ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

১৯৩৬ সালের ১১ জুলাই জন্মেছিলেন কবি আল মাহমুদ।

একটা বিষয় খেয়াল করলাম, প্রয়াত এ কবির জন্মদিন নিয়ে খুব বেশি উচ্ছ্বাস নেই পাঠকদের মধ্যে। কারণ কী? মৃত্যুর আগে নিজের ব্যক্তি দর্শন নিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ ছিলেন বলে?

গত ১৫ ফেব্রুয়ারি  ইহজগতের সাথে সব সম্পর্ক ছিন্ন হয়েছিল আল মাহমুদের। সেদিন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার পর কবিকে নিয়ে বিভক্ত হয়ে পড়েছিলো তার পাঠকগণ। এমন কি যিনি সাহিত্য বোঝেন না তিনিও রাজনৈতিক মানদণ্ডে মূল্যায়ন করেছিলেন কবিকে। সেদিন সামাজিক যোগাযোগের বিভিন্ন সাইটে পাঠকদের এ মনোভাব ফুটে উঠেছিল।

তবে আমার ভাবনাটা অন্যখানে। ভাবছি,  আজ থেকে একশ বছর পরের কথা। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস লিখবেন সে সময়কার গবেষকরা। কবিতায় যাদের অবদান, এ অধ্যায়ে এসে একটি নাম তাদের লিখতেই হবে। তিনি মীর আবদুস শুকুর আল মাহমুদ। যাকে আমরা কবি আল মাহমুদ হিসেবেই চিনি।

একশ বছর পর আল মাহমুদ সম্পর্কে একজন সমালোচক হয়ত লিখবেন,  তিনি মৃত্যুর আগেও একবার মরেছিলেন। কারণ, তিনি তার আদর্শ থেকে সরে এসেছিলেন।

আরেকজন হয়ত লিখবেন, পচা শামুকে পা কেটেছিলেন আল মাহমুদ। তাই মৃত্যুর পর আল মাহমুদের শূন্যতা অনুভব করেননি সেই সময়কার  সাহিত্যিকরা।

আল মাহমুদ সম্পর্কে নিজেদের বক্তব্য সত্য প্রমাণে তারা  হয়তো রেফারেন্স হিসেবে এখনকার ফেইসবুকের কিছু পোস্ট সংযোজন করবেন। অবশ্য নিজেকে সুশীল এবং বিজ্ঞ সাহিত্যসমালোচক হিসেবে প্রচারই যে এসব পোস্টদাতাদের আসল উদ্দেশ্য সেটা ফুটে উঠবে না এইসব গবেষণায়।

একশ বছর পর হয়তো আরেকদল সমালোচক লিখবেন, ব্যক্তি আল মাহমুদের নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন থাকতে পারে। কিন্তু তার কাব্যপ্রতিভা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ নাই। যে বা যারা আল মাহমুদের নীতির প্রশ্ন তোলেন তাদের অনেকে হয়তো এটা জানেন না, আল মাহমুদ একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। অথবা জানলেও আল মাহমুদের কাব্যের স্বরুপ উন্মোচনের ক্ষমতা তাদের নেই। পাণ্ডিত্যে নিজেদের ব্যর্থতা আড়ালে তাই এরা আল মাহমুদের চরিত্র নিয়ে টানাটানি করেন। অথচ একজন কবির প্রকৃত মূল্যায়ন হওয়া উচিত তার কাব্য কতটা সমৃদ্ধ সেটার বিবেচনায়।

সত্তর বছর বয়সে সক্রেটিস যখন বিচারকদের মুখোমুখি হয়েছিলেন তখন তার বিরুদ্ধে তিনটি অভিযোগ ছিল। এর মধ্যে মারাত্বক অভিযোগ ছিল, তিনি যুবকদের নৈতিক চরিত্র কলুষিত করে তাদের বিপথে চালিত করছেন। আথেন্সের তিনজন খ্যাতিমান ব্যক্তি তথা একজন কবি, একজন বক্তা এবং একজন নেতা অভিযোগগুলো করেছিলেন।

বিচারক মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করেছিলেন রায়ে। বিচারকদের উদ্দেশ করে সক্রেটিস বলেছিলেন, আমি চলেছি মৃত্যুর দিকে, আপনারা যান জীবনের দিকে। ঈশ্বর জানেন কার দিকটা শ্রেষ্ঠ।

বিচারে অপরাধী প্রমাণিত হয়েছিলেন সক্রেটিস। অথচ মৃত্যুর পরেও এখনো বেঁচে আছেন দার্শনিক সক্রেটিস। যুগ যুগ বেঁচে থাকবেন তার কর্মে।

কোন কোন কবি এক পংক্তি লিখেই অমর। একজন আল মাহমুদও বেঁচে থাকবেন সোনালি কাবিন দিয়ে। সোনালি কাবিনেই বলেছিলেন,  ‘পরাজিত হয় না কবিরা’। আল মাহমুদকে পরাজিত করা যাবে না।

আবৃত্তি মঞ্চে স্থান না পেলেও পাঠকের হৃদয়ে জায়গা পাওয়া কবি অনন্তকাল বেঁচে থাকবেন। কবিকে পরাজিত করতে চাইলে চরিত্র নয়, বরং তার সাহিত্যের সমালোচনা করে প্রমাণ করুন এসব অখাদ্য কবিতা হয়ে উঠেনি।

জানি পারবেন না। তাই একশ বছর পরেও কবি ঠিকই ঠাঁই করে নিবেন বাংলা সাহিত্যের সোনালী ইতিহাসে। তখন হয়তো সমালোচকরা বলবেন, আল মাহমুদকে ছাড়া বিংশ শতাব্দীর বাংলা কবিতা কল্পনা করা যায় না। কবির শেষ জীবনের মতাদর্শ নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও তা একজন কবিকে মূল্যায়নে যথেষ্ট নয়। কবির মূল্যায়ন হয় তার কাব্য দিয়ে। তাছাড়া মৃত্যুর যে কয়টি বছর আগের জীবন নিয়ে আল মাহমুদ প্রশ্নবিদ্ধ তার বহু আগেই কবি হয়ে উঠেছিলেন তিনি।

 

মন্তব্য ০ পঠিত