ক্যাটেগরিঃ প্রশাসনিক

সরকারি চাকরি কোটামুক্ত হচ্ছে, এমন ঘোষণা দিয়েছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। কোটা সংস্কারের দাবিতে যারা মাঠে ছিলেন তাদের জন্য এ বড় অর্জন। সংস্কার চেয়ে, একেবারে বিলুপ্তি। এর চেয়ে আনন্দের আর কি হতে পারে!

কোটাবিহীন সরকারি চাকরির ঘোষণা দিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী  একদিকে তাঁর বিচক্ষণ নেতৃত্বকে আরো বেশি সুদৃঢ় করেছেন। অন্যদিকে ছাত্রসমাজের প্রতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ভালোবাসার বহি:প্রকাশও ঘটেছে।

এটাও অস্বীকার করার উপায় নেই, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তারুণ্যের ভোট নিশ্চিত করার জন্য সরকারি চাকরির নিয়োগে কোটা তুলে দেয়ার ঘোষণা দেয়া প্রয়োজন ছিল এ মুহূর্তে । সময়ের আলোচিত ইস্যুতে রাজনৈতিক ফায়দা নেয়ার এ সুযোগ  হাতছাড়া  কেন করবেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী।  তবে এসব সমালোচনা বাদ রেখে ছাত্র সমাজের প্রতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ভালোবাসার বহি:প্রকাশটাও দেখতে হবে।

তথ্য প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম জাতীয় সংসদে বলেছিলেন, “আমাদের  গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারে সংবিধানে ২৯ (৩) এর ‘ক’ তে বলা আছে, এই অনুচ্ছেদের কোন কিছু নাগরিকদের অনগ্রসর অংশ যাহাতে প্রজাতন্ত্রের  কর্ম উপযুক্ত প্রতিনিধিত্ব লাভ করিতে পারেন, সেই উদ্দেশ্যে তাদের অনুকূলে বিশেষ বিধান প্রণয়ন করা যাইবে। সংবিধানে এই বিধানের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশে যে কোটার সিস্টেম করা হয়েছে। সেই খানে মেধার ভিত্তিতে ৪৫, নারী কোটা ১০, জেলা কোটা ১০, মুক্তিযোদ্ধা কোটা ৩০, প্রতিবন্ধী কোটা ১, ও ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠী ৫ শতাংশ। ছাত্র-ছাত্রীদের মাঝে যে বিভ্রান্তিটা ছড়িয়েছে, সেটিই হচ্ছে  জেলা কোটার ভিতরে যে কোটা বলা হয়েছে, ঢাকা বসবাসরত  যত বড় বিশ্ববিদ্যালয়ের আপনি ছাত্র-ছাত্রী হোন না কেন, ফরম পূরণ করার সময় নিচে যে জেলাটি লিখবেন সেটিই তার জেলা কোটা। এছাড়াও জেলা কোটা যদি বাদ দেওয়া হয়, তাহলে প্রাকান্তরে নিজের অধিকারকে নিজেই খর্ব করছেন।”

তিনি আরো বলেছেন, “৪ এপ্রিল ২০১৮ সালে জনপ্রশাসনের ১৭০১১০৩৫১৭৯৬  স্মারকের ‘খ’ নম্বর অনুচ্ছেদে সরকার পূর্বে নির্দেশনা জারি করেছে, সকল সরকারি নিয়োগের ক্ষেত্রে সরাসরি নিয়োগে কোন পদযুক্ত প্রার্থীর অভাবে পূরণ করা সম্ভব না হলেই,সেই সকল পদ মেধাতালিকায় শীর্ষে অবস্থানকারী প্রার্থীদের মধ্য থেকে পূরণ করিতে হইবে। এছাড়াও বলা হয়েছে, মুক্তিযোদ্ধা, নারী ও ক্ষুদ্র ও নৃগোষ্ঠীর জন্য প্রণীত জাতীয় মেধা তালিকা থেকে পূরণ করিতেই হইবে।

এমনকি ‘খ’তে বলা হয়েছে, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির পদ সমূহে সরাসরি নিয়োগের ক্ষেত্রে কোন বিশেষ কোটা মুক্তিযোদ্ধা, মহিলা, এতিম, ও ক্ষুদ্র ও নৃগোষ্ঠীর এবং শারীরিক প্রতিবন্ধী ও আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা সদস্য কোন পদ যোগ্য প্রার্থীর অভাবে পূরণ করা সম্ভব না হলেই, অপূর্ণ পদ সমূহ জেলার প্রাপ্যতা অনুযায়ী স্বস্ব জেলার সাধারণ প্রার্থীদের মধ্য থেকে মেধা তালিকায় শীর্ষে অবস্থানকারী প্রার্থী থেকে পূরণ করতেই হইবে।”

এখন তারানা হালিমের বক্তব্যের সূত্রে কি আমরা বলতে পারি, কোটা বিলুপ্তি সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক?

