ক্যাটেগরিঃ সেলুলয়েড

 
halda-1

 

হালদা। একটি নদী। চট্টগ্রামের সম্পদ নদীটির দুইপাড়ের মানুষের গল্প নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্রের নামও ‘হালদা’। মানব জীবনও বহতা নদীর মত, হালদা ছবির মধ্য দিয়ে সেটিই যেন আবার মনে করিয়ে দিলেন এর নির্মাতা তৌকির আহমেদ।

মা ও মাতৃত্বের গল্প হালদা। এক নারীর গল্প হালদা। নিপীড়িত এক নারীর প্রতিবাদী হয়ে উঠার গল্প। সর্বোপরি সভ্যতার নেকাব পরা লোভী মানুষগুলোর মুখোশ উন্মোচনের চেষ্টা ছিল এ গল্পে। সুনিপুণ অভিনয়ের মধ্য দিয়ে এ গল্পকে জীবন্ত করে তুলেন ছবিটির প্রত্যেক অভিনেতা-অভিনেত্রী।

চট্টগ্রামের সিনেমা হল আলমাসে হালদা ছবির নিমার্তা তৌকির আহমেদসহ কলাকুশলীরা। ‘হালদা নদী রক্ষা কমিটি’ তাদের সংবর্ধনা দেয় ৯ ডিসেম্বর।

হালদা চলচ্চিত্রের মূল চরিত্র হাসু (নুসরাত ইমরোজ তিশা)। জেলে মনু মিয়ার (ফজলুর রহমান বাবু) মেয়ে হাসু। হাসুর বিয়ে হয় সম্ভ্রান্ত জমিদার বংশের ছেলে ও ইটভাটার মালিক নদের চৌধুরীর (জাহিদ হাসান) সাথে। অবশ্য নদের বিবাহিত। তার প্রথম স্ত্রী জুঁই (রুনা খান) বংশে প্রদীপ জ্বালাতে পারে না। তাই জুঁইয়ের শাশুড়ি সুরৎ বানু (দিলারা জামান) ছেলে নদেরের দ্বিতীয় বিয়ে দেয় হাসুর সঙ্গে। দিন যায়, হাসুর মধ্যেও সন্তান ধারণের কোন লক্ষণ দেখা যায় না। এই নিয়ে ফোঁড়ন কাটে সুরৎ বানু। একদিন হাসু বাপের বাড়ি যায়। শ্বশুর বাড়িতে ফিরে আসার কিছুদিন পর তার মধ্যে পরিবর্তন লক্ষ্য করেন সুরৎ বানু। অনাগত বংশের প্রদীপকে বরণ করে নিতে চলে প্রস্তুতি। কিন্তু খুুশি নন নদের। তার দাবি, এ সন্তান তার না।

নদেরের সন্দেহকে সত্য করে দিয়েই এক রাতে হাসু পালিয়ে যান তাদের বাড়িতে আশ্রয় পাওয়া বদিউজ্জামানের (মোশাররফ করিম) সঙ্গে। অবশ্য শেষ রক্ষা হয় না। বদিউজ্জামানকে হত্যা করে নদেরের লোকজন। তার নিথর দেহকে পুড়িয়ে ফেলা হয় নদেরের ইট ভাটায়। হাসুকে নিয়ে আসে নদের। ছবির একদম শেষ দিকে এসে নদেরকে খুন করে বদিউজ্জামানকে হত্যার প্রতিশোধ নেয় হাসু।

হালদা ছবির অভিনেত্রী তিশা ও রুনা খানের সঙ্গে চট্টগ্রামের সাংবাদিকরা।

 

হালদাপাড়ের জেলে কন্যা হাসুর জীবনের নানা ঘাত-প্রতিঘাতকে কেন্দ্র করে এগিয়েছে চলচ্চিত্রটির কাহিনি। নদী ও নারী, এই পৃথক সত্ত্বার মধ্যেও এক ধরনের সংযোগ ঘটিয়েছেন নির্মাতা তৌকির আহমেদ। অবশ্য নারী ও নদীর স্বভাবগত মিল অনেক আগেই বিশ্বসাহিত্যের মঞ্চে এসেছে।

একজন নারী হাসু। যাকে ঋণগ্রস্থ বাবার দুর্দশা লাঘবে ইচ্ছের বিরুদ্ধে বিয়ে করতে হয় নদেরকে। স্বামীর বাড়ি এসেও নিপীড়িত সে। মানসিকভাবে তো আছেই, শারীরিকভাবেও স্বামী দ্বারা লাঞ্ছিত। তার প্রতিপক্ষ হয়ে ওঠে আরেক নারী, তার সতীন জুঁই।

