ক্যাটেগরিঃ ভ্রমণ

Day-3-06

১।
সমুদ্দুর দ্যাখতে একলা যাইতে পারবা না, সঙ্গে কাওরে লইতে হইব,
গার্ল ফ্রেন্ড রে গার্লফ্রেন্ড কইতে পারবা না, বউ কইতে হইব!

আমাদের দেশে কয়েকটা মাথামোটা তৃতীয় শ্রেণীর গর্ধব কর্তৃক প্রচলিত কিছু “পুলিশি আইন” বিভ্রাটের কারনে মাঝে মাঝে এমন সব বিরম্বনায় পরতে হয়; নিজেকে নিজের কাছে তখন ভিনগ্রহবাসি মনে হতে থাকে, যেন আমি পৃথিবীর বাসিন্দা না, জুপিটার গ্রহ থেকে আসছি!

দিন কয়েক আগে এক বন্ধুর বিয়ের নেমন্তন্ন খেতে চাটগাঁ গিয়েছিলাম। হঠাৎ মাথায় কক্সবাজার যাওয়ার ভূত সওয়ার হল, যেই ভাবা সেই কাজ, বন্ধুর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে পশ্চিমে না এসে পূর্ব দিকে রওনা হলাম। সমুদ্র এবং পাহাড়; প্রকৃতির দেয়া দুইটা অসামান্য উপহার আমাদের সুন্দর পৃথিবীটা’কে আরও রূপসী করেছে, মাঝে মাঝে মনে হয় এই দুইটা জিনিস না থাকলে পৃথিবীতে আরও একটা দিন বাঁচার আকাঙ্ক্ষা অনেকখানি কমে যেতো! এই দুইটার মধ্যে সুমদ্রই আমাকে বেশি টানে, এবং পনেরো বছর বয়সে এক বন্ধুর সাথে ঘুরতে গিয়ে এঁর সাথেই আমার কৈশোরের প্রথম প্রেম হয়। সেই থেকে শুরু, আজ অবধি যতবার তাঁর কাছে গিয়েছি প্রতিবারই নতুন করে তাঁর প্রেমে পরেছি, এমনকি ফিরে আসার পর থেকে পুনরায় প্রেয়সীর মিলনের জন্য উদগ্রীব হয়ে থাকি!!

সৃষ্টিকর্তা যদিও মাথার উপর বিশাল এক ছাদ তৈরি করে রেখেছেন, তবুও রাত কাটানোর জন্য মানুষের তৈরি একটা ছাদ তো প্রয়োজন, তো সেই ছাদের সন্ধানে একটি কটেজে উপস্থিত হলাম। কটেজের কেয়ারটেকার কে যখন বললাম আমার একটা রুম চাই, সে আমার দিকে না তাকিয়ে তাঁর (ধূসর পদার্থবিহীন) মাথাটা উঁচু করে বার বার আমার পেছনে তাকাচ্ছিল, অবশেষে মাথা এবং চোখের ব্যায়াম শেষ করে সে আমাকে জিগ্যেস করলো ‘আপনার সাতে আর কেউ নাই?’

আমিও বেকুবের মতো পেছন ফিরে একবার দেখে নিলাম, বললাম নাতো! কেন বলেন তো?
তাহলে ত আপনাকে রুম বারা দিতে ফারবো না যে।
কেন?

