ক্যাটেগরিঃ আন্তর্জাতিক, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

 
Modi

কেন্দ্রের কাজ মানে এখন
গয়না ভেঙে গয়না গড়ানো!

বর্ষপূর্তিতেই মোদী সরকারের মধুচন্দ্রিমা হাওয়ায় মিলিয়ে গিয়েছে। মোদীর উপর ভর করে একটা ‘বিগ ব্যাং’ সংস্কারের প্রত্যাশায় ছিলেন যাঁরা, তাঁরাই আজ বিক্ষুব্ধদের প্রথম সারিতে। ভোটের সময়ে মোদীকে ঘিরে যে ধরনের একটা অবাস্তব প্রত্যাশা ফেনিয়ে উঠে ভারতের আকাশ ছেয়ে ফেলেছিল, তারপর তো এই অতল হতাশার সাগরে ডুববারই কথা! প্রশ্নের পর প্রশ্ন ছিটকে আসছে: কোথায় লগ্নি? কোথায় চাকরি?

অথচ, সরকারের গরিমা কীর্তন করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, গত ৩৬৫দিনে সরকার নাকি এত কাজ করেছে যে হিসেব দিতে গেলে ৩৬৫ঘণ্টা লাগবে।

‘ইউ টার্ন সরকার’ নামে প্রায় প্রথম থেকেই পরিচিত হয়েছে মোদী সরকার। অতীতে বিরোধী দলে থাকার সময়ে বিভিন্ন প্রশ্নে দলের অবস্থান এবং লোকসভা নির্বাচনের প্রচারে স্বয়ং মোদীর ভাষণে উচ্চারিত বহু অবস্থানে ১৮০ডিগ্রি ঘুরে গিয়েই এই উপাধি কুড়িয়েছে মোদী সরকার। এক বছর কেটে গেল। এখনও কালো টাকা ফেরত এনে দেশের ১২৫ কোটি মানুষের প্রত্যেকের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে পনেরো লক্ষ টাকা করে জমা পড়েনি। পনেরো লক্ষ টাকা পাওয়ার আশায় কত জন বসে ছিলেন, বলা মুশকিল। কিন্তু, নরেন্দ্রভাই দিল্লির মসনদ আলো করে বসলে ‘অচ্ছে দিন’ আসবেই, এই বিশ্বাস ছিল অনেকেরই মনে। কিংবা নরেন্দ্র মোদীর ভাষণ অথবা অরুণ জেটলির বাজেট বক্তৃতা শুনে, অথবা অরবিন্দ সুব্রহ্মণ্যনের অর্থনৈতিক সমীক্ষা পড়ে তাঁদের মনে হতেই পারে, আহা! এই তো সুদিন সমাগত।

সরকারি ভাবনার প্রমাণ খুঁজলে হাতের কাছেই অরুণ জেটলির বাজেট রয়েছে। জেটলি শিক্ষা খাতে মোট ৬৮,৯৬৮ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছেন। গত বাজেটে বরাদ্দ ছিল ৬৮,৬২৮ কোটি টাকা। টাকার অঙ্কেই বৃদ্ধির পরিমাণ ০.৪৯ শতাংশ। স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ হয়েছে ৩৩,১৫২ কোটি টাকা। গত বছর এই খাতে বরাদ্দের পরিমাণ ছিল ৩৫,১৬৩ কোটি টাকা। মানে, সরাসরি বরাদ্দ কমেছে। বাজেটে খাদ্যের অধিকার আইনের উল্লেখ নেই কোথাও। নারী ও শিশুকল্যাণের খাতে বাজেট বরাদ্দ কমেছে ৪৪ শতাংশ। নির্বাচনী ভাষণে মোদী অর্থনীতিকে ধোঁয়াশায় ঢেকে রেখেছিলেন। তাঁর শাসনের এক বছরে সেই অনিশ্চয়তা গভীরতর হয়েছে। তিনি বিনিয়োগকারীদের সংস্কারের গল্প শুনিয়েছেন, সাংসদদের বলেছেন জনসভায় সরকারের কৃষকদরদি অবস্থান ব্যাখ্যা করতে। শেষ পর্যন্ত তাঁর অর্থনীতি কোথায় পৌঁছোবে, এক বছরে তার আঁচটুকুও পাওয়া যায়নি।

