ক্যাটেগরিঃ প্রবাস কথন

স্বপ্নের মাধুরী মিশিয়ে হাজারো মানুষ পাড়ি দেয় যুক্তরাষ্ট্রে। কেউ স্বপ্ন দেখে উচ্চশিক্ষা শেষে দেশে ফিরে গিয়ে দেশের জন্য কিছু করার। সততা, মেধা, পরিশ্রম দিয়ে তারা চেষ্টা চালিয়ে যায়। আবার কেউ স্থায়ীভাবেই থেকে যায়। আর তাদের এই রঙিন স্বপ্নে ধুলো ছিটিয়ে দেয় নাফিস আর আকায়েদের মত কিছু মানুষ।

এক নাফিস বা আকায়েদ উল্লাহ পুরো বাংলাদেশীদের চিত্র নয়। তবুও এই দুই একজনের জঘন্য কর্মকাণ্ডের জন্য বাংলাদেশীদের বাঁকা চোখে দেখে। বন্ধ হয়ে যেতে পারে ডিভি লটারী ও অভিবাসন নীতি। কারণ ট্রাম্প সরকার মনে করছে এই নীতির ফলে যুক্তরাষ্ট্রে আসার পথ সহজ হয়ে যাচ্ছে। আর এতে করে সন্ত্রাসের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।

ট্রাম্প ইতিমধ্যে বলে দিয়েছে অভিবাসন নীতি কড়াকড়ি করার। ট্রাম্প কংগ্রেসকে চেইন অভিবাসন নীতি সংস্কারের আহ্বানও জানিয়েছেন। তিনি বলেন ‘আজকের সন্দেহভাজন সন্ত্রাসী আমাদের দেশে অভিযোজিত পারিবারিক চেইন অভিবাসন নীতির মাধ্যমে প্রবেশ করেছে, যা জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন।’ প্রয়োজনে অভিবাসন নীতি বন্ধ করে দিতে হবে। এর আগে ৬টি মুসলিম দেশের ভিসা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। ইরান, সিরিয়া, ইয়েমেন, সুদান, লিবিয়া এবং সোমলিয়া। ভিসা নিষেধাজ্ঞা করার যুক্তি ছিল আমেরিকাকে সন্ত্রাসবাদের হাত থেকে নিরাপদ রাখা। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ছিল নিষেধাজ্ঞার বাইরে। বর্তমানে যে কোন মুহূর্তে তা বন্ধ হতে পারে।

আমরা জানি ১১ ডিসেম্বর ২০১৭, নিউইয়র্ক বাস টার্মিনালে সুইসাইড বোম্ব যে বিস্ফোরণ করেছিল সে একজন বাংলাদেশী। নাম আকায়েদ উল্লাহ। সাত বছর আগে দেশ থেকে এসেছিল তার পরিবারের সাথে F4 ইমিগ্রেন্ট ভিসায়। F4 কি সে কথায় পরে আসছি।

এর আগে নিউইয়র্কে (১৭ অক্টোবর ২০১২) সালে বড় ধরনের সন্ত্রাসী হামলার পরিকল্পনার অভিযোগে গ্রেফতার হয়েছিল বাংলাদেশী যুবক কাজী মোহাম্মদ রেজওয়ানুল আহসান নাফিস। এক হাজার পাউন্ড ওজনের বোমা দিয়ে নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক ভবন উড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পা করেছিল সে। মার্কিন অর্থনীতিতে আঘাত হানা ছিল তার লক্ষ্য। তার বিরুদ্ধে মামলা হয় এবং আদালতে দোষী প্রমাণিত হওয়ায় তার ৩০ বছরের জেল হয়। নাফিস যুক্তরাষ্ট্রে এসেছিল স্টুডেন্ট ভিসায়। নাফিস ২০০৯ সালে ঢাকায় নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ইলেকট্রনিক অ্যান্ড টেলিকম প্রকৌশলে ভর্তি হয়ে আট সেমিস্টার সম্পন্ন করে যুক্তরাষ্ট্রে পা বাড়ান।

তখনও তার বাবা মোঃ আহসান উল্লাহ (তখন ন্যাশনাল ব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন) ভাবেননি এই ছেলে বিপথে গিয়ে তার বুকে কষ্টের পাহাড় জমা করবে।

