ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

21_World+University+Student_Protest_Dhanmondi_12092015_0011

হ্যাঁ, মানছি যে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়ুয়া স্টুডেন্টদের অনেকেই সোনার চামুচ মুখে নিয়ে জন্মেছে, তাই বলে কি সবাই? তাঁদের মধ্যে অনেকেই আছে যাদের বাবা মা’র কাছে ১০০০ টাকার ৭.৫% ৭৫০ হোক আর ৭,৫০০ টাকা হোক, কিছুই এসে যায় না। তাঁরা পারলে তাঁদের সন্তানদের একটা Educational Pill খাইয়ে নিজেদের সামাজিক স্ট্যাটাস নিশ্চিত করতেন! এখন, সেই পিল বাজারে সাড়ে সাত লাখে বিক্রি হচ্ছে নাকি সাড়ে সাত কোটিতে সেটা তাঁদের কাছে আমলে নেয়ার মতো কোন বিষয়ই না!!

অন্যদিকে, অনেকের বাবা-মা তাঁদের সন্তানের লেখাপড়ার খরচ যোগাতে গিয়ে ফসলের জমিটুকু বিক্রি করে দিয়ে অন্যের জমিতে কামলা দেন, কিংবা শেষ জীবনে নিজেদের একটা মাথা গোঁজার ঠাঁই করতে তিল তিল করে জমানো সঞ্চয় ভেঙ্গে দিয়ে বাকি জীবনটা বাড়িওয়ালাকে কুর্ণিশ করতে করতে কাটিয়ে দেন। কেও আবার সন্তানের সেমিস্টার ফি’র টাকা যোগাড় করতে গিয়ে দিনের পর দিন ডাক্তারের কাছে না গিয়ে শরীরে সাময়িক আশ্রয় নেয়া ব্যাধিটাকে স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ করে দেন। মায়ের গয়না বিক্রি আর বাবা’র এক কাপড়ে তিন তিন ঈদ পার করে দেয়ার কথাটা নাহয় বাদ’ই দিলাম। উপরোক্ত কোন একটি দৃশ্যও কাল্পনিক না, এর সব ক’টির সাথে আমার বাস্তব জীবনে পরিচয় হয়েছে। কিছু নিজের ঘর থেকে, কিছু অন্যের ঘর থেকে।

যারা সেবা’র নামে এসে শাসক বনে যান, নিজেরা ট্যাক্স-ফ্রী গাড়িতে ঘুরেন, এবং জনগনের ঘাম ঝরানো আয় থেকে আখ মাড়াই কলের মত নিংড়ে বের করা ট্যাক্স এর পয়সায় অযাচিত বিদেশ ভ্রমন করেন; তাঁদের হয়তো শুধু সেই সোনার চামুচ মুখে নিয়ে জন্মানোদের সাথেই পরিচয় আছে, এর বাইরেও যে উল্যেখযোগ্য এক বিশাল জনগোষ্ঠী এই দেশেই বাস করে, তা সম্পূর্ণ তাঁদের মগজের বাহিরে।

প্রসঙ্গ হচ্ছে শিক্ষার উপর “মূল্য সংযোজন কর”। “শিক্ষা” মানুষ তথা রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে আমাদের মৌলিক অধিকারগুলোর মধ্যে অন্যতম। যা প্রতিটি নাগরিকের জন্য নিশ্চিত করার দায়িত্ত রাষ্ট্রের, আর রাষ্ট্রের অভিভাবক হিসেবে সরকারের। হিসেবমতো “বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়” বলতে কোন প্রতিষ্ঠানই থাকার কথা না, যদিও বা থাকে, তার সংখ্যা নিতান্তই নগণ্য এবং তাতে ভর্তি হওয়ার ব্যাপারটা সম্পূর্ণ ঐচ্ছিক হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু গণনা করলে দেখা যাবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়’ই সংখ্যায় বেশি! প্রশ্ন আসে, তাহলে যারা বেঃ বিঃ তে ভর্তি হচ্ছে, তাঁরা কি স্বেচ্ছায় ভর্তি হচ্ছে না? উত্তরটা হল ‘না’। রাষ্ট্রীয়ভাবে পর্যাপ্ত ব্যাবস্থা থাকলে দু’একজন ধনীর দুলাল ছাড়া কেও স্বেচ্ছায় বেঃ বিঃ তে ভর্তি হতোনা। তাঁরা সুযোগ না পেয়ে বাধ্য হচ্ছে পরিবারের অন্যান্য সুখের গলা মাড়িয়ে চার মাস অন্তঃর অন্তঃর নিজের গলা কাটাতে। আপনি বলবেন, সবাইকে তো সুযোগ দেয়া সম্ভব না, যারা যোগ্য তাঁদেরকেই সুযোগ দেয়া হচ্ছে। আমি বলবো, যোগ্যতার মাপকাঠিতেই গলদ আছে!! যোগ্যতার মাপকাঠি কি? ১০০ জনের মধ্যে যে দশজন সবচেয়ে ভালো করবে তাঁরাই সুযোগ পাবে। তাহলে বাকি ৯০ জন কি অযোগ্য? যে নব্বইজন’কে আপনারা অযোগ্য ঘোষণা করলেন, তাঁদের মধ্যে অনেকেই হয়তো ঐ দশ জনের চেয়ে মাত্র ৫ নম্বর কম পেয়েছে, কিন্তু প্রতিভার দিক দিয়ে অনেকাংশে এগিয়ে। যোগ্যতা যাচাইয়ের ব্যাবস্থাটা যদি এমন হতো; একটা নির্দিষ্ট নম্বর অর্জনকারী প্রত্যেকেই সুযোগ পাবে, তবে তথাকথিত অযোগ্যরাও যোগ্য বলে বিবচিত হতো, এবং কসাইখানাগুলোও এতো রমরমা ব্যাবসা ফেঁদে বসতে পারতনা।

