ক্যাটেগরিঃ আন্তর্জাতিক

 

ললিতকথা!

১৯৮৫ সাল।‌ নর্থ ক্যারোলাইনার ডিউক ইউনিভার্সিটিতে পড়তে গিয়েছিলেন ললিত মোদি।‌ সবান্ধবে বেরিয়েছিলেন মাদক কিনতে।‌ মওকা বুঝে মাদক বিক্রেতা ১০ হাজার ডলার ছিনিয়ে নেয়।‌ ডারহামের আদালতে মাদক বিক্রি, অপহরণ আর মারামারির দায়ে মামলা হয়েছিল ললিত মোদির নামে।‌ কিছু অপরাধ মেনে নিয়ে, অসুস্হতার অজুহাত দেখিয়ে দেশে ফেরার অনুমতি জুটেছিল, না হলে আমেরিকায় জেল খাটার কথা ললিতের।‌ বাবা কে কে মোদি বিরাট ব্যবসায়ী, গডফ্রে ফিলিপস টোব্যাকো কোম্পানিরও মালিক।‌ সিগারেট কোম্পানির বিপণনের বিস্তৃতি কাজে লাগিয়ে অনলাইনে লটারি চালু করতে বাবাকে বাধ্য করেছিলেন ললিত, ব্যবসা লাটে ওঠে।‌ অনলাইনের সরঞ্জাম কিনেছিলেন ডিলাররা, তাঁদের চটাতে চাননি কে কে, টাকা ফেরত দিতে গিয়ে ১০০ কোটি গচ্চা যায় তাঁর।‌ স্ত্রী মিনাল ললিতের থেকে ৯ বছরের বড়, নিজের মায়ের প্রিয় বান্ধবী, স্বভাবতই বিয়েটা ললিতের মা মেনে নিতে পারেননি।‌ বাবা-মায়ের সঙ্গে শুধু নয়, ললিত মধুর-সম্পর্কে বিশ্বাসীই নন।‌ ফ্যাশন টিভি-র কর্তা মাইকেল অ্যাডামের সঙ্গে ঝগড়া আদালতে গড়ায়, রুপার্ট-মার্ডককে কার্যত ঠকিয়েছিলেন ললিত মোদি।‌ স্ত্রী মিনালের ঘনিষ্ঠ বন্ধু বসুন্ধরা রাজে রাজস্হানের ক্ষমতায় আসতেই আইনকে কাঁচকলা দেখানো শুরু হয় আবার।‌ কোনও জমি বিক্রির ছাড়পত্র তাঁকে না জানিয়ে দেওয়া যাবে না, বড় বড় প্রোমোটারদের খাতির, আইন ভেঙে আমের হাভেলি কেনা, প্রতিটি সরকারি সিদ্ধান্তে নাক গলানো।‌ ‘ললিত কুমার’ নাম সই করে রাজস্হান ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য হয়েছিলেন, তাঁর আসল সইয়ের সঙ্গে কোনও মিলই নেই।‌ বোর্ড অফ ক্রিকেট কন্ট্রোল, রাজস্হান ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনকে ঠকানোর ভূরি ভূরি মামলা তাঁর নামে।‌
ক্যান্সার আক্রান্ত স্ত্রীর কথা বলে লন্ডন থেকে অন্য দেশে যাওয়ার ছাড়পত্র জোগাড় করেছিলেন ললিত মোদি।‌ গত বছর আগস্টে।‌ ভারতের বিদেশমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ বলেছেন, ‘মানবিকতার খাতিরেই’ এ ব্যাপারে তাঁর সম্মতি জানিয়েছিলেন।‌ তাঁর স্ত্রীর অস্ত্রোপচারের কারণে পর্তুগালে যেতে হবে, এরকমই নাকি বলেছিলেন ললিত মোদি।