ক্যাটেগরিঃ প্রশাসনিক

সরকারি চাকরির নিয়োগে বিদ্যমান কোটা সংস্কারের দাবিতে চলমান আন্দোলনের খবর কম-বেশি সবাই জানি। সামগ্রিক কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন বলা হলেও আন্দোলনকারীদের প্রধান টার্গেট মুক্তিযোদ্ধা কোটা সংস্কার। এই আন্দোলনকে যারা সমর্থন করেন তারাও মুক্তিযোদ্ধা কোটার বিরুদ্ধে কথা বলেন। মাঝে মাঝে এমন বক্তব্যও শুনেছি, যার সারমর্ম মুক্তিযোদ্ধার ছেলেরা মেধা দিয়ে নয়, কোটা দিয়ে চাকরি পায়। আরেকটু সহজ করে বললে, মুক্তিযোদ্ধার ছেলেদের মেধা ও যোগ্যতা নিয়ে কোটা সংস্কারপন্থীদের অনেকেই সন্দিহান। আসলেই কি মুক্তিযোদ্ধার ছেলে মানেই মেধাহীন?

কোটা সংস্কার দাবিতে যখন আন্দোলন  চলছে তখনি চাকরিতে “মুক্তিযোদ্ধা কোটা” বহাল রাখার ঘোষণা দিয়েছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এই ঘোষণার জন্য তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মুক্তিযোদ্ধা কোটা বহাল রাখার পিছনে কিছু যুক্তি দিয়েছেন, এই যুক্তিগুলো একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হিসেবে আমাকে অনেক বেশি আনন্দিত করেছে।

গত ২১ মার্চ চট্টগ্রামের পটিয়ায় আওয়ামী লীগ আয়োজিত জনসভায় বক্তব্য দিয়েছিলেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। কর্মসূত্রে ওই বক্তব্য শুনেছিলাম সমাবেশে উপস্থিত থেকেই। ওই বক্তব্যেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মুক্তিযোদ্ধা কোটা প্রসঙ্গে বলেছিলেন।

“মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগের জন্যই আমরা আমাদের স্বাধীনতা পেয়েছি” উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, “এই কথা ( মুক্তিযোদ্ধাদের ত্যাগ) ভুললে চলবে না। কাজেই তাদেরকে আমাদের সম্মান দিতে হবে। তাদের ছেলে–মেয়ে নাতি–পতি পর্যন্ত যাতে চাকরি পায় তার জন্য কোটার ব্যবস্থা করে দিয়েছি। আর যদি কোটা না পাওয়া যায়, সেটা শিথিল করা আছে, যেখানে মেধাবী ছাত্র–ছাত্রী তাদেরকে চাকরি দেয়া যাবে। মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য এই বিশেষ ব্যবস্থা করতেই হবে। কারণ, তাদের আত্মত্যাগের জন্যই তো আজকে চাকরির সুযোগ, এই স্বাধীনতা, আজকে মানুষের উন্নয়ন। যদি দেশ স্বাধীন না হতো তাহলে কোনো উন্নয়ন হতো না, কারো কোনো চাকরিও হতো না, কোনো উচ্চ পদেও কেউ যেত পারতো না। একথাটা ভুললে চলবে না। তাই তাদেরকে আমরা সম্মান করি।”

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বারবার মুক্তিযোদ্ধাদের ত্যাগের কথা বলেছেন। আসলেই তো, দেশ স্বাধীন না হলে কিসের চাকরি? আর কোটা সংস্কারের নামে কেউ কি “মুক্তিযোদ্ধা কোটা” নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারতেন? না। ওই জায়গা থেকে তো আমরা কখনো চিন্তা করি না। হয়তো ইচ্ছে করেই এড়িয়ে চলেছি বিষয়টা। তবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বিষয়টা উপলব্ধি করেছেন। সে জন্য প্রধানমন্ত্রীকে শ্রদ্ধা জানাই। কৃতজ্ঞতা জানাই।

বলে রাখি, আমার পিতা একজন মুক্তিযোদ্ধা। কোটা সুবিধা কাজে লাগিয়ে সরকারি চাকরি পেতে আমি কখনো তদবির করিনি। বাবার মুখে শুনেছিলাম, “অসংখ্যবার মৃত্যুর খুব কাছে চলে গিয়েছিলেন যুদ্ধের দিনগুলোতে।” বাবা যদি যুদ্ধে প্রাণ হারাতেন তাহলে কি আমি বা আমার ভাই-বোনেরা পৃথিবীর আলো দেখতে পেতাম? হয়তো না। আমাদের পৃথিবীর আলোর মুখ দেখার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ আমার দাদা-দাদি সন্তানহারা হতেন। তারচেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বাবা নিজের প্রাণটায় হারাতেন। এরচেয়ে বড় সত্য, বাবা দেশের জন্য জীবনবাজি রেখেই যুদ্ধে গিয়েছিলেন। বাবার মত অন্য মুক্তিযোদ্ধারাও সেদিন দেশের জন্য, বাঙালির নিরাপদ ভবিষ্যতের জন্য যুদ্ধ করেছিলেন। স্যালুট মুক্তিযোদ্ধাদের।