একটা কথার প্রচলন আছে “এক গরু কয়বার জবাই করা যায়?” বাস্তবে একবার করা গেলেও আমাদের দেশের মানুষ একাধিকবার জবাই হন! সন্তানের মেধা থাকা সত্তেও যোগ্যতা যাচাইয়ের গ্যাঁড়াকলে পরে একটি মধ্যবিত্ত পরিবার যখন বাধ্য হয় বেঃ বিঃ নামক কশাইখানায় নিজেদেরকে কুরবানি করতে; সেটা যথেষ্ট নয়, আমাদের অভিভাবক তখন ভ্যাট নামক ছুরিতে শান দেন পুনরায় জবাই করার লক্ষে!! অভিভাবক বলছেন, ভ্যাট তো তোমরা দিবা না, যারা ব্যাবসা করবে তাঁরা দিবে। জনাব সরকার মহাদয়, মায়ের দুধে প্রোটিন/ আয়রন এতো কম ছিলোনা যে, বছরের সেরা ভুয়া কথাটা বুঝবোনা!!!
আপনার ছেলে প্রভাব খাটিয়ে ব্যাংক এর ডিরেক্টর হতে পারবে, আমার ছেলের মেধা থাকা স্বত্তেও MBA না থাকাতে ব্যাংক এ একটা চাকরিও পাবেনা! আপনার মেয়ে বিদেশ থেকে ডিগ্রী নিয়ে এসে কোন MNC’র হেড অফ মার্কেটিং হবে, আর আমার ছেলে বাংলাদেশে MBA করে দেশীয় কোম্পানির ম্যানেজারও হতে পারবে না! আপনার ছেলে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় BCS উত্তীর্ণ হয়ে ম্যাজিস্ট্রেট হবে, পর্যায়ক্রমে সচিব থেকে মন্ত্রণালয়ের DG, আর আমার মেয়ে জীবনভর প্রাইমারি স্কুলে “আ” তে আতা গাছে তোতা পাখি পড়াবে?

VAT

অভিভাবকের কথা থাকতে পারে, বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া কি গ্র্যাজুয়েশন করা যায় না? যায়, তবে তা’দিয়ে এই প্রতিযোগিতার বাজারে শুধু হকারি করে শ্রীপুরের বড়ি বেচার চাকরি পাওয়া যাবে! ব্যাবসা করার কথা বলবেন? একটু নিচের তলায় নেমে দেখেন, কী হরিলুট চলছে। একটা ব্যাবসার ছাড়পত্র পেতে গেলে এতো জায়গায় টেবিলের নীচ দিয়ে টাকা দিতে হয় যে, ব্যাবসা শুরুর আগেই মূলধন খুইয়ে বসে থাকা লাগে, তার উপর ইনকাম না হলেও ইনকাম ট্যাক্স এর খড়গ তো আছেই!! রাষ্ট্রের মতো বড় পরিসরে চিন্তা নাই’বা করলাম, একটা মধ্যবিত্ত পরিবারের সবচেয়ে বড় সম্পদ (কখনো কখনো একমাত্র) হচ্ছে একটা শিক্ষিত সন্তান, এই সম্পদকে পুঁজি করেই পরিবার’টি অর্থনৈতিক ভাবে এগিয়ে যায়। আর এই বাজারে শিক্ষিত বলতে নুন্যতম অনার্স-মাস্টার্স অথবা BBA-MBA কে বোঝায়। যা অর্জন করতে গিয়ে ঐ পরিবারের প্রত্যেকটি সদস্য যার যার অবস্থান থেকে অনেক সুখ বিসর্জন দিয়ে থাকেন, এই আশায় যে, একদিন তাঁদের এই সম্পদ তাঁদের দিন ফেরাবে, এই সম্পদটিকে ঘিরে পরিবারের অন্যরাও স্বপ্ন বুনতে থাকেন।

যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন, ভ্যাট নামক ছুরিটি ছাত্রদের গলায় চালানোর আগে একবার ভাবুন। এই ছুরির ফলায় শুধু ছাত্রটির ভবিষ্যৎই কাটা যাবেনা; আরও অনেকের আশা ভঙ্গ হবে, স্বপ্ন পূরণের রাস্তা বন্ধ হয়ে যাবে। অনেক পরিবার আছে, যাদের দুটি সন্তান থাকলেও একজনকে পড়ানোর সামর্থ্য আছে, তাঁরা তাঁদের সর্বস্ব ঐ একজনের পেছনে বাজি রেখেছেন, হয়তো বর্তমান ব্যয় তাঁরা কোনরকমে সামলে নিচ্ছেন, কিন্তু ভ্যাট নামক ছুরিটি তাঁদের গলায় চালানো হলে তাঁরা এখানেই হাল ছেড়ে দিবেন, অনেকগুলো স্বপ্ন এবং একটি পরিবারের আত্মিক যবনিকা ঘটবে…

‪#‎NoVatOnEducation‬

Facebook: https://www.facebook.com/mortuza.abdullah.9