‌ ঘটনা হল, সুষমা স্বরাজ এবং ব্রিটেনের সাংসদ কিথ ভাজের দৌলতে ললিত যে ট্রাভেল ডকুমেন্ট পেয়েছেন, তার মেয়াদ ২০১৬ পর্যন্ত।‌ এর মধ্যে প্রাক্তন আই পি এল কমিশনারের আচরণ নিয়েও উঠে আসছে নানা তথ্য।‌ গত দশ মাসে আটটি দেশে তিনি ঘুরেছেন।‌ শুধু তাই নয় দেশে দেশে পার্টি করে বেড়িয়েছেন তিনি, এমন প্রমাণও রয়েছে।‌ তিনি পার্টি করেছেন অভিনেত্রী প্যারিস হিলটন, মডেল-গায়িকা-লেখিকা নাওমি ক্যাম্পবেলের সঙ্গেও।‌ যাঁর স্ত্রী ক্যান্সার আক্রান্ত তিনি দেশে দেশে পার্টি করেন কী করে? উঠছে প্রশ্ন।‌ তারকাদের সঙ্গে সেলফি তুলে তা নিজের অ্যাকাউন্টে প্রকাশ করে থাকেন আই পি এলের একদা-কর্তা ললিত মোদি।‌ সেসময়কার ইনস্টাগ্রামে ধরা আছে এরকম অনেক ছবি।‌ ফাঁস হওয়া ই-মেলগুলিতে স্বরাজ পরিবারের সঙ্গে ললিত মোদির ঘনিষ্ঠতা ও লেনদেনের ছবিটিও স্পষ্টভাবেই বেরিয়ে আসছে।‌ ২০১৩ সালে সুষমার স্বামী স্বরাজ কৌশল ললিত মোদিকে ই-মেলে লিখছেন, জ্যোতির্ময় সাসেক্সে সুযোগ পেলে খুশি হবে।‌ এর তিনদিন পরেই ব্রিটেনের লেবার পার্টির প্রভাবশালী এম পি কিথ ভাজকে ললিত লিখছেন, শ্রীমতী স্বরাজ আমাকে ফোন করে বলেছেন, ওঁদের ভাইপোকে সাসেক্সে আইন পড়ার ব্যাপারে আমরা কোনওভাবে সাহায্য করতে পারি কি না।‌ আপনি কি সাহায্য করতে পারবেন? ভাজ উত্তর দিচ্ছেন: নিশ্চয়ই।‌ আপনি ওঁকে সি ভি, অধ্যাপকের নাম ইত্যাদি পাঠাতে বলুন।‌
শুধু ভারতের বিদেশমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ নন, প্রিন্স চার্লস ও অ্যান্ড্রুর নাম ব্যবহার করেও ব্রিটিশ এমপি কিথ ভাজ বিভিন্ন দেশে যাওয়ার ছাড়পত্র ললিত মোদীকে পাইয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
ব্রিটেনের একটি সংবাদপত্রের দাবি, ললিতের ব্যাপারে এ দেশের ভিসা ও অভিবাসন দফতরের প্রধান সারা র্যা পসন এবং ওই দফতরের আধিকারিক লিজা কিলহ্যামকে একাধিক চিঠি লেখেন ভাজ। এর মধ্যে লিজাকে লেখা একটি চিঠিতে ভাজ বলেন, ‘‘সম্প্রতি ললিত মোদীর সঙ্গে প্রিন্স অব ওয়েলস (চার্লস) ও প্রিন্স অ্যান্ড্রুর দেখা হয়েছিল। মোদী তাঁদের বলেন, বোনের বিয়েতে যাওয়া ও সেশেলসের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে দেখা করা আর হয়তো হবে না। দুই রাজকুমারই বিষয়টি নিয়ে হস্তক্ষেপ করার প্রস্তাব দিয়েছেন।’’
