ক্যাটেগরিঃ মুক্তমঞ্চ

 

ক’দিনে আবেগের বাড়াবাড়ি আর কথার ফুলঝুরি দেখিয়া মনে হইল বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের মহা ক্ষতি হইয়া গিয়াছে! অন্তত বাঙ্গালদের ত বটেই! যখন দেখিলাম ব্যানার / ক্যাপশন লিখন – “অভিজিত – রাজীবরা না থাকিলে বাংলাদেশ থাকিবেনা!” “প্রিয় অভিজিৎ রায়! কাদের জন্য করলেন এতকিছু?

ভাবিলাম সর্বনাশ! এতটাই মূর্খ আমি যে কিছুই জানিনা, ভয়ও পাইলাম একটু বাংলাদেশ যদি না থাকে তবে থাকিবোটা কোথায়! নির্বিঘ্ন আশ্রয় পাইবার জন্য কাহার দ্বারে দ্বারে ঘুরিব? রাজনৈতিক কর্মী না অতএব রাজনৈতিক আশ্রয় আশা করাটা বাহুল্য! না লেখক না দার্শনিক না অধার্মিক, তাই মানসিক আশ্রয় যে নিবো তাহারও উপায় নাই! কারো জন্যে কিছুই করিনিও!

এমতাবস্থায় এমন মুক্তমনের প্রগতিশীল একজনের জন্য মিডিয়া, বুদ্ধিজীবি সমাজ, রাজনৈতিক দল, এমনকি জাতিসংঘ শোকাহত হইবে তাহাই স্বাভাবিক, বিজ্ঞজনেরা নিশ্চয় আমাদের জন্য অমঙ্গল চিন্তা করিবেন না ! হাঁফ ছাড়িয়া বাঁচিলাম, যখন শুনিলাম এফবিআই আসিতেছে! হতেই হবে কেউকেটা এমন একজন মহাত্মার অকাল মহাপ্রয়াণ!

বাঁচিয়া থাকিলে হইতেও পারিতেন, সূর্যসেন, প্রীতিলতার মত মুক্তিকামী বিপ্লবী বোধকরি! কিংবা হাজি শরীয়তুল্লাহ কিংবা শেরেবাংলার মতন! সমাজ, দেশ, বিশ্ব কে নতুন কোন ধারনা বা মানবতার কল্যাণে পুরনো দর্শন, যুক্তিবিদ্যা প্রচার কাজে নিয়োজিত ছিলেন কিনা কে জানে!

কিন্তু অতঃপর জানিলাম উনি বিজ্ঞানমনা লেখক ছিলেন!

ও ! নিশ্চয়ই উনি বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের অন্ধকার সুড়ঙ্গের শেষ মাথায় আলোর ব্যবস্থা করিয়াছেন! হকিংস সাহেবের মতন একজন হইলেও হইতে পারিতেন, অবশ্য না হইলেও ক্ষতি নেই! সব্বাইকে যে জগদীশ চন্দ্র বোস বা কুদরত-ই-খুদা হইতেই হইবে এমন কোন কথা নাই!

যুক্তি-তক্কো-গপ্পো করেও বাঙ্গাল সময় পার করে এগিয়েছে আজ বহুদূর!

ইহাকে উহাকে জিজ্ঞাসাবাদ করিবার পর বোধগম্য হইল তাহা যাহাই থাকুন না কেন উনারা কিছু একটা ছিলেন – সৃষ্টির প্রথম অস্থিতিশীল শূন্য কিংবা তাহারও আগে কিছু একটা; এমন মহাত্মাদের হত্যা করিয়াছে! একা ভাবিতে লাগিলাম এ দেশটা রসাতলে গেল বোধকরি এইবার!

ও! কি বলিলেন? তা ঠিকই বলিয়াছেন; মানুষ তো ছিলেন!

না মশাই! আমি একমত পোষণ করিতে পারিলাম না; মানুষের আগে প্রাণী! প্রান হইতেই প্রাণীর উৎপত্তি, তাহার পর বিভিন্ন প্রজাতি, উহার মাঝে মানুষও এক ধরনের প্রজাতি! তবে মানুষ হইতে হইলে কিছু পরীক্ষায় আপনাকে পাশ করিতেই হইবে; নকলবাজি করিয়া হইলেও।

যাহা হউক প্রান থাকিলে প্রানভোমরা উড়িয়া যাইবেই; যুক্তি-বিজ্ঞান দিয়া আটকানো যাইত কিনা তাহা বিজ্ঞান-মনস্ক রা ভাল বলিতে পারিবেন! প্রশ্ন করিতে পারেন – প্রানভোমরা কি স্বেচ্ছায় গিয়াছে, দুর্ঘটনাবশত খাঁচা খুলিয়া গিয়াছে নাকি দুর্বৃত্তরা খাঁচাকে চুরমার করিয়া দিয়াছে?

ভাবিলাম তাহাদের সমাজকর্ম সম্পর্কে খোঁজ না নেয়াটা ভারী অন্যায়! খোঁজ নিতেই দেখিলাম এমন বিষয় নিয়ে যার জন্ম মানবসভ্যতার শুরু থেকেই! আস্তিকতা বনাম নাস্তিকতা!

তাহলে তো বাতুলতা মাত্র!

তারপরেও, গেল, গেল, দেশ গেল, মুক্তচিন্তা গেল রব শুনে ভড়কে যাই! কান নিয়ে গেল নাকি চিলে?

সহমত পোষণ করিতেই হইবে এমন কথা নেই; ভিন্ন মত থাকিবে, থাকিবে তাহার মতপ্রকাশের অধিকারও! তাই বলে এতো ফ্যাসাদ! এতো দেখছি কলিকাল! সে যেভাবেই হোক, মৃত্যু দুঃখজনক। নিরস্ত্র মানুষকে হত্যাকাণ্ড নিন্দনীয় এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

ভাবিলাম আরও জানিবার চেষ্টা করি ! ঘটনার পিছনেও ঘটনা থাকিলেও থাকিতে পারে! উরিবাব্বা কেঁচো খুঁড়িতে গিয়া কেউটে বাহির হইবার অবস্থা! কেউটে বাহির হইয়াছেও!

যাহাদের নিয়ে এত আলোচনা, উদ্বেগ তাহাদের মত প্রকাশের ধরন সুস্থ মানব সন্তানের মত নয় বরং বিকারগ্রস্ত মানসিকতার এবং তাহাদের মুক্তচিন্তার প্রকাশ ভঙ্গি, ব্যবহৃত ভাষা, মুক্ত মনের স্বাধীনতার ঠাণ্ডা মাথায় ধর্ষণ ছাড়া আর কিছুই নয়! যদিও তাহারা খুবই নিম্ন প্রজাতির প্রাণীর ন্যায় নিচভাবে উস্কানি সৃষ্টি করিয়া ভিন্নমতকে কুৎসিত ভাবে অসম্মান করিয়াছে তবুও মানুষ দ্বারা তাহাদের প্রকাশ্য পৈশাচিক হত্যাকাণ্ড কোন ভাবেই অনুকম্পার যোগ্য নহে বরং গর্হিত অপরাধ।

মনে আসিল বাংলা প্রবাদ – কানা ছেলের নাম পদ্মলোচন!

পাদটীকাঃ আমাদের চিন্তার স্বচ্ছতার অভাব প্রচণ্ড! ইচ্ছে করেই হোক অথবা অনিচ্ছা করেই হোক! যখন একটা সহজ উপসংহারে আসা যায় এভাবে – একজন উগ্র অধর্মীয় প্রানীকে আর এক জন উগ্র ধর্মীয় প্রানী হত্যা করেছে! আর এতে মানবতারই ক্ষতিসাধন হয়েছে! তা না করে যখন দুই পক্ষই অপরাধী তখন পক্ষাবলম্বন করিয়া জিঘাংসা জন্ম দেয়া এবং তা থেকে সৃষ্ট অরাজকতার দায়গ্রহণ না করে স্বার্থ হাসিলের নিরন্তর প্রয়াস আমাদের। সমাজে এখন কি সবই নষ্টদের দখলে? ন্যায়বোধের মানদণ্ড কি পরিবর্তিত হয়েছে? সেই ন্যায়দণ্ড আজ কোথায়? যে ন্যায়দণ্ড মহান স্রষ্টা প্রতিটি মানবাত্মার হাতে তুলে দিয়েছেন বিবেকের আকারে?

তোমার ন্যায়ের দণ্ড প্রত্যেকের করে
অর্পণ করেছ নিজে। প্রত্যেকের ’পরে
দিয়েছ শাসনভার হে রাজাধিরাজ।
সে গুরু সম্মান তব সে দুরূহ কাজ
নমিয়া তোমারে যেন শিরোধার্য করি
সবিনয়ে। তব কার্যে যেন নাহি ডরি
কভু কারে।

ক্ষমা যেথা ক্ষীণ দুর্বলতা,
হে রুদ্র, নিষ্ঠুর যেন হতে পারি তথা
তোমার আদেশে। যেন রসনায় মম
সত্যবাক্য ঝলি উঠে খরখড়্গসম
তোমার ইঙ্গিতে। যেন রাখি তব মান
তোমার বিচারাসনে লয়ে নিজ স্হান।

অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে
তব ঘৃণা যেন তারে তৃণসম দহে।