ফুলিশের নিশেদ আসে, হত্তে (একলা) কন গ্যাস্ট আসলে রুম বারা না দিতে।
আমার তো আক্কেল গুড়ুম! বললাম, কেন, একা কোন গেস্ট আসলে তাঁকে রুম ভাড়া দিলে অসুবিধাটা কোথায়?
কসবাযারে গ্যাস্ট্রা অ্যাকা অ্যাকা আসে চুইসাইড করতে।
এবার তো আমার বিষম খাবার যোগাড়! নিজেকে অনেক কষ্টে সংবরণ করে তাঁকে বোঝালাম যে, ভাই আমি সুইসাইড করতে আসলে পিঠে করে এতো বড় একটা বোঝা টেনে আনতাম না!! সে আমার ব্যাকপ্যাক দেখতে চাইলো, আমিও সুবোধ বালকের মতো দেখালাম। অবশেষে অনেক বাক্য বিনিময় করে তাঁকে বিশ্বাস (থুক্কু) মানাতে সক্ষম হলাম যে, আমি আত্মহত্যা করবোনা। তাঁকে বিশ্বাস আর অবিশ্বাসের মাঝে দোদুল্যমান অবস্থায় রেখে আমি আমার জন্য বরাদ্দকৃত ঘরটিতে চলে এলাম।
২।
সার, কতাই যাবেন? বালো হুটেল আসে, রুম তেকে বিস দ্যাক্তে ফারবেন যে।
চমকে পেছনে তাকালাম। এই ভোর রাতেও রিকশাওয়ালার চোখদুটো চকচক করছে। সবে মাত্র বাস থেকে নেমেছি। অফ সিজন হওয়াতে রাস্তায় তেমন লোকজনও নেই। ঢাকা থেকে আসার সময় এক বন্ধু বলে দিয়েছিলো কক্সবাজার যেয়ে যেন মূল শহরে ঢোকার আগেই কলাতলি রোডের কোথাও নেমে যাই। বেশিরভাগ ভালো হোটেল নাকি এই রোডের আশেপাশেই। রিকশাওয়ালার কথা শুনে মনে মনে খুশিই হলাম। জিগ্যেস করলাম ‘ভাড়া কত নিবেন?’
সার, আফনাকে আগে হুটেলে নিয়ে যাই, রুম ফসন্দ অইলে আফনার যা কুশি দিবেন যে।
ঠিক আছে, চলো। তবে বলে নিলে ভালো হতো।
কি বলেন সার! ব্যাবসা কি একদিনের!! আফনাকে যদি বালো হুটেলে নিয়ে যাই, কালকে হিমচরি গুরতে গেলে আমাকে ডাকবেন না? রিকশায় প্যাডেল মারতে মারতে সমর্থনের আশায় বার বার পেছন ফিরে তাকাচ্ছে।
তোমাকে পাবো কই যে ডাকবো!
আফনাকে আমার মোভাইল লম্বর দিয়ে দ্যাবো।
উত্তর শুনে আমি কিছুটা হকচকিয়ে গেলেও প্রকাশ করলাম না কিছুই। ততক্ষণে আমরা বেশ ছিমছাম একটা হোটেলের গাড়ি বারান্দায় এসে পৌঁছেছি।
ভাবী, হুটেল ফসন্দ হইসে? এতক্ষণ আমার সাথে কথা বললেও রিকশাওয়ালা এখন আমার বান্ধবীর সাথে আলাপ জোড়ার চেষ্টা করছে।
দেখে তো ভালই মনে হচ্ছে, ভেতরে গিয়ে দেখি কি অবস্থা। এই প্রথম ওঁর মুখ থেকে কথা শুনে নীরবে রিকশাওয়ালার বত্রিশ পাটি বেরিয়ে গেলো। রিকশাওয়ালার সম্বোধন শুনে আমার কিছুটা রাগই হতে লাগলো।
অ্যাই, ওকে তুমি ভাবী বলছো কেন? আপু বলো!
চরি সার! কিন্তু হুটেলে আফুকে আফনার অওাইফ বলে ফরিসয় দিবেন যে।
কেন?
না হলে আফনারা রুম ফাবেন না।
চুপ করো! রিকশাওয়ালা কে একটা ধমক লাগিয়ে আমি হোটেলের লবির দিকে হাঁটতে লাগলাম।

বিঃ দ্রঃ। নিজের বিড়ম্বনার গল্প বলতে গিয়ে (কক্সবাজারে পরিচয় হওয়া) এক বন্ধুর বিড়ম্বনায় পরার ঘটনা অবলম্বনে। গল্পটা শোনার পর তাঁকে একটা কথাই বলেছিলাম; ‘ভাই আপনার কপাল ভালো যে আপনি গার্লফ্রেন্ড’কে নিয়ে এসেছিলেন, যদি কোন মেয়ে বন্ধু নিয়ে আসতেন, যাকে আপনি শুধুই বন্ধু মনে করেন, তাইলে না জানি আপনাকে আরও কত কি দেখা লাগতো!’