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পরদিন ২২ মার্চ চট্টগ্রামের একজন বিএনপি নেতা তাদের দলীয় কর্মসূচীতে বলেছিলেন, “মুক্তিযোদ্ধা কোটা প্রথার মাধ্যমে দেশ মেধাশূন্য হয়ে পড়বে।” এই নেতার সঙ্গে পেশাগত কারণে ব্যক্তিগত সম্পর্ক আছে আমার। তবু তাঁর এবং তাঁর মত আরো যারা মুক্তিযোদ্ধা কোটার বিরোধিতাকারী তাদের সঙ্গে আমি একমত নই। কারণ, মুক্তিযোদ্ধার ছেলে মানেই দয়া করে চাকরি দেয়া হয় না। অন্য চাকরিপ্রার্থীদের মত তাদেরও চাকরির আবেদন করার মত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকে বা থাকতে হয়। তাদেরকেও লিখিত পরীক্ষা বা অন্য শারীরিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়। তাদেরকেও মৌখিক পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয়। তাহলে তারা কি কম মেধাবী?

আর দশটা শিক্ষার্থীদের মতই মুক্তিযোদ্ধার সন্তানরাও নিজের মেধার কারণেই উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করেছেন। তখন কি মুক্তিযোদ্ধার ছেলে বলে তাদেরকে পরীক্ষায় অনৈতিকভাবে পাস করানো হয়েছিল? নিশ্চয়ই না। এমন নজির তো নেই। তবু মুক্তিযোদ্ধার ছেলে বলেই তাদের মেধা এবং যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে অপমান করার অর্থ কি? আমি এমন মুক্তিযোদ্ধার ছেলেদের দেখেছি যারা কোটা সুবিধা ছাড়াই মেধার কারণে ভাল পজিশনে আছেন, সরকারি চাকরিও পেয়েছেন কোটা সুবিধা না নিয়েই।

আমাদের দেশের সরকারি চাকরিগুলোতে নিয়োগ পেতে তদবির বা আর্থিক লেনদেনের কথা প্রায় শুনি, এরকম অসংখ্য অভিযোগ আছে। তদবির করে বা অর্থ দিয়ে চাকরি নেয়ার সময় তো আমার একটিবারও ভাবি না, “গরীব ঘরের ছেলেটা আমার চেয়েও অধিক যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও চাকরি পাচ্ছে না। কারণ, তার টাকা বা “ঘুষ” দেয়ার সামর্থ্য নাই। আমি ‘ঘুষ’ দিয়ে চাকরি নিলাম, বিনিময়ে একজন মেধাবীকে অধিকার থেকে বঞ্চিত করলাম।” কেবল মুক্তিযোদ্ধার ছেলে চাকরি পেলেই গা জ্বলবে কেন?

এবার আসা যাক সেই বিএনপি নেতার বক্তব্যে। তিনি এটাও বলেছেন, ” আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে যুক্ত ব্যক্তিদেরকে রাতারাতি মুক্তিযোদ্ধা বানিয়ে মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেট দেয়া হয়েছে।” তার এ বক্তব্য নিয়ে আমার সরাসরি আপত্তি নেই। এমন অভিযোগ আগেও অনেক শুনেছি। “ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার” কথাও অনেক সময় পত্রপত্রিকায় দেখেছি। মুক্তিযোদ্ধাদের যাচাই-বাছাইয়ে কমিটিও করেছিল সরকার। ওই জায়গা থেকে বলব, যুদ্ধ না করেও যেন কেউ মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় নিজের নাম তুলতে না পারেন। এ বিষয়ে সরকারে নজরদারি অবশ্যই বৃদ্ধি করতে হবে। কিন্তু প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের মেধা নিয়ে সবসময় প্রশ্ন নয়।

উল্লেখ্য, বর্তমানে সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের জন্য ৩০ শতাংশ, ক্ষুদ্র নৃ–গোষ্ঠীর জন্য ৫ শতাংশ, প্রতিবন্ধীদের জন্য ১ শতাংশ পদ সংরক্ষিত। এছাড়া নারী ও জেলা কোটা রয়েছে ১০ শতাংশ করে। এই কোটা সংস্কারের দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন চলে আসছে। অবশ্য মুক্তিযোদ্ধা কোটা বহাল রাখার পক্ষেও অনেকে বলেছেন।

কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনকারীদের পুলিশ লাঞ্ছিত করেছেন, এটাও সমর্থনযোগ্য নয়।  প্রত্যেক মানুষের অধিকার আছে, যৌক্তিক দাবিগুলো সরকারের দৃষ্টিতে আনার। যারা কোটা সংস্কারের পক্ষে তারাও তাদের দাবির স্বপক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করতে পারবেন। শান্তিপূর্ণ অবস্থানে থেকে যৌক্তিক দাবি উপস্থাপনের সময় যদি পুলিশ ‘বাধা’ দেয় সেটাও অন্যায়। সেটাও আমি সমর্থন করি না। তবে এই বাধা দেয়ার জায়গায় মুক্তিযোদ্ধা বা তাদের ছেলেদের নামে মিথ্যা অপবাদ দেয়া অন্যায়। আমার বক্তব্য সেখানেই।

আর কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনকারীরা মুখে ৫৬ শতাংশ কোটা সংস্কারের দাবি তুলে মাঠে নামবেন আর গালি দিবেন শুধু মুক্তিযোদ্ধার ছেলেদের সেটা তো অনুচিত।