছিলাম। যেদিন কিনলাম সেদিনই প্রিয় এবং স্নেহের এক ভাই বইটি আমার কাছ থেকে নেয়; ফলে সেটিও পড়া হয়নি। মন না টানায় কিংবা আমার ব্যথর্তার কারণে হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস কম পড়া হলেও তাঁর পরিচালনায় নাটক-সিনেমার বেশিরভাগই দেখেছি এবং প্রতিবারই মুগ্ধ হয়েছি।

ভাবি, চারিদিকে হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে এত উচ্ছ্বাস তা নিশ্চয়ই তাঁর সৃষ্টিগুলো মানুষকে নাড়া দিয়েছে বলে। যে কোনদিন গল্পের বই পড়েনি সে যখন হিমু সমগ্র নিয়ে বসে তখন নিশ্চয়ই মানতে হবে, হুমায়ূন আহমেদের সৃষ্টিতে পাঠক-পাঠিকার মন ভরিয়ে দেয়ার উপাদান আছে। বাঙলা সাহিত্যকে কি দিয়েছেন সেটা বাদ দিলেও অসংখ্য বাঙলাভাষীকে তিনি বইমুখী করতে পেরেছেন সেটায় বড় স্বার্থকতা হুমায়ূন আহমেদের।

ক্লাশ এইট- নাইন থেকে অনার্স শেষ করার আগ পর্যন্ত সময়গুলোতে নিয়মিত ডায়েরি লিখতাম। কোথায় কিছু পড়ে ভাল লাগলে তা লিখে রাখতাম ডায়েরিতে। তেমন একটি পুরোনো ডায়েরির পাতা উল্টাতে গিয়ে একটা জায়গায় চোখ আটকাল। হুমায়ূন আহমেদের কোন একটি উপন্যাস থেকে নেয়া কিছু অংশ লেখা ছিল সেখানে। লেখাটি এমন – ‘অতি সহজেই আমরা মানুষ সম্পর্কে একটা সিদ্ধান্তে চলে আসি। মানব চরিত্রের এটা একটা বড় দুর্বলতা। একটা মানুষ সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেব তাঁর মৃত্যুর বার বছর পর। মৃত্যুর পরপর কোন মানুষ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেয়া যায় না। মৃত্যুর কারণে লোকটার প্রতি মমতা চলে আসে’।

‘সঞ্চয়িতা’র ক্লাশে একবার প্রিয় ময়ূখ স্যারকে ( প্রফেসর বাঙলা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়) জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাসে তুলনামূলকভাবে নজরুল উপেক্ষিত কেন’? স্যার কিছুটা রেগে গিয়েছিলেন, প্রশ্ন শুনে। বললেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াক বা না পড়াক, মানুষ পড়ুক বা না পড়ুক নজরুল বেঁচে থাকবেন সবসময়। প্রতি বছর ঈদ এলেই তো ঘরে ঘরে বেজে উঠবে, ‘ও মন রমজানেরই রোযার শেষে এল খুশির ঈদ’। এই গানের বিকল্প আছে? এটা দিয়েই তো নজরুল বেঁচে থাকবে। কেন চিন্তা করেন’। জাতীয় কবি নজরুলকে নিয়ে ময়ূখ স্যারের কথাটি হুমায়ূন আহমেদের জন্যও প্রাসঙ্গিক মনে হয় আমার কাছে। ওই যে, বহুব্রীহি নাটকে টিয়ে পাখির মুখ দিয়ে বলা ‘তুই রাজাকার’ সংলাপ দিয়েই তো বেঁচে থাকবেন হুমায়ূন আহমেদ।

আসলেই তো। আমার প্রিয় কবিদের একজন পূর্ণেন্দু পত্রী ঠিকই বলেছেন….

‘কোন কোন কবি এক লাইনেই অমর।
আর সে রকম পংক্তির জন্য
একজন কবির কাছে পৃথিবী আজন্ম নতজানু।’

***
স্টাফ রিপোর্টার, দৈনিক আজাদী ( স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সংবাদপত্র)