ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

কবি বেলাল চৌধুরীকে (১২ নভেম্বর ১৯৩৮- ২৪ এপ্রিল ২০১৮) লেখা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের একটি চিঠি ছাপা হয়েছে গত শুক্রবারের (২৭ এপ্রিল, ২০১৮) একটি জাতীয় দৈনিকে।

“প্রিয় বেলাল, এই রবিবার…..।”

চিঠিটা ১৯৮৫ সালের। চিঠিটা পড়ছিলাম, আর ভাবছিলাম, মেইল ও ফেসবুক-ম্যাসেঞ্জারের এ যুগে কেউ কাউকে চিঠি লিখে? এখনকার কবি-সাহিত্যিকরা কি তার বন্ধু-স্বজনদের চিঠি লেখেন? যেগুলো আরো ৫০ বা একশ বছর পর ছাপা হবে তখনকার কোন সংবাদপত্রে! কিংবা এসব চিঠি নিয়ে ‘অমুকের একগুচ্ছ পত্র’ কিংবা ‘বিশ্বজিৎ চৌধুরীর (বিশ্বজিৎ চৌধুরী বর্তমান সময়ের একজন কথা সাহিত্যিক। দূর সম্পর্ক, নার্গিস, বাসন্তী তোমার পুরুষ কোথায় ও ফুটো’র মত জনপ্রিয় উপন্যাসগুলোর লেখক) চিঠি’ নামে কোন বই বের হবে? কিন্তু বের হওয়া উচিত।

যাদের লেখা চিঠিগুলো এখন অনন্য সম্পদ:

মাইকেল মধুসূদন দত্ত (২৫ জানুয়ারি ১৮২৪- ২৯ জুন ১৮৭৩) আত্মজীবনী লিখে যাননি। কিন্তু বন্ধু ও নিকটজনদের কাছে অনেক চিঠি লিখেছিলেন তিনি। সেইসব চিঠির কল্যাণেই তার জীবন সম্পর্কে আমরা মোটামুটি একটা ধারণা পেয়েছি। মাইকেল তার ঘনিষ্ট বন্ধু গৌরদাস বসাককে সবচেয়ে বেশি চিঠি লিখেছেন। এসব চিঠিই অমূল্য সম্পদ মাইকেলকে জানার জন্য। মধুসূদনের লেখা ‘বঙ্গভাষাপ্রীতি, স্বদেশপ্রেম, জ্ঞানানুশীলন, প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, পাশ্চাত্য কাব্য-চিন্তা’ এসব চিঠি থেকে তাকে জানা যাবে।

মাইকেল রাজনারায়ণ বসুকেও অনেক চিঠি লিখেছিলেন। মাইকেল তার বিভিন্ন কাব্যগ্রন্থ নিয়ে বলেছেন এসব চিঠিতে। ভূদেব মুখোপাধ্যায়, কেশবচন্দ্র গাঙ্গাপাধ্যায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরসহ তার ঘনিষ্টজনদের চিঠি লিখতেন মাইকেল। এসব চিঠি মধুসূদনকে গভীরভাবে জানার সুযোগ করে দিয়েছে আমাদের। তিনি বিভিন্ন ভাষায় চিঠি লিখতেন। তার বেশকিছু চিঠি নিয়ে নিয়ে একটি বইও বের হয়েছে ‘মধুসূদনের চিঠি’ নামে। যার ভূমিকায় অনুবাদক খসরু চৌধুরী লিখেছেন, “প্রকৃত অর্থে মধুসূদনের চিঠি আবিষ্কৃত না হলে মধুজীবনীর অনেক অপূর্ণতা থেকে যেত।”

 

ছবি সংগ্রহ- বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম। অলঙ্করণ- শিল্পী সমর মজুমদার।

 

আমাদের মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়া তরুণ যোদ্ধাদের লেখা চিঠি নিয়ে প্রকাশিত গ্রন্থ ‘একাত্তরের চিঠি’। এসব চিঠি পাঠ করলে আমরা বুঝতে পারি ‘অনিয়মিত যোদ্ধারা প্রাণের আবেগকে শ্রেষ্ঠ অস্ত্র বানিয়ে লড়াই করেছেন’ তার কথা।

চিঠি লিখতেন রবীন্দ্রনাথ এবং নজরুলও। প্রথম স্ত্রী নার্গিসকে লেখা নজরুলের দীর্ঘ চিঠি “কল্যাণীয়াসু! তোমার পত্র পেয়েছি সেদিন নববর্ষায় নবগন-সিক্ত প্রভাতে……।” কিংবা ফজিলাতুন্নেসাকে না পাওয়ার ব্যাথায় কাজী মোতাহার হোসেনকে লেখা চিঠির তো কোন তুলনাই হয় না। আরো অনেককেই চিঠি লিখেছেন নজরুল। এসব চিঠির মাধ্যমে আমরা তার মানস চেতনা উন্মোচন করতে পারি।

অসংখ্য চিঠি লিখেছেন রবীন্দ্রনাথও। কাজী নজরুলসহ বিভিন্ন জনকে লেখা ৫২টি চিঠির সংকলন বের করেন আমার শিক্ষক ভূঁইয়া ইকবাল। ‘রবীন্দ্রনাথের একগুচ্ছ পত্র’ শিরোনামে প্রকাশিত এ সংকলন গ্রন্থের ভূমিকায় বলা হয়েছে, “বাঙালি মুসলমান সমাজ, সমকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে হিন্দু-মুসলমান সম্পর্ক ও বিরোধ, ভারতবর্ষের স্বাধীনতা, শিক্ষা-ব্যবস্থা ও নতুন ধরনের পরীক্ষা পদ্ধতি, ধর্ম, বাংলা ভাষায় আরবি-ফারসি ও আঞ্চলিক শব্দের ব্যবহার, সাহিত্যে সাম্প্রদায়িক মনোভাব, বিদেশি কবিতার অনুবাদ প্রভৃতি নানা বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের ভাবনা-চিন্তার প্রত্যক্ষ প্রতিফলন ঘটেছে এই পত্রমালায়।”

