ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) উদ্যোগে একটি অভিযান চালানো হয়েছিল গত ৭ ফেব্রুয়ারি। ওই অভিযানে সাইনবোর্ডে বাংলা না লেখায় গুলশান এলাকার ১৮ প্রতিষ্ঠানকে (প্রত্যেককে ১০ হাজার টাকা করে) জরিমানা করেছিল। পরবর্তীতে ১৫ ফেব্রুয়ারি আসাদ গেইট এলাকায়ও সাত প্রতিষ্ঠানকে একই অপরাধে ৪৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছিল।

বাংলা ভাষার ব্যবহার নিশ্চিতে পরিচালিত অভিযানগুলো দেখে মনে মনে ভাবছিলাম,  অভিযান চালিয়েই বা কেন বাংলা ভাষার বিষয়ে সচেতন করতে হবে!  বাংলাদেশে থেকেও বাংলা ভাষায় সাইনবোর্ড লিখতে এত লজ্জ্বা কেন আমাদের? আমরা কি কেবল ফেব্রুয়ারি মাস এলেই বাংলা ভাষার ইতিহাস বলতে বলতে মুখে ফনা তুলব? আর বছরের বাকি সময়টুকুতে এই ভাষাকে অবহেলা করেই যাবো?

বাংলা ভাষাকে মন থেকে ধারণ করতে সমস্যা কোথায়?  ভিনদেশি ভাষায় লেখা সাইনবোর্ডগুলো কি দেখতে খুব আকর্ষণীয় হয়? খুব অর্থবহ হয় কি ভিনদেশি ভাষায় দেয়া সাইনবোর্ড? মোটেই না। আমি তো জোর গলায় বলতে পারি, বাংলা ভাষার চেয়ে সমৃদ্ধ শব্দভাণ্ডার পৃথিবীর আর কোন ভাষায় নেই। তাহলে কেন ভিনদেশি ভাষার প্রতি আমাদের এত আগ্রহ?

এই জায়গায় এসে পাঠকদের প্রতি একটি আহবান, আমরা কি পারি না আমাদের মাতৃভাষাকে সম্মান করে না এমন লোকদের এড়িয়ে চলতে? যেসব প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ডে ভিনদেশি ভাষা থাকবে সেইসব প্রতিষ্ঠানকে বর্জন করতে? ভেবে দেখুন। প্রিয় পাঠক, ভাষার মাসে একটি আহবান। আসুন, ভিনদেশি ভাষায় সাইনবোর্ড আছে এমন প্রতিষ্ঠানগুলোকে বর্জন করি।

নিজের মর্জিমাফিক যা খুশি তা করতে পারবো আমরা? দেশের প্রচলিত আইন সেই সুযোগ দেয়নি আমাদের। আমরা কি ভুলে গেছি, ২০১৪ সালেই উচ্চ আদালত সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছিল, ‘সাইনবোর্ড বাংলায় লিখতে হবে।’ তবুও আদালতের নির্দেশনা মানছি না কেন?

২০১৫ সালের ১৮ আগস্ট উচ্চ আদালতের একটি রায়ে মন্তব্য করা হয়েছিল, ‘বাংলা ব্যবহারে দৃশ্যত কোনো অগ্রগতি নেই।’ ২০১৬ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে পাঠানো চিঠিতে ‘সাইনবোর্ড, বিলবোর্ড, ব্যানার ইংরেজির স্থলে বাংলায় প্রতিস্থাপিত হয়েছে বলে দেখা যায় না’ উল্লেখ করে বলা হয়েছিল, এটা বাংলা ভাষা প্রচলন আইন, হাইকোর্টের রুল ও আদেশের পরিপন্থী।’

বাংলা ভাষায় সাইনবোর্ড লেখা নিশ্চিত হচ্ছে না :
২০১৭ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি। শহরের বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যমান সকল সাইনবোর্ড পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে বাংলা ভাষায় প্রতিস্থাপনের নির্দেশ দিয়ে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছিল চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন। এর প্রায় এক বছর পর গত ১ ফেব্রুয়ারি (২০১৮) আরেকটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে সংস্থাটি। এতে বলা হয়, ‘‘ইদানিং লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে, কোন কোন প্রতিষ্ঠানের নামফলক, সাইনবোর্ড, ব্যানার ইংরেজি ও অন্যান্য ভাষায় লেখা হয়েছে।’’

ফেব্রুয়ারি মাসের শুরুতে ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের পক্ষেও বাংলা ভাষায় সাইনবোর্ড লেখার জন্য নির্দেশনা দিয়ে বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়েছিল। সর্বশেষ এ বিজ্ঞপ্তিগুলোই প্রমাণ করে, চট্টগ্রাম ও ঢাকা শহরে ভিনদেশি ভাষায় লেখা ব্যানার-সাইনবোর্ড রয়েছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের বাকি জেলাগুলোতেও একই অবস্থা।
উচ্চ আদালতের নির্দেশনা পুরোপুরি বাস্তবায়িত না হওয়ার কারণ কী? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে জানা গেছে, মাঠ পর্যায়ে সঠিক তদারকির অভাবেই উপেক্ষিত থেকে গেল উচ্চ আদালতের নির্দেশনা। পাশাপাশি যে সব ব্যক্তি তাদের প্রতিষ্ঠানের নামে ব্যানার, সাইন বোর্ড বা নামফলক দেন তাদের অসচেতনতা। কোন কোন ক্ষেত্রে ওইসব ব্যক্তি বাংলা ভাষাকে প্রকৃত অর্থে হৃদয়ে ধারণ করতে ‘না পারা’ কাজ করেও বলে মনে করেন কেউ কেউ।