৩।
লবি পার হয়ে রেসিপশান কাউন্টারে এসে দাঁড়ালাম। টেবিলের পেছনদিকে মাঝবয়সী এক লোক চিৎপটাং হয়ে ঘুমাচ্ছে। নাক ডাকার আওয়াজ অনেকটা স’মিলের গাছ কাটার কড়াতের মতো শোনাচ্ছে। ‘এই যে ভাই, শুনছেন?’ প্রথম ডাকে ঘুম ভাঙলোনা, আবার ডাকবো তার আগেই রিকশাওয়ালা এসে হাজির। আঞ্চলিক ভাষায় খানিকটা চিৎকার করে অতি দ্রুত কি যেন বললো, যার এক বিন্দুবিসর্গও আমার বোধগম্য হলোনা, কিন্তু কাজ হল! লোকটি ধড়মড়িয়ে উঠে বসলো, চোখ ডোলতে ডোলতে আমার দিকে একবারা দৃষ্টিপাত করে মনে মনে আমার গুষ্ঠি উদ্ধার করতে করতে চেয়ারটি টেনে বসলো। ‘রুম লাগব্যা?’ বলেই আমার দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাল।
জি, আমাদের একটা ডাবল রুম দরকার, নন-এসি হলেও চলবে।
নন-এসি খালি নাই, অ্যাসি রুম আসে, বার’শ টাকা, সলবে?
জি, চলবে। রুমটা একটু দেখতে পারি?
দ্যাখবেন কি বাই? আমাদের হাই ফাই হুটেল, একানে বড় বড় কুমফানিরা তেকে গ্যাসে যে!
আচ্ছা ঠিক আছে, আমদের লাগেজগুলো একটু রুমে পাঠানোর ব্যাবস্থা করেন।
‘করতেসি, আফনি অ্যাখানে আফনার নাম টিকানা ল্যাকেন’ বলে আমার দিকে হোটেলের রেজিস্টারটি ঠেলে দিল। আমি রেজিস্টার পূরণ করছি, হোটেলের ম্যানেজার আমার লেখার দিকে তাকানোর ফাঁকে ফাঁকে একটু দূরে সোফায় বসে থাকা আমার বান্ধবীর দিকে আড় চোখে তাকাচ্ছে।
নিচে আফনার অয়াইফের নাম ল্যাকেন। আমি লেখা বন্ধ করে তাঁর দিকে তাকালাম।
ও তো আমার ওয়াইফ না, ও আমার বান্ধবি! তাঁর চেহারা দেখে মনে হল এমন আশ্চর্যজনক কথা সে জীবনে এই প্রথম শুনেছে। ‘রুম কালি নাই’ বলে আমার কাছ থেকে রেজিস্টারটা একরকম কেড়েই নিল!
কেন? এইমাত্র না আপনি বললেন এসি রুম আছে, বারো’শ টাকা ভাড়া!
আমাদের অ্যাকানে কন অসামাজিক কাজ হইনা। ম্যানেজারের কথা শুনে আমি আকাশ থেকে পড়লাম!
আরে ভাই, এখানে অসামাজিকের কি দেখলেন? ও আমার বান্ধবী, মাসের তিরিশ দিনের বিশ দিনই ওঁর সাথে আমার দেখা হচ্ছে, প্রতিদিন কথা হয়, আমরা এখনও বিয়ে করিনি, কিন্তু ওঁকে ছাড়া কোথাও ঘুরতে যাওয়ার কথা আমি কল্পনাও করতে পারিনা! আপনি তো আমাকে বাধ্য করছেন মিথ্যা বলতে, নিজের সম্পর্কে ভুল তথ্য দিতে!!
বাই, অ্যাত কতা জানিনা, আমাদের অ্যাকানে হাসব্যান্ড অওাইফ সারা রুম বারা দি’না। আমাদের বাকবিতণ্ডা শুনে রিকশাওয়ালা এগিয়ে এল। আমাকে পাস কাটিয়ে ম্যানেজারের কানে বিড় বিড় করে কি যেন বলল, ম্যানেজার আমার দিকে একবার আমার বান্ধবীর দিকে একবার আড় চোখে তাকাচ্ছে, অবশেষে তাঁদের কান আর মুখ আলাদা হলো। রিকশাওালাকে হুমকির সূরে কি যেন বলল ম্যানেজার। রিকশাওয়ালা আমার কাছে এসে ফিসফিস করে বলল ‘সার আফনাকে বলেসিলাম আফুকে আফানার অওাইফ বলে ফরিসয় দিতে, অ্যাকন দ্যাকলেন ত! আমি অনেক কষ্ট করে মান্যাজার কে রাজি করাইসি আফনাকে রুম দ্যাবার জন্য, সুদু আফনার জন্য করলাম সার!! অ্যাকন আফনাকে সুদু আফুর সাতে আফনার সম্পর্ক হাঁসব্যান্ড অওাইফ বলতে হবে।’
এমনিতেই আমার মেজায খিঁচড়ে আছে, তার উপর এই ব্যাটার ন্যাকা ন্যাকা কথা শুনে মাথাটা আরও বেসি গরম হতে লাগলো। তবুও অনেক কষ্টে নিজের রাগের টুটি চেপে ধরে বললাম ‘ঠিক আছে ম্যানেরজার কে বলো যা খুশি লিখে নিতে, আমি সাইন করে দিবো’ এই বলে আমি আমার বান্ধবীর পাশে গিয়ে ধপ করে সোফায় নিজেকে ছেড়ে দিলাম।
পরিশিষ্ট।
উপরোক্ত চিত্র দুটি পাঁচ কিংবা তিন তারকা মানের হোটেল গুলোয় দৃশ্যায়িত হয়না, যা আমি পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে জানি। এছাড়া প্রায় সব শ্রেণীতেই এই উটকো ঝামেলাটা রয়েছে, বিশেষ করে দ্বিতীয় নাটকটি তো দেশের সব জায়াগায়’ই মঞ্চস্ত হয়! আমার কথা হচ্ছে, সবসময় তো আমি ঐ মান এফর্ড নাও করতে পারি, কিংবা একটু ভিন্ন পরিবেশ চাইতে পারি, যেমনটা এবার চেয়েছিলাম। আমার কথা বাদ দিলাম, অনেকে হয়তো কখনই ঐ মানের ভার বহন করতে পারবেনা, আমার বন্ধুর বিষয়টা অনেকটা এরকমই ছিল। তাহলে কি তাঁদের কপালে ইজ্জতের ফালুদাই লেখা আছে? এখানে তো মাত্র দুটো গল্প বললাম, শুধু আমার একলার পরিচিতজন’দের এমন ডজনখানেক বিড়ম্বনার গল্প আছে!