কালো টাকা ফেরত আনা, বিমায় বিদেশি বিনিয়োগ, খুচরো ব্যবসায়ে বিদেশি বিনিয়োগের অনুমতি, পণ্য পরিষেবা করের মতো একের পর এক প্রশ্নে মোদী সরকার পূর্বের অবস্থান বদল করেছে। ইউ পি এ–র নীতিই অনুসরণ করেছে। এ যেন সেই সাহেব বিবি গোলাম-এর যুগের জমিদারবাড়ির গিন্নিদের কাহিনি। কাজ বলতে গয়না ভেঙে গয়না গড়ানো!

আশ্বাস ছিল ‘আচ্ছে দিন’-এর। কিন্তু মোদী সরকারের বর্ষপূর্তিতে প্রশ্ন একটাই, পরিবর্তন কিছু হলো কি?

অর্থনীতির দিকে তাকালে অবশ্য বদল তেমন কিছু চোখে পড়ছে না। দেশের বাজারে চাহিদা নেই। বিদেশের অবস্থাও তথৈবচ। সুতরাং হাত গুটিয়ে দেশি-বিদেশি সব লগ্নিকারীই। এমনকী, শিল্প-উৎপাদনের সূচক (আইআইপি) বৃদ্ধির হার কমছে। কারখানা, নির্মাণ শিল্প, হোটেল ব্যবসা, পরিবহণ, যোগাযোগ, আবাসন, আর্থিক পরিষেবা— সব ক্ষেত্রেই ছবিটা এক। নতুন শিল্পের জন্য ব্যাঙ্ক থেকে ঋণ নেওয়া হচ্ছে না। এই জড়তা কাটাতে সংস্কারের প্রশ্নে যতটা সাহসী হওয়ার দরকার ছিল, তা-ও দেখাতে ব্যর্থ কেন্দ্র। নরেন্দ্র মোদী প্রধানমন্ত্রীর গদিতে বসার এক বছর পরে অর্থনীতি ঘিরে এই উদ্বেগটাই দেখা দিচ্ছে বড় হয়ে।

কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলির অবশ্য ব্যাখ্যা, ‘‘ইউপিএ-আমলের শেষ পর্যায়ে অর্থনীতিতে যে হতাশার পরিবেশ তৈরি হয়েছিল, এক বছরে তা কেটে গিয়েছে। আমরা যে আর্থিক বৃদ্ধি ও উন্নয়নের পথে হাঁটতে চাই, তা নিয়ে কারও মনে কোনও অস্পষ্টতা নেই।’’ তাঁর মতে, বৃদ্ধির হার খুব দ্রুত ১০ শতাংশ ছোঁবে। কিন্তু বাস্তব বলছে— বৃদ্ধির হারে এই বাড়বৃদ্ধির একটা বড় কারণই হলো হার নির্ধারণের মাপকাঠিটা পাল্টে ফেলা, শিল্পমহলের উদ্দীপনা নয়। মোদী ক্ষমতায় আসার সময় তাঁকে ঘিরে শিল্পপতিদের যে আগ্রহ ছিল, এক বছর পরে তা কার্যত উধাও।

বি জে পি দাবি করছে, দেশের অর্থনীতির হাল এখন অনেক ভালো। ‘ব্যবসায়ের পক্ষে সহায়ক আবহাওয়া’ তৈরি হয়েছে। এ কথা ঠিক যে এই সময়ে বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী দ্রুত কিছু সুবিধা আদায় করে নিতে পেরেছে। বিশেষ করে আদানি গোষ্ঠীর মতো মোদী-ঘনিষ্ঠরা। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর বহুচর্চিত ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ স্লোগানের কোনো বাস্তবায়ন হয়নি। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধির চেষ্টায় তাদের ওপরে কর কমানো হয়েছে, ঢালাও সুবিধার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এ বছরেরই প্রত্যেক মাসে আগের মাসের তুলনায় কমে গেছে বিদেশি পোর্টফোলিও বিনিয়োগ। জানুয়ারিতে তা ছিলো ৩৩,৬৮৮কোটি টাকা, ফেব্রুয়ারিতে কমে হয় ২৪,৫৬৪কোটি টাকা, মার্চে ২০,৭২৩কোটি টাকা, এপ্রিলে ১৫,২৬৬কোটি টাকা। মে মাসের প্রথম দু’সপ্তাহেই দেশ থেকে প্রায় ১৭হাজার কোটি টাকা বের করে নিয়ে গেছেন বিদেশি বিনিয়োগকারীরা। আর মোদী সরকারের এক বছর পূর্তির প্রচারের গ্যাসবেলুন প্রকারান্তরে ফাটিয়ে ‘ফাঁকা আওয়াজ’, ‘ভাঁওতাবাজি’ বাক্যবাণে মোদী সরকারকে বিঁধেছে মার্কিন দুই পত্রিকা।‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ প্রকল্পকে ‘স্রেফ ভাঁওতাবাজি’ বলে কটাক্ষ করেছে নিউ ইয়র্ক টাইমস এবং ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল। মোদী জমানার এক বছর পূর্তি উপলক্ষে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর একটি পর্যালোচনা রিপোর্টে বলা হয়েছে, পরিবর্তন ও অর্থনৈতিক সংস্কারের আশায় এক বছর আগে নরেন্দ্র মোদীর হাতে দেশের ভার তুলে দিয়েছিল ভারতের ভোটারদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ। ক্ষমতায় আসার পর উৎপাদন এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধির লক্ষ্যে ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ অভিযান হই হই করে শুরু করেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। উৎপাদনে গতি বাড়িয়ে কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে এই অভিযান করলেও এক বছর পর দেখা যাচ্ছে যত ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে বলা হয়েছিল তত সাফল্য আসেনি। বস্তুত গোটা বিষয়টি হয়ে দাঁড়িয়েছে অতিরঞ্জিত প্রচার মাত্র। তাঁর এই অভিযান প্রতারণা ছাড়া আর কিছুই নয়। অর্থনৈতিক বিকাশের মাপকাঠিতে ফেললেই বোঝা যাবে, কীভাবে ধুঁকছে ভারতের অর্থনীতি। এই রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে, গতবছর মূলধনী বিনিয়োগ কমে গিয়েছে। গত পাঁচ মাসে রপ্তানিও কমে গিয়েছে। কর্পোরেটদের আয়ও তেমন বাড়েনি। মে মাস পর্যন্ত বিদেশী প্রাতিষ্ঠানিক লগ্নিকারীরাও ভারতীয় শেয়ার বাজার ও বন্ড থেকে ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার তুলে নিয়েছে। নিউ ইয়র্ক থেকে প্যারিস, আবার সেখান থেকে সিডনি ঘুরে বেড়ালেও অর্থনীতির মূল ক্ষেত্রগুলির সংস্কারে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছেন মোদী। ফলে বিনিয়োগকারীরা বীতশ্রদ্ধ, যাঁরা ভেবেছিলেন সরকার পরিবর্তন হলে অর্থনৈতিক চিন্তাভাবনারও আমূল বদল ঘটবে।

মোদী সরকারের এক বছরে আরো বেহাল হয়েছে গ্রাম ভারতের অর্থনীতি। ফসলের দর কমেছে, সহায়ক মূল্যের বৃদ্ধির হার সবচেয়ে কম, উত্তর ও পশ্চিম ভারতে ফসলহানির ঘটনায় হাহাকার পড়ে গেছে। সরকার কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেনি। মোদী বলেছিলেন, ফসলের দামে কৃষকদের উৎপাদন খরচের তুলনায় অন্তত ৫০শতাংশ লাভজনক দাম দেওয়া হবে। এই প্রতিশ্রুতি বেমালুম ভুলে মেরেছেন তিনি। সোমবারই মথুরায় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, কৃষকের আত্মহত্যা নিয়ে রাজনীতি করতে চাই না, দুর্দশার কারণ খুঁজে বের করতে চাই। একথা বলতে তিনি বাধ্যই হচ্ছেন কেননা গত পাঁচ মাসে কৃষকদের আত্মহত্যার ঘটনা দ্রুত হারে বেড়েছে। এরই ওপরে জমি অধিগ্রহণ নিয়ে নতুন বিল কৃষকের আশঙ্কা বাড়িয়েছে। ইউ পি এ আমলে গৃহীত আইনের সংশোধন করে কৃষকের সুরক্ষার শর্ত শিথিল করে জমি অধিগ্রহণ বিল সম্পর্কে বিরোধীদের অভিযোগ, কর্পোরেটের হাতে জমি তুলে দিতেই এই বেপরোয়া পথ নেওয়া হচ্ছে। তার উপর, মোদী সরকারের বারো মাসে বিভিন্ন সামাজিক কল্যাণ খাতে বাজেট বরাদ্দ হ্রাস করার মোট পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লক্ষ ৭৫ হাজার ১২২ কোটি টাকা। তাহলে ‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ’ কীভাবে হবে? বস্তুত, একদিকে গরিব মানুষের কল্যাণের দায়-দায়িত্ব মোদী সরকার তার কাঁধ থেকে ঝেড়ে ফেলছে এবং অন্যদিকে, নিয়ন্ত্রক হওয়ার বদলে শিল্প-বাণিজ্য বাড়ানোর সুযোগ-সুবিধাদায়কের ভূমিকা পালন করছে।

ভারতে ১০০ ব্যক্তি ২৫ শতাংশ জিডিপির সমান সম্পদের মালিক। ভারতে পুঁজিবাদ সম্পর্কিত পুরো বিতর্ক এটা নিয়ে। এখানে যা ঘটছে, অতীতে ঠিক তা-ই ইউরোপ ও আমেরিকায় ঘটেছিল। ভারতের একটি এলিট শ্রেণি আছে যারা বাইরের পরিমন্ডলে ছিটকে গিয়েছে। সেখান থেকে তারা গ্রামবাসী আর আদিবাসী জনগণের বাস করা ভূমির দিকে, বক্সাইডের দিকে, লোহার খনির দিকে, জলের দিকে, বনের দিকে নজর দিচ্ছে। তারা কেবল বলছে, তাদের পাহাড়গুলোতে আমাদের বক্সাইড সেখানে পড়ে আছে কেন? তাদের নদীতে আমাদের জন কেন? এটা হলো শোষণের অর্থনীতি। যে অর্থনীতির পৃষ্ঠপোষকতা করছে মোদী সরকার।

দেশের মানুষ বলা শুরু করেছেন, বছর তো ফুরোল, ‘অচ্ছে দিন’ এখনও অধরা কেন? তাঁর নির্বাচনী প্রচারে অর্থনীতি বিষয়ে এক আশ্চর্য ধোঁয়াশা তৈরি করেছিলেন নরেন্দ্র মোদী। এক বছর পরে জমা-খরচের হিসেব মেলাতে গিয়ে দেখা যাচ্ছে, প্রাপ্তির ঘর এখনও প্রায় শূন্যই। আসলে মোদী সরকার শুধু বিজ্ঞাপন ও বিপণনটাই ভাল বোঝে। কিন্তু এক বছরে বিনিয়োগের পরিবেশে যেমন বদল হয়নি, তেমনই কাজের সুযোগ বাড়েনি। মানুষও বুঝতে পারছে সুদিনের প্রতিশ্রুতি ছিল শুধু বলার জন্য বলা।