চট্টগ্রামের রাউজান ও হাটহজারী উপজেলার পাশ দিয়ে যাওয়া হালদা নদীর খ্যাতি মূলত মৎস্য প্রজননের জন্য। দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র নদী হালদা, যে নদী থেকে সরাসরি নিষিক্ত ডিম সংগ্রহ করা হয়। তাই এ নদীর দুইপাড়ের মানুষদের কাছে মাছের প্রজনন মৌসুমটা খুব গুরুত্ববহ। হালদা ছবিতেও গুরুত্ব পেয়েছে মাছের প্রজননের বিষয়টি। একইসঙ্গে এখানে গুরুত্ব পেয়েছে মাতৃত্ব। দুটোর সমীকরণ ছিল অনন্য। মাতৃত্বের আকাঙ্ক্ষায় থাকেন নদেরের পরিবার। আবার মাছের প্রজনন মৌসুমের জন্যও কাতর থাকেন জেলেরা।

হালদা পাড়ের জেলেরা অপেক্ষায় থাকে হালদায় কখন মা মাছ ডিম ছাড়বে তার। আবার তারাই হালদাকে ধ্বংস করার খেলায় মেতেছে। বাঁক কেটে ধ্বংস করা হয়েছে মৎস্য প্রজননের জন্য সুবিধাজনক স্থানগুলো। কল-কারখানার তরল বর্জ্য ফেলা হচ্ছে এ নদীতে। হালদা পাড়ে অবৈধভাবে স্থাপন করা হয়েছে ইট-ভাটা। এটিও নদীর জন্য ক্ষতিকর। ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে উত্তোলন করা হচ্ছে বালি। যা মা-মাছের চলাচলে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে।

দুটো বিষয় পাশাপাশি রাখলে যা স্পষ্ট হয়, নদীকে ধ্বংস করেও তার কাছ থেকে প্রত্যাশা করি। একইভাবে নারীকে প্রতিনিয়ত নিপীড়ন করেও তার কাছে আমাদের প্রত্যাশা থাকে। কিন্তু প্রকৃতি তা মেনে নেয় না। তাই পূর্ণ মৌসুমেও ডিম না পেয়ে হতাশ হন জেলেরা। একইভাবে প্রকৃতির আরেক সৃষ্টি নারীও প্রতিশোধ নেয়।

হালদা ছবির নির্মাতা তৌকির আহমেদের সঙ্গে

নদী ও নারী; এই দুই সত্ত্বার সংযোগ ঘটাতে গিয়ে কাহিনিতে এসেছে হালদাপড়ের লোকজীবন ও সংস্কৃতিও। হালদাপাড়ের মানুষের উৎসব নৌকাবাইচ, ব্যাঙের বিয়ে, বলীখেলা, কবিগান, মাইজভান্ডারী গানও ছিল উপকরণ হিসেবে।

হালদা নদীর চারপাশে গড়ে ওঠা ইটিপিহীন বিভিন্ন শিল্প-প্রতিষ্ঠান ও কারখানা থেকে নির্গত বর্জ্য পদার্থ, চারপাশের জমির কীটনাশকসহ নানা কারণে নদীটি যে দিন দিন হুমকির মুখে পড়ছে সেটিও বাদ যায়নি। নদীর পাড়ে গড়ে ওঠা ইটভাটার কারণে হালদা যে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে আছে সেই গল্পও। হালদা নদী রক্ষায় বিভিন্ন সময়ে সামাজিক আন্দোলন ও মানবন্ধনও হয়েছে। বিষয়গুলোও আছে এই চলচ্চিত্রে।

হালদা ছবিটির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক এর সংলাপ। হালদা পাড়ের মানুষ যে ভাষায় কথা বলেন সেটায় সংলাপ হিসেবে ছিল এ চলচ্চিত্রে। অর্থাৎ চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় বহাল রাখা হয়েছে। তবে পরিপূর্ণ আঞ্চলিক ভাষা ছিল না। অবশ্য সারাদেশের মানুষের বোঝার সুবির্ধাথে এমনটি করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে হালদা চলচ্চিত্রের পরিচালক তৌকির আহমেদ সাংবাদিক সম্মেলনে বলেছেন, ‘ভাষার ব্যাপারে আমার সেন্সিটিভিটি আছে। আঞ্চলিক ভাষাকে আমি সম্মান করি। আঞ্চলিক ভাষা হচ্ছে মায়ের মত। আমরা ঢাকায় গিয়ে যে ভাষায় কথা বলি সেটা হচ্ছে প্রমিত বাংলা। কিন্তু আমি মনে করি, সিলেট, বরিশাল প্রত্যেকটি ভাষাতেই ছবি করা যায়। তবে আমরা চট্টগ্রামের ভাষাকে সহজ করেছি। না হলে সবাই বুঝতে পারতো না। যা করেছি তাতে কিন্তু বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না।’

হালদা ছবিতে অনেগুলো নেতিবাচক দিকও আছে। যদিও সাধারণের চোখে সে সব ধরা পড়বে না। তবে একটি বিষয় সবার চোখে ধরা পড়েছে। ‘ইটিপি না থাকায় নাদেরর ইটভাটা সীলগালা করে দেয়া হয়।’ কিন্তু দেশের প্রচলিত আইনে ইটভাটার জন্য ইটিপি লাগে না! বিষয়টি হয়তো তৌকির আহমেদের দৃষ্টিতে আসেনি।

মোরশেদ তালুকদার, গণমাধ্যমকর্মী॥