স্বরাজ কৌশলের ভাইপো জ্যোতির্ময় কৌশল ওই বছরই সাসেক্সের কলেজে ভর্তি হন।‌ আই পি এল কেলেঙ্কারি ফাঁস হওয়ার পর বড় রকমের আর্থিক বেনিয়মের অভিযোগ ওঠে ললিতের বিরুদ্ধে।‌ তাঁর আইনজীবীদের মধ্যে আছেন সুষমার কন্যা বাঁশুরি।‌ সুষমার স্বামী তাঁর অন্যতম আইনি উপদেষ্টা।‌ ললিত মোদির ট্রাভেল ডকুমেন্ট মঞ্জুর করার জন্য গত বছর ৩১ জুলাই কিথ ভাজ এদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের অভিবাসন সংক্রান্ত দপ্তরের কর্ত্রী সারা র্যা পসনকে যে মেলটি পাঠান, তাতে উল্লেখ করেন, ভারতের বিদেশমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর কথা হয়ে গিয়েছে।‌ তিনি জানিয়ে দিয়েছেন, ভারত সরকারের কোনও আপত্তি নেই এ ব্যাপারে।‌ এর পরের দিনই, ১ আগস্ট তারিখে র্যা পসন জানিয়ে দেন, জট কেটে গিয়েছে।‌ আর সেই দিনই স্বরাজ কৌশল নাওমি ক্যাম্পবেল-সহ পৃথিবীর নানা প্রান্তের নানা শুভার্থীকে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে মেল করেন।‌ সেখানে কিথ ভাজকে ‘সুপার স্টার’ বলে উল্লেখ করেন।‌

• ললিত মোদির উত্থান
আইপিএলের চেয়ারম্যান ও কমিশনার ললিত মোদি ২০০৮ সালে প্রথম আইপিএল টুর্নামেন্টের আয়োজনের মধ্য দিয়ে রাতারাতি খ্যাতি, যশ ও প্রতিপত্তির মালিক হয়ে উঠেছেন। আয়কর কর্মকর্তারা বলছেন বেশ কিছুদিন ধরেই তাঁদের নজরে ললিত মোদি। তাঁদের এক গোপন রিপোর্টের শুরুতেই বলা হয়েছে, বছর চারেক আগেও ললিত মোদি মানে কিছু ব্যর্থ ব্যবসায়িক উদ্যোগ আর নানা বকেয়া। আর এখন ললিত মোদিও জীবনযাপন মানে ব্যক্তিগত জেট বিমান, বিলাসতরণী, এক গাদা মার্সিডিজ, বিএমডব্লু। আয়কর দফতরের সূত্রে জানা যায়, ২০০৭ সালে মোদি আগাম কর দেন প্রায় ৩০ লক্ষ টাকা। ২০০৮ সালে এসে তাঁর করের পরিমাণ দাঁড়ায় ৩ কোটি ৭৫ লক্ষ টাকা। ২০০৯ সালে আইপিএল যখন দক্ষিণ আফ্রিকায় অনুষ্ঠিত হয় তখন মোদি আগাম কর দেন মাত্র ৪৭ লক্ষ টাকা। এরপর এক সময় তাঁর করের পরিমাণ দাঁড়ায় ১৬ কোটি টাকা। অথচ, ২০০৬-এ মোদি কোনও কর দেননি। করের অঙ্কের এই তারতম্য খতিয়ে দেখবে আয়কর দফতর। বিভিন্ন পত্রপত্রিকার প্রতিবেদন থেকে জানা যায় রাজস্থান রয়েলস, কিংস ইলেভেন পাঞ্জাব এবং কলকাতা নাইটরাইডার্সে বেনামে বা নিকটজনদের নামে মালিকানা রয়েছে মোদির। এছাড়া কালো টাকার কারবার, বিদেশে অর্থ পাচার ও বেটিং-এর সাথে জড়িত ছিলেন তিনি। বেটিং বা ক্রিকেট জুয়ার কাজটা করতেন মোদির হয়ে তার বন্ধু সমীর থুকরাল। মার্চ ২০০৮ ইন্ডিয়া টুডে ম্যাগাজিনের ৩০ শীর্ষ ক্ষমতাধরের তালিকায় ছিল ললিত মোদির নাম।