যেমন- ১৯৪০ সালের ২৯ মে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একটি চিঠি লিখেছিলেন কাজী আহমেদকে। কাজী আহমেদ ঐ সময় ময়মনসিংহের করিমগঞ্জ জুট রেজিস্ট্রেশনের সহকারি ইন্সপেক্টর পদে কর্মরত ছিলেন। চিঠিটি ছিল এমনি-

“কল্যাণীয়েষু,
তোমার পত্রখানি পেয়ে বড় আনন্দিত হলাম। ধর্ম যদি মানুষকে বিচ্ছিন্ন করে খর্ব্ব করে তার চেয়ে শোচনীয় কিছু হতে পারে না। যারা সর্ব্ব মানুষের এক ঈশ্বরের যথার্থ বিশ্বাস রাখেন তাঁরা কোনো কারণেই মানবকে অপমান করে নিজের ধর্মকে অপমানিত করতে পারে না। এই আমার মত। ক্ষুদ্র হৃদয় যাদের ঈশ্বরের সিংহাসনকে সংকীর্ণ করে- এটা অপরাধ।
ইতি
শুভার্থী
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।”

কবি লর্ড বায়রন, লিও টলস্টয়, সুর সম্রাট বেটোফোন, নেপোলিয়নসহ পৃথিবীখ্যাত বহু ব্যক্তি চিঠি লিখতেন তার আপনজনদের। এসব চিঠি পাঠে আমরা তাদের ব্যক্তিগত জীবন, প্রেম, আবেগ এবং সমকাল সম্পর্কে একটা ধারণা পাই।

এ পর্যায়ে এসে একটি চিঠি দেয়া যাক। ১৮১৯ সালের আগস্ট মাসে প্রেমিকা তেরেসাকে দেওয়া কবি লর্ড বায়রনের চিঠিটা ছিল এমনি-

“প্রেমময়ী,
আমি তোমার মনের বাগানে ঘুরে ঘুরে তোমারই অনুভূতির ডানায় চড়ে বেড়িয়েছি। কারণ আমি তোমায় ভালোবাসি, আমি বুঝে নিয়েছি তোমার বাগানকোণে আমার প্রতি জমানো তোমার ভালোবাসা। শুধু মুখের আগল খুলে একবার বল, আমায় ভালোবাসো! সে কথা শোনার অপেক্ষার প্রহর গুনছি।
তোমারই প্রিয়।”

বহুবছর কেউ লিখে না আমাকেও:

তখন একাদশ শ্রেণিতে পড়তাম। মাসিক রহস্য পত্রিকায় দু-একটা লেখা ছাপা হয়েছিল। এরপর বেশকিছু চিঠি পেয়েছিলাম। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মেয়েদের পাঠানো সেইসব চিঠিতে ছিল বন্ধুত্বের আহবান। মধ্যবিত্তের রক্ষণশীলতার শিকলে বন্দি ছিলাম, তাই সাহস করে জবাব দিতে পারিনি। যদিও মন চাচ্ছিল। সেদিন সাহসী হলে আজ রাজশাহী, খুলনা, নওগাঁ, নোয়াখালীর মাইজদীসহ বেশ কিছু জায়গায় আমার বন্ধু থাকত।

একবার সাহসী হয়েছিলাম। দিনাজপুরের একটি মেয়ের চিঠির উত্তর দিয়েছিলাম। সেও লিখত। এভাবে কমপক্ষে আড়াই বছর। তার চিঠিগুলো ছিল অদ্ভুত ভালোলাগায় ভরা। দারুণ লিখত সে, যেন মুখোমুখি বসে কথা বলছি আমরা। কোথাও বেড়াতে গেলে তার নিঁখুত বর্ণনা দিত। চোখের সামনে ভাসত দৃশ্যগুলো। তার চিঠিগুলোর মাধ্যমে পুরো দিনাজপুর শহর আমার মুখস্থ হয়ে উঠেছে। একজন কিশোরির বেড়ে ওঠা, আবেগ ও স্বপ্ন সম্পর্কে প্রথম জেনেছিলাম তার চিঠিতে। মুঠোফোনের দিনগুলোতে এসেও যোগাযোগ ছিল কিছুদিন। কিন্তু জমত না। ধীরে ধীরে হারিয়ে যায় সেই অদেখা বন্ধু। হয়তো আমিই হারিয়েছিলাম, স্বেচ্ছায় তার আবেগকে প্রশ্রয় দিতে চাইনি বলে। যাই হোক, মুঠোফোনের দিনগুলোর তার সেই আবেগমাখা কন্ঠ এখন স্মৃতিতে নেই, তার পাঠানো চিঠিগুলোই আছে কেবল স্মৃতিগুলো উস্কে দিতে।

আরো কয়েকটা চিঠি লিখেছিলাম অন্য কাউকে, অল্প বাক্যে। আমাকেও লিখেছে কেউ কেউ। সেও অনেক বছর আগে। এখন কেউ লিখে না, আমিও লিখি না।