হিন্দিতে একটা বহুল প্রচলিত উক্তি আছে; “কানুন বানায়ি যাতি হ্যায় তোড়্‌নে কেলিয়ে”, যার অর্থ হচ্ছেঃ আইন বানানই হয় ভাঙ্গার জন্য। আমাদের দেশে ঐ উক্তির প্রচলন খুব একটা না থাকলেও কিছু বস্তাপঁচা আইন আমদের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে বাধ্য করা হয় তা ভাঙতে!

আরে ভাই, আমার যদি কোন কারনে মন খারাপ থাকে, কিংবা একান্ত নিজের মতো করে কিছু সময় কাটাতে চাই, অথবা শুধুই সমুদ্র দেখতে ইচ্ছে করে, কেন আমি সেখানে একা যেতে পারবোনা? কেন আমাকে সঙ্গের জন্য অন্যের দ্বারে ধর্না দিতে হবে?

অন্যদিকে, তাবৎ পৃথিবীর মানুষ প্রেম ভালোবাসার কথা বলতে বলতে মুখে ফেনা তুলে ফেলছে। প্রতি বছর এই ভালোবাসাকে কেন্দ্র করেই শত শত সিনেমা মুক্তি পাচ্ছে। কই, দুই একটা ব্যাতিক্রম ছাড়া কোন সিনেমায় দেখলামনা তো, শুধু বিবাহিত স্বামী-স্ত্রির প্রেম দেখাচ্ছে! আর সেই সিনেমা দেখতে যে সব জুটি যাচ্ছে, তাঁরা সিনেমা হলে যাওয়ার আগে কবুল বলে রেজিস্টারে সই করে কাবিননামা হাতে নিয়ে যাচ্ছে!! তাহলে প্রেম করার সময় কোথাও ঘুরতে গেলে কেন নিজের বান্ধবীকে বউ বলে পরিচয় দিতে হবে? আমার মেয়ে বন্ধু যাকে আমি অন্য ছেলে বন্ধুর থেকে আলাদা করে দেখিনা, কোন দূর ভ্রমনে গিয়ে নিজেদের সম্মান রক্ষা করতে জায়গায় জায়গায় কেন তাঁকে নিজের স্ত্রী বলে পরিচয় দিতে হবে?

পাঠকের কাছে আমার জানবার ছিল; কক্সবাজারে গিয়ে আত্মহত্যা করলে কি বেহেশত নসিব হয়? প্রেম করার সময় ডেইট করার পরিধি কি শুধু নিজ জেলা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ? ছেলে মেয়ে’তে বন্ধুত্ব কি শুধু মোবাইল ফোন আর ফেইসবুক পর্যন্তই? প্লীজ, আবার এ’কথা বলেননা যে, ছেলে মেয়ে’তে বন্ধুত্বই অবৈধ! আদৌ কি বাংলাদেশে কাগজে কলমে এমন কোন আইন আছে?

seriously-wtf