ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

দিনে একবার পশ্চিম দিকে উস্টা (হোঁচট) খায় কিনা সন্দেহ আছে, কিন্তু ধর্ম প্রচারে ফেইসবুকে নূহ নবীকেও যেন হার মানিয়েছে!

Yellow-Journalism-Koran-Kuning
অনলাইন মিডিয়াতে ভিত্তিহীন সংবাদ প্রচারের বিষয়টি পুরনো হয়ে গিয়েছে। মেইনস্ট্রিম পোর্টালগুলো এদিক থেকে একটু পিছিয়ে থাকলেও কিছু ভুঁইফোড় পোর্টাল সংবাদের নামে বিভ্রান্তি ছড়াতে একটুও দ্বিধাবোধ করেনা। যখন তাঁদের এই বাসি-পঁচা উপাদান দিয়ে তৈরি সংবাদ পাবলিক খাচ্ছেনা; তখন তাঁরা আকর্ষণীয় গ্রাফিক্যাল এলিমেন্ট অথবা চটকদার টাইটেল এর কাভারে লাইক ভিক্ষা করতে “লিঙ্ক” নামক থলে নিয়ে ফেইসবুকে লাইন ধরেছে! যেহেতু সেই অর্থে ফেইসবুকে কোন জবাবদীহিতা কিংবা পর্যালোচনার (review) বালাই নেই, তাই যার যেভাবে খুশি ডাম্পিং জোনের মতো এখানে আবর্জনা এনে জমা করছে।

এ’তো গেলো পোর্টাল ভিত্তিক ভিক্ষুকদের গল্প, এখন আসি ব্যাক্তিপর্যায়ের কিছু ভিক্ষুকদের কথায়। এঁরা পোর্টাল ভিত্তিক ভিক্ষুকদের থেকেও ভয়ঙ্কর! পোর্টাল ভিত্তিক ভিক্ষুকদের নামকাওয়াস্তে হলেও একটা প্রাতিষ্ঠানিক পরিচিতি আছে, তাই তাঁরা হাতির শুঁড় কে পাঁচ নম্বর পা হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করেনা, এবং সরাসরি ভিক্ষা চায়না। কিন্তু ব্যাক্তিপর্যায়ের ভিক্ষুকগুলার দৌরাত্ম্য এখন সীমা ছাড়িয়ে গেছে। অন্যের লেখা চুরি করে নিজের নামে চালিয়ে দেয়া, এবং নিজের অজ্ঞতাপুর্ণ লেখায় বিখ্যাত কারো নাম ভাঙ্গানো থেকে শুরু করে হেন নিচ কাজ নেই যা তাঁরা করেনা। আজগুবি (কখনো কখনো অস্তিত্বহীন) কিছু জিনিস নিয়ে হাজির হয়, তাও যদি কম পরে যায়, এবার শুরু করে ধর্ম নিয়ে টানাটানি, এবং বেহায়া নির্লজ্জের মতো লাইক চাইতে থাকে!! আর আমাদের দেশের সরলমনা লোকজন খুব পুন্যের(!) কাজ করছেন মনে করে নিজে একটা ভিক্ষা দেন, এবং তা শেয়ার করে অন্যকেও পুণ্য কামানোর সুযোগ করে দিয়ে মনে মনে একটা তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলেন। যিনি শেয়ার করছেন তিনি ভাবেন, MLM কম্পানির মতো ওঁনারও মাল্টি লেভেলে সওয়াব আসতে থাকবে, এবং ধর্মের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলার ধারে কাছে না থাকলেও একটা বদনার ছবিতে চুমু খেলে, কিংবা ফাতেমা রাঃ কে Happy Birthday বললেই উনি দায় সারতে পারবেন। অথচ উনি জানেন না যে, লাইক ভিক্ষুকেরা নিজেদের তৈরি বস্তাপঁচা সব উক্তি বড় বড় মনীষীদের নামে চালাতে চালাতে তাঁদের সল্পবিদ্যার ভাণ্ডার নিঃশেষ করে ফেলেছে, এখন ভিক্ষাবৃত্তির নতুন কৌশল হিসেবে আমাদের দেশের মানুষের কাছে সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয় ধর্মের লেবেল লাগিয়ে, তাঁদের আবেগ কে পুঁজি করে কিছু ভিত্তিহীন জিনিস গলধঃকরন করিয়ে নতুন উদ্যমে ব্যাবসা করে যাচ্ছে। যা আপনি প্রচার করে পুন্য কামানো তো দূরের কথা, কোন কোন ক্ষেত্রে নিজের অজান্তেই পাপের ভাগীদার হচ্ছেন।