তদারকির দায়িত্ব কার?
একটি রিটের প্রেক্ষিতে ২০১৪ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি উচ্চ আদালতের দেয়া রায়েরে আদেশে দেশের সব সাইনবোর্ড, বিলবোর্ড, ব্যানার, গাড়ির নম্বরপ্লেট সরকারি দপ্তরের নামফলক এবং গণমাধ্যমে ইংরেজি বিজ্ঞাপন ও মিশ্র ভাষার ব্যবহার বন্ধ করতে নির্দেশ দেন। বিষয়ে সরকারকেই ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছিল ওই সময়।

আদালতের রায়ের প্রেক্ষিতে, একই বছরের ১৪ মে ১৪ মে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় চিঠি দিয়ে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডগুলোকে আদেশটি কার্যকর করতে বলেছিল। পরবর্তীতে ২০১৬ সালের ২৮ জানুয়ারি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে আরেকটি চিঠি দেন। ওই চিঠিতে উচ্চ আদালতের নির্দেশনার কথা উল্লেখ করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে সাইনবোর্ড, বিলবোর্ড, ব্যানার ইংরেজির স্থলে বাংলায় রুপান্তরের উদ্যোগ নেওয়ার জন্য অনুরোধ করা হয়েছিল।

অর্থাৎ চট্টগ্রাম শহরে চট্টগ্রাম কর্পোরেশন বিষয়টি কার্যকর করবে। তাছাড়া চট্টগ্রাম শহরে সাইনবোর্ডের অনুমোদনও দেয় সংস্থাটি। একইসঙ্গে বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেরও ট্রেড লাইসেন্স দেয় সংস্থাটি। একইভাবে রাজধানীতে ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন।

বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেই দায় এড়ানো:
প্রতি বছর ফ্রেব্রুয়ারি মাস এলেই বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেই যেন দায়িত্ব পালন করে সিটি কর্পোরেশনগুলো। এর বাইরে সারা বছর উল্লেখযোগ্য দৃশ্যমান কোন তৎপরতা দেখা যায় না। যদিও সংস্থাগুলোর দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের দাবি, সবসময় তদারকি করেন তারা। একইসঙ্গে লাইসেন্স নবায়ন করার সময়ও বিষয়টি দেখা হয়।

বাংলা ভাষায় সাইনবোর্ড নিশ্চিতে সর্বশেষ গত ১ ফেব্রুয়ারি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন। এতে উচ্চ আদালতের নির্দেশনাটি উল্লেখ করে বলা হয়, ‘সিটি কর্পোরেশন আওতাধীন এলাকায় (দূতাবাস, বিদেশি সংস্থা ও তৎসংশ্লিষ্ট ক্ষেত্র ব্যতীত) যে সব প্রতিষ্ঠানের নামফলক, সাইনবোর্ড, ব্যনার ইত্যাদি লেখা হয় নি তা স্ব উদ্যোগে আগামী ১৫ ফেব্রুয়ারির মধ্যে ইংরেজির পাশাপাশি বাংলায় লিখে প্রতিস্থাপন করা এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ট্রেড লাইসেন্স নতুন/ নবায়ন করার অনুরোধ করা হয়।’ নির্দিষ্ট সময়ের পর আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে বলেও এতে উল্লেখ করা হয়।’

এদিকে সিটি কর্পোরেশনের ওই বিজ্ঞপ্তি নিয়েও আছে সমালোচনা। কারণ এতে বলা হয়, ‘ইংরেজির পাশাপাশি বাংলায় রুপান্তর।’ সাধারণ লোকজন বলছেন, ‘বাংলার পাশাপাশি ইংরেজি’ লেখায় অধিক যৌক্তিক।

এর আগে ২০১৭ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছিল,

‘এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা। বাংলাদেশ একটি জাতি রাষ্ট্র। ১৯৫২ সালে মায়ের ভাষার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির জন্যও বাংলাদেশের মানুষ অকাতরে রক্ত দিয়েছে। ফেব্রুয়ারি মাস বাঙালির ভাষার মাস। প্রদর্শিত সকল সাইনবোর্ড বাংলা ভাষায় লেখার বিষয়ে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের নির্দেশনা থাকা সত্তেও অসংখ্য সাইনবোর্ড ইংরেজিসহ অন্যান্য ভাষায় পরিলক্ষিত হচ্ছে- যা কাঙ্খিত নয়।’

এছাড়া চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন এলাকায় বিদ্যমান সকল সাইনবোর্ড পরবর্তী ত্রিশ দিনের মধ্যে বাংলা ভাষায় রুপান্তর করার জন্য চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নগরবাসীর প্রতি অনুরোধ করার পাশাপাশি বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছিল,

‘কেউ ইচ্ছ করলে বাংলার পাশাপাশি ছোট পরিসরে ইংরেজিতেও লিখতে পারবেন।’

লেখক – মোরশেদ তালুকদার
স্টাফ রিপোর্টার , দৈনিক আজাদী (স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সংবাদপত্র)