বিসিসিআইয়ের সদর দফতর এবং আইপিএলের বিভিন্ন দলের দফতরে অনুসন্ধান চালিয়ে পাওয়া কাগজপত্র থেকে মোদির ২২টি ভুয়ো সংস্থার কথা জানা যায়। আয়কর দফতর জানায়, কাগজে কলমে থাকলেও বাস্তবে এই সংস্থাগুলোর কোনও অস্তিত্ব নেই। কিন্তু এই সংস্থাগুলোর মাধ্যমেই মোদি আইপিএলের অর্থ লেনদেন করতেন বলে অভিযোগ। মরিশাস, দুবাই, স্কটল্যান্ড, এমনকি ম্যাকাও দ্বীপের মতো জায়গাতেও এই আর্থিক লেনদেনগুলো হয়েছিল। যার অধিকাংশই অবশ্য সীমাবদ্ধ ছিল স্রেফ কাগজে। অর্থমন্ত্রক জানায়, ওই ২২টি সংস্থার অধিকর্তা ললিত মোদি নিজে।

• নজর ব্রিটিশ নাগরিকত্বে
প্রশ্ন উঠেছে, ললিত মোদি কি ব্রিটিশ নাগরিকত্ব পেতে পারেন? গত দু’বছর ব্রিটেনেই আছেন। সে দেশে তার ব্যবসার পরিমাণও কম না। ব্রিটিশ আইন কিন্তু অনেকটাই ললিত মোদিরই পক্ষে। একবার ব্রিটিশ নাগরিকত্ব পেলে ভারতীয় তদন্তকারীদের অনেকটাই ধরা ছোঁয়ার বাইরে চলে যাবেন তিনি। আইপিএল কেলেঙ্কারিতে নাম জড়ানোর পর ব্রিটেন পাড়ি দেন ললিত মোদি। তার পর আর তাঁকে ছুঁতে পারেননি ভারতের তদন্তকারীরা। তবে বাজেয়াপ্ত করা হয় ললিতের পার্সপোর্ট। এই অবস্থায় ২০১৪-তে দু’বছরের জন্য ব্রিটেনে থাকার অনুমতি পান আইপিএল কেলেঙ্কারির নায়ক।
লন্ডনে ললিত মোদি। বরো অব চেলসির স্লোয়েন স্ট্রিট, লন্ডনের অন্যতম সম্ভ্রান্ত ঠিকানা। এই রাস্তারই কর্নার প্লটে লোলিত মোদির বর্তমান প্রাসাদ। পাঁচ তলা বাড়িটি প্রায় সাত হাজার স্কোয়ার ফুটের। বাড়িতে রয়েছে ১৪টি ঘর, ইনবিল্ড লিফ্ট। এই বাড়িতেই এখন থাকেন ললিত মোদি। আইপিএল কেলেঙ্কারির পর ভারতে মোদির বিরুদ্ধে একাধিক মামলা চলছে। ফলে মোদি চাইছেন এবার ব্রিটেনই তাঁর দেশ হোক। কী বলছে ব্রিটিশ আইন? সে দেশে দু’লক্ষ পাউন্ডের বেশি বিনিয়োগ থাকলে ব্যবসায়ীদের নাগরিকত্বে সিলমোহর দেয় ব্রিটিশ সরকার। এই মুহূর্তে ব্রিটেনে দশ লক্ষ পাউন্ডের কাছাকাছি বিনিয়োগ রয়েছে ললিত মোদির। দশ জনের বেশি কর্মচারী রয়েছে এমন ব্যবসায়ীদের ব্রিটিশ নাগরিকত্ব পেতে সুবিধা হয়। ব্রিটিশ নাগরিকত্বের সুবিধা, ব্রিটিশ পাসপোর্ট হাতে পেলে ভিসা ছাড়াই ১৭০টি দেশে যেতে পারবেন মোদি। সহজে এড়িয়ে যেতে পারবেন ভারতীয় তদন্তকারীদের সমন।