গতকাল বুধবার (১১ এপ্রিল, ১৮) সংসদে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন,  “অনগ্রসর জনগোষ্ঠী, পিছিয়ে থাকা জনপদের মানুষদের তুলে আনতে এই কোটা ব্যবস্থা।”

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের সূত্রে বলছি, পাবলিক পরীক্ষার ফলাফলে মফস্বলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে থাকেন। শহরের ভেতরও নামকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ফলাফল ভাল হয়ে থাকে অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর তুলনায়। এটা কি কেবল মেধার জন্য? আমি বিশ্বাস করি না, কেবল মেধার জন্য। মফস্বলের অনেক স্কুলে ভাল শিক্ষক এবং শিক্ষা উপকরণের অভাবের কথাও বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে এসেছে।

সে জায়গা থেকে তো বলা যায়, সবগুলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মান সমান করতে না পারলে রাষ্ট্রই তো মেধার বিকাশে অন্তরায়। এটা কি কোটার চেয়েও বড় সমস্য নয়? এ সমস্যা দূর না করে অবহেলিত এলাকার লোকজনকে কোটা বঞ্চিত করার আগে আরো অনেক বেশি ভাবা কি উচিত ছিল না?

তাছাড়া,  শুধু কোটা তুলে দিলেই হবে? চাকুরির নিয়োগে ‘স্বজনপ্রীতি’ ও ‘ঘুষ’ দেয়া-নেয়ার যে প্রবণতা তা কে বন্ধ করবে? এই দুটি মাধ্যম ব্যবহার করে যারা চাকুরি নিয়েছেন, নিচ্ছেন বা ভবিষ্যতেও নিবেন তারা কি মেধাবীদের বঞ্চিত করেননি? করবেন না?

যখন যে দল ক্ষমতায় থাকেন সেই দলের এমপি-মন্ত্রী বা শীর্ষ নেতারা যখন কোন চাকুরি প্রার্থীর জন্য ডি.ও লেটার দেন এবং ওই ডি.ও লেটারের উপর ভিত্তি করে যিনি চাকুরি পাচ্ছেন তিনি কি মেধাবীদের বঞ্চিত করেন নি? ভবিষ্যতেও করবেন না তার নিশ্চয়তা কি?

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনার কাছে অনুরোধ। কোটামুক্ত বাংলাদেশের পাশাপাশি সরকারি চাকরিগুলোর নিয়োগ স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় করার বিষয়টিও নিশ্চিত করুন।

এবার আসা যাক ভিন্ন গল্পে। টমাস মুরের ‘ইউটোপিয়া’র গল্প। ইউটোপিয়ায় সবাই রাজা। সবার সমান অধিকার। নারী-পুরুষ সবাই সমান। সমষ্টিগত সুখের অন্তরায় বলে ব্যক্তিগত সম্পত্তি এখানে নিষিদ্ধ। তাছাড়া, ব্যক্তিমালিকানা থাকা মানে তো ধনীরা আরো বিত্তের পাহাড় করতে চাইবে। আর আমার মত বিত্তহীনরা আরো আরো বেশি অসহায় হবে। ও, স্বর্ণ কেনার টাকা নাই বলে যারা বিয়ে করতে পারছেন না তাদের জন্য বেশিই ভাল দেশটি। কারণ, এখানে স্বর্ণ-রুপার কদর নেই। নোংরা বর্জ্য ফেলার পাত্র তৈরি করা হয় স্বর্ণ দিয়ে।

অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী দেশটির খুব সুন্দর বর্ণনা দিয়েছেন তাঁর ‘দর্শনের সুখানুসন্ধান’ প্রবন্ধে। তিনি লিখেছেন, “ইউটোপিয়া দেশটি বড় নয়। সেখানে ৫৪টি শহর আছে। সবগুলো সমান এবং সুপরিকল্পিত, একটি রাজধানী। বাড়িগুলো সব একই রকমের। তালাচাবির বালাই নেই,; ঘরের সব দরজাই খোলা, যেকোন লোক যেকোন বাড়িতে ঢুকতে পারে, ইচ্ছেমতো। সে দেশের সব মানুষই কাজ করে, তবে মাত্র ছয় ঘন্টা। শিক্ষা সবার জন্য একই প্রকারের। দিন শুরু হয় বক্তৃতাসভায় যোগদানের ভেতর দিয়ে। বক্তৃতায় সবাই যায়। পারিবারিক জীবন আছে, খাওয়াদাওয়া নিজের বাড়িতেই করা যায়, তবে অধিকাংশ মানুষই পছন্দ করে একসাথে বসে খেতে। জীবনযাপনে যাতে বৈচিত্র্য থাকে এবং গৃহের প্রতি মোহ তৈরী না হয়, সে জন্য দশ বছর পর পর বাড়ি বদল করা হয়। সরকার গণতান্ত্রিক। নির্বাচনের ভেতর দিয়ে সরকার গঠিত হয়, তবে তারাই শুধু নির্বাচিত হয়, যারা সুশিক্ষিত।”