নিম্নে আমার পর্যবেক্ষণ থেকে নির্দিষ্ট কিছু বিষয় (ছবি সহ) আপনাদের সাথে শেয়ার করছি।

01
১। এই ছবিটিতে মাজার টাইপের কিছু একটা দেখানো হচ্ছে, এবং তাতে এক ব্যাক্তিকে নতজানু হয়ে চুম্বন করতে দেখা যাচ্ছে।
প্রথম কথা হচ্ছে ইসলামে আল্লাহ্‌ ব্যাতিত অন্য কারো সামনেই নতজানু হওয়া (ভক্তি দেখানোর উদ্দেশে) হারাম। ছবিতে যেই লোকটা কবর ধরে বসে আছে তাঁর তো কবর পূজার গুনাহ হচ্ছেই, আপনি শেয়ার করার কারনে যদি আর কারো ঐ কবরে মাথা ঠেকাইতে ইচ্ছা হয়, সেই গুনাহ’ও আপনার হবে! যারা হজ্জে গিয়েছেন তাঁদের জানা থাকার কথা, চুম্বন কিংবা মাথা ঠেকানো তো দূরের কথা, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মনীষী আমাদের নবীজির (সঃ) রওজাতে কাওকে এমনকি নিচুও হতে দেয়া হয়না।
দ্বিতীয় কথা হচ্ছে মাজার বা কবর জেয়ারত বলে একটা কথা আছে, যার মানে হচ্ছে কবরবাসি ব্যাক্তির সাথে দেখা করা, এবং তাঁর জন্য আল্লাহ্‌’র নিকট প্রার্থনা করা। দেখা করার মানে এই না যে, তাঁর নিকট কিছু চাওয়া, বরঞ্চ তাঁর জন্য কিছু নিয়ে যাওয়া, কবরে শায়িত ব্যাক্তিটি ICU তে লাইফ সাপোর্টে থাকা পেশেন্টের থেকেও বেশি অসহায়। ব্যাক্তিটি জীবিত থাকতে যত বড় মনীষীই থাকুক না কেন, এখন আমাদের কোন পার্থিব কিংবা অপার্থিব প্রয়োজন পূরণ করার ক্ষমতা তাঁর নেই, (হ্যাঁ শেষ বিচারের দিন যার যার অবস্থান অনুযায়ী অন্যের ক্ষেত্রে তাঁদের সুপারিশ গ্রহণ করা হবে) এমন কি তাঁর নিজের জন্যও সে কিছু করতে পারেনা, সে তাকিয়ে থাকে কখন এই পার্থিব জগত থেকে কেও একজন কোন পুণ্য করে তাঁকে উৎসর্গ করবে, কিংবা তাঁর জন্য প্রার্থনা করবে। এ বিষয়ে অনেক তর্ক-বিতর্ক আছে, সেদিকে আর গেলাম না।
তৃতীয় কথা হচ্ছে আদমের প্রথম দুই সন্তান “হাবিল” এবং “কাবিল” এঁদের কারো কবরের অস্তিত্ব (দৃশ্যমান অর্থে) অবশিষ্ট আছে কিনা? আমার জানামতে নেই। কারন তাঁদের অনেক পরে পৃথিবীতে আবির্ভূত নবীদেরই কবরের নিশানা নেই, আর তাঁরা তো নবীই ছিলনা!

02
২। নবীজির বদনা দেখলে কোন পুণ্য পাওয়া যাবেনা, বদনা ব্যাবহার করে উনি যা করতেন, তা করলে অবশ্যই পুণ্য পাওয়া যাবে!
একবার আবু হুরায়রা রাঃ বাজারে এসে বলতে লাগলেন ‘তোমরা এখানে বসে আছো? ওদিকে নবীজির ওয়ারিশের মালামাল বণ্টন হচ্ছে!’ সবাই দৌরে হাজির হলো, দেখলো কোন মালামাল বণ্টন হচ্ছেনা, কিন্তু কিছু লোক হাদিস-কুরআনের আলোচনা করছে। তাঁরা জিজ্ঞেস করলো ‘হে আবু হুরায়রা তুমি যে বললে নবীজির মালামাল বণ্টন হচ্ছে, কোথায়?’ আবু হুরায়রা বললেন ‘নবীজি তো কোন ধন সম্পদ রেখে যাননি, উনি যা রেখে গেছেন এখানে তাই বণ্টন হচ্ছে!’ সুবহানাল্লাহ্‌!!

03
৩। এই উদ্ভট বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করার রুচি হচ্ছেনা! বিশ্লেষণের ভারটা বিজ্ঞ পাঠকদের উপরেই ছেড়ে দিলাম।

04
৪। ঐ আমলে কোন ক্যামেরা ছিলোনা, আর এই আমলে সৌদিতে এমন মসজিদ শুধু স্বপ্নেই দেখা সম্ভব! তাছাড়া, ছবিতে যে ধরনের জায়নামাজ দেখা যাচ্ছে, তার প্রচলন ৫০ বছরের কিছু কম-বেশি সময় ধরে ছলছে, আর একশ বছর আগেও সৌদিতে কোন মসজিদের এমন দৈন্যদশা ছিল কিনা সন্দেহ আছে। নবীজীর আমলে তো কাপড়ের জায়নামাজ’ই ছিলোনা, তখন চামড়ার জায়নামাজ ব্যাবহার হতো!!

05
৫। এখানে প্রথম অংশে যে প্রতিদানের কথা বলা হচ্ছে, তার কোন ভিত্তি না থাকলেও তেমন আপত্তিকর কিছু নেই। কিন্তু দ্বিতীয় অংশে এসে মনে হচ্ছে এই মাত্র জিবরাঈল ফেরেশতা তাঁর নিকট ওহী নিয়ে এসেছে! এ’ধরনের কথা বিশ্বাস করলে আপনার ঈমান চলে যাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে!! ইসলামের প্রতিটি বিষয় কুরআনে সংক্ষিপ্ত এবং হাদিসে বিস্তারিত দেয়া আছে, এর বাইরে কোন ইসলাম নেই।

06
৬। মেঘ আড়াল না করার ব্যাপারটা সম্বন্ধে জানা নেই, বাকি বিসয়বস্তু আপত্তিকর না। কিন্তু লাইক ভিক্ষুকদের দৌরাত্ম্যের কিছুটা নমুনা দেখে নিন!

07
৭। আমি কুরআন ভালোবাসি, কিন্তু আমার টাকারও প্রয়োজন আছে! এখানে যেভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, তাতে মনে হচ্ছে কুরআন কে ভালোবাসলে আপনার টাকা-পয়সা সব নদীতে ফেলে দিতে হবে!! হাদিসের ভাষ্য; পরিবার-পরিজনদের জন্য হালাল উপার্জন করা এবাদাতের অন্তর্ভুক্ত।

08
৮। একটি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাঁধানোর জন্য এমন একটি ছবিই যথেষ্ট! ভাগ্যিস ছবিটিতে দেখানো ঘটনার স্থান ভারত ছিল!! মানছি ঘটনাটি অত্যন্ত ঘৃণিত এবং ন্যাক্কারজনক, এবং আমি এর তীব্র নিন্দা জানাই, যা এই ছবিটি শেয়ার করার সময় আপনার জানানো উচিৎ ছিল। ২০০৮ সালে ঘটে যাওয়া ঘটনাটি আপনি আজকে শেয়ার করে কি বোঝাতে চাইছেন? আপানার দায় শেষ? ভারতকে আপনি প্রচণ্ড ঘৃণা করেন? তাহলে এখনি আপনার মেমোরি কার্ড থেকে যত হিন্দি গান আছে তা ডিলিট করুন, আজকেই আপনার টিভি থেকে ভারতীয় চ্যানেলগুলো রিমুভ করুন, এবং আগামী ঈদে শপিংএ গিয়ে শুধু দেশীয় পণ্য কিনবেন বলে অঙ্গীকার করুন। তাতো করতে পারবেন না, শুধু শুধু ফেসবুকে আরও কিছু আবর্জনা ছড়ানোর কি দরকার?

আপনি কতটা ধর্মানুরাগী তা বাস্তব জীবনে প্রকাশ করুন, আক্ষরিক অর্থে তা অন্যকে অনেক বেশি প্রভাবিত করবে। ফাতেমা রাঃ কে Happy Birthday বললে কোন আশা পূর্ণ হয়না। বদনার ছবি শেয়ার করলে কোন পুণ্য পাওয়া যায়না…

Facebook: https://www.facebook.com/mortuza.abdullah.9