আকায়েদের পরিবারের যেভাবে যুক্তরাষ্ট্রে আসে। ফ্যামিলি ক্যাটাগরিতে পড়ে F4 ভিসা। ফ্যমিলিতে ৪ রকমের ক্যাটাগরি আছে। যেমন – ক, স্বামী-স্ত্রী, খ,সন্তান, গ,বাবা-মা এবং ঘ,ভাই-বোন। এই ভাইবোনদের জন্য এপ্লিক্যাশন করলে তা ফ্যামিলি ক্যাটাগরির ঘ, পড়ে যেটাকে F4 বলে। এবং এই F4 অবশ্যিই ইমিগ্রেন্ট ভিসা। ইমিগ্র্যান্ট ভিসা মানে বৈধ ভাবে আসা ও কিছু দিনের মধ্যেই গ্রীন কার্ড পেয়ে যাওয়া। যা আকায়েদের বেলায় হয়েছে। আকায়েদ তার বাবা-মার সাথে এসেছে, তার মামা আগে থেকেই আমেরিকা থাকত। সম্ভবত তার মামা তার মায়ের জন্য F4-1 মানে বোনের জন্য এপ্লাই করেছিল। সেই ক্যাটাগরিতে বোনের ছিলে হিসাবে F4-3 সেও এসেছে পরিবারের সবার সাথে।

আসুন জেনে নেই কারা এই ফ্যামিলি ভিসার জন্য এপ্লিকেশন করতে পারে? যারা আমেরিকান সিটিজেন এবং বয়স ২১ বছরের উপরে তারা ফ্যামিলির লোকদের জন্য এপ্লাই করতে পারবে এবং স্পন্সর করার যোগত্যা থাকতে হবে। এপ্লিকেশনের যে ফরমটা পূরন করতে হয় তা হল I-130. এবং এর ফি হচ্ছে বর্তমানে ৪০০ ডলার। এপ্লাই করার পর তারা পেয়েছি কি না জানাবে সঠিক হলে গ্রহণ করে জমা করে রাখবে। এই F4 ভিসা প্রসেসিং হতে সময় লাগে ১০ থেকে ১২ বছর।

অর্থাৎ বর্তমানে ২০০৪ যারা এপ্লাই করেছিল তাদের ভাই-বোনদের জন্য তাদের এখন ভিসা দিচ্ছে এবং প্রেসিং হতে কিছু ফি দিতে হয় একেকটা ফরমের জন্য এটা তারা আপনাকে বলে দিবে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে এই ভাই-বোন যদি বিবাহিত হয় তাদের সন্তান থাকলে কি আসতে পারবে। হা আসতে পারবে। তবে সন্তান ২১ বছরের বয়সের নিচে হতে হবে। ২১ এর বেশী হলে আসতে পারবে না।

স্বামী-স্ত্রী, সন্তান, বাবা-মা জন্য মাত্র এক বছরের মত লাগে। আর যদি আপনার কাগজপত্র স্ট্রং হয় যেমন টেক্স দেন সময় মত, ভালো জব করেন তাহলে আরো কম সময় লাগে। এভাবে প্রতি বছর পারিবারিক ইমিগ্রেন্ট ভিসায় মানুষ পাড়ি দেয় যুক্তরাষ্ট্রে।

আমরা যারা প্রবাসে থাকি আমাদের ব্যক্তিগত পরিচয় ছাপিয়ে যে পরিচয়টি বড় হয়ে উঠে সেটা হল আমরা কোন দেশের। ভালো-মন্দ যেই কাজ করি না কেন সাথে দেশের নামটাও চলে আসে। কেউ আসে ফ্যমিলি ভিসায়, কেউ বা ডিভি লটারীতে। আবার কেউ স্টুডেন্ট ভিসায়। যে যেভাবে আসিনা কেন আমাদের পরিচয় একটাই আমরা বাংলাদেশী।

আকায়েদ বা নাফিসরা কখনো ভাবে না যারা হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে সততা দিয়ে নিজের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করে তাদের কতটা বাস্তবতার সম্মুখীন হতে হয় এই প্রবাসে। পরিশ্রমী সৎ মানুষদের সফলতায় কালির দাগ পড়ে যায় আকায়েদের কারণে। তখন মানুষ বলে ও তুমি বাংলাদেশী আকায়েদের দেশের লোক? কি রকম একটা সুক্ষ্ম তীর ছুড়ে দেয় অনায়াসে।

যারা প্রতিদিন বাসে, সাবওয়ে যাতায়ত করে, যারা লেখাপড়ার পাশাপাশি জব করে, যারা দালালের মাধ্যমে আসে তাদের যে বাস্তবতার জীবন তা নাফিস বা আকায়েদরা কখনো ভাবে না। তারা ভাবে না আমাদের এই অপরাধের জন্য হাজারো বাংলাদেশীর দিকে তিরস্কারের তীর ছুটে আসতে পারে। ইমানী আর জিহাদি জোসে দিক শূন্য হয়ে যায়। নিরাপত্তার অজুহাতে যদি অভিবাসন নীতি বা ডিভি লটারী বন্ধ করে দেয় ট্রাম্প তাহলে অবাক হবার কিছু নেই। যদিও তিনি বলে দিয়েছেন কড়াকড়ি করার, প্রয়োজনে বন্ধ করে দেওয়ার।


এম আর ফারজানা
নিউজার্সি, যুক্তরাষ্ট্র থেকে।
১৬, ডিসেম্